১৯৪৮ থেকে ২০২৫ : কীভাবে গড়ে উঠল ইজরায়েল-আমেরিকার অটুট সম্পর্ক
US-Israel Relations: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য না থাকলে এতদিন ধরে এই হত্যাযজ্ঞ চালানো ইজরায়েলের পক্ষে কার্যত অসম্ভব ছিল। গত এক বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলকে ১৮ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।

২১ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এরপর সেই পথেই পা বাড়িয়েছে পর্তুগাল। একে একে জাতিসংঘের চারভাগের তিনভাগেরও বেশি সদস্য দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মনে পড়ে যায় ১৯৪৮ সালের মে মাসের সেই ঘটনা— তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ১৪ মে ইজরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। মাত্র আড়াই দিনের মাথায় সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াও ইজরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এ যেন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুই শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যেকার চলমান ঠান্ডা লড়াইয়েরই অংশ।
গত দুই বছরে ইজরায়েলের আগ্রাসনে গাজা প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য না থাকলে এতদিন ধরে এই হত্যাযজ্ঞ চালানো ইজরায়েলের পক্ষে কার্যত অসম্ভব ছিল। গত এক বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলকে ১৮ মিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম নজির আর দ্বিতীয়টি নেই। এখন প্রশ্ন— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এত ইজরায়েল-প্রীতির কারণ কী?
১৯৪৮ সালেই প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান-কে সাংবাদিকরা একই প্রশ্ন করেছিলেন— ‘এত তড়িঘড়ি ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে হল কেন?’ উত্তরে ট্রুম্যান দু’টি কারণ উল্লেখ করেছিলেন। প্রথমত, সহানুভূতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদিকে হিটলার হত্যা করেছিলেন। ফলে সেই সময় ইহুদিদের প্রতি বিশ্বব্যাপী সমবেদনা ছিল প্রবল। ট্রুম্যান দেখলেন, তাঁর ভোটব্যাঙ্কের একটি বড় অংশ চাইছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইহুদিদের সমর্থন করুক। তারই বহিঃপ্রকাশ এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবসময় নিজেদের গণতন্ত্রের পীঠস্থান বলে দাবি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক দেশগুলির ভিড়ে নবগঠিত গণতান্ত্রিক ইজরায়েল— সেই সুযোগ কি ট্রুম্যান হাতছাড়া করতে পারতেন!
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gaza: প্রতিবেদনে আরও লেখা হয়, মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট ও অ্যামাজন ইজরায়েলকে তাদের ক্লাউড ও এআই-এর বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ করে দিচ্ছে।
তবে স্বীকৃতি দিলেও তখনও ভালোবাসার সূচনা হয়নি। কোনো আর্থিক সাহায্য বা সামরিক সরঞ্জামের আদানপ্রদান ছিল না। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলের কাছে প্রথমদিকে অস্ত্রও বিক্রি করত না। রাষ্ট্র গঠনের পর ইজরায়েল প্রথম সামরিক সরঞ্জাম কেনে ফ্রান্সের কাছ থেকে।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। এই যুদ্ধে ইজরায়েল মিশর, জর্ডন ও সিরিয়াকে পরাজিত করে। সেই জয়ই তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুনজরে আনে। অন্যদিকে, আরব দেশগুলির সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ফলে ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’— এই প্রাচীন প্রবাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকেও প্রভাবিত করে। সেই সময় থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি শুরু করে। ইজরায়েল বুঝেছিল, আরবদের মাঝে টিকে থাকতে গেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মতো নিউক্লিয়ার শক্তিধর রাষ্ট্রের সুরক্ষা প্রয়োজন। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও দেখল, রাশিয়ার সঙ্গে ঠান্ডা লড়াইয়ে জিততে হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভালো রকম সমর্থন দরকার। সেখান থেকেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সময়ে ইজরায়েল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক মজবুত হয়।
১৯৭৩ সালের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইজরায়েলকে সাহায্য করে। এরপর ১৯৭৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক চুক্তি প্রস্তাব করে— এবার শুধু ইজরায়েল নয়, মিশরও সেই চুক্তির অংশ হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দেয়, ইজরায়েলকে তিন বিলিয়ন ও মিশরকে দুই বিলিয়ন ডলার দেবে। শর্ত একটাই— দুই পক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা শুনবে এবং নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করবে না। অনেকটা ডনের প্রস্তাবের মতোই ছিল সেটা। দুই দেশই তাতে সম্মত হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলকে অর্থ সাহায্য করে আসছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Israel’s killing of journalists: ইজরায়েল ১৯৬৭ সালে দখলদারিত্বের প্রথম দিন থেকেই, মিডিয়া রিপোর্টিংয়ের উপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছে। পরে সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে সেন্সরশিপ আনা হয়।
তাহলে কি মনে হচ্ছে— আমেরিকা শুধু দিয়েই যাচ্ছে আর ইজরায়েল শুধু নিচ্ছে? আসলে ব্যাপারটা এত সরল নয়। ১৯৮৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলের সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক চুক্তি করে— দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানিতে কোনো ট্যারিফ থাকবে না। আজকের সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যাদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সপ্তাহে সপ্তাহে বিশ্বকে শুল্কের হুমকি দিচ্ছেন, তারাই কিনা ইজরায়েলের সঙ্গে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট করেছিল! এর পেছনে অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় স্বার্থ লুকিয়ে ছিল। ইজরায়েল চিকিৎসা ও প্রযুক্তিতে উন্নত দেশ। এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে ইজরায়েলের বিপুল প্রযুক্তি ও মেধার অবাধ প্রবেশ ঘটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে।পরিসংখ্যান বলছে, এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চার লক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
আমেরিকা-ইজরায়েল সম্পর্কের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হল AIPAC (American Israel Public Affairs Committee)। বিখ্যাত ফর্চুন (Fortune) ম্যাগাজিন একসময় এই কমিটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী লবিং গ্রুপ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। মার্কিন কংগ্রেসের বহু প্রভাবশালী সদস্যই এর সঙ্গে যুক্ত, যারা নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।
আসলে ইজরায়েল খুব তাড়াতাড়ি বুঝেছিল— পৃথিবীতে প্রভাব বিস্তার করতে হলে মিডিয়া ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেই কাজ তারা শুরু করে তিন দশক আগে। একসময় হলিউডের বহু বড় প্রোডাকশন হাউস ছিল ইজরায়েলি মালিকানাধীন। তাদের কাজ ছিল সুকৌশলে ইজরায়েলপন্থী ন্যারেটিভ ছড়িয়ে দেওয়া। টানা সাড়ে তিন দশকের সেই প্রচারণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে ইজরায়েলের প্রতি সহানুভূতি জন্মেছিল।
তবে এখন পরিস্থিতি কিছুটা বদলাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে ইজরায়েলের বর্বরতার ছবি বিশ্ববাসী স্পষ্ট দেখছে। আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়, চত্বর, মিছিল— সর্বত্র ইজরায়েল-বিরোধী স্লোগান উঠছে। এক দশক আগে এটা অকল্পনীয় ছিল। তবুও সমস্যা রয়ে গেছে— মার্কিন নীতি নির্ধারকদের মনে এখনও জমে আছে সেই পুরনো ইজরায়েল-প্রীতির বরফ। প্রশ্ন হচ্ছে— আর কত রক্তপাতের বিনিময়ে সেই বরফ গলবে?






