ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ মনে করাচ্ছে বে অফ পিগস
US Venezuela conflic: বে অফ পিগস অভিযানের মতোই এবারও আলোচনায় রয়েছে সিআইএ-র ভূমিকা।
শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে হামলার ঘটনা নতুন করে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ভোররাতে শহরজুড়ে বিকট শব্দ শোনা যায়, আকাশে যুদ্ধবিমান অনেকটাই নিচ দিয়ে উড়তে দেখা যায়। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সামরিক বিমানঘাঁটি লা কার্লোটা এবং প্রধান সামরিক ঘাঁটি ফুয়ের্তে তিউনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর। পার্শ্ববর্তী একাধিক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আতঙ্কে সাধারণ মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়েন।
এই ঘটনার মধ্যেই আরও বিস্ফোরক ঘোষণা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রডরিগেজ দাবি করেছেন, মাদুরোর জীবিত থাকার প্রমাণ দিতে হবে। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ভেনেজুয়েলা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন করে চরম উত্তেজনার দিকে মোড় নেয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Venezuela crisis: ট্রাম্প শুধু সমুদ্রেই নয়, 'স্থল ভাগে' কথিত মাদকচক্রকেও আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন— যা বাস্তবে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান ঘোষণার সমতুল্য।
এই ঘটনা নতুন নয়। ট্রাম্প প্রশাসন আগেও একাধিকবার মাদুরো সরকারকে ‘অবৈধ’ বলে আক্রমণ করেছে। একসময় মাদুরোকে গ্রেফতারের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে সামরিক বিকল্প খোলা আছে।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বড় আকারে বাড়িয়ে দেয়। উন্নত প্রযুক্তির যুদ্ধজাহাজ, নজরদারি বিমান এবং সমুদ্রপথে হাই-টেক অপারেশন চালিয়ে মার্কিন নৌবাহিনী ভেনেজুয়েলার উপকূলের একেবারে কাছাকাছি অবস্থান নেয়। সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চল ও প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৩০টি হামলা চালিয়েছে কথিত মাদক পাচারকারী নৌযানে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই হামলাগুলি আন্তর্জাতিক মাদক চক্র দমনের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই অভিযান কি শুধুই মাদকবিরোধী? নাকি এর আড়ালে রয়েছে রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Maria Corina Machado: মারিয়া কোরিনা মাচাদোর অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনা কেবল ভেনেজুয়েলার রাজনীতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, বরং লাতিন আমেরিকার ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক নিওলিবারেল মডেলের পুনরাবৃত্তি।
এই আবহেই মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন দাবি করেছিল, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে কোকেন উৎপাদন কেন্দ্র ও পাচার রুটে হামলার ছক করছিল। এর পরই একের পর এক হামলার ঘটনা সামনে আসে। মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর ‘আটক’ ঘোষণাকে ভেনেজুয়েলা সরকার ও সমর্থকরা দেখছেন সরকারের ভিতরে অস্থিরতা তৈরি করার একটি কৌশল হিসেবে। তাঁদের দাবি, এই ঘোষণার উদ্দেশ্য দেশজুড়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং সরকারের অবস্থান দুর্বল করা। এই পরিস্থিতিতেই অনেকের মনে ফিরে আসছে ইতিহাসের বে অফ পিগস অভিযানের কথা।
কী হয়েছিল এই অভিযানে? ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সদ্য প্রতিষ্ঠিত ফিদেল কাস্ত্রোর সমাজতান্ত্রিক সরকার উৎখাত করতে গোপনে একটি সামরিক অভিযান চালায়। এই অভিযানের পরিকল্পনা করেছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। প্রায় ১,৫০০ জন মার্কিন প্রশিক্ষিত কিউবান নির্বাসিত সৈন্যকে কিউবার দক্ষিণ উপকূলে নামানো হয়। লক্ষ্য ছিল একটাই, সরকার বদল। ধারণা ছিল, হামলার পর কিউবার জনগণ কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল উল্টোটা। কিউবার সেনা ও সাধারণ মানুষ কাস্ত্রোর পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। মাত্র তিন দিনের মধ্যেই অভিযান ব্যর্থ হয়। ১,২০০ জনের বেশি হামলাকারী বন্দি হয় এবং শতাধিক নিহত হন। এই ব্যর্থতা তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা ছিল। আন্তর্জাতিক স্তরে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, ফিদেল কাস্ত্রোর সরকার আরও শক্তিশালী হয়।
আজ ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও অনেকে একই ধরনের ছক দেখতে পাচ্ছেন। প্রথমে সরকারকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা, তারপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, এরপর সামরিক চাপ ও গোপন অভিযানের ইঙ্গিত। বে অফ পিগস অভিযানের মতোই এবারও আলোচনায় রয়েছে সিআইএ-র ভূমিকা। ভেনেজুয়েলা সরকারের মতে, মাদকবিরোধী অভিযানের আড়ালে আসলে লক্ষ্য একটাই, সরকার পরিবর্তন। ট্রাম্পের মাদুরো আটক ঘোষণা সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে।
তবে, বে অফ পিগস অভিযান প্রমাণ করেছিল, লাতিন আমেরিকায় বাইরের হস্তক্ষেপ সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফল আনে না। অনেক সময় তা উল্টো প্রভাব ফেলে এবং যাকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়, সে-ই আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আজ ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও কি তাই হতে চলেছে? নাকি এবার ফলাফল হবে ভিন্ন? এটি কি সত্যিই একটি সামরিক অভিযান, নাকি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত এক পুরনো কৌশলের নতুন রূপ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনই স্পষ্ট নয়। তবে ইতিহাস বলছে, লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বারবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও কি ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে, তা সময়ই বলবে।






