ভাঙতে চলেছে ১৫০ বছরের রেকর্ড, যে দুর্যোগ সংকেত দিচ্ছে সুপার এল নিনো
আমেরিকার আবহাওয়া সংস্থা 'নোয়া' (NOAA)-এর মে ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যেই এই এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮২ শতাংশ। শুধু তাই নয়, বছরের শেষের দিকে এটি এতটা শক্তিশালী রূপ নিতে পারে যা গত ১৫০ বছরের ইতিহাসকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত তাপমাত্রা বাড়ছে, যার অর্থ— বিশ্বজুড়ে ধেয়ে আসছে এক শক্তিশালী বা 'সুপার' এল নিনো (El Niño)।
আমেরিকার আবহাওয়া সংস্থা 'নোয়া' (NOAA)-এর মে ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যেই এই এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৮২ শতাংশ। শুধু তাই নয়, বছরের শেষের দিকে এটি এতটা শক্তিশালী রূপ নিতে পারে যা গত ১৫০ বছরের ইতিহাসকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কিন্তু এল নিনো ঠিক কী? এর প্রভাব কতটা মারাত্মক হতে পারে? এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে 'লা নিনা' (La Niña)- ই বা আমাদের জন্য কী বার্তা নিয়ে আসছে?
এল নিনো আসলে কী?
খুব সহজ করে বললে, এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের একটি বিশেষ আবহাওয়া চক্র। স্বাভাবিক সময়ে এই মহাসাগরের বিষুবরেখায় যে বাতাস (ট্রেড উইন্ড) বয়, তা সমুদ্রের উপরের স্তরের গরম জলকে এশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনো শুরু হলে এই বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের জল অস্বাভাবিকভাবে গরম হতে শুরু করে।
সমুদ্রের এই গরম জল বাষ্প তৈরি করে আকাশে মেঘ জমায়, যার ফলে পৃথিবীর চেনা আবহাওয়ার নিয়ম পুরোপুরি উল্টে যায়। যেখানে সাধারণত বেশি বৃষ্টি হওয়ার কথা, সেখানে দেখা দেয় খরা; আর যেখানে শুকনো আবহাওয়া থাকার কথা, সেখানে শুরু হয় ভারী বৃষ্টি ও বন্যা।
আবহাওয়া মাপার জন্য বিজ্ঞানীরা 'ওশান নিনো ইনডেক্স' (ONI) ব্যবহার করেন। এই ইনডেক্সে তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে, তখন এল নিনো শুরু হয়। আর তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রি বা তার বেশি বেড়ে যায়, তখন তাকে বলা হয় 'সুপার এল নিনো'। ২০২৬ সালের শেষের দিকে কিছু মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, যা চরম চিন্তার বিষয়।
১৮৭৬-৭৮ সালের সেই ভয়াবহ স্মৃতি
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ শনিবারের শুনানিতে খনি মালিক এবং লবিস্টদের সমস্ত যুক্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছর আগে ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে পৃথিবীতে এমনই এক বিধ্বংসী সুপার এল নিনো এসেছিল। সেই সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় রেকর্ড খরা ও ফসল নষ্ট হয়েছিল। যার ফলে বিশ্বজুড়ে এক মহাদুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা যান।
২০২৬ সালের এল নিনো সেই ইতিহাসকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখনকার পরিস্থিতি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কেন? কারণ ১৫০ বছর আগে পৃথিবী আজকের তুলনায় অনেক ঠান্ডা ছিল। গত দেড়শো বছরে মানুষের তৈরি দূষণ আর গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যে ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গিয়েছে। ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের অন্যতম উত্তপ্ত বছর। এই তপ্ত পৃথিবীর উপর যখন আরেকটি সুপার এল নিনো চড়ে বসবে, তখন গরম, খরা এবং দাবদাহের তীব্রতা যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
বিশ্বজুড়ে এবং ভারতে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব
এল নিনো শুরু হলে বিশ্ব দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়— একদিকে চরম শুকনো আবহাওয়া, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি।
১. খরা ও তীব্র গরমের ঝুঁকি
অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারতের কিছু অংশে এল নিনোর কারণে বৃষ্টিপাত অনেক কমে যায়। এর ফলে নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়া, জলের অভাব এবং তীব্র খরা দেখা দিতে পারে। শুকনো আবহাওয়ার কারণে বনাঞ্চলে ভয়াবহ 'দাবানল' বা বনের আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া সামুদ্রিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, যা সামুদ্রিক মাছের মারাত্মক ক্ষতি করবে।
২. অতিবৃষ্টি ও বন্যা
এর উল্টো চিত্র দেখা যাবে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চল (যেমন পেরু ও ইকুয়েডর), আমেরিকার দক্ষিণাংশ এবং আফ্রিকার কিছু এলাকায়। সেখানে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টি হবে, যার ফলে হড়পা বান ও বন্যা দেখা দিতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Climate change India impact: রিপোর্টে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে গরমের কারণে প্রায় ১৯১ বিলিয়ন বা ১৯,১০০ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, যা ১৯৯১ থেকে ২০০০ সালের গড়ের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি।
৩. ভারতের উপর প্রভাব
ভারতে এল নিনোর সরাসরি প্রভাব পড়ে বর্ষাকালের উপর। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মৌসুমী বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে কম বৃষ্টিপাত বা খরা দেখা দিতে পারে। এর ফলে চাষবাস, বিশেষ করে ধান ও ভুট্টার মতো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কম ফসলের কারণে বাজারে খাবার-দাবারের দাম বেড়ে গিয়ে খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি তীব্র গরমের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যহানি এবং পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে।
পরবর্তী পর্যায়: লা নিনা এবং বন্যার আশঙ্কা
প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী, এল নিনো চিরকাল থাকে না। সাধারণত একটি শক্তিশালী এল নিনো শেষ হওয়ার পর তার ঠিক বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি হয়, যাকে বলা হয় 'লা নিনা' (La Niña)।
২০২৬ সালের মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, এই বছর জুড়ে এল নিনোর দাপটই থাকবে। উত্তর গোলার্ধে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এর প্রভাব চলার সম্ভাবনা ৯৬ শতাংশ। তবে ২০২৭ সালের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে এই এল নিনো বিদায় নিয়ে 'লা নিনা'র আগমন ঘটতে পারে।
লা নিনা এলে কী হয়?
লা নিনা হলো এল নিনোর ঠিক উল্টো। এই সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের জল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঠান্ডা হয়ে যায়। এর ফলে এশিয়া এবং বিশেষ করে ভারতে মৌসুমী বায়ু অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ভারতে অতিবৃষ্টি ও বন্যা: লা নিনা এলে ভারতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টি হয়। এর ফলে বিহার, অসম, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা এবং মধ্য ভারতের গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বড় ধরনের বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।
শহুরে বন্যা: অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে কলকাতা, মুম্বই বা দিল্লির মতো বড় শহরগুলোতে জল জমে 'স্মার্ট ফ্লাড' বা শহুরে বন্যা দেখা দেয়।
চাষবাসের ক্ষতি: লা নিনা চাষের জন্য ভালো হলেও, অতিরিক্ত বৃষ্টি আর জল জমার কারণে খেতের ফসল পচে নষ্ট হতে পারে এবং ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মতো রোগ ছড়াতে পারে।
আজ থেকে ১৫০ বছর আগের তুলনায় বর্তমান পৃথিবী প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের দিক থেকে অনেক এগিয়ে। ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (WMO), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলি এখন অনেক আগে থেকেই আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে পারে। এর ফলে সরকার ও সাধারণ মানুষ আগে থেকেই সচেতন হওয়ার সুযোগ পায়।
তবে চিন্তার বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতির রূপ এখন অনেক বেশি খামখেয়ালি। একসঙ্গে খরা, গরম এবং পরে বন্যার মতো দুর্যোগ সামলাতে গিয়ে সরকারি ও সামাজিক ত্রাণ ব্যবস্থা বা বিপর্যয় মোকাবিলা দলগুলি চরম চাপের মুখে পড়তে পারে।
২০২৬ সালের এল নিনো কোনো সাধারণ আবহাওয়া বদল নয়, এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। আবহাওয়া পুরোপুরি মানুষের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও, সঠিক প্রস্তুতি নিলে ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব।
সরকারকে এখনই জল সংরক্ষণ, সেচ ব্যবস্থার উন্নতি এবং কম জলে চাষ করা যায় এমন ফসলের দিকে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি, ২০২৭ সালের সম্ভাব্য লা নিনা ও বন্যার কথা মাথায় রেখে নদী বাঁধ মেরামত ও শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিষ্কার করার কাজও এগিয়ে রাখতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপ (মে ২০২৬ আপডেট):
এল নিনোর সম্ভাবনা: ৮২% (মে-জুলাই ২০২৬-এর মধ্যে শুরু)।
স্থায়িত্ব: ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত (৯৬% সম্ভাবনা)।
তীব্রতা: সুপার এল নিনো বা ঐতিহাসিক রেকর্ডের কাছাকাছি হওয়ার আশঙ্কা।
সতর্কতা: ২০২৬ সালে খরা ও গরমের প্রস্তুতি এবং ২০২৭-এর জন্য বন্যার আগাম ভাবনা জরুরি।






