'নারী' চরিত্রে অভিনয় থেকে 'মহাভারত'-এর তর্জমা, বাঙালির হুতোম প্যাঁচা কালীপ্রসন্ন সিংহের অচেনা জীবন
Kaliprasanna Singha : আজ থেকে দেড়শো বছর আগের বাংলা থিয়েটারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন কালীপ্রসন্ন। মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’।

কালীপ্রসন্ন সিংহ নামটি শোনামাত্র মনে পড়ে যায় ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-র কথা। মানতেই হয়, কালীপ্রসন্ন সিংহের লেখকজীবনে এই লেখাটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু কালীপ্রসন্ন সিংহের মতো মানুষের সমস্ত জীবনকে শুধু এই একটি রচনার প্রেক্ষিতে দেখলে ভুল হবে। আজ থেকে দেড়শো বছর আগের বাংলা থিয়েটারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন কালীপ্রসন্ন। মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’। থিয়েটার শিক্ষায় আগ্রহীদের জন্য বিদ্যোৎসাহিনী সভা ছিল এক নতুন নাট্যাঙ্গন। সম্ভবত, ১৮৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এই সভা। শুধু কালীপ্রসন্ন-ই নয়, এই সভার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কৃষ্ণদাস পাল, আচার্য কৃষ্ণ কোমল ভট্টাচার্য, প্যারীচাঁদ মিত্র এবং রাধানাথ শিকদারের মতন ব্যক্তিত্বরা। ১৮৫৭ সালে বিদ্যোৎসাহিনী-র মঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয় কালীপ্রসন্ন সিংহের নিজের বাড়িতে। এই সভার আয়োজনে প্রথম মঞ্চস্থ নাটক ছিল ‘শকুন্তলা’। পরবর্তীতে, সেখানে অভিনীত হয় ‘বেণীসংহার’। কালীপ্রসন্ন নিজে এই নাটকে অভিনয় করেছিলেন। সেই সময় ‘বেণীসংহার’ দর্শকের মধ্যে খুবই প্রশংসিত হয়েছিল এবং ‘সংবাদ প্রভাকর’-এও নাটকটির অভিনয়ের প্রশংসামূলক আলোচনা প্রকাশিত হয়।

'হুতোম প্যাঁচার নকশা'-র প্রচ্ছদ
কালীপ্রসন্ন যখন এই নাটকে অভিনয় করেছেন তখন তাঁর বয়স ষোলো বছর। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার আরও একটি দিক এখানে বলতে হয়। কোনো পুরুষ হিসেবে নয়, ‘বেণীসংহার’-এ কালীপ্রসন্ন অভিনয় করেছিলেন ‘ভানুমতী’ নামক এক নারীর চরিত্রে। এর ঠিক পরপরই, কালীপ্রসন্ন লেখেন ‘বিক্রমোবর্শী’ নামক নাটক। কালিদাসের সংস্কৃত রচনার ওপর ভিত্তি করে কালীপ্রসন্ন ‘বিক্রমোবর্শী’ লিখেছিলেন। ১৯৫৭ সালে বিদ্যোৎসাহিনী সভায় নাটকটি অভিনীত হয়। এবং পুরুভের চরিত্রে অভিনয় করেন কালীপ্রসন্ন নিজে। বলা বাহুল্য, নাটকটির রচনাগুণ, কাহিনি এবং অভিনয়— সেই সময় বিশেষভাবে দর্শকের মনোযোগ কেড়ে ছিল। যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছিল নাটকটি। এখানে জানানো উচিত, কালীপ্রসন্ন আরও বেশ কয়েকটি নাটক এই সময়পর্বে পরপর লিখেছিলেন। নাটকগুলি হল:
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Durga Puja 2024: রায়চৌধুরী বাড়ির পুজোরও রয়েছে বেশ কিছু নিয়মকানুন। যা আজও মেনে চলেন পরিবারের মানুষ।
'বাবু' (১৮৫৪)
'সাবিত্রী সত্যবান' (১৮৫৮)
'মালতী মাধব' (১৮৫৬)
অত অল্প বয়সে একজন কিশোর একটা নাট্যসভা গঠন করছে এবং একের পর এক নাটক লিখে যাচ্ছে, এ-ঘটনা কালীপ্রসন্ন-র ক্ষমতাকে আরও স্পষ্টভাবে চিনিয়ে দেয়। বিদ্যোৎসাহিনী সভা কেবল নাটক মঞ্চস্থ-ই করেনি। আরও একটি ইতিহাসের সঙ্গে এই সভার যোগসূত্র রয়েছে। কালীপ্রসন্ন সিংহ বিদ্যোৎসাহিনী সভার পক্ষ থেকে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে বাংলা কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তনের জন্য সম্মানিত করেছিলেন। কালীপ্রসন্ন, মধুসূদনকে বাংলা কবিতায় তাঁর এই অতুলনীয় কাজের জন্য শংসাপত্র ও একটি রূপার খুঁটি উপহার দেন।
এবার আসি সম্পাদক ও প্রকাশক কালীপ্রসন্ন সিংহের বিষয়ে। কালীপ্রসন্ন একাধিক পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। যেমন, ‘বিদ্যোৎসাহিনী পত্রিকা’, ‘পরিদর্শক’, ‘সর্বতত্ত্ব প্রকাশিকা’, ‘বিবিধর্ম সংগ্রহ’ ইত্যাদি। এর মধ্যে ‘পরিদর্শক’ পত্রিকার শুরু করেছিলেন জগনমোহন তর্কালঙ্কর এবং মদনগোপাল গোস্বামী। ‘পরিদর্শক’ ছিল একটি বাংলা দৈনিক সংবাদপত্র। জানা যায়, পরবর্তী সময় কাগজটিকে নতুনভাবে প্রকাশ করার জন্য কালীপ্রসন্ন ‘পরিদর্শক’-এর সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এবং ‘পরিদর্শক’ পত্রিকা কালীপ্রসন্ন সিংহের সম্পাদনাকালীন সময়ে সর্বাধিক জনপ্রিয় হয়েছিল। অনেকের মতে, সম সময়ের থেকে অনেক দিক থেকেই এগিয়ে ছিল ‘পরিদর্শক’। এ-সম্পর্কে কৃষ্ণদাস পাল লিখেছেন,
তিনি (কালীপ্রসন্ন সিংহ) একটি প্রথম শ্রেণির স্থানীয় দৈনিক সংবাদপত্রও শুরু করেছিলেন, যার মতো আমরা এখনও দেখিনি।"
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Slovenia Tour: এমন একটা দেশে, প্রায় সম্পূর্ণ একটা অজানা সংস্কৃতির শহরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আশ্চর্য মোলাকাত হবে এ কথা ভাবিনি ঘুণাক্ষরেও।
‘বিবিধর্ম সংগ্রহ’-ও প্রথমে সম্পাদনা করতে শুরু করেছিলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র। পরে, ‘বিবিধর্ম সংগ্রহ’ সম্পাদনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়েছিলেন কালীপ্রসন্ন। এর বাইরেও তৎকালীন বাংলার বহু পত্র-পত্রিকাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতেন হুতোম প্যাঁচা ওরফে কালীপ্রসন্ন সিংহ। এইসব পত্রিকার মধ্যে ছিল: ‘তত্ত্ববোধিনী’, ‘সোমপ্রকাশ’, ‘মুখার্জি ম্যাগাজিন’, ‘বেঙ্গল এবং ‘হিন্দু দেশপ্রেমিক’।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
সকলেই জানেন, বাংলা গদ্যভাষায় কালীপ্রসন্ন ‘মহাভারত’ অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর সেই তর্জমা-কাজ তখন থেকে এখনও পর্যন্ত 'মহাভারত'-এর পাঠকদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ হয়ে আছে। 'মহাভারত'-এর তরজমা করছিলেন কালীপ্রসন্ন এবং সম্পূর্ণ কাজটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। উল্লেখ্য, বরানগরের 'সর্বস্বাশ্রম' নামে একটি বাড়িতে বসে মহাভারত-এর তর্জমা সম্পূর্ণ করেছিলেন কালীপ্রসন্ন। বাংলা গদ্যে প্রথম
অনূদিত ‘মহাভারত’ কোনো বিনিময় মূল্য ছাড়াই সবার মধ্যে বিতরণ করেছিলেন কালীপ্রসন্ন। এই কাজের জন্য তাঁকে নিজের বেশ কিছু সম্পত্তিও বিক্রি করতে হয়। পাশাপাশি তিনি ‘ভগভদগীতা’-ও তরজমা করেছিলেন, যা তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছিল।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রশ্ন হল, এইসব কাজের পেছনে কালী প্রসন্ন সিংহের মূল অভিধা কী ছিল? এক্ষেত্রে বলতে হয়, একই সঙ্গে বাঙালি ও বাংলা ভাষার উন্নতিসাধনই ছিল তাঁর মনের প্রধান অভিমুখ। এছাড়াও, যেখানেই কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে কালীপ্রসন্ন সিংহ সব সময় নিজের সাহায্যহাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সেখানেই। এমন এক বহুমুখী প্রতিভার আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র ঊনত্রিশ বছর। ১৮৭০ সালের ২৪ জুলাই প্রয়াত হন বাঙালির হুতোম প্যাঁচা। কিন্তু তাঁকে কেবল মাত্র 'হুতোম প্যাঁচার নকশা'-র রচয়িতা বলেই যদি মনে রাখি তাহলে খুব বড়ো ভুল করব। তাঁর মতো বড়ো সাহিত্যপ্রতিভা ও সমাজসংস্কারক বাঙালির ইতিহাসের অন্যতম গর্বের বিষয় হওয়া উচিত।







