২০২৬-এর বর্ষায় খরার আশঙ্কা, পুড়বে ভারত! কী বলছে আবহাওয়া দপ্তর?
পরিসংখ্যান বলছে, এবারের বর্ষায় দেশজুড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হবে বলে ৮৪ শতাংশ নিশ্চয়তা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জোড়া ধাক্কা বৃষ্টির অভাব এবং তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি আমাদের জীবনযাত্রা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
ভারতের আবহাওয়া দপ্তর (IMD) গত ২৯ মে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে (SWM) নিয়ে যে সংশোধিত পূর্বাভাস জারি করেছে, তা এক প্রকার বিপদের ঘণ্টাই বাজাচ্ছে। নতুন তথ্য অনুযায়ী, এবারের বর্ষায় দেশজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের (LPA) মাত্র ৯০ শতাংশ বৃষ্টিপাত হতে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, এবারের বর্ষায় দেশজুড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হবে বলে ৮৪ শতাংশ নিশ্চয়তা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জোড়া ধাক্কা বৃষ্টির অভাব এবং তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি আমাদের জীবনযাত্রা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
১. 'এল নিনো' এবং 'আইওডি'-র রসায়ন
এর জন্য কোনো স্থানীয় কারণ নেই, বরং প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের এক বিশাল জলবায়ুগত পরিবর্তন দায়ী।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
heatwave India: দিনের দাবদাহের চেয়ে কি রাতের বাড়তে থাকা তাপমাত্রাই এখন বেশি বিপজ্জনক? কেন শহরে গরমে বাড়ছে অসুস্থতা ও মৃত্যুহার?
এল নিনোর দাপট (৯২% আশঙ্কা): 'এল নিনো' হলো একটি সামুদ্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের জলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। এর ফলে বিশ্বব্যাপী বায়ুপ্রবাহের দিক বদলে যায়। ভারতের উপর দিয়ে যে মৌসুমি বায়ু আসে, এল নিনো তাকে দুর্বল ও শুষ্ক করে দেয়। অতীতেও যতবার ভারতে বড় খরা হয়েছে, তার পিছনে এই এল নিনোরই হাত ছিল। ২০২৬ সালে এর সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা ৯২%।
নিষ্ক্রিয় আইওডি (IOD): ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা যখন ভারতের অনুকূলে থাকে (পজিটিভ আইওডি), তখন প্রশান্ত মহাসাগরের এল নিনোর ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কেটে যায়। এটি ভারতের বর্ষার জন্য এক প্রকার রক্ষাকবচ। কিন্তু আবহাওয়াবিদদের মতে, এবার পজিটিভ আইওডি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ফলে এল নিনো কোনো বাধা ছাড়াই ভারতীয় উপমহাদেশে তার রুদ্ররূপ দেখাতে পারবে।
কোন এলাকার বিপদ সবচেয়ে বেশি?
বৃষ্টির এই ঘাটতি ভারতের সব জায়গায় সমান হবে না। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী ঝুঁকির মাত্রা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আমেরিকার আবহাওয়া সংস্থা 'নোয়া' (NOAA)-এর মে ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যেই এই এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮২ শতাংশ। শুধু তাই নয়, বছরের শেষের দিকে এটি এতটা শক্তিশালী রূপ নিতে পারে যা গত ১৫০ বছরের ইতিহাসকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে বিপন্ন এলাকা: মধ্য, পশ্চিম এবং পূর্ব ভারতের যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে মূলত খরিফ শস্যের চাষ হয়, তাকে 'মনসুন কোর জোন' বলা হয়। মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গের একাংশ এর মধ্যে পড়ে। এই জোনে বৃষ্টিপাত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের ৯৪ শতাংশের কম হবে। যেহেতু এখানকার সিংহভাগ চাষ এখনও পুরোপুরি বৃষ্টির জলের উপর নির্ভরশীল, তাই এই বেল্টটি সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে চলেছে।
উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ উপদ্বীপীয় ভারত: পঞ্জাব, হরিয়ানা ও রাজস্থানের মতো ভারতের 'শস্যভাণ্ডার' বলা চলে যে অঞ্চলকে, সেখানে বৃষ্টিপাত হবে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের ৯২ শতাংশের নিচে। যদিও এই অঞ্চলে সেচ ব্যবস্থা ভালো, তবুও বৃষ্টির অভাব ভূগর্ভস্থ জলের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং কর্ণাটকের অভ্যন্তরীণ অংশে বৃষ্টিপাত গড়ের ৯৪ শতাংশের কম থাকার পূর্বাভাস রয়েছে।
ব্যতিক্রম উত্তর-পূর্ব ভারত: ভৌগোলিক গঠনের কারণে কেবল উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে (যেমন—অসম, অরুণাচল, মেঘালয় ইত্যাদি) এবার স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের ৯৬ থেকে ১০৪ শতাংশের মধ্যে থাকবে।
'উষ্ণ রাত' ও তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড
বৃষ্টি কম হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে তাপমাত্রায়। জুন মাস থেকেই দেশজুড়ে এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতি তৈরি হতে চলেছে।
দিনের বেলার উত্তাপ ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা: জুন মাসে দেশের বেশিরভাগ অংশেই দিনের বেলার তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই বেশি থাকবে। তবে জম্মু ও বিহারের অনেক এলাকা এবং পঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মিজোরাম ও ত্রিপুরার কিছু কিছু জায়গায় দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম থাকতে পারে। কিন্তু দেশের বাকি বিশাল অংশে সূর্য দেবের তেজ থাকবে তীব্র।
অসহ্য উষ্ণ রাত ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা: দক্ষিণ ওড়িশা, ছত্তিশগড় এবং উত্তর অন্ধ্রপ্রদেশের সামান্য কিছু অঞ্চল ছাড়া গোটা দেশের রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের গণ্ডি পেরিয়ে যাবে। সাধারণত রাতে বাতাস ঠাণ্ডা হলে মানুষের শরীর দিনের ক্লান্তি থেকে রেহাই পায়। কিন্তু রাতও যদি গরম থাকে, তবে মানুষের শরীরে ক্লান্তি ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
দীর্ঘস্থায়ী হিটওয়েভ বা দাবদাহ: জুন মাসে উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, পঞ্জাব, বিহার, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, গুজরাট ও অন্ধ্রপ্রদেশের বেশিরভাগ অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি দিন ধরে লু বা দাবদাহ চলবে। এছাড়া মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা, হিমাচল ও তামিলনাড়ুর কিছু অঞ্চলেও এর প্রভাব পড়বে। তবে রাজস্থান ও ঝাড়খণ্ডে দাবদাহের দিন তুলনামূলক কম হতে পারে।
এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবল চাষবাসেরই ক্ষতি করবে না, বরং দেশের সামগ্রিক পরিকাঠামোকে কাঁপিয়ে দেবে:
খরিফ চাষে বিপর্যয়: ভারতের প্রধান খাদ্যশস্য ধান, সেই সঙ্গে ভুট্টা, তুলা, সয়াবিন, চিনাবাদাম ও তৈলবীজের বপন শুরু হয় জুনে। বৃষ্টি না হলে বীজ নষ্ট হবে, কিংবা চাষ পিছিয়ে যাবে। সেচের জলের জন্য পাম্প চালাতে গিয়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাবে, যার ফলে ছোট চাষিরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
পানীয় জলের হাহাকার: কেন্দ্রীয় জল কমিশনের (CWC) তথ্য অনুযায়ী, যদি বর্ষা ঠিকমতো না হয়, তবে দেশের প্রধান ১৪৬টি জলাধারের জলের স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে যেতে পারে। বৃষ্টিপাত ঠিকমতো ভাবে না হলে মাটির তলায় জল থাকবে না। ফলে, গ্রামের কুয়ো ও টিউবওয়েল শুকিয়ে যেতে পারে। ফলে ট্যাঙ্কার দিয়ে জল সরবরাহের খরচ administrations বা প্রশাসনের উপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি: টানা তীব্র গরম ও উষ্ণ রাতের কারণে প্রবীণ মানুষ, শিশু এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে পারে। বিশেষ করে যারা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন—যেমন খেতমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, হকার বা রিকশাচালক—তাদের ডিহাইড্রেশন, হিট ক্র্যাম্প এবং মারাত্মক হিটস্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর উপর চাপ: চাষের পাম্প চালানো এবং শহর ও গ্রামে ঘর ঠাণ্ডা রাখার জন্য (এসি ও ফ্যান) বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড স্তরে পৌঁছবে। এর ফলে গ্রামীণ এলাকায় লোডশেডিং বাড়বে এবং পাওয়ার গ্রিড ট্রিপ করার (বসে যাওয়ার) ঝুঁকি তৈরি হবে।
বাজার দর ও গ্রামীণ অর্থনীতি: উৎপাদন কম হলে বাজারে চাল, ডাল, তেল ও সবজির সরবরাহ কমে যেতে পারে। ফলে দেখা দিতে পারে মূল্যবৃদ্ধি বা মুদ্রাস্ফীতি। গ্রামীণ মানুষের পকেটে টাকা না থাকলে তারা কেনাকাটা কমিয়ে দেবে, যা দেশের সার্বিক শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে মন্দা ডেকে আনতে পারে।
বিজ্ঞান অনুযায়ী, আইএমডি-র এই পূর্বাভাসের মধ্যে ৬০% খরার কথা বলা হলেও ৪০% অনিশ্চয়তা থেকে যায়। এল নিনো সবসময় একই রকম আচরণ করে না। যদি কোনো কারণে জুনের শেষে ভারত মহাসাগরের বায়ুপ্রবাহে আকস্মিক বদল আসে, কিংবা বঙ্গোপসাগরে একের পর এক শক্তিশালী নিম্নচাপ তৈরি হয়, তবে খরা পরিস্থিতির তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে।






