ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ মনে করাচ্ছে বে অফ পিগস

US Venezuela conflic: বে অফ পিগস অভিযানের মতোই এবারও আলোচনায় রয়েছে সিআইএ-র ভূমিকা।

Tanvia Barua
৩ মিনিট
ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ মনে করাচ্ছে বে অফ পিগস

শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে হামলার ঘটনা নতুন করে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ভোররাতে শহরজুড়ে বিকট শব্দ শোনা যায়, আকাশে যুদ্ধবিমান অনেকটাই নিচ দিয়ে উড়তে দেখা যায়। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সামরিক বিমানঘাঁটি লা কার্লোটা এবং প্রধান সামরিক ঘাঁটি ফুয়ের্তে তিউনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে খবর। পার্শ্ববর্তী একাধিক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আতঙ্কে সাধারণ মানুষ ঘরবন্দি হয়ে পড়েন।

এই ঘটনার মধ্যেই আরও বিস্ফোরক ঘোষণা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রডরিগেজ দাবি করেছেন, মাদুরোর জীবিত থাকার প্রমাণ দিতে হবে। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ভেনেজুয়েলা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নতুন করে চরম উত্তেজনার দিকে মোড় নেয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
উন্মত্ত ট্রাম্পের মাদকবিরোধী অভিযান ভেনেজুয়েলায়! মার্কিন মিডিয়া চুপ কেন?

Venezuela crisis: ট্রাম্প শুধু সমুদ্রেই নয়, 'স্থল ভাগে' কথিত মাদকচক্রকেও আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন— যা বাস্তবে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান ঘোষণার সমতুল্য।

এই ঘটনা নতুন নয়। ট্রাম্প প্রশাসন আগেও একাধিকবার মাদুরো সরকারকে ‘অবৈধ’ বলে আক্রমণ করেছে। একসময় মাদুরোকে গ্রেফতারের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে সামরিক বিকল্প খোলা আছে।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বড় আকারে বাড়িয়ে দেয়। উন্নত প্রযুক্তির যুদ্ধজাহাজ, নজরদারি বিমান এবং সমুদ্রপথে হাই-টেক অপারেশন চালিয়ে মার্কিন নৌবাহিনী ভেনেজুয়েলার উপকূলের একেবারে কাছাকাছি অবস্থান নেয়। সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চল ও প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৩০টি হামলা চালিয়েছে কথিত মাদক পাচারকারী নৌযানে। ওয়াশিংটনের দাবি, এই হামলাগুলি আন্তর্জাতিক মাদক চক্র দমনের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই অভিযান কি শুধুই মাদকবিরোধী? নাকি এর আড়ালে রয়েছে রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাচাদো: শান্তির মুখোশে সাম্রাজ্যবাদী ছায়া পুতুল

Maria Corina Machado: মারিয়া কোরিনা মাচাদোর অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনা কেবল ভেনেজুয়েলার রাজনীতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, বরং লাতিন আমেরিকার ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক নিওলিবারেল মডেলের পুনরাবৃত্তি।

এই আবহেই মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন দাবি করেছিল, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে কোকেন উৎপাদন কেন্দ্র ও পাচার রুটে হামলার ছক করছিল। এর পরই একের পর এক হামলার ঘটনা সামনে আসে। মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর ‘আটক’ ঘোষণাকে ভেনেজুয়েলা সরকার ও সমর্থকরা দেখছেন সরকারের ভিতরে অস্থিরতা তৈরি করার একটি কৌশল হিসেবে। তাঁদের দাবি, এই ঘোষণার উদ্দেশ্য দেশজুড়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং সরকারের অবস্থান দুর্বল করা। এই পরিস্থিতিতেই অনেকের মনে ফিরে আসছে ইতিহাসের বে অফ পিগস অভিযানের কথা।

কী হয়েছিল এই অভিযানে? ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার সদ্য প্রতিষ্ঠিত ফিদেল কাস্ত্রোর সমাজতান্ত্রিক সরকার উৎখাত করতে গোপনে একটি সামরিক অভিযান চালায়। এই অভিযানের পরিকল্পনা করেছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। প্রায় ১,৫০০ জন মার্কিন প্রশিক্ষিত কিউবান নির্বাসিত সৈন্যকে কিউবার দক্ষিণ উপকূলে নামানো হয়। লক্ষ্য ছিল একটাই, সরকার বদল। ধারণা ছিল, হামলার পর কিউবার জনগণ কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল উল্টোটা। কিউবার সেনা ও সাধারণ মানুষ কাস্ত্রোর পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। মাত্র তিন দিনের মধ্যেই অভিযান ব্যর্থ হয়। ১,২০০ জনের বেশি হামলাকারী বন্দি হয় এবং শতাধিক নিহত হন। এই ব্যর্থতা তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা ছিল। আন্তর্জাতিক স্তরে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, ফিদেল কাস্ত্রোর সরকার আরও শক্তিশালী হয়।

আজ ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও অনেকে একই ধরনের ছক দেখতে পাচ্ছেন। প্রথমে সরকারকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা, তারপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, এরপর সামরিক চাপ ও গোপন অভিযানের ইঙ্গিত। বে অফ পিগস অভিযানের মতোই এবারও আলোচনায় রয়েছে সিআইএ-র ভূমিকা। ভেনেজুয়েলা সরকারের মতে, মাদকবিরোধী অভিযানের আড়ালে আসলে লক্ষ্য একটাই, সরকার পরিবর্তন। ট্রাম্পের মাদুরো আটক ঘোষণা সেই চাপ আরও বাড়িয়েছে।

তবে, বে অফ পিগস অভিযান প্রমাণ করেছিল, লাতিন আমেরিকায় বাইরের হস্তক্ষেপ সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফল আনে না। অনেক সময় তা উল্টো প্রভাব ফেলে এবং যাকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়, সে-ই আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আজ ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও কি তাই হতে চলেছে? নাকি এবার ফলাফল হবে ভিন্ন? এটি কি সত্যিই একটি সামরিক অভিযান, নাকি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত এক পুরনো কৌশলের নতুন রূপ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনই স্পষ্ট নয়। তবে ইতিহাস বলছে, লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বারবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও কি ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করবে, তা সময়ই বলবে।

লিখেছেন
Tanvia Barua
Tanvia Barua
7 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? সরকার বদলায়, কেন বদলায় না মন?

Rabindranath Tagore Targeted in Bangladesh: বাংলাদেশে বারবার কেন নিশানা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? হাসিনা থেকে ইউনূস, সরকার বদলালেও কেন থামছে না তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার মুছে ফেলার চেষ্টা? জাতীয় সঙ্গীতের স্রষ্টাকেই কেন বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হচ্ছে?

যন্তর মন্তরে ঢুকে বিক্ষোভ, পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে সিজেপি-র দুই নেতা

Jantar Mantar protest: যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের জেরে সিজেপি নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে পাঁচ দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠাল আদালত। নির্বাচন কমিশন, এসআইআর এবং প্রতিবাদের অধিকার ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক।

দিল্লিতে মহিলা বিক্ষোভকারীদের হেনস্থার অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠছে যে সব প্রশ্ন

Delhi protest: দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ঘিরে মহিলা আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশের বিরুদ্ধে হেনস্থা ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন।

২৩ দিনের অনশন থেকে জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন, রাজপথই নেহা বোরার হয়ে ওঠার সাক্ষী

Neha Bora: ২৩ দিন ধরে অনশন করে যেমন তিনি সংবাদমাধ্যমের নজরে এসেছিলেন, তেমনই সম্প্রতি দিল্লির রাজপথে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও তাঁকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

বরফের গভীরে নিউট্রিনোর খোঁজ: মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে এবারের পদার্থবিদ্যায় নোবেল

IceCube Neutrino Observatory: অ্যান্টার্কটিকার বরফের গভীরে কীভাবে কাজ করে আইসকিউব টেলিস্কোপ? কীভাবে অদৃশ্য নিউট্রিনো কণার সংকেত ধরে কৃষ্ণগহ্বর, ব্ল্যাজার এবং মহাবিশ্বের গভীর রহস্য উন্মোচন করছেন বিজ্ঞানীরা?

ইন্ডিয়া জোটের মিছিলে বাধা, সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হলো রিট

INDIA bloc's march towards supreme court: সোমবার কনট প্লেস থেকে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে ইন্ডিয়া ব্লকের ‘চলো দিল্লি’ মিছিল অনুষ্ঠিত হলো। রাহুল গান্ধীর দুই পাশে ছিলেন, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও নেহা বোরা। মিছিলে অংশ নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, ডি রাজা, সুপ্রিয়া সুলে। ভগবান দাস রোডে মিছিল পুলিশি বাধার সম্মুখীন হয়। শেষমেশ সুপ্রিম কোর্টে ‘রাহুল গান্ধী বনাম নির্বাচন কমিশন অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি রিট পিটিশন দাখিল হয়।