প্যালেস্টাইন থেকে ভেনেজুয়েলা: হানাদার ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কার চাই!
Donald Trump: ট্রাম্পের প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও কখনও সফল হয়নি। তিনি ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন, যা প্যালেস্টাইনিদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন তারপর প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপহরণ। নেপথ্যে কে? ট্রাম্প প্রশাসন। ইরানে পরমানু কেন্দ্রে হামলা। নেপথ্যে? ট্রাম্প প্রশাসন। লাগাতার গাজায় ইজরায়েলি হামলায় মদত। নেপথ্যে সেই ট্রাম্প। প্রশ্ন একটাই, যে রাষ্ট্রনেতা অবিরাম যুদ্ধজিগির তোলেন, অবিরাম ইন্ধন দেন অশান্তিতে, হুমকি দেওয়া, চাপ তৈরি করা, সরকার ফেলে দেওয়া যার রোজের রুটিন তিনি কী ভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দাবি করেন? অথচ আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর। কারণ, এখন আর সিদ্ধান্ত নৈতিকতার উপর দাঁড়িয়ে থাকে না। কে বেশি ক্ষমতাবান, কে নিজের কথা জোর করে চাপিয়ে দিতে পারে উত্তরটা আসলে সেখানেই।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বাস্তবতারই উদাহরণ। ইরান, ভেনেজুয়েলা, মধ্যপ্রাচ্য বা পূর্ব এশিয়া— সব জায়গাতেই তাঁর নীতি ছিল চাপ বাড়ানো, হুমকি দেওয়া আর যুদ্ধের বিকল্প সব সময় খোলা রাখা। তবু সেই ট্রাম্পই নিজেকে শান্তির দাবিদার হিসেবে তুলে ধরেন। এখানেই আধুনিক ‘শান্তি’ ধারণার সংকট।
এক সময় শান্তি মানে ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা, অস্ত্র নামিয়ে রাখা, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সংজ্ঞা বদলেছে। এখন শান্তি মানে যেন যুদ্ধ পুরোপুরি না হওয়া, অথবা যুদ্ধকে এমন ভাবে পরিচালনা করা যাতে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়। এই পরিবর্তনই ট্রাম্পের মতো নেতাদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়। যুদ্ধ ঘোষণা না করেও যখন হামলা চলে, নানা নিষেধাজ্ঞাকে নিরাপত্তার নামে চালানো হয়, গোপনে অন্য দেশের ভেতরে ঢুকে পড়া হয়— তখন সেই সহিংসতাকেই শান্তি বলে দেখানো হয়। ট্রাম্প এই কৌশলটাই খুব ভালোভাবে ব্যবহার করেন।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল ছিল ধাপে ধাপে চাপ বাড়ানো। প্রথমে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তারপর তেল পরিবহণে হস্তক্ষেপ, আর শেষে সমুদ্রপথে কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ।তেলনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি ছিল শ্বাসরোধকারী ব্যবস্থা। অথচ এই পদক্ষেপ গুলিকে কখনও ‘যুদ্ধ’ বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মাদক পাচার বন্ধ করা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
US Venezuela conflic: বে অফ পিগস অভিযানের মতোই এবারও আলোচনায় রয়েছে সিআইএ-র ভূমিকা।
গত বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই তিনি মাদুরো সরকারের উপর চাপ দেওয়া শুরু করেন। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো সম্পর্কিত তথ্য দেওয়ার জন্য পুরস্কারের পরিমাণ দ্বিগুণ করে দেন। সেপ্টেম্বরে মার্কিন সেনারা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পরিবহণে অভিযুক্ত নৌযানগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করেন। এরপর থেকে ক্যারিবিয়ান ও প্রশান্ত মহাসাগরে এই ধরনের নৌযানগুলিতে ৩০টির বেশি হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে ১১০-এরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
অক্টোবরে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তিনি সিআইএ-কে ভেনেজুয়েলার ভিতরে গোপন অভিযান চালানোর অনুমতি দিয়েছেন। তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন, মাদুরো 'যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু নয়' এবং তার সরে যাওয়াই ঠিক হবে। এরপর থেকে ভেনেজুয়েলার উপকূলে মার্কিন রণতরীর উপস্থিতি, তেলবাহী জাহাজ দখল, একের পর এক হামলা চালান হয়েছে। তবে সবই এমন ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যেন এগুলো শান্তি বজায় রাখার প্রয়োজনীয় উপাদান। 'শান্তি বজায় রাখা', 'নিরাপত্তা' এই কথাগুলোই আসলে মূল রাজনীতির অংশ। কারণ, যতক্ষণ কোনো কাজকে যুদ্ধ বলা হচ্ছে না, ততক্ষণ তার নৈতিক দায় সহজেই এড়িয়ে যাওয়া যায়।
শনিবার ভোরে মার্কিন বাহিনী কারাকাস শহরে আক্রমণ চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ভোররাতে শহর জুড়ে প্রচণ্ড শব্দ শোনা গিয়েছে এবং আকাশে যুদ্ধবিমান অনেকটাই নিচ থেকে উড়তে দেখা গিয়েছে। এই ঘটনার মধ্যেই ট্রাম্প আরও চাঞ্চল্যকর ঘোষণা করেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। নিউইয়র্ক ছাড়াও ফ্লোরিডা ও অন্যান্য শহরে তাঁদের বিচার হবে বলে ট্রাম্প জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন,
প্রয়োজনে আরও বড় পরিসরে দ্বিতীয় দফায় আক্রমণের প্রস্তুতি রেখেছি আমরা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Venezuela crisis: ট্রাম্প শুধু সমুদ্রেই নয়, 'স্থল ভাগে' কথিত মাদকচক্রকেও আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন— যা বাস্তবে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান ঘোষণার সমতুল্য।
তিনি মন্তব্য করেছেন,
ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রদবদল না হওয়া পর্যন্ত আমরাই দেশটি চালাব।
এখন প্রশ্ন হলো, “আমরাই দেশটি চালাবো”— এই বক্তব্য কি সরাসরি দখলদারিত্বের স্বীকারোক্তি? “প্রয়োজনে আরও বড় আক্রমণ”— এই হুমকি কি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের ইঙ্গিত নয়? এভাবে শক্তি প্রয়োগ করে শান্তি আনা কি আদৌ সম্ভব?
ইরানের ক্ষেত্রে এই কৌশল আরও স্পষ্ট। পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো, বি-২ বোমারু বিমান ও সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ— এগুলো নিঃসন্দেহে সামরিক আগ্রাসন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন একে আখ্যা দেয় ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে। এই যুক্তি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, যদি ভবিষ্যতে হুমকি হতে পারে এই অজুহাতে বর্তমান হামলাকে বৈধতা দেওয়া হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন অর্থহীন হয়ে পড়ে। তবু এই যুক্তি দিয়েই ট্রাম্প নিজেকে শান্তির রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি নাকি বড় যুদ্ধ আটকাতে ছোট হামলা চালিয়েছেন।
ট্রাম্পের প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও কখনও সফল হয়নি। তিনি ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন, যা প্যালেস্টাইনিদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। এর পরবর্তী সময়ে হামাস-ইজরায়েল দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতেও ট্রাম্প প্রশাসন মূলত ইজরায়েলকেই সমর্থন জানিয়েছে এবং কোনো নিরপেক্ষ মধ্যস্থতায় আসেনি। ট্রাম্পের নীতি প্যালেস্টাইনের জনসাধারণের উপর চাপ ক্রমশ বাড়িয়েছে।
আসলে ট্রাম্পের শান্তির ধারণা যুদ্ধবিরোধী নয়, বরং যুদ্ধ-ব্যবস্থাপনামূলক। তিনি এমন এক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে, যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্র ঠিক করে দেবে কোথায় কতটা সহিংসতা গ্রহণযোগ্য। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বৈঠক, মধ্যপ্রাচ্যে চুক্তি, আফগানিস্তান নিয়ে আলোচনা— সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্য ছিল মার্কিন প্রভাব বজায় রাখা। কোথাও তিনি নিরস্ত্রীকরণের কথা বলেননি, বলেননি সামরিক ব্যয় কমানোর কথা। বরং একই সঙ্গে শান্তির কথা বলেছেন এবং সামরিক বাজেট বাড়িয়েছেন।
এই প্রেক্ষিতেই নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রসঙ্গ আসে। আজকের নোবেল শান্তি পুরস্কারও আর যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক নয়। এটা মূলত কূটনৈতিক উপস্থিতি আর দেখনদারির স্বীকৃতি। কে কতটা বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে, কে আলোচনার টেবিলে বসতে পেরেছে এই সবকিছুরই মূল্য বাড়ছে।
ফলে ট্রাম্পের দাবি অদ্ভুত শোনালেও একেবারে আলাদা কিছুও নয়। যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন বিদেশ সচিব হেনরি কিসিঞ্জারের মতো যুদ্ধকৌশলবিদ শান্তির পুরস্কার পেতে পারেন, তখন ট্রাম্প নিজেকে সেই তালিকার বাইরে ভাববেন কেন? ট্রাম্পের কাছে শান্তি একটি রাজনৈতিক ব্র্যান্ড। এটি তাঁর শক্তিশালী নেতার ভাবমূর্তি জোরদার করে। তিনি দেখাতে চান বিশ্ব তাঁকে গুরুত্ব দেয়, শত্রুরা তাঁকে ভয় পায়, মিত্ররা তাঁর উপর নির্ভর করে। নোবেল শান্তি পুরস্কার এই ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য আদর্শ প্রতীক।
তাই প্রশ্নটা শুধু আর ট্রাম্পকে ঘিরেও সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্নটা গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে ঘিরে। যদি শান্তি মানে হয় শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা, যদি শান্তি মানে হয় নিয়ন্ত্রিত সহিংসতা, তাহলে ট্রাম্পের মতো নেতারা নিজেকে শান্তির দাবিদার ভাবতেই পারেন। কিন্তু যদি শান্তি মানে হয় যুদ্ধের বিরোধিতা, সামরিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা তাহলে এই দাবির ভিতর ফাঁপা শব্দ ছাড়া কিছুই নেই। আজকের বিশ্ব সেই দ্বন্দ্বের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে। শান্তির ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে শক্তির পক্ষে, আর এতেই ট্রাম্পের দাবি স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এই স্বাভাবিকতাই সবচেয়ে ভয়ের।







