হাতের ইশারায় ঠিক হলো জমির মাপ! যেভাবে চিনাদের বসতি গড়ে উঠল বাংলায়

Chinatown: আজকের চায়নাটাউন, টেরিটিবাজার বা জি হিং চার্চ-কে ঘিরে কলকাতায় যে চিনা বসতি গড়ে উঠেছে, তার যাত্রাপথ শুরু আছিপুরে।

tiasa gupta
৪ মিনিট
হাতের ইশারায় ঠিক হলো জমির মাপ! যেভাবে চিনাদের বসতি গড়ে উঠল বাংলায়

তখন ১৭৭৮ সাল। বজবজের দক্ষিণে নদীতিরে এসে ভিড়ল একটি চিনা জাহাজ। উদ্দেশ্য ইংরেজদের সঙ্গে বাণিজ্য করা। আফিমের ব্যবসাতেও ততদিনে বেশ হাত পাকিয়ে ফেলেছে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তাই চিন থেকে এমন জাহাজ মাঝে মাঝেই আসে কলকাতার বন্দরে। কিন্তু জাহাজ থেকে যাঁরা নামেন, তাঁরা সকলেই ফিরে যান না। তেমনই ফিরে গেলেন না টং অছি। কলকাতার অদূরে খানিকটা পরিত্যক্ত ফসলি জমি দেখে থেকে গেলেন। শুরু হলো ভারতে চিনা উপনিবেশ তৈরির একটি প্রস্তুতি। আজকের চায়নাটাউন, টেরিটিবাজার বা জি হিং চার্চ-কে ঘিরে কলকাতায় যে চিনা বসতি গড়ে উঠেছে, তার যাত্রাপথ শুরু এই আছিপুরেই। সে আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা।

আলোচনার টেবিলে বারবার বসেছে ভারত-চিন। কোনও লাভ হয়নি। লাল ফৌজ ও ভারতীয় সেনা বারবার সীমান্তে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে থেকেছে পরস্পরের দিকে। তা সত্ত্বেও এই শহর বিভিন্ন সংস্কৃতিকে ঠাঁই দিয়েছে। তাই তো 'সিটি অফ জয়', কলকাতা। এই শহরের বুকেই রয়েছে একটুকরো চিন। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। কলকাতার এই চিনা পাড়া যেন বাংলার মিশ্র সংস্কৃতির এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সালটা ১৯৬২। ইন্দো-চিন যুদ্ধের পর কাজের খোঁজে ভারতে চলে আসে ভারত-চিন সীমান্তে বসবাসকারী অনেক চিনা পরিবার। তাও প্রায় কয়েকহাজার। তাদেরই মধ্যে এখনও টিকে রয়েছে কিছু পরিবার। তাদের হাত ধরে এই শহরে ঠাঁই করে নিয়েছে চিনা খাদ্য-সংস্কৃতি। নুডল স্যুপ, রাইস পুডিং, ওয়ানটন, পর্ক সসেজ সাজিয়ে তাই তো টেরিটিবাজার সূর্যের আলো ফোটার আগেই আপনার অপেক্ষায় বসে থাকে। এই শহরের সঙ্গে চিনা সংস্কৃতির আত্তীকরণ এবং চিনা উপনিবেশের পত্তন হয় অনেক আগে। শুরু হয়েছিল টং অছির হাত ধরে। এর পরের গল্প অনেক দীর্ঘ এবং আকর্ষণীয়।

টাকাপয়সা সঙ্গে করে খুব কম আনেননি টং অছি। লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস অবশ্য ৫৬০ বিঘা ফসলি জমি অছিকে দানই করেছিলেন। কিন্তু সেখানে চাষ-আবাদের প্রস্তুতি করলেন তিনি নিজেই। আর এই সংবাদ শুনে ছুটে এলেন বর্ধমানের মহারাজা। দাবি, এই জমি তাঁর। অবশেষে কোম্পানির মধ্যস্থতায় ঠিক হলো, বার্ষিক খাজনার ভিত্তিতে জায়গাটির মালিকানা পাবেন অছি। তিনি তাতেই রাজি। কারণ তিনি ঠিক করে ফেলেছেন, এখানেই তৈরি করবেন চিনির কল। আর রোজগার তাহলে নেহাৎ মন্দ হবে না।

অছি-র এই জমিকে নিয়ে আছে আরেক কিংবদন্তি। যে কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে কলকাতার চিনা সংস্কৃতিও। অনেকে বলেন, অছির সমাধির মতো তাঁর এলাকাও নাকি ছিল অশ্বক্ষুরাকৃতি। বড়লাট যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কতটা জায়গা লাগবে; তখন অছি হাতের ইশারায় দেখিয়েছিলেন 'এই এত্তটা'। আর সেই ইশারা অনুযায়ী জমির আকৃতিও হয় ঘোড়ার ক্ষুরের মতো। তাঁর সমাধির আকারও তাই। এমনকী, পরবর্তীকালে কলকাতার অনেক চিনা অধিবাসীর সমাধির গঠন ছিল ঘোড়ার ক্ষুরের মতো।

শুরুটা বেশ জাঁকিয়ে বসলেও, বেশিদিন চিনির ব্যবসা চালাতে পারলেন না অছি। চিন থেকে আসা অন্যান্য ব্যবসায়ীরাই নিজেদের ঈর্ষার বশে তাঁর পিছনে লাগলেন। তাঁরা তো আর জানতেন না, তিনি আসলে ইংরেজদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কলকাতার মতোই আরেক শহর তৈরির চেষ্টা করছেন। যে শহর আসলে চিনাদের তৈরি। স্বজাতিদের ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে অছি শেষ পর্যন্ত কোম্পানির হস্তক্ষেপ দাবি করলেন। ১৭৮১ সালে কোম্পানি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ঘোষণা করল, তারা এই চিনা উপনগরীটিকে উৎসাহ দিতে চায়। ফলত যাঁরা অছির চিনির কলে বাধা সৃষ্টি করবেন, তাঁরা শাস্তি পাবেন। তার প্রত্যুত্তরে কোম্পানিকে ধন্যবাদ দিয়ে চিঠিও লিখলেন টং অছি। তবে ততদিনে অনেক শ্রমিকই তাঁর কারখানা ছেড়ে চলে গেছেন কলকাতা শহরে। ধর্মতলার কাছেই একটি জায়গায় হাত লাগিয়েছেন নতুন ব্যবসায়। সে জায়গার নাম তখন কাসাইতলা। এর কিছুদিনের মধ্যেই মারা গেলেন টং অছি। তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হলো। পরে নিলামেও উঠেছিল।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নথি অনুসারে ১৭৮৩ সাল নাগাদ অছির মৃত্যু হয়। এরপর চিনা অধিবাসীরা কালক্রমে চলে আসেন কলকাতায়। এরপর ক্রমে জমে ওঠে বেন্টিংক স্ট্রিট, বউবাজার এবং টেরিটিবাজারে চিনা জনবসতি। অছিপুর ফেরিঘাটের পাশেই পূজালি পুরসভার গেস্টহাউস। ফেরিঘাটের আগে বাঁদিকে এক রাস্তা চলে গেছে বটতলা থেকে চিনেম্যানতলায়। সেই চিনেম্যানতলায় অবিকল ইস্টবেঙ্গলের পতাকার রঙে সেজে উঠেছে চিনা উপাসনাস্থল। সবদিন এই মন্দির খোলে না। এই মন্দির সেজে ওঠে চিনা নববর্ষের দিন ও তারপরের রবিবারে। এই মন্দিরে পূজিত হন অছির আনা দেবমূর্তি খুদা মুদি। মজার ব্যাপার হলো, একই সঙ্গে মন্দিরে ফুল, মালা, নৈবেদ্য পান দক্ষিণরায় ও বনবিবিও।

অছি প্রতিষ্ঠিত চিনির কল আজ আর নেই। নেই সাধের চিনা উপনগরীও। অছির প্রকৃত সমাধিকে নাকি গ্রাস করেছে নদী। এখনকার সমাধিটা নাকি পরে তৈরি করা। যেসব চিনদেশীয় এখন মাঝেমধ্যে আসেন, আজ তাঁরা ভারতেরই নাগরিক। অনেক চিনাই আজও শিকড়ের সন্ধানে আসেন এইখানে। ছুঁয়ে দেখেন অছির সমাধি, ফেলে আসা উপনগরীর ছোঁয়া। অছির মন্দিরের আশপাশে ঝোপঝাড় সরিয়ে চিনারা খোঁজার চেষ্টা করেন সেইসব সোনার দিন। আজ প্রায় তার কিছুই অবশিষ্ট নেই। বেঁচে আছে 'আছিপুর’ নামটা। এই নাম স্মৃতি বহন করছে টং অছির। আর সেই সঙ্গে বাংলার বুকে চিনা উপনগরীর পথচলার দিনগুলোর ইতিকথায় লেখা আছে এক চিনা নাগরিকের উদ্যোগ এবং স্বপ্নের কথা।

কলকাতায় আজ চায়নাটাউন আছে, টেরিটিবাজার আছে। কলকাতার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে চিনা সংস্কৃতি। অন্য অনেক সংস্কৃতির মতো চিনা সংস্কৃতিকেও ঠাঁই দিয়েছে এই শহর। এরপরও ভারতের সীমান্তে লাল ফৌজের লাল চোখ অতীত নয়, বর্তমান।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়েই গড়ে উঠেছিল ঢাকা কালীবাড়ি, দক্ষিণ কলকাতার মন্দিরের ইতিহাস

Dhaka Kalibari: দেশভাগের পর বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে নিজের শিকড়ের স্মৃতি ধরে রাখতে মন্দির গড়ে তুলেছিলেন ননীগোপাল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরই আজ পরিচিত ঢাকা কালীবাড়ি নামে। মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, কালীপুজোর বিশেষ ভোগ—মন্দিরটির ইতিহাসে মিশে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশভাগের স্মৃতি। কী ভাবে?

বইয়ের জন্য হাঁটতে হয় কেন?

Walk for Books 2026: প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বইমেলাকে মনে করে বইয়ের জন্য একবার হেঁটেছিল বাঙালি। তারপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবার এই ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এ দেখা গেল সেই ছবি। হুড়দুড় করে ছেলেবুড়োমেয়েমদ্দ সব রাস্তায় নেমে এল—এ কী আজব খেলা রে ভাই!

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।