মনে আছে দূরদর্শনের ভয় ধরানো মহিষাসুরকে? আজ চরম দারিদ্রে দিন কাটছে সেই অভিনেতার

Mahisashuramardini: দূরদর্শনের অসুর অমল চৌধুরীর আজ কী অবস্থা?

tiasa gupta
৩ মিনিট
মনে আছে দূরদর্শনের ভয় ধরানো মহিষাসুরকে? আজ চরম দারিদ্রে দিন কাটছে সেই অভিনেতার

সমস্ত শক্তির আদি উৎস

অশুভ বিনাশের জন্য

দিব্যশক্তির জাগরণের জন্য

তাঁকে মূর্তি ধারণ করতে হয়।

নিতে হয় আসুরিক শক্তি দলনের ভার

বারংবার...

এরপর দেবী দুর্গার সামনে আবির্ভূত হলো মহিষাসুর। মা দুর্গা কখনও দেবী কৌশিকী হয়ে বধ করেন ধুম্রলোচনকে। মা দুর্গার সামনে তখন অসুরের ভয়ংকর চেহারা। চোখের চাউনি আর বিকট হাসি এক মুহূর্তে মহালয়ার ভোরে ভয় ধরিয়ে দিতে পারে ছোট-বড় সবাইকে। এতদিন যাঁরা শুনে এসেছেন 'আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে...’, এবার তাঁরা দেখলেন উমাকে। ১৯৯৪ সালে প্রথম মহালয়া দূরদর্শনে সম্প্রচারিত হলো। বাঙালির মনে সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় চিরস্থায়ী হয়ে রইলেন দনুজদলনী রূপে। একাধিক চ্যানেলের প্রতিযোগিতার ভিড়ে আজও ট্রেন্ডিং সংযুক্তার ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। সেইসঙ্গে অমল চৌধুরী হয়ে গিয়েছিলেন দূরদর্শনের আইকনিক অসুর। মাথা ভর্তি কোঁকড়া চুল, পেশিবহুল বিরাট আকারের চেহারা- তাই দূরদর্শনে মহালয়ার অসুরের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য ডাক আসত অশোকনগরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা অমল চৌধুরীর। আজও তিনি বাঙালি মনে সংযুক্তার মতোই অবিকল্প।

বড় বড় চোখ, পাকানো গোঁফ– আদ্যন্ত মহিষাসুর। মহিষাসুরের সঙ্গে এতটা মিল বোধহয় আর কোনও মানুষের ছিল না। তখন দূরদর্শনের পর্দায় মহিষাসুরমর্দিনী মানেই 'অমল অসুর’। আর মহিষাসুর অমল চৌধুরীর সেই অট্টহাসি আজও যেন ঘোরের মতো বাঙালির কাছে। তখন বিকট হাসিতে কেঁপে উঠত মহালয়ার ভোর। যুদ্ধের রণদুন্দুভি বেজে উঠল। বেজে উঠল কাঁসর-ঘণ্টা। মা দুর্গা এলেন।

মহিষাসুর হারিয়েছেন দিনের পরিবর্তনে। অশোকনগরের বাসিন্দা অমল চৌধুরী পরিচিতি লাভ করেছিলেন 'অমল অসুর’ নামে। তাঁর সেই চেহারা নজরে এসেছিল দুই টেকনিশিয়ানের। তারপর থেকেই দীর্ঘ কয়েক বছর একাধারে অভিনয় করে গিয়েছেন মহিষাসুর-রূপে। কিন্তু দিন পেরিয়েছে, আজ আর তাঁকে কেউ চেনেন না। খোঁজ করেন না শিল্পীর। একসময়ের টেলিভিশনের পর্দার বিখ্যাত সেই শিল্পী কেমন আছেন আজ?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'এই উজ্জ্বলতার স্রোতে...' আজও বাঙালির নস্টালজিয়ায় কেন ফিরে আসে বারবার শালিমার?

Durgapuja 2022: নতুন, পুরনোর মিলমিশের মধ্যেই অব‍্যহত বাংলায় দুর্গাপুজোর আমেজ।

তাঁর সেই অট্টহাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকত একজন শিল্পীর দক্ষতা। কালের নিয়মে তিনি হারিয়েছেন দর্শকদের মাঝে, তবে মা দুর্গার আগমনে আজও যেন স্মৃতিরা ভিড় করে। পুরনো দিনের কথা মনে করতেই ভারাক্রান্ত হয়ে যান অমলবাবু। ছোট বাচ্চাদের আঁকা শেখান তিনি। সেইভাবেই চলছে সংসার। পুরনো সেই মহালয়ার দিনের কথা মনে পড়লেই কষ্ট ঘিরে ধরে তাঁকে। আত্মীয়রা আজ মুখ ফিরিয়েছেন। কোনও মতে চলছে দিনগুলো। এদিকে, একসময় নাট্যচর্চায় নিজের অভিনয়-দক্ষতার মাধ্যমেই সাড়া ফেলেছিলেন তিনি। তাঁকে টিভির পর্দায় দেখলেই আনন্দে আত্মহারা হতেন অশোকনগরের মানুষরা। কিন্তু আজ সবই অতীত। বয়স হয়েছে, চুল-দাড়িতে পাক ধরেছে।

আজ ১০ বছর হয়ে গেল, ইন্ডাস্ট্রি থেকে আর ডাক পান না ‘অমল অসুর’। তবে একসময় দূরদর্শনের কাজ যেচে এসেছিল তাঁর কাছে। প্রথমদিকে অভিনয় নিয়ে তেমন আগ্রহী ছিলেন না তিনি। তবে দূরদর্শনের দুই টেকনিশিয়ানের নজরে পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর বিরাট আকারের চেহারাই হয়ে উঠেছিল তাঁর ইউএসপি। অসুরের অবতারে তিনি যে কতটা মানানসই, দূরদর্শনের মহালয়া তার প্রমাণ।

তবে টলিউড থেকে দূরে আজ তাঁর দিন কাটছে অন্ধকারে। একসময় টলিউডের প্রথম সারির অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন অমল চৌধুরী। একের পর এক কাজ পেয়েছেন। ক্রমে অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালবাসা জন্মে যায়। কিন্তু আজ আর তাঁকে মনে রাখেনি কেউ। যখন তিনি অভিনয় করতেন, তখন তাঁদের সংসার চলত বেশ স্বচ্ছলভাবেই। আত্মীয়-পরিজনের আনাগোনাও লেগে থাকত বাড়িতে। তবে ক্রমে টলিউডের সঙ্গে তাঁর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। কাজের অভাবে তাই ভিন্ন পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন অমল চৌধুরী। সংসারে সদস্য বলতে কেবল দু’জন। তিনি এবং তাঁর দিদি। অমল চৌধুরী যখন অভিনয় করতেন, তাঁর দিদি সেই সময়ে শোলার কাজ করতেন।

যখন স্টুডিওপাড়ার দরজা ‘অমল অসুর’-এর জন্য বন্ধ হয়ে গেল, তখন দিদির সঙ্গে শোলার কাজ শুরু করলেন অমলবাবু। হাতে তুলে নিলেন রং-তুলি। সেই থেকে কষ্টে-সৃষ্টে দিন কাটছে তাঁদের। কোনওরকম সরকারি সহায়তাও পাননি। ভবিষ্যতে সংসার কীভাবে চালাবেন? সেই চিন্তা করেই আজকের এক-একটা দিন কাটাচ্ছেন ‘অমল অসুর’ এবং তাঁর দিদি।

এক সময়ে এই অভিনয়ের জন্যকই কত কদর ছিল অমল চৌধুরীর। দূরদর্শন, বাংলা সিনেমায় অভিনয় বলে কথা। পাশাপাশি অশোকনগরে নাট্যচর্চাতেও সম্মান পেতেন তিনি। সেসব দিন যেতেই মুখ ফিরিয়েছে সবাই। বয়সের ভারে সব হারালেও বড় বড় চোখ আর পাকানো গোঁফ এখনও ছেড়ে যায়নি অমল চৌধুরীকে।

দারিদ্র্যর সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে লড়াই করে আজ চলছে দিন গুজরান। এখনও পর্যন্ত মেলেনি কোনও সরকারি সুযোগ-সুবিধা। বয়সের ভারে এখন অনেকটাই হারিয়েছে সেই ভয়ংকর রূপ। বার্ধক্য থাবা বসিয়েছে জীবনে। তবুও, বড় বড় সেই চোখ ও পাকানো গোঁফ দেখলে চিনতে খুব একটা অসুবিধা হয় না কারওরই যে, ইনিই এককালের মহিষাসুর। অশোকনগরে নাট্যচর্চায় অমলবাবুর অভিনয় সাড়া ফেলে দিয়েছিল এক সময়। টিভির পর্দায় দাদাকে দেখে রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে উঠতেন বোন। আজ সেসব অতীত।

সুদিন সবই গিয়েছে। সরকারি সাহায্য তো মেলে না। তবুও মহালয়া আসার আগেই মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে অমল অসুরের। এখন বিভিন্ন চ্যানেলের অনুষ্ঠানে অসুরদের সাজ দেখে হাসাহাসি করে মানুষ। মহালয়া যেন একটা ‘ছেলেখেলা’-য় পরিণত হয়েছে। সাজসজ্জা আর ভিএফএক্সের আধিক্যেের মাঝেই এখনও পুরনো দিনের দর্শকরা খুঁজে বেড়ান তাঁদের 'অমল অসুর’-কে।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।