মনে আছে দূরদর্শনের ভয় ধরানো মহিষাসুরকে? আজ চরম দারিদ্রে দিন কাটছে সেই অভিনেতার
Mahisashuramardini: দূরদর্শনের অসুর অমল চৌধুরীর আজ কী অবস্থা?

সমস্ত শক্তির আদি উৎস
অশুভ বিনাশের জন্য
দিব্যশক্তির জাগরণের জন্য
তাঁকে মূর্তি ধারণ করতে হয়।
নিতে হয় আসুরিক শক্তি দলনের ভার
বারংবার...
এরপর দেবী দুর্গার সামনে আবির্ভূত হলো মহিষাসুর। মা দুর্গা কখনও দেবী কৌশিকী হয়ে বধ করেন ধুম্রলোচনকে। মা দুর্গার সামনে তখন অসুরের ভয়ংকর চেহারা। চোখের চাউনি আর বিকট হাসি এক মুহূর্তে মহালয়ার ভোরে ভয় ধরিয়ে দিতে পারে ছোট-বড় সবাইকে। এতদিন যাঁরা শুনে এসেছেন 'আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে...’, এবার তাঁরা দেখলেন উমাকে। ১৯৯৪ সালে প্রথম মহালয়া দূরদর্শনে সম্প্রচারিত হলো। বাঙালির মনে সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায় চিরস্থায়ী হয়ে রইলেন দনুজদলনী রূপে। একাধিক চ্যানেলের প্রতিযোগিতার ভিড়ে আজও ট্রেন্ডিং সংযুক্তার ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। সেইসঙ্গে অমল চৌধুরী হয়ে গিয়েছিলেন দূরদর্শনের আইকনিক অসুর। মাথা ভর্তি কোঁকড়া চুল, পেশিবহুল বিরাট আকারের চেহারা- তাই দূরদর্শনে মহালয়ার অসুরের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য ডাক আসত অশোকনগরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা অমল চৌধুরীর। আজও তিনি বাঙালি মনে সংযুক্তার মতোই অবিকল্প।
বড় বড় চোখ, পাকানো গোঁফ– আদ্যন্ত মহিষাসুর। মহিষাসুরের সঙ্গে এতটা মিল বোধহয় আর কোনও মানুষের ছিল না। তখন দূরদর্শনের পর্দায় মহিষাসুরমর্দিনী মানেই 'অমল অসুর’। আর মহিষাসুর অমল চৌধুরীর সেই অট্টহাসি আজও যেন ঘোরের মতো বাঙালির কাছে। তখন বিকট হাসিতে কেঁপে উঠত মহালয়ার ভোর। যুদ্ধের রণদুন্দুভি বেজে উঠল। বেজে উঠল কাঁসর-ঘণ্টা। মা দুর্গা এলেন।
মহিষাসুর হারিয়েছেন দিনের পরিবর্তনে। অশোকনগরের বাসিন্দা অমল চৌধুরী পরিচিতি লাভ করেছিলেন 'অমল অসুর’ নামে। তাঁর সেই চেহারা নজরে এসেছিল দুই টেকনিশিয়ানের। তারপর থেকেই দীর্ঘ কয়েক বছর একাধারে অভিনয় করে গিয়েছেন মহিষাসুর-রূপে। কিন্তু দিন পেরিয়েছে, আজ আর তাঁকে কেউ চেনেন না। খোঁজ করেন না শিল্পীর। একসময়ের টেলিভিশনের পর্দার বিখ্যাত সেই শিল্পী কেমন আছেন আজ?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Durgapuja 2022: নতুন, পুরনোর মিলমিশের মধ্যেই অব্যহত বাংলায় দুর্গাপুজোর আমেজ।
তাঁর সেই অট্টহাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকত একজন শিল্পীর দক্ষতা। কালের নিয়মে তিনি হারিয়েছেন দর্শকদের মাঝে, তবে মা দুর্গার আগমনে আজও যেন স্মৃতিরা ভিড় করে। পুরনো দিনের কথা মনে করতেই ভারাক্রান্ত হয়ে যান অমলবাবু। ছোট বাচ্চাদের আঁকা শেখান তিনি। সেইভাবেই চলছে সংসার। পুরনো সেই মহালয়ার দিনের কথা মনে পড়লেই কষ্ট ঘিরে ধরে তাঁকে। আত্মীয়রা আজ মুখ ফিরিয়েছেন। কোনও মতে চলছে দিনগুলো। এদিকে, একসময় নাট্যচর্চায় নিজের অভিনয়-দক্ষতার মাধ্যমেই সাড়া ফেলেছিলেন তিনি। তাঁকে টিভির পর্দায় দেখলেই আনন্দে আত্মহারা হতেন অশোকনগরের মানুষরা। কিন্তু আজ সবই অতীত। বয়স হয়েছে, চুল-দাড়িতে পাক ধরেছে।
আজ ১০ বছর হয়ে গেল, ইন্ডাস্ট্রি থেকে আর ডাক পান না ‘অমল অসুর’। তবে একসময় দূরদর্শনের কাজ যেচে এসেছিল তাঁর কাছে। প্রথমদিকে অভিনয় নিয়ে তেমন আগ্রহী ছিলেন না তিনি। তবে দূরদর্শনের দুই টেকনিশিয়ানের নজরে পড়ে গিয়েছিলেন। তাঁর বিরাট আকারের চেহারাই হয়ে উঠেছিল তাঁর ইউএসপি। অসুরের অবতারে তিনি যে কতটা মানানসই, দূরদর্শনের মহালয়া তার প্রমাণ।
তবে টলিউড থেকে দূরে আজ তাঁর দিন কাটছে অন্ধকারে। একসময় টলিউডের প্রথম সারির অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন অমল চৌধুরী। একের পর এক কাজ পেয়েছেন। ক্রমে অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালবাসা জন্মে যায়। কিন্তু আজ আর তাঁকে মনে রাখেনি কেউ। যখন তিনি অভিনয় করতেন, তখন তাঁদের সংসার চলত বেশ স্বচ্ছলভাবেই। আত্মীয়-পরিজনের আনাগোনাও লেগে থাকত বাড়িতে। তবে ক্রমে টলিউডের সঙ্গে তাঁর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। কাজের অভাবে তাই ভিন্ন পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন অমল চৌধুরী। সংসারে সদস্য বলতে কেবল দু’জন। তিনি এবং তাঁর দিদি। অমল চৌধুরী যখন অভিনয় করতেন, তাঁর দিদি সেই সময়ে শোলার কাজ করতেন।
যখন স্টুডিওপাড়ার দরজা ‘অমল অসুর’-এর জন্য বন্ধ হয়ে গেল, তখন দিদির সঙ্গে শোলার কাজ শুরু করলেন অমলবাবু। হাতে তুলে নিলেন রং-তুলি। সেই থেকে কষ্টে-সৃষ্টে দিন কাটছে তাঁদের। কোনওরকম সরকারি সহায়তাও পাননি। ভবিষ্যতে সংসার কীভাবে চালাবেন? সেই চিন্তা করেই আজকের এক-একটা দিন কাটাচ্ছেন ‘অমল অসুর’ এবং তাঁর দিদি।
এক সময়ে এই অভিনয়ের জন্যকই কত কদর ছিল অমল চৌধুরীর। দূরদর্শন, বাংলা সিনেমায় অভিনয় বলে কথা। পাশাপাশি অশোকনগরে নাট্যচর্চাতেও সম্মান পেতেন তিনি। সেসব দিন যেতেই মুখ ফিরিয়েছে সবাই। বয়সের ভারে সব হারালেও বড় বড় চোখ আর পাকানো গোঁফ এখনও ছেড়ে যায়নি অমল চৌধুরীকে।
দারিদ্র্যর সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে লড়াই করে আজ চলছে দিন গুজরান। এখনও পর্যন্ত মেলেনি কোনও সরকারি সুযোগ-সুবিধা। বয়সের ভারে এখন অনেকটাই হারিয়েছে সেই ভয়ংকর রূপ। বার্ধক্য থাবা বসিয়েছে জীবনে। তবুও, বড় বড় সেই চোখ ও পাকানো গোঁফ দেখলে চিনতে খুব একটা অসুবিধা হয় না কারওরই যে, ইনিই এককালের মহিষাসুর। অশোকনগরে নাট্যচর্চায় অমলবাবুর অভিনয় সাড়া ফেলে দিয়েছিল এক সময়। টিভির পর্দায় দাদাকে দেখে রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে উঠতেন বোন। আজ সেসব অতীত।
সুদিন সবই গিয়েছে। সরকারি সাহায্য তো মেলে না। তবুও মহালয়া আসার আগেই মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে অমল অসুরের। এখন বিভিন্ন চ্যানেলের অনুষ্ঠানে অসুরদের সাজ দেখে হাসাহাসি করে মানুষ। মহালয়া যেন একটা ‘ছেলেখেলা’-য় পরিণত হয়েছে। সাজসজ্জা আর ভিএফএক্সের আধিক্যেের মাঝেই এখনও পুরনো দিনের দর্শকরা খুঁজে বেড়ান তাঁদের 'অমল অসুর’-কে।








