
আহমদ শরীফের জন্ম অবিভক্ত বাংলার চট্টগ্রাম জেলার এক প্রান্তিক অঞ্চলে। অঞ্চলটি প্রান্তিক হলেও বাংলার সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সেই এলাকাটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। চট্টগ্রামের যে ভৌগলিক অবস্থান, একাধারে সমুদ্র আর পাহাড় দ্বারা পরিবেষ্টিত অপরূপ নৈসর্গিক শোভা, তার ভিত্তিতে গোটা অঞ্চলটিকে পুষ্পপুট, সবুজ শহর, ইসলামাবাদ ইত্যাদি নানা নামে অভিহিত করা হয়। অনেক প্রাচীন পুঁথিপত্রে আমরা দেখতে পাই চাটিগ্রাম, ধ্বনি পরিবর্তিত হয় কালক্রমে তা চাটগাঁ, কাব্যিক অভিব্যক্তিতে চট্টলা,আবার ইংরেজি উচ্চারণ সূত্রে চিটাগাং বলেও এলাকাটির পরিচিতি আছে।
আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ 'ইসলামাবাদ' নামক একটি বিখ্যাত গ্রন্থ আবেগ তাড়িত হয়ে মধ্যযুগের কবি রূপে বর্ণনায় চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বলতে গিয়ে লিখেছিলেন; " ইসলামাবাদ প্রকৃতির চির লীলা নিকেতন।প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ইহার সহিত তুলনীয় হতে পারে, ভারতে এমন স্থান অতি অল্প ই আছে। প্রকৃতি সুন্দরী তাহার সকল সুন্দর বস্তু হইতে তিল তিল সৌন্দর্য আহরণ করিয়াই যেন আমাদের জন্মভূমি মাখাইয়ে দিয়াছেন। ইহাকে সৌন্দর্য লালামভুতা সৌন্দর্যের রাণী বলিলেও তাহার কিছুই বর্ণনা করা হয় না। সৌন্দর্যের উপাসকগণ ইহার মুনিমন শোভা দেখিয়া ভাবে আত্মহারা হইবেন। ঘোর সংসারী হইতে সংসার বিরাগী যোগীজন পর্যন্ত সকল শ্রেণির লোকের পক্ষেই ইহা পরম মনোরম স্থান।"
এই চট্টগ্রামে অবিভক্ত বাংলায় বৌদ্ধ পুনর্জাগরণ আন্দোলনের অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব কৃপাশরণ মহাস্থবির (১৮৬৫-১৯২৭), সাহিত্য সমালোচক, লেখক, রাজনীতিক , সাংবাদিক, সমাজকর্মী মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী , সেহিত্য সমালোচক শশাঙ্কমোহন সেন(১৮৭২-১৯২৮) শিক্ষাবিদ, লেখক আব্দুর রহমান লেখক এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা পূর্ণেন্দু দস্তিদার (১৯০৯-১৯৭১), বৌদ্ধ পন্ডিত ও সমাজসেবক আর্য বংশ মহাস্থবির(১৯১৫-১৯৯৪) , প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম, মাস্টারদা সূর্যসেন, কল্পনা দত্ত, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, লোকনাথ বল, কল্পতরু সেনগুপ্তের মত মানুষ জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
আহমদ শরীফের জন্ম অবিভক্ত চট্টগ্রাম জেলার সুচক্রদন্ডী নামক একটি গ্রামে। এই গ্রামটি বর্তমানে পটিয়া উপজেলা সদরের কাছাকাছি আরাকান রোডের উত্তর দিকে অবস্থিত। এই গ্রামের কৃতি পুরুষদের মধ্যে রয়েছেন সপ্তদশ শতকের প্রখ্যাত কবি দ্বিজ রতিদেব।' মৃগলুব্ধ ' বলে একটি কাব্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন আছেন তিনি বিশিষ্ট সমাজসেবী ডাক্তার খাস্তগীরের জন্ম এই গ্রামেই। অখণ্ড বাংলার বিখ্যাত কবিরাজ ষষ্ঠীচরণ মজুমদার, দিল্লির তিব্বিয়া আয়ুর্বেদ কলেজের অধ্যক্ষ হরিনারায়ণ মজুমদার, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত প্রখ্যাত বিপ্লবী সহায়সম্পৎ চৌধুরী, যিনি কারাগারের ভেতরে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, চট্টগ্রাম সাপ্তাহিক পত্রিকা ' জ্যোতি'-র সম্পাদক, প্রকাশক কালিশংকর চক্রবর্তী প্রমুখ ছিলেন এই গ্রামের সন্তান। দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত মামার বাড়ি সুচক্রদণ্ডী গ্রামে।
অনেকেরই অনুমান চর্যাপদকারদের ভেতরে অন্তত দু'জন ছিলেন এই সূচক্রদন্ডী গ্রামের মানুষ। বৌদ্ধ আমলে বৌদ্ধকৃষ্টির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে এই গ্রামটির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। ইতিহাসের একটা পর্যায়ে অভিজাত মুসলমান পরিবারগুলির আবাসভূমি হয়ে ওঠে এই গ্রামটি। বাংলার সমাজ সংস্কৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই সুচক্রদন্ডী গ্রামটি। ভারতের সমন্বয়বাদী সংস্কৃতির ঐতিহাসিক অবদান হিসেবে এই গ্রামের জগন্নাথ মন্দির বাংলার বহুত্ববাদী চেতনার উজ্জ্বল চিহ্ন হিসেবে বিরাজমান রয়েছে।
এই গ্রামে ১৯২১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ,রবিবার, সকালে আহমদ শরীফের জন্ম। তাঁর পিতার নাম আব্দুল আজিজ (১৮৮০-১৯৪৬) এবং মায়ের নাম সিরাজ খাতুন( ১৮৮৮-১৯৮৩) পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান এবং তৃতীয় পুত্র আহমদ শরীফ অত্যন্ত গর্ব ভরে বলতেন; আমার আক্ষরিক অর্থেই চৌদ্দ পুরুষের পরিচয় জানা আছে।
আহমদ শরীফ নিজের দশম পূর্বপুরুষের পরিচয় সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছিলেন; তাঁর নাম ছিল হাবিবাষ মল্ল। আহমদ শরীফের ধারণা ছিল, উনি হিন্দু ছিলেন। কারণ; মল্ল অগ্রসর বর্ণহিন্দুদের একটি পদবি এবং অভিলাষ শব্দটির বিবর্তিত রূপ হল হাবিলাষ। ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে শেরশাহের সৈন্যবাহিনী চট্টগ্রামে এসেছিল-- এইরকম একটি ধারণা অনেকেরই আছে। তবে এ সম্পর্কে সুনিশ্চিত তথ্য আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। আবার কেউ কেউ ওই ১৫৩৮ সালেই আরাকানদের চট্টগ্রামের অধিকাংশ স্থান দখলের কথা বলেছেন। তাঁদের দাবি ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত আরাকান রাজের সেই আধিপত্য চট্টগ্রামে বজায় ছিল। ১৬৬৬খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম মুঘল শাসকদের হাতে আসে। সেই সময় মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব চট্টগ্রামের নাম রেখেছিলেন ,'ইসলামাবাদ'। আবার এই যে 'মল্ল ' শব্দটির ব্যবহার করা হয়েছে এখানকার আদি অধিবাসীদের ঘিরে, তার সঙ্গে কেউ কেউ পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম বাঁকুড়ার 'মল্ল ' রাজবংশের মুঘলদের সামন্তে পরিণত হওয়ার ঘটনাক্রমেদ কেউ যোগসূত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অনেকেরই ধারণা আহমদ শরীফের পূর্বপুরুষ হাবিলাষ মাল্য এই বীরভূম বাঁকুড়া অঞ্চলের মল্ল রাজবংশের কেউ হতে পারেন। আবার এই যে তাঁর নামের সঙ্গে কোন পদবি ,তাঁকেও ব্যাখ্যা করে কেউ কেউ বলেছেন, হাবিলাষ বা তার ছেলে 'পাহাড় মল্ল' শায়েস্তা খানের সঙ্গে এসেছিলেন ।সেই কারণেই তিনি চট্টগ্রামেই থেকে গিয়েছিলেন। পাহাড় খানের পুত্রের নাম ছিল দরিয়া খান মল্ল। তাঁর পুত্রের নাম সিফৎমল্ল। এখানে অনেকে অনুমান করেন যে ধর্মান্তরের সাথে সাথে ধর্মীয় পদবি ঘটলেও বৃত্তি নির্দেশক পদবি পরিবর্তনটা সব সময় কিন্তু ঘটত না। তাই মল্ল অগ্রসর বর্ণহিন্দুদের পদবি না হয়ে কুস্তিগীর যোদ্ধা হিসেবে বৃত্তীয় পদবি ছিল, এটাই অনেকে ধারণা করেন।
মুঘল আমলে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ধর্ম পরিবর্তনের কিছু কিছু ঘটনা ঘটলেও, বাসভূমি পরিবর্তনের ঘটনা প্রায় নেই বলা যেতে পারে। তার উপরে সৈন্য হিসেবে যাতায়াত এবং সমতল ,মধ্য বাংলা ছেড়ে প্রান্তদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়া- এটাও বেশ ব্যতিক্রমী একটি ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। আহমদ শরীফের পিতামহ আইনুদ্দিন ছিলেন ইংরেজি শিক্ষিত মানুষ। এন্ট্রান্স পাস করার পর তিনি চট্টগ্রাম জজ কোর্টে চাকরি করতেন। সেরেস্তাদার হিসেবে সঙ্গে নানা বিবাদে জড়িয়ে পড়ায় তাঁর চাকরি চলে যায়। গ্রামে এসে তিনি জমি জমার হাল ধরেন। সেখানে ভূ-সম্পত্তি থেকে তাদের বার্ষিক আয় ছিল তিন, সাড়ে তিন হাজার টাকা।
এই পারিবারিক ঐতিহ্যটি আহমদ শরীফ অত্যন্ত মুন্সিয়ানা সঙ্গে বজায় রেখেছিলেন। তাঁর সম্বন্ধে হুমায়ুন আজাদ লিখছেন; এমন আর নেই, আর পাওয়া যাবে না। পলিমাটির এই ছোট্ট দ্বীপে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ নেই, যেমনটা অধ্যাপক আহমদ শরীফ একগুচ্ছ অসামান্য তীব্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে ঢাকা শহরে, এই বাংলায় আছেন।
ডঃ আহমদ শরীফের অন্য পরিবেশসাপেক্ষ একটা বিষয় আছে। আহমদ শরীফের চরিত্র ছিল অত্যন্ত জ্বলন্ত সততা, দেশপ্রেম, সামাজিক দায়বোধ, অনুশীলন ইত্যাদি বিষয় , যা মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক গুণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার একটি আঙ্গিক ,মানব সমাজের বর্তমান সময়ের অপেক্ষায় সেই গুণগুলো ,একজন মানুষের মধ্যে পরিস্ফুট হয়ে, একটা অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠা, যাকে হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন ,'নির্দেশে মহাকায়' , এই গুণটি আহমদ শরীফের জীবনের অন্যতম সেরা বৈশিষ্ট্য।
এমন বিরল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী আহমদ শরীফ কিন্তু একান্ত নিজস্বতায় পারিবারিক যাপন চিত্রে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সাধারণ কিছু গুণ নিজের মধ্যে পরিস্ফুট করতে পেরেছিলেন, সেই গুন গুলো কিন্তু তাঁকে অসাধারণত্বের মধ্যেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্ত করে দিয়েছিল। স্ববিরোধিতায় আহমেদ শরীফের মধ্যে ছিল না তেমনটা মনে করার কোন কারণ নেই। কিন্তু সেই স্ববিরোধিতার ক্ষেত্রগুলিতে প্রকট হয়ে ওঠেনি।তিনি যেন ছিলেন শিশুর মত সরল আর অভিমানী। একটু বেশি রকমের গৃহস্থ একজন মানুষ। পারিবারিক মূল্যবোধে যে প্রজন্মের বাঙালি গরীয়ান ছিল, সেই মূল্যবোধের একজন ধারক-বাহক হিসেবে কিন্তু আহমদ শরীফ তার গোটা জীবনটা কাটিয়ে ছিলেন।
এই অনন্য সাধারণ গুণাবলীর ভিতর একটি অন্যরকম মানুষ হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তাঁর এক আত্মীয় আমিনা মাহমুদকে উদ্ধৃত করা যেতে পারে। আমিনা লিখছেন; "শরীফ দুলাভাইয়ের কথা বলবার ধরনই ছিল ধমক দিয়ে কথা বলা। সব সময় তার ধমক শুনেছি। চিরকাল শুনেছি। কিন্তু এই ধমকের পিছনে যে একটা স্নেহের ,ভালোবাসার পরশ ছিল, তা আমাদের বুঝতে দেরি হতো না।" আহমদ শরীফ নিজে লিখেছেন; "আমি কখনো কারো প্রতি ভিকটিমাইজেশান যাকে বলে, সেটা কখনো করিনি। কথায় কথায় আমি অসংখ্য মানুষকে 'হারামজাদাটা' বলেছি। কিন্তু মুহূর্তেই আমার রাগ গোস্সা চলে যায়।"
আহমদ শরীফের এই বিষয়টি যাঁরাই উপলব্ধি করতে পেরেছেন, তাঁরাই অনুরাগী হয়ে পড়েছেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর পুত্রবধূর একটি উদ্ধৃতি দিকে আমরা দৃষ্টি দিতে পারি। তিনি লিখছেন; "যখন মৌলবাদীরা তাঁকে মুরতাদ ঘোষণা দেয়, তখন আত্মীয়-স্বজনরা বাবাকে বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও থাকতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু বাবা বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যাননি। কোনো ভয় পাননি। কিছুদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাঁটতে এবং আড্ডা দিতে যেতেন না। বলতেন, আমার সঙ্গে শ'খানেক ছেলে বসে। যদি কিছু হয়,তাহলে আমি তাঁদের মায়ের কাছে কী জবাব দেব?"
তিনি লিখছেন; "এত ঘটনার পরও বাবা ছিলেন নির্বিকার। তিনি নিয়মিত লিখেছেন। পড়াশুনা করেছেন। বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে বক্তৃতা দিয়েছেন। দৈনন্দিন জীবনে এই ঘটনা যেন কোনো প্রভাব ফেলেনি। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানি তাঁর ছিল। অত্যন্ত খুশি হতেন অতিথিকে মুঘল কায়দায় আপ্যায়ন করতে।সেটা না করে তিনি ছাড়তেন না। বাড়িতে অতিথি আসাকে তিনি এক ধরনের গর্বের বিষয় হিসেবে চিরদিন গ্রহণ করেছিলেন। অতিথির খাবারের আগে খেতেন না।"
দরিদ্রদের প্রতি একটা অন্যরকম পক্ষপাতিত্ব আহমদ শরীফের ছিল। তাঁর বাড়ি থেকে অনেক নিকটাত্মীয়, দূরসম্পর্কের আত্মীয়, চেনা পরিচিত মানুষজনের থেকে নিজেদের জীবন তৈরি করেছেন। এইসব মানুষদের জন্য খরচ করার ক্ষেত্রে আহমদ শরীফের কখনো কোনো রকম কার্পণ্য ছিল না।বরং বলা যেতে পারে এইসব মানুষদের জন্য খরচ করতে পেরে তিনি যেন গর্বিত হতেন। আর যদি কোনো কারণে সেই সময়ে খরচ করার ক্ষেত্রে তাঁর আর্থিক সামর্থ্যে কোনোরকম সমস্যা থাকত, তার জন্য তিনি যারপরনাই দুঃখবোধ করতেন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লোকসংস্কৃতির বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী, আহমদ শরীফের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র ছিলেন। তিনি একবার তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, জীবনে এমন কোনো ঘটনার কথা, যা তাঁকে আলোড়িত করে। উত্তরে আহমদ শরীফ তিনটি ঘটনার কথা বলেছিলেন। যার ভেতরে অতিথিপরায়ণতা পাশাপাশি ছিল তাঁকে বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ জরুরি।
ঘটনাটি হল ,তাঁর এক ভাগ্নে মেট্রিক পাশ করে ছোটখাটো একটি চাকরি করতেন। এক শীতকালে তাঁকে শীতবস্ত্রে দেখতে না পারার কারণ আহমদ শরীফ জিজ্ঞাসা করেন। উত্তরে জানতে পারেন সেই আত্মীয়দের কাছে গরম জামা কেনার সামর্থ্য নেই। একথা শুনে আহমদ শরীফের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, দীর্ঘদিন পরেও তা তিনি ব্যক্ত করেছিলেন আবুল আহসান চৌধুরীর কাছে। তিনি বলেছিলেন; এটাতে আমি এত লজ্জা পেয়েছিলাম, এত কান্না পেয়েছিল আমার ,আমার তখন মনে হলো যে,অনেক আগেই , দুই বছর আগেই আমার সেই আত্মীয়র জন্যে কোটের ব্যবস্থা করা উচিত ছিল।
আরেকটি ঘটনার কথা তিনি বলেছিলেন। তাঁর এক আত্মীয় ঢাকায় তাঁর বাসায় থাকতেন। সকালে দুপুরে খেতেন আর রাতে আহমেদ শরীফের আরেক ভাইয়ের বাসায় খেতেন। আহমদ শরীফ কল্পনাও করতে পারেননি, সেখানে রাতে সেই আত্মীয়ের খাওয়া জুটত না। বছরখানেক পরে তিনি যখন ঘটনাটা জানতে পারেন, তখন তাঁর মনের মধ্যে প্রচণ্ড আফসোস হয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন; সেইরকম সময় এটা জানলে পরে বলতাম, এখানে বারান্দাতে থাকলেও ভালো। বহুকাল পরে ঘটনাটা শুনে আমার এখনও আফশোস জাগে। সে কথা যখনই মনে পড়ে আমার কান্না পায়। আমার ফার্স্ট কাজিন প্রায় বছর খানেক ওপর একবেলা খেয়ে থেকেছ। আরেকটি ঘটনা আহমদ শরীফ বলছেন, আর একটা ঘটনায় কান্না পায়। সেটা হচ্ছে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের কালে রংপুরের একটা লোক, তোমার থেকেও লম্বা ( আবুল হাসান চৌধুরীকে বলছেন তিনি) একেবারে কালো মানুষ। টল ফিগার। আমি ইউনিভার্সিটি যাচ্ছি। আমাকে বললে, "এই যে সাহেব ,আপনারা থাকতে আমরা কেন না খাইয়া মরুম?"
এগুলো এখন ভাবলে আমার কান্না পায়। আমার পকেটে মাত্র পাঁচ টাকা ছিল। তোমাকে বলেছি যে টাকা নিয়ে আমি বের হই না। পাঁচ টাকা দিয়ে আমি চলে গেলাম। আর কিছুই বলল না। এগুলোর থেকে বেদনাদায়ক কথা আর কিছু হতে পারে না। বাড়িতে যারা পরিচারকের কাজ করতেন ,তাদের প্রতি একটা অদ্ভুত স্নেহ-মমতা আহমদ শরীফের ছিল। আগত অতিথিরা যদি ফল, মিষ্টি ইত্যাদি নিয়ে আসতেন বা অন্য কোনো রকম খাবার নিয়ে আসতেন, বাড়িতে সেই খাবারের ভাগ বাড়ির পরিচারক ,পরিচারিকাদের দেয়া হয়েছে কিনা সেটা তিনি নিজে খবর নিতেন। এমন ঘটনা দেখা গেছে যে, তাঁর বাড়িতে আসা একটি ছোট মেয়ে নানা কারণে তাকে খাবার দিতে দেরি হয়েছে, সেই কারণে রাগ করে আহমদ শরীফ নিজে সেদিন কোন খাবার খাননি।টেলিভিশনে ভালো কোন নাটক শুরু হওয়ার আগে তিনি বাড়ির পরিচারিকাদের ডেকে আনতেন নাটকটা দেখবার জন্য।
যৌথপরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আহমদ শরীফ। যৌথ পরিবারের ধারাটি কিন্তু আমৃত্যু তিনি তাঁর নিজের বাড়িতে তিনি বজায় রেখেছিলেন। খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত যতটা সম্ভব একসঙ্গে করতে তিনি পছন্দ করতেন। আর এখানে আরেকটা কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে হয় যে, তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন পর্যন্ত উপার্জনক্ষম কোনো সন্তানের কাছ থেকে সংসার চালানোর জন্য একটি পয়সাও তিনি নেননি।








