ক্রোয়েশিয়ার ক্রোধ নাকি বড় ভুল, কেন ছিটকে গেলেন নেইমাররা?
Brazil knocked out: রদ্রিগোর শট বাঁচিয়ে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের স্বপ্নভঙ্গ করলেন ক্রোয়েশিয়ার সেই গোলরক্ষক লিভাকোভিচ।

আল রাইয়ানে আজ ভারতীয় সময় রাত সাড়ে আটটায় বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল। বিশ্বকাপে গত কুড়ি বছরে গ্রুপ পর্ব পার হয়ে নকআউট ইউরোপিয়ান কোন দলের বিরুদ্ধে জিততে পারেনি লাতিন আমেরিকার এই দলটি। তাই ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে এটা ছিল ব্রাজিলের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু, চেষ্টা করেও সেই চ্যালেঞ্জ সম্পূর্ণ করতে পারল না তীতের দল। নেইমারের সমস্ত চেষ্টা বিফল করে দিলেন ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক লিভাকভিচ। ইতিহাস বদলে দিয়ে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের প্রথম সেমিফাইনালিস্ট হলো ক্রোয়েশিয়া।
২০০৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স, ২০১০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডস, ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জার্মানি, ২০১৮ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। ২০২২ বিশ্বকাপে সুযোগ ছিল নেইমার ক্যাসেমিরুদের কাছে। কিন্তু, পেটকোভিচ ও লিভাকভিচের যৌথ প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হল নেইমারের অভাবনীয় সেই গোল।
২০০২ বিশ্বকাপের নক আউটে সর্বশেষ কোন ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষকে হারাতে পেরেছিল ব্রাজিল এবং সেই আসরে চ্যাম্পিয়ন হয়ে পঞ্চম বারের মতো শিরোপা জিতেছিল লাতিন আমেরিকার এই দলটি। তবে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ১০০ ভাগ অপরাজিত থাকা রেকর্ড ছিল ব্রাজিলের কাছে। আজকের আগে চারবার মুখোমুখি হয়ে তিনটি জয় এবং একটি ম্যাচে ড্র করেছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। তাই আজকের ম্যাচ ব্রাজিলের কাছে ছিল অনেকটাই বেশি কনফিডেন্সের। কিন্তু কোথাও একটা ভুল হয়ে গেল থিয়াগো সিলভা ও অ্যালিসন বেকারের।
আজকের ম্যাচে প্রথম থেকেই ব্রাজিলকে চাপে রাখার চেষ্টা করছিল ক্রোয়েশিয়া। ব্রাজিলকে প্রথম থেকেই ব্লক করার ট্যাকটিক নিয়ে এগিয়েছিলেন লুকা মদরিচরা। ফলে বরের নিয়ন্ত্রণ বেশি ছিল ক্রোয়েশিয়ার পায়ে। ১৩ মিনিটের মাথায় প্রতি আক্রমণ থেকে গোলের চেষ্টা করেছিল ক্রোয়েশিয়া। ডান দিক থেকে ক্রস করে মদরিচ তার সহ খেলোয়ার পেরিসিচের কাছে বল বাড়ালেও সেই ক্রসে পা ঠেকাতে পারেননি তিনি। প্রথম থেকেই অতিরক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেলা শুরু করেছিল ক্রোয়েশিয়া। ব্রাজিলের কোন ফুটবলার বল ধরতে এলেই তাকে ঘিরে ধরছিলেন ৩-৪ জন। তবে ব্রাজিলের ফুটবলাররা একেবারে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলেন না।
২২ মিনিটের মাথায় পরপর দুটি আক্রমণ করে ব্রাজিল। প্রথমটি আসে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের কাছ থেকে এবং পরের আক্রমণটি করেন নেইমার জুনিয়র। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ার দুর্দান্ত রক্ষণভাগ আটকে দেয় সেই আক্রমণ। ফাউল-পাল্টা ফাউলের খেলায় বারবার নেইমারকে আটকানোর মরিয়া প্রচেষ্টা করে ক্রোয়েশিয়া। আর সফলতাও পায় অনেকবার।
তবে ৪২ মিনিটের মাথায় একটা গোলের সুযোগ তৈরি করতে পেরেছিল ব্রাজিল। ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে বক্সের সামান্য বাইরে ফ্রি কি করা হলে নেইমারের পাস বিপক্ষ ফুটবলের গায়ে লেগে শট অন টার্গেট হয়ে যায়। কিন্তু সেখানেই বাধা হয়ে দাঁড়ান গোলরক্ষক লিভাকভিচ।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হতে না হতেই গোলের জন্য রীতিমতো মরিয়া হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের খেলোয়াররা। তবে সেখানেই শুরু হয় বিতর্ক। ক্রোয়েশিয়ার এক ফুটবলের হাতে বল লাগলেও রেফারি ভারের সঙ্গে পরামর্শ করে পেনাল্টি না দেবার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেন। অনেকেই ৪৭ মিনিটের মাথায় এই সিদ্ধান্তে রেফারির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দিলেও তেমন কোনো লাভ হয়নি। ৫৭ মিনিটের মাথায় রাফিনহাকে তুলে এন্টনিকে নামিয়ে দেন ব্রাজিলের কোচ। নেমেই ডান দিক থেকে নেইমারের দিকে পাশে এগিয়ে দেন তিনি। তবে কোন লাভ হয় না। আবারও ৬৬ মিনিটের মাথায় লুকাস পাকেতার শট বাচিয়ে দিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে জীবনদান দেন সেই গোলরক্ষক। ৭৬ মিনিটের মাথায় আবারো নেইমারের শর্ট বাঁচান লিভাকোভিচ। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শেষ হয় গোলশূন্য অবস্থায়।
অতিরিক্ত সময় খেলা গড়ালে গোল মুখ খোলার জন্য আরো মরিয়া হয়ে ওঠে ব্রাজিল। মুহুর্মুহু আক্রমণ শুরু হয় ক্রোয়েশিয়ার বক্সে। ১০৩ মিনিটের মাথায় একটা দুর্দান্ত সুযোগ পেয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। কিন্তু বারের উপর দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে সহজ সুযোগ নষ্ট করেন ব্রজোভিচ।
তবে ব্রাজিলের ভক্তদের অপেক্ষার শেষ হয় ১০৫ মিনিটের মাথায়। মাথায় অসাধারণ গোল করলেন নেইমার। মাঝমাঠ থেকে খেলা শুরু করে পেদরোর সঙ্গে পাস খেলে সেখান থেকে নেইমার বল পেয়ে এগিয়ে দেন পাকুয়েতাকে। তার থেকেই আবার পাসব্যক করে গোলকিপারকে কাটিয়ে বল জালে জড়ান নেইমার।
তবে এই গোলের পর ব্রাজিল মনে করেছিল তারা সেমিফাইনাল পর্যন্ত উঠে গেছে। কিন্তু ১১৭ মিনিটের মাথায় সেই ভুল ভাঙ্গে তাদের। মুহূর্তের অসাবধানতায় গোল খেয়ে বসে ব্রাজিল। ১১৭ মিনিটের মাথায় প্রতি আক্রমণ আসে ক্রোয়েশিয়ার থেকে। পেরিসিচের পাশে বাঁ পায়ের শটে গোল করেন ব্রুনো পেটকোভিচ।
খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। আর এই টাইব্রেকার হয়ে ওঠে ব্রাজিলের জন্য কাল। আজকের ম্যাচে প্রথম থেকেই নিজের মান বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ক্রোয়েশিয়ার গোল রক্ষক লিভাকোভিচ। তাই, টাইব্রেকারে কোনো ভুল করলেন না তিনি। ক্রোয়েশিয়া পরপর চারটি শট গোলে কনভার্ট করল। আর রদ্রিগোর শট বাঁচিয়ে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের স্বপ্নভঙ্গ করলেন ক্রোয়েশিয়ার সেই গোলরক্ষক লিভাকোভিচ।







