তিতে থেকে লুইস এনরিকে, ২০২২ কাতার ফুটবল বিশ্বকাপের পর চাকরি খুইয়েছেন যে কোচেরা
FIFA World Cup 2022 : ২০২২ বিশ্বকাপের পর অনেক দলেই কোচের রদবদল হয়েছে। কেউ কেউ নিজেই সরে গিয়েছেন, কারও হাতে ফিরে যাওয়ার চিঠি ধরিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

প্রায় এক মাস হতে চলল, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গিয়েছে। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে রাত জাগা, প্রিয় খেলোয়াড়দের জন্য গলা ফাটানো, প্রিয় দল বেরিয়ে যাওয়ার পর কান্না, ঝগড়া – কাতারের বিশ্বকাপ অনেক মুহূর্ত উপহার দিয়েছে। চ্যাম্পিয়ন হয় মাত্র একটি দেশই; কিন্তু এই একটি ট্রফির জন্য লড়াই অনেক গল্প তৈরি করে গিয়েছে। দল প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে গেলে যেমন দুঃখে ভেঙে পড়েন সমর্থকরা। সেরকমই কোপ নেমে আসে দলের ওপরও।
২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলও সেই ‘প্রথা’ ছেড়ে বেরোয়নি। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আর্জেন্টিনার মুখে এখন খুশির আমেজ। সমস্ত প্রত্যাশা ছাপিয়ে সমর্থকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। একটা সময় খোদ মারাদোনা বলেছিলেন, “ও কী করে আর্জেন্টিনার মতো একটি দলকে পরিচালনা করবে?” সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন স্কালোনি। তাও একটা নয়, দু’দুটো ট্রফি জিতে। বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকা। অন্যদিকে, ফাইনালে হারলেও ফ্রান্সের এখনও ভরসার প্রতীক হয়ে আছেন দিদিয়ের দেশঁ। তাঁর কোচিংয়েই ২০১৮ বিশ্বকাপ জিতেছে ফ্রান্স। কাতারের ফাইনালে হারলেও ফরাসি ব্রিগেডের পারফরমেন্স তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বিধ্বংসী এই মানসিকতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজন দেশঁকেই, জানেন ফরাসিরা।
তবে সবার ভাগ্য হয়তো এঁদের মতো প্রসন্ন নয়। ২০২২ বিশ্বকাপের পর অনেক দলেই কোচের রদবদল হয়েছে। কেউ কেউ নিজেই সরে গিয়েছেন, কারও হাতে ফিরে যাওয়ার চিঠি ধরিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিশ্বকাপের পর চাকরি যাওয়া সেরকমই কয়েকজন কোচের কথা জেনে নেওয়া যাক।
তিতে (ব্রাজিল)
প্রবল আশা জাগিয়ে শুরু হয়েছিল পথচলা। রিচার্লিসনের বাইসাইকেল কিক, নেইমারের দুরন্ত সাম্বা ছন্দে গোল – ব্রাজিল যেন পুরনো সময়ের কথাই মনে করাচ্ছিল বারবার। অনেকেই ভেবেছিলেন, এবারের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়ন বোধহয় বিখ্যাত এই হলুদ জার্সিই। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে সমস্ত আশা আচমকাই থমকে গেল। ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে এগিয়ে থেকেও পরে ড্র, তারপর টাইব্রেকারে হার – মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিল ব্রাজিল দল। সেই ম্যাচ শেষের কিছুক্ষণের মধ্যে পদত্যাগ করেন ব্রাজিলের কোচ তিতে। ২০১৬ সালে দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর হাত ধরে নতুন স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল সাম্বা ব্রিগেড। অবশ্য তিতের বক্তব্য, তিনি আগেই বলেছিলেন যে, এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। তাই তিনি কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
লুইস এনরিকে (স্পেন)
বার্সেলোনার প্রাক্তন ফুটবলার-কোচ এনরিকের স্পেন বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই আশা জাগিয়েছিল। মাঝমাঠের সেই পুরনো ছন্দ, তিকিতাকা ফুটবলে সমৃদ্ধ স্পেন আশাও জাগিয়েছিল। কিন্তু প্রি কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর সঙ্গে টাইব্রেকারে বিদায় নেয় ২০১০ বিশ্বকাপের বিজয়ীরা। ২০১৮ বিশ্বকাপেও মোটামুটি একই ছবি দেখেছে ফুটবল বিশ্ব। আশা জাগিয়ে, পাস সমৃদ্ধ তিকিতাকার বন্যা বইয়েও শেষরক্ষা করতে পারেননি এনরিকে। ২০২২ বিশ্বকাপে হারের পরই কোচের চাকরি থেকে সরে গিয়েছেন এনরিকে।
ফার্নান্দো স্যান্টোস (পর্তুগাল)
২০১৬ সালে তাঁর কোচিংয়েই ইউরো জেতে পর্তুগাল। কিংবদন্তি ক্রিশ্চিয়ান রোনাল্ডোর সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল ভালোই। কাতারের বিশ্বকাপ যেন পুরো ছবিটাই বদলে দিল। পর্তুগালের শুরুটা সেরকম ছন্দে হয়নি। নিজের ফর্মের ধারেকাছেও ছিলেন না সিআর সেভেন। তার মধ্যে কোচ স্যান্টোস তাঁকে রিজার্ভ বেঞ্চে বসিয়ে রাখলেন। কোচ বনাম রোনাল্ডো, বিতর্ক চরমে উঠল। কোয়ার্টার ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও প্রথমার্ধে বেঞ্চেই ছিলেন রোনাল্ডো। পরে তাঁকে নামান স্যান্টোস। সেই ম্যাচে মরক্কোর কাছে হারের পর তোপের মুখে পড়েন স্যান্টোস। পরে তিনি নিজেই সরে যান দায়িত্ব থেকে।
লুই ভ্যান গল (নেদারল্যান্ড)
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ, অনেক যুদ্ধের সাক্ষী ভ্যান গল। বার্সেলোনা, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের দায়িত্বও সামলেছেন একসময়। বহুদিন ধরে নেদারল্যান্ডের দায়িত্বে আছেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর একটু একটু করে ডাচ ফুটবলকে তৈরি করেছেন ভ্যান গল। ২০২২ বিশ্বকাপেও নেদারল্যান্ড ছিল অন্যতম জমাটি দল। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার সঙ্গে ‘বিতর্কিত’ ম্যাচ, টাইব্রেকারে হার – আর দায়িত্ব নিতে চাননি ভ্যান গল। বয়সও হয়েছে অনেক, তাছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসার আক্রান্ত তিনি। বিশ্বকাপের পর নিজেই পদত্যাগ করেন এই কোচ।
রবার্তো মার্তিনেজ (বেলজিয়াম)
ইডেন হ্যাজার্ড, লুকাকু, কুর্তোয়া, কেভিন দে ব্রুইন – বেলজিয়ামের এই দলটিকে বারবার কালো ঘোড়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কেউ কেউ বলে, দেশের সোনালি যুগের টিম। প্রত্যেকেই নিজের নিজের জায়গায় সেরা। বড় বড় ক্লাবে সেরার জায়গা দখল করে আছেন। সেই বেলজিয়ামই এই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে গেল। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলেছিল দলটি। কিন্তু ‘সোনালি টিম’-এর ট্রফির খরা। ইউরো থেকে বিশ্বকাপ – নিরাশ হয়েই ফিরতে হয়েছে লুকাকুদের। এরপরই হারের দায় নিয়ে কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন রবার্তো মার্তিনেজ।
জেরার্ডো মার্তিনো (মেক্সিকো)
২০২২ বিশ্বকাপ হয়তো সারাজীবন মনে রাখবে মেক্সিকো। ১৯৭৮ সালের পর এই প্রথম গ্রুপ পর্যায় থেকে বিদায় নেয় লাতিন আমেরিকার এই দেশ। গোলের নিচে ওচোয়ার পারফরমেন্সও বাঁচাতে পারেনি দলকে। এরপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় মেক্সিকো ফুটবল ফেডারেশন। কোচ জেরার্ডো মার্তিনোকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
কার্লোস কুইরোজ (ইরান)
এর আগেও পর্তুগাল, আরব, কলম্বিয়ার মতো বেশকিছু দেশে কোচের দায়িত্ব সামলেছেন কার্লোস। রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্বে ছিলেন একসময়, ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের সহকারী কোচও ছিলেন। ইরানের জাতীয় দলের হয়ে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্যায় থেকে বিদায় নেওয়ার পর আর দায়িত্ব বাড়াতে চাননি তিনি। ছেড়ে দেন ইরানের কোচের পদ।







