ইরান সংকট: যেভাবে যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে পরিবেশে
Middle East conflict climate impact: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ কি শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটই তৈরি করছে, নাকি এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনকেও তীব্র করছে? ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, জ্বালানি সংকট ও কার্বন নিঃসরণ কি হিমালয়ের হিমবাহ গলন-সহ দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে না?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের আঁচ আমরা ইতোমধ্যেই উপলব্ধি করেছি আমাদের রান্নাঘরে, কলকারখানায়, খেত-খামারে। জ্বালানি সংকটের সঙ্গে, দৈনন্দিন শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, ফসল ফলানোর জন্য সার বা কীটনাশক, ইত্যাদির ভাঁড়ারে ইতোমধ্যে সংকট দেখা দিতে শুরু করেছে । কিন্ত এই যুদ্ধের কারণে,আমাদের পরিবেশ যে ক্রমশ বিষিয়ে উঠছে, তা আমরা হয়তো ভুলতে বসেছি। একদিকে বিজ্ঞানীরা প্রতি মুহূর্তে আমাদেরকে সতর্ক করেছেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যেন কোনোভাবেই ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি না বাড়ে, অপরদিকে অন্তহীন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় দক্ষিণ এশিয়া-সহ বিশ্বের একাংশের পরিবেশ আজ সংকটাপন্ন। সেই ভার এসে পৌঁছেছে হিমালয়ের হিমবাহ গুলিতে, যেগুলিই মূলত দক্ষিণ এশিয়ার নদীগুলিকে সারাবছর বাঁচিয়ে রাখে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল 'অপারেশনএপিক ফিউরি' শুরু করলেই , ইরান তড়িঘড়ি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। পারস্য ও ওমান উপসাগরের মাঝে অবস্থিত মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া সংকীর্ণ এই জলপথের গুরুত্ব বিশ্ব বাজারে অপরিসীম। পরিসংখ্যান বলছে, ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত থেকে আমদানিকৃত তেলের ২০% আসে এই প্রণালী দিয়ে। শুধু তেল নয়, এই জলপথের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় অংশ (প্রায় ২২%) রফতানি হয়; বাস্তব অর্থে, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম-জ্বালানী চোকপয়েন্টে। এই পথ বন্ধ করে দেওয়ায়, অপরিশোধিত তেলের দাম চড়চড় করে বাড়তে থাকে; যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রথম দিকে তেলের দাম বাড়ে ১০ শতাংশের বেশি। উপরি পাওনা হিসাবে জীবাশ্ম জ্বালানি স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, বেসামরিক এলাকা এবং সুমুদ্রে হামলা তো আছেই। চলমান আর্থিক সংকটের সঙ্গে পরিবেশগত বিপর্যয় পৃথিবীকে বড় ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ক্লাইমেট অ্যান্ড কমিউনিটি ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর, প্যাট্রিক বিগারের তত্ত্বাবধানে একদল গবেষকের একটি কাজ পরিবেশদিদের মাঝে রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছে। তাঁরা গণনা করে দেখেছেন, যুদ্ধের প্রথম ১৪ দিনেই প্রায় ৫ মিলিয়ন টন গ্রিনহাউস গ্যাস পরিবেশে মিশেছে! বিশ্বের ছোট ছোট ৮৪টি দেশ সম্মিলিতভাবে এক বছরে এই পরিমাণ দূষণ সৃষ্টি করতে পারে না।
কী ভাবছেন, কেবল মিসাইল ও ড্রোন হামলার ফলেই এই দূষণ? এর স্বীয়ভাগের জন্যে দায়ী ইরানের ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনগুলি। রেড ক্রিসেন্ট নামক এক ইরানি সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, প্রথম পনেরো দিনে ইরানের প্রায় ২০,০০০ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; এর ফলে ২.৪ মিলিয়ন টন গ্রিনহাউস গ্যাস বাতাসে মিশেছে। এছাড়া সামরিক বিমান এবং অন্যান্য যুদ্ধের সরঞ্জাম চালাতে পুড়েছে প্রায় ৬ বিলিয়ন ব্যারেল তেল। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে বাড়তি ২.৪ মিলিয়ন টন গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপন্ন হয়েছে।
এমনিতেই, গত কয়েক বছর ধরে প্যালেস্টাইনের ওপর চলা ইজরায়লি আগ্রাসন, বা রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধে পরিবেশ বিপন্ন; তার উপর এই নতুন পরিসংখ্যান গুলি পরিবেশ বিজ্ঞানীদেরকে চিন্তায় ফেলেছে। তুলনামূলক কয়েকটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করলে আমাদের জন্যে বোঝা সুবিধাজনক হবে; বিগত কয়েক বছর ধরে গাজার উপর ইজরায়েলি হামলার কারণে ৩৩ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়েছে, যা জর্ডানের মতো দেশের বার্ষিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের সমান। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রথম চার বছরে প্রায় ৩১১ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড উৎপন্ন হয়েছে, যা ফ্রান্সের বার্ষিক নির্গমনের সমতুল্য।
ট্রান্সন্যাশনাল ইনস্টিটিউট এবং কনফ্লিক্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টঅবজারভেটরির (সিইওবিএস) একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৫.৫ শতাংশের জন্য দায়ী নিয়মিত সামরিক অনুশীলন। যদি পৃথিবীর সব দেশের সামরিক বাহিনী নিয়ে একটি দেশ কল্পনা করা যেত, তবে তারা হতো পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম নির্গমনকারী রাষ্ট্র। এর পরেও প্যারিস চুক্তিতে সামরিক সামরিক নির্গমন নিয়ে কোনো বাধ্য বাধকতা নেই। এটা অত্যন্ত হাস্যকর।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব জায়গাগুলিতে, ইরান ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, সিইওবিএস এবং উপসাগরীয় গবেষকরা সেখানকার বায়ুমণ্ডলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা করেছেন; বিশেষত, সৌদি আরবের রাস তানুরা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ-সহ প্রধান প্রধান তেল শোধনাগার এবং বন্দরগুলিতে গুরুতর দূষণের আভাষ পান তাঁরা। মূলত ড্রোন হামলার ফলে তেলের ট্যাঙ্কগুলিতে আগুন লাগে, এবং বিশাল ধোঁয়ার স্তূপ বায়ুমণ্ডলে মেশে। এই বিস্ফোরণের ফলে নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইডের মতো ক্ষতিকারক গ্রিনহাউজ গ্যাসগুলি বাতাসে মেশে, যার জন্যে মানুষের মাঝে শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় , এবং ফসলের জমি এবং শহরের আশেপাশের অঞ্চলে বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
স্থলভাগের পাশাপাশি, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ট্যাঙ্কারে বিস্ফোরণের ফলে, সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। একবার সামুদ্রিক দূষণ দেখা দেখা দিলে, সেখান থেকে মুক্তি মেলা কষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা পানীয় জলের; সেজন্য তাঁদেরকে সামুদ্রিক জলের উপর নির্ভর করতে হয়। সেই উৎস যদি বিষাক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে জল পরিশোধনের খরচা বেড়ে যাবে। উপসাগরীয় পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন, যুদ্ধের ফলে সামুদ্রিক উদ্ভিদ, প্রাণী, এবং উপকূলীয় শিল্পাঞ্চল গুলি ক্ষতি গ্রস্থ হবে; সর্বোপরি, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হতে পারে। কারণ, বিভিন্ন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রে ডাইমিথাইল হাইড্রাজিনের মতো অত্যন্ত ক্ষতিকারক জ্বালানী এবং লাল ইনহিবিটেড রেড ফিউমিং নাইট্রিক অ্যাসিডের মতো বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে।
এই মুহূর্তে বিশ্ব উষ্ণায়ন ঠেকানোর জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস করা আশু কর্তব্য ছিল, কিন্ত বর্তমান জ্বালানী সংকটের নিরিখে তা আর হচ্ছে কই! প্রতিটি রাষ্ট্রই সমস্যা মেটানোর জন্যে কয়লার দিকে ঝুঁকছে। সেই সঙ্গে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের (পলিসিলিকন, ও বিভিন্ন বিরল মৌল) যোগানে টান পড়ায় শক্তির সংকট আরও তীব্র হচ্ছে; সরবরাহ যত বিলম্বিত হবে মানুষ তত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করতে থাকবে। ফলস্বরুপ পরিবেশে মিশবে বিপুল কালো ধোঁয়া।
দক্ষিণ এশিয়া, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল; মধ্য প্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা এবং জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন, এজন্যে দায়ী। খাবার ও জলের জন্যে এই অঞ্চলের মানুষজনকে হিন্দু কুশ হিমালয়ের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়; আর্কটিক এবং অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া এখানে প্রচুর বরফ জমে থাকে, যেগুলি সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো প্রধান নদীগুলির চালিকা শক্তি। কিন্ত সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হিন্দু কুশ-হিমালয়ের হিমবাহগুলি আগের চেয়ে দ্রুত গলে যাচ্ছে; ২০০০ সাল থেকে বরফের গলন দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। এইভাবে চলতে থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশ হিমবাহ হারিয়ে যাবে, যা ভবিষ্যতে নদিগুলির প্রবাহের জন্যে হুমকি স্বরুপ।
বর্তমান বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলি তাকিয়ে আছে সামরিক ও পারমানবিক শক্তির দিকে; এর মাঝে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে কার্বন বাজেট ক্রান্তি সীমায় দাঁড়িয়ে। হরমুজ প্রনালীতে কে আধিপত্য বিস্তার করবে, মধ্যপ্রাচ্যে কে একচেটিয়া বানিজ্য করবে, এসবের দড়ি টানাটানি খেলায় শেষপর্যন্ত আমরা হেরে যাবো না তো! একবার প্রকৃতির রোষে পড়লে আগামী প্রজন্মের জন্যে একটি বসবাসযোগ্য নীল গ্রহ রেখে যেতে পারব কি? হ্যাঁ, যদি প্রশ্নগুলি করাঘাত করত আগ্রাসী রাষ্ট্রযন্ত্রগুলির মগজে!
তথ্য সূত্র:
https://www.statista.com/chart/35914/destination-maritime-crude-oil-strait-of-hormuz/?srsltid=AfmBOopbz6QFrT99CMDSX-bueRSJjVoSJ7_sT1JhtbF6dbFlId4EL8yl
https://ccpi.org/guest-article-ccpi-x-military-emissions-gap-how-military-emissions-impact-global-warming/
https://www.theguardian.com/world/2026/mar/21/middle-east-iran-conflict-environment-climate
https://www.welthungerhilfe.org/global-food-journal/rubrics/climate-resources/glacier-melt-in-the-
himalayas-endangers-south-asia






