হাই কোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট, বিপাকে তৃণমূল! একনজরে আইপ্যাক মামলা
ED Raid on I-PAC: ১৫ জানুয়ারি শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করে জানায়, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কাজে রাজ্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ হতে পারে কি না, এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুতর এবং এর সাংবিধানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। হাই কোর্টে শুনানি চলাকালীন যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট।
আইপ্যাক দফতরে ইডির তল্লাশি অভিযান ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক শুধু রাজনৈতিক স্তরেই নয়, বিচারবিভাগীয় স্তরেও ক্রমশ জটিল আকার নিয়েছে। এই মামলার সূত্র ধরে কলকাতা হাই কোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত আইনি টানাপড়েন তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ৮ জানুয়ারি। ওই দিন সকালে তৃণমূল কংগ্রেসের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের কর্ণধারের বাড়িতে এবং আইপ্যাকের সল্টলেকের অফিসে ইডি অভিযান চালায়। সেই খবর পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী পৌঁছে যান প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি এবং আইপ্যাকের অফিস দু’জয়গাতেই। কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযান চলাকালীনই তাঁকে সবুজ ফাইল হাতে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। তারপরই বিজেপি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। তৃণমূল সুপ্রিমো অভিযোগ তোলেন, নির্বাচনের আগে ভোট কৌশল চুরি করতেই ইডির এই অভিযান।
এই ঘটনায় ইডির বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয় শেক্সপিয়র সরণী থানায় এবং দু'টি বিধাননগরের ইলেকট্রনিক কমপ্লেক্স থানায়। এই ঘটনায় জোড়া মামলা দায়ের হয় কলকাতা হাই কোর্টে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার বিরুদ্ধে মামলা করে তৃণমূল। পাল্টা মামলা করে ইডিও।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Pratik Jain I-PAC: ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরেই সিটিজেনস ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্নেন্স নামের একটি সংস্থা তৈরি করেন প্রতীক। সংস্থাটি ছিল গুজরাটের আহমেদাবাদে। উনিশ মাস এখানে কাজ করেন তিনি। সেখানে কাজ করতে করতেই তাঁর সাক্ষাৎ প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে।
৯ জানুয়ারি কলকাতা হাই কোর্টে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের বেঞ্চে আইপ্যাক সংক্রান্ত মামলার শুনানি নির্ধারিত ছিল। কিন্তু এজলাসে অস্বাভাবিক ভিড় জমে যাওয়ায় কার্যত শুনানি সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ নিজেই শুনানি মুলতুবি রেখে ১৪ জানুয়ারি পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন। আদালতের কাজকর্ম স্বাভাবিক ভাবে চালানো যায়নি, এই বিষয়টি ওই দিন বিচারপতির পর্যবেক্ষণেই উঠে আসে।
এরপরই পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। ইডির তরফে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে একটি আবেদন জানানো হয়। সেই আবেদনে দ্রুত শুনানির পাশাপাশি বিচারপতির বদলের দাবিও তোলা হয়। তবে এই আবেদনের বিষয়ে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি কোনো হস্তক্ষেপ করেননি। বিচারপতির বদল বা বিশেষ বেঞ্চ গঠনের বিষয়েও কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
এই অবস্থায় ইডি আরও এক ধাপ এগিয়ে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। ইডি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানানোয় ১৪ জানুয়ারি কলকাতা হাই কোর্টে নির্ধারিত শুনানির আগে আবার নতুন জটিলতা তৈরি হয়। ইডির তরফে হাই কোর্টে জানানো হয়, যেহেতু বিষয়টি এখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন, তাই হাই কোর্টে শুনানি আপাতত মুলতুবি রাখা হোক। এদিন ইডির আইনজীবী আদালতে সওয়ালে বলেন, ইডি আইপ্যাক দফতর থেকে কোনো নথি বাজেয়াপ্ত করেনি। যদি কেউ নথি বাজেয়াপ্ত করে থাকেন, তাহলে তা মুখ্যমন্ত্রী করেছেন। তৃণমূলের উচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মামলা করা। তৃণমূলের করা মামলার কোনো ভিত্তি নেই, এবং তাঁদের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। ইডির আইনজীবীর সওয়ালের ভিত্তিতে তৃণমূল কংগ্রেসের করা মামলার নিষ্পত্তি করে দেয় কলকাতা হাই কোর্ট।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
CBI And BJP TMC Govt: দুর্নীতি মামলায় সিবিআইয়ের সাফল্যের হার মাত্র তিন শতাংশ কেন? প্রশ্ন তুলছে বাংলা যা ভাবছে।
এই গোটা ঘটনাক্রমই পরে সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে বিশেষ গুরুত্ব পায়। ১৫ জানুয়ারি শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করে জানায়, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কাজে রাজ্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ হতে পারে কি না, এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুতর এবং এর সাংবিধানিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। হাই কোর্টে শুনানি চলাকালীন যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট।
ইডির অভিযোগ, অবৈধ কয়লা পাচার মামলার তদন্তের সূত্রে আইপ্যাক কর্ণধারের বাড়ি ও দফতরে তল্লাশি চালাতে গেলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্তে বাধা দেন। সংস্থার দাবি, ইডি আধিকারিকদের কাছ থেকে তথ্য ও নথি নিয়ে নেওয়া হয় এবং পরে উল্টে তাঁদের বিরুদ্ধেই এফআইআর দায়ের করা হয়। এমনকি সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগও তোলে ইডি। সলিসিটর জেনারেলের বক্তব্য, পিএমএলএ আইনের আওতায় ইডি কোনো সাধারণ দফতর নয়, বরং অবৈধ ভাবে উপার্জিত সম্পত্তি চিহ্নিত ও বাজেয়াপ্ত করাই তাদের দায়িত্ব।
এর পাল্টা রাজ্যের তরফে কপিল সিব্বল ও অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, মুখ্যমন্ত্রীর ঘটনাস্থলে যাওয়া অস্বাভাবিক নয় এবং তল্লাশিতে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। তাঁদের যুক্তি, এই মামলার শুনানি হাই কোর্টেই হওয়া উচিত এবং সুপ্রিম কোর্টে মামলা এনে ফোরাম শপিং করা হয়েছে।
উভয় পক্ষের সওয়াল শুনে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, এই মামলায় একটি অত্যন্ত গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠে এসেছে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তদন্তে রাজ্য সরকারের সংস্থাগুলি হস্তক্ষেপ করতে পারে কি না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মত আদালতের। একই সঙ্গে ইডির বিরুদ্ধে পুলিশের দায়ের করা এফআইআরের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পুলিশি তদন্তও বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের নির্দেশও দিয়েছে আদালত। মামলার পরবর্তী শুনানি ধার্য করা হয়েছে ৩ ফেব্রুয়ারি।





