চিনে খাবারের স্বর্গরাজ্য, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে কলকাতার এই এলাকা

tiasa gupta
৩ মিনিট
চিনে খাবারের স্বর্গরাজ্য, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে কলকাতার এই এলাকা

নুডল স্যুপ, রাইস পুডিং, ওয়ান্টন, পর্ক সসেজ। এসব যখন আপনার হাতের নাগালে- তখন যে কোনও খাদ্য-বেরসিকেরও জিভে জল আসতে বাধ্য। টেরিটিবাজারের চিনে জলখাবার গোটা কলকাতার মানুষের কাছেই পরিচিত। ভোরবেলা পৌঁছে গেলে সেখানে মিলবে এলাকার বাসিন্দাদের ঘরে তৈরি মোমো, নুডলস, মাংস থেকে শুরু করে নানা ধরনের খাবার। চিনের সঙ্গে সীমান্তে ঝগড়া চললেও, এদের খাবারের প্রতিপত্তিকে কুর্নিশ না জানিয়ে উপায় কী! আর কলকাতার ভোজন-আমুদেরা তো এই জায়গার প্রেমে পড়ে রয়েছেনই।

মধ্য কলকাতার টেরিটিবাজার ‘পুরনো চায়না টাউন’ নামেও পরিচিত। ‘ওয়ার্ল্ড মনুমেন্টস ওয়াচ লিস্ট ২০২২’-এ বিশ্বের ২৫টি ঐতিহ্যবাহী জায়গার একটি তালিকা তৈরি হয়েছে। তাতেই উঠে এসেছে এই অঞ্চলের নাম।

কলকাতার মানুষ ভোজনবিলাসী। আর তা শুধু আজ থেকে নয়, আগাগোড়াই এই শহরের মানুষ ভাল-মন্দ খাবার খেতে ভালবাসে। আর এই খাওয়াদাওয়া যদি হয় সকালের জলখাবারে, তা হলে তো আর কোনও কথাই নেই। কলকাতায় একদিন আপনি ভোরবেলা জলখাবারে খাঁটি চিনে খাবার দিয়ে পেটপুজো করতে পৌঁছে যেতেই পারেন এই শহরের টেরিটিবাজার অঞ্চলে।

সকাল সকাল যদি আপনার ডেস্টিনেশন হয় টেরিটিবাজার, কীভাবে যাবেন?

টেরিটিবাজারের অবস্থান লালবাজারের কাছে। টেলিফোন এক্সচেঞ্জের পাশে ছাতাওয়ালা গলিতে এই চিনে জলখাবারের বাজার বসে প্রত্যেক দিন ভোরে। আপনি পোদ্দার কোর্ট এলাকা থেকে আসতে পারেন, অথবা বড়বাজারের সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশন থেকে মাত্র ৫ মিনিট হেঁটেই এখানে পৌঁছে যেতে পারেন।

দেরি করলেই মিস!

ভোর ৫টার মধ্যেই প্রাতঃরাশের জন্য এই বাজারে পৌঁছে যেতে হবে। না হলে মুখরোচক অনেক খাবারই বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যেতে পারে। এখানে পাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার হল নানা কিসিমের মোমো। চিকেন মোমো, ফিশ মোমো, পর্ক মোমো, চিকেন তাই পাও, শুমাই, সসেজ, প্রন ওয়েফার, হট স্যুপ নুডুলস, স্টেমড বাওজি বান, চিকেন রোল সসেজ, স্টাফড বান, শুয়োরের মাংসের রোল, ওয়ান্টন ইত্যাদি।

বাজারটির নামকরণ করা হয়েছে ভেনিসের একজন ইতালীয় অভিবাসী এডওয়ার্ড টিরেত্তার নামে। তিনি আঠারো শতকের শেষের দিকে এই এলাকার একজন জমি জরিপকারী এবং অনেক জমির মালিক ছিলেন।

১৭৮০ সাল নাগাদ কলকাতায় বসতি স্থাপন করার পর চিনদেশীয় মানুষজন পোশাক, চিকিৎসার পাশাপাশি কলকাতা শহরের রন্ধনশিল্পকেও প্রভাবিত করেছে। এঁদের সংস্পর্শে এসেই পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত একটি ধারার খাবারের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় হয়। এখনও যদি আপনি যথাযথ চিনে খাবারের স্বাদ নিতে চান, তবে আপনাকে অবশ্যই কলকাতার নিজস্ব মিনি চায়নাটাউন হিসাবে খ্যাত টেরিটিবাজার পরিদর্শন করতে হবে। এই জায়গাটি শুধুমাত্র কিছু ভাল চিনে খাবার পরিবেশন করে না। এমনকী, স্থানীয় চিনা অভিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যও রক্ষা করে।

‘ওয়ার্ল্ড মনুমেন্টস ফান্ড’ (ডব্লিইউএমএফ) বিশ্বের ২৫টি ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকা প্রকাশ করে। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ যেসব স্থানের রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন, যত্নের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যেসব জায়গা, তেমনই কিছু জায়গার তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকাতেই ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বের প্রথম ২৫টি স্থানের মধ্যে রয়েছে টেরিটিবাজারের নাম। এই এলাকাকে ভারতের প্রথম চায়নাটাউন হিসাবে উল্লেখও করা হয়েছে সেখানে। এই ডব্লিউএমএফ হল আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরের একটি সংস্থা। তাদের দফতর রয়েছে ব্রিটেন, ভারত, কম্বোডিয়া, পেরু, স্পেন, পর্তুগালের মতো কিছু দেশেও। এই তালিকা প্রকাশের উদ্দেশ্য হিসাবে তারা জানিয়েছে, ইতিহাস সংরক্ষণ করতে বিভিন্ন সংগঠন, সংস্থা এবং ব্যক্তিকে উৎসাহ দিতে চায় তারা। সেজন্যই তৈরি হয় এমন তালিকা।

গোটা শহরের বেশিরভাগ এলাকাই যখন ঘুমঘুম চোখে আচ্ছন্ন, তখন এই একটা পাড়ায় ঢুকলেই সমস্ত ভ্রম দূর হয়ে যায়। নানারকম চিনা খাবারের ডালা সাজিয়ে বসে থাকে এই জায়গা। কোথাও টগবগিয়ে ফুটছে স্যুপ, তো কোথাও মোমো থেকে উঠছে ধোঁয়া। চিনা পরিবারের সদস্যরা নিজেদের হাতে তৈরি খাবার নিয়ে বসেন ওই এলাকায়। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা, যে কোনও মরশুম নির্বিশেষে আজও তাঁরা হাতে তৈরি খাবার নিয়ে বসেন পথের ধারে। মোমো, সুপ, ডাম্পলিং, ওয়ানটন, সসেজের গন্ধে ভরপুর থাকে গোটা চত্বর। ভোর ছ’টা-সাড়ে ছ’টা থেকেই রমরমিয়ে শুরু হয়ে যায় কেনাকাটা। আর ঘড়ির কাঁটা আটটার ঘরে পৌঁছনোর আগেই প্রায় সব শেষ!

আলোচনার টেবিলে বারবার বসেছে ভারত-চিন। কোনও লাভ হয়নি। লাল ফৌজ ও ভারতীয় সেনা বারবার সীমান্তে বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে থেকেছে পরস্পরের দিকে। তা সত্ত্বেও এই শহর বিভিন্ন সংস্কৃতিকে ঠাঁই দিয়েছে। তাই তো সিটি অফ জয় কলকাতা। আর এই শহরের বুকেই রয়েছে এক টুকরো চিন। কলকাতার এই চিনা পাড়া যেন বাংলার মিশ্র সংস্কৃতির এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ইন্দো-চিন যুদ্ধের পর কাজের খোঁজে ভারতে চলে আসে ভারত-চিন সীমান্তে বসবাসকারী অনেক চিনা পরিবার। তাও প্রায় কয়েক হাজার। তাদেরই মধ্যে এখনও টিকে রয়েছে কিছু পরিবার। তাদের হাত ধরে এই শহরে ঠাঁই করে নিয়েছে চিনা খাদ্য-সংস্কৃতি।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।