প্যালেস্টাইনের স্বীকৃতি ও ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা: আদতে রাজনৈতিক প্রহসন?

Palestine Recognition and Trump’s Peace Plan: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন— সবাই জানে যে ইজরায়েলি দখল আন্তর্জাতিক আইন বিরোধী। কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের কারণে তারা মুখ খোলে না।

Tanvia Barua
৩ মিনিট
প্যালেস্টাইনের স্বীকৃতি ও ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা: আদতে রাজনৈতিক প্রহসন?

প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া বা ট্রাম্পের তথাকথিত 'শান্তি পরিকল্পনা'— দু’টিই আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক প্রহসন। এই মতই প্রকাশ করেছেন মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্যালেস্টাইন ইস্যু যত পুরনো, ততই জটিল। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে যেভাবে পশ্চিমা দেশগুলো এই প্রশ্নে দ্বৈত নীতি গ্রহণ করেছে, তাতে স্বাধীন প্যালেস্টাইন যেন আজ শুধুই দূরের স্বপ্ন।

১৯৮৮ সালে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হলেও, বাস্তবে সেই রাষ্ট্র আজও কাগজেই বন্দি। পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা ও পূর্ব জেরুজালেম— এই তিনটি অঞ্চল নিয়ে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হলেও, ইজরায়েলি দখল ও পশ্চিমা নীরবতা মিলে সেটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বিশ্বের একাধিক দেশ, বিশেষত ইউরোপের কয়েকটি দেশ, প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি কূটনৈতিক প্রদর্শনীর বেশি কিছু নয়। প্রকৃত অর্থে কোনো বাস্তব পরিবর্তন ঘটেনি। ইজরায়েলি সেনা আগ্রাসন যেমন ছিল, তেমনই আছে।

২০১৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন তথাকথিত 'Deal of the Century' অর্থাৎ শতাব্দীর সেরা শান্তি পরিকল্পনা। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলেন, এটি আসলে ছিল ইজরায়েলকেই আরও শক্তিশালী করার এক কৌশল। এই পরিকল্পনায় প্যালেস্টাইনিদের জন্য ছিল না কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের নিশ্চয়তা, বরং ছিল ইজরায়েলি দখলের বৈধতা। পূর্ব জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের রেজোলিউশনের সরাসরি লঙ্ঘন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ট্রাম্পের চাপ, হামাসের শর্ত : গাজায় শান্তি ফিরবে?

Trump Peace Plan & Hamas Response: হামাস জানিয়েছে, তারা গাজায় আটক সব ইজরায়েলি বন্দিকে, জীবিত ও মৃত উভয়কেই, মুক্তি দিতে প্রস্তুত। তবে, হামাস ট্রাম্পের পরিকল্পনার অন্যান্য দিক নিয়ে আরও আলোচনা চায়।

প্যালেস্টাইন ইস্যুতে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলির নীরবতা আজ এক ধরনের অপরাধে পরিণত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন— সবাই জানে যে ইজরায়েলি দখল আন্তর্জাতিক আইন বিরোধী। কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের কারণে তারা মুখ খোলে না। জাতিসংঘের প্রস্তাবও কাগজে রয়ে গেছে। ১৯৬৭ সালের সীমান্তে ফিরে যাওয়া বা বসতি স্থাপন বন্ধ করার মতো পদক্ষেপগুলি আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

ব্রিটেনের কথা বলা যাক। ব্রিটেন যেমন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে, অন্যদিকে আবার ইজরায়েলকে অস্ত্র রফতানি করছে— এই দ্বিমুখী নীতি বিষয়ে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। অক্সফ্যাম ও ক্যাম্পেন এগেনস্ট আর্মস ট্রেড (Campaign Against Arms Trade)-এর মতো সংস্থা বলেছে, এই নীতি 'অনৈতিক' এবং 'ভণ্ডামি'। চলতি বছর অগাস্ট মাসে ব্রিটেন থেকে ইজরায়েলে প্রায় এক লক্ষ দশ হাজার গুলি, ট্যাংকের যন্ত্রাংশ, শটগান-রাইফেল, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরক-সহ বড় পরিমাণ অস্ত্র পাঠানো হয়েছে। ব্রিটেন সরকারের দাবি— কিছু অস্ত্র রফতানির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে যেন মানবাধিকার লঙ্ঘন না হয়। তবে তথ্য অনুযায়ী, শতাধিক লাইসেন্স এখনও রয়েছে, এবং অস্ত্র রফতানি বন্ধের কোনো বড় পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে না।

গাজায় মানবিক সাহায্যের নামে মৃত্যুর মিছিল নতুন নয়। খাবার, জল আর ওষুধের আশায় হাজার হাজার মানুষ ত্রাণ কেন্দ্রের সামনে ভিড় করছেন। কিন্তু সেই কেন্দ্রগুলিতেই গুলি করা হচ্ছে, বোমা ছোড়া হচ্ছে, এতেই অনেক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। অভিযোগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত সংস্থা (Gaza Humanitarian Foundation) গাজায় সাহায্য বিতরণের কাজ করছে, কিন্তু বাস্তবে সেই ত্রাণই পরিণত হয়েছে ভয়াবহতার উৎসে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইজরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে ত্রাণের নামে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে চাইছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৯৬৭ থেকে ২০২৫! যেভাবে গাজায় বারবার নিশানা করা হচ্ছে সাংবাদিকদের

Israel’s killing of journalists: ইজরায়েল ১৯৬৭ সালে দখলদারিত্বের প্রথম দিন থেকেই, মিডিয়া রিপোর্টিংয়ের উপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছে। পরে সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে সেন্সরশিপ আনা হয়।

শুধু তাই নয়, গাজায় ইজরায়েলের সামরিক দখল ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে জাতিসংঘের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি কোম্পানি মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট (গুগলের মূল সংস্থা) ও অ্যামাজন ইজরায়েলকে তাদের ক্লাউড ও এআই-সুবিধা দিয়ে সহায়তা করছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে গাজার নাগরিকদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, রাখা ও নজরদারিতে। এছাড়া বড় বিনিয়োগকারীরা এসব সংস্থায় ব্যাপক অর্থ লগ্নি করছে যা অবৈধ দখল ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকে মদত দিচ্ছে বলে অভিযোগ। প্রতিবেদনে এসব কোম্পানিকে ইজরায়েলের অবৈধ কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা বন্ধ করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

এখন প্যালেস্টাইনিদের জীবনে শান্তি মানে কেবলই কল্পনা। পশ্চিম তীরে প্রতিদিন বাড়ছে ইজরায়েলি চেকপয়েন্ট, বসতি ও দেওয়াল। গাজায় খাবার, জল, ওষুধ— সব কিছুরই সংকট। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলি বারবার বলেছে— এই অবরোধ একপ্রকার সমষ্টিগত শাস্তি। কিন্তু তবুও বিশ্ব নীরব। কারণ, ইজরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার মূল ভিত্তি।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, যতদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সমাজ ইজরায়েলের বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ নেবে না, ততদিন কোনো শান্তি সম্ভব নয়। শুধু মুখে সমাধান বললেই হবে না— প্রয়োজন নৈতিক অবস্থান। ইউরোপীয় দেশগুলির প্যালেস্টাইন স্বীকৃতি যদি সত্যিই অর্থবহ হত, তবে তারা ইজরায়েলি পণ্য বয়কট করত, বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করত। কিন্তু তা তারা করেনি। তাই এই স্বীকৃতি আজ এক প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

প্যালেস্টাইন আজও এক অসম যুদ্ধের ময়দানে। তাদের স্বপ্ন— স্বাধীন রাষ্ট্র, মুক্ত ভূমি, শান্তিপূর্ণ জীবন সবই যেন আন্তর্জাতিক কূটনীতির লাল ফিতেতে জড়িয়ে আছে। ট্রাম্পের 'শান্তি পরিকল্পনা' কিংবা ব্রিটেনেরর 'স্বীকৃতি দেওয়া'—দু’-টোই আসলে বিশ্বের নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যতদিন এই দ্বিচারিতা চলবে, ততদিন প্যালেস্টাইনিদের স্বাধীনতার গল্প রয়ে যাবে শুধু ইতিহাসের এক অসমাপ্ত অধ্যায় হিসেবে।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।