এসআইআর বাতিলের দাবি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের, কী বলছে আন্তর্জাতিক সংস্থা?
Special Intensive Revision SIR: ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তথ্যগত ত্রুটির কারণে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকার এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা হরণ হচ্ছে বলে সংগঠনটির অভিযোগ।
ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানাল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংগঠনটির অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মহিলা, মুসলিম এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ এর ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। শুধু ভোটাধিকার নয়, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় অনেকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
গত ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের চালানো এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়ার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংগঠনটির এশিয়া বিভাগের অধিকর্তা এলেন পিয়ারসন বলেন, প্রথমে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এরপর সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করতে গিয়ে মানুষকে পুলিশি মারধর ও গ্রেফতারের মুখে পড়তে হচ্ছে। তাঁর মতে, এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।
এই প্রতিবেদন তৈরির জন্য দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র এবং কর্নাটকের ৭০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে এইচআরডব্লিউ। তাঁদের মধ্যে ৪০ জন সরাসরি এসআইআর প্রক্রিয়ার কারণে সমস্যায় পড়েছেন। এছাড়াও প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার, আইনজীবী, সমাজকর্মী এবং একজন বর্তমান নির্বাচনী আধিকারিকের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
SIR 2025 in West Bengal: বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছে, সংখ্যালঘু-প্রধান সীমান্ত জেলাগুলিতে বেশি অনথিভুক্ত মানুষ রয়েছেন। কিন্তু এসআইআর-এর তথ্য বলছে ঠিক উল্টো, এই জেলাগুলিতেই বৈধ নথি থাকা মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের ব্যবহৃত 'লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি' বা তথ্যগত অসংগতির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এইচআরডব্লিউর দাবি, এই শব্দের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়েই বহু মানুষের নাম বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। নামের বানানে সামান্য ভুল, পরিবারের সদস্যের সংখ্যা ছয়ের বেশি হওয়া কিংবা দুই ভাইবোনের জন্মের ব্যবধান নয় মাসের কম হওয়ার মতো বিষয়ও অসংগতির কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের এক মুসলিম দর্জির উদাহরণ দিয়েছে সংগঠনটি। পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচের বেশি হওয়ায় তাঁকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছিল। অথচ তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রয়োজনীয় নথি ছিল এবং তাঁরা বহু বছর ধরেই ভোটার তালিকায় ছিলেন।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ। তাদের দাবি, পুরনো কাগজের ভোটার তালিকা ডিজিটাল করার সময় ভুল হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ব্যবহৃত সফটওয়্যারের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে নামের বানান এবং তথ্যের ভুলের কারণে মুসলিম ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি সমস্যায় পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাদের দাবি, এসআইআরে বাদ পড়া বা সন্দেহের তালিকায় থাকা ভোটারদের মধ্যে যাঁদের আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে, তাঁদের ৯৩ শতাংশের নাম আবার ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ, যাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের বড় অংশই বৈধ ভোটার ছিলেন। অন্যদিকে, এখনও ৩৪ লক্ষের বেশি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এই গতিতে কাজ চললে সব আবেদনের নিষ্পত্তি করতে অন্তত ২১ বছর লাগতে পারে বলে কলকাতা হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় বহু মানুষ রেশন, সরকারি বৃত্তি, পাসপোর্ট নবীকরণ এবং বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা পেতে সমস্যায় পড়ছেন। পশ্চিমবঙ্গে এক মহিলার অন্নপূর্ণা যোজনার আর্থিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যায়। আবেদন করার পরেও তিনি সেই সুবিধা ফিরে পাননি। অন্য এক ব্যক্তির ১৪ বছরের ছেলের ১২০০ টাকার সরকারি বৃত্তিও বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ।
এইচআরডব্লিউ মনে করিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ভারতের দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার এবং সরকারি পরিষেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা। সংগঠনটির মতে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের উপর অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ তৈরি করা হয়েছে। তাই এই প্রক্রিয়া যুক্তিসংগত ও বৈষম্যহীন নয়। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যাতে প্রান্তিক মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া না হয়, সেই দাবিতেই এসআইআর বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে তারা।







