করোনা সেরে গেলেও পিছু ছাড়ছে না ক্লান্তি! লং কোভিড নিয়ে নতুন গবেষণায় কী জানা গেল?
Long COVID: করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার পরেও অনেকের শরীরে থেকে যাচ্ছে ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট ও স্মৃতিশক্তির সমস্যা। লং কোভিড নিয়ে নতুন মার্কিন গবেষণায় দেখা গেল, তিন বছরে প্রায় অর্ধেক রোগীর উপসর্গ কমেছে এবং এক-চতুর্থাংশ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন। কিন্তু কোন ধরনের উপসর্গ থাকলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি? কী বলছে গবেষণা?
করোনা মহামারির ভয়াবহ দিনগুলি পেরিয়ে গিয়েছে বেশ কয়েক বছর। কিন্তু সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পরেও অনেকের শরীরে থেকে গিয়েছে নানা সমস্যা। কারও দীর্ঘদিন ক্লান্তি কাটছে না, কারও স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে সমস্যা হচ্ছে, আবার কেউ ভুগছেন শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা কিংবা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলিকে বলা হয় ‘লং কোভিড’। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় লং কোভিড থেকে সুস্থ হওয়ার সময় এবং রোগীদের উপসর্গের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে এসেছে। গবেষণাটি বলছে, সব রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা এক নয়। কারও ক্ষেত্রে উপসর্গ অনেকটাই কমে যাচ্ছে, আবার কারও ক্ষেত্রে বছরের পর বছর সমস্যা থেকে যাচ্ছে।
লং কোভিড আসলে কী?
করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার পরেও যখন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শারীরিক বা মানসিক সমস্যা থেকে যায়, তখন সেই অবস্থাকে লং কোভিড বলা হয়। সাধারণত সংক্রমণের পর কয়েক সপ্তাহ বা মাস পেরিয়ে গেলেও উপসর্গ না কমলে এই সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকদের উদ্বেগ বাড়ে। লং কোভিডের উপসর্গ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। কারও সারাক্ষণ ক্লান্তি লাগে, অল্প পরিশ্রমেই শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। কেউ আবার ভুলে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা বা মাথা ঝাপসা লাগার সমস্যায় ভোগেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে অনেক সময় ‘ব্রেন ফগ’ বলা হয়। এ ছাড়াও মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট, গন্ধ ও স্বাদের অনুভূতি কমে যাওয়া এবং সামান্য শারীরিক পরিশ্রমের পরেও অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। এই সমস্যাগুলি দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং কাজকর্মেও প্রভাব ফেলে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Long COVID: : জানা যাচ্ছে, নারী-পুরুষ লিঙ্গভেদে লং কোভিডের প্রভাব ক্রিয়াশীল হলেও, কোভিড-এ গুরুতর আক্রান্ত হওয়া নারীদের মধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি উপসর্গের আশঙ্কা বেশি।
কী বলছে নতুন গবেষণা?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১,০১৯ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে এই গবেষণা করা হয়েছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা করোনা সংক্রমণের এক বছর পরেও লং কোভিডের উপসর্গে ভুগছিলেন। এরপর তাঁদের স্বাস্থ্যের পরিবর্তন পরবর্তী তিন বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণার ফলাফল বলছে, এই সময়ের মধ্যে প্রায় অর্ধেক রোগীর উপসর্গ দীর্ঘমেয়াদে কমেছে। অন্যদিকে, প্রায় এক-চতুর্থাংশ রোগী সম্পূর্ণভাবে উপসর্গমুক্ত হয়েছেন।অর্থাৎ, লং কোভিড থেকে সুস্থ হওয়া সম্ভব হলেও সবার ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া একই রকম নয়। কারও উপসর্গ ধীরে ধীরে কমে যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে সমস্যা থেকে যায়।
কোন উপসর্গ থাকলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Covid and Depression: কোভিড ১৯-এর প্রভাবে শিশু ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার ওপর যে প্রভাব পড়েছে তা অনেকদিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যাঁদের প্রধান সমস্যা ছিল গন্ধ ও স্বাদের অনুভূতি কমে যাওয়া, তাঁদের সুস্থ হওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এই ধরনের রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশের উপসর্গের উন্নতি হয়েছে।অন্যদিকে, যাঁদের শরীরের একাধিক অঙ্গ বা শারীরিক ব্যবস্থায় একসঙ্গে সমস্যা দেখা দিয়েছিল, তাঁদের সুস্থ হওয়ার হার অনেক কম। এই ধরনের রোগীদের মধ্যে ১৯ শতাংশেরও কমের উপসর্গের উন্নতি হয়েছে। এই পার্থক্য থেকেই বোঝা যাচ্ছে, লং কোভিড একটি নির্দিষ্ট ধরনের সমস্যা নয়। বরং বিভিন্ন রোগীর শরীরে এটি বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। যাঁদের একাধিক ধরনের উপসর্গ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া আরও জটিল হতে পারে।
কেন লং কোভিড নিয়ে এত উদ্বেগ?
লং কোভিডের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এর উপসর্গ দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে। অনেকেই করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার পর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট বা স্মৃতিশক্তির সমস্যার কারণে তাঁদের দৈনন্দিন কাজেও বাধা তৈরি হয়। বিশেষ করে শারীরিক পরিশ্রমের পর অতিরিক্ত ক্লান্তি অনেকের জীবনকে কঠিন করে তোলে। সামান্য হাঁটাচলা বা কাজ করার পরেও শরীরের অবস্থা খারাপ হতে পারে। ফলে আগের মতো কাজ করার ক্ষমতা ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এ ছাড়া লং কোভিডের উপসর্গ সব সময় একই রকম থাকে না। কখনও সমস্যা কমে যায়, আবার কিছুদিন পর তা ফিরে আসতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Long COVID: পাশাপাশি অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই হরমোনের স্বাভাবিক মাত্রায় তারতম্য দেখা দিচ্ছে । দেখা যাচ্ছে যে, কর্টিসল, টেস্টোস্টেরন তাদের স্বাভাবিক মাত্রার থেকে কমে গেছে।
লং কোভিডের চিকিৎসা?
গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। লং কোভিডের জন্য এখনও কোনও অনুমোদিত নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। ফলে রোগীদের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা এবং শারীরিক অবস্থার পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অফ হেলথের (NIH) অর্থায়নে পরিচালিত RECOVER উদ্যোগের অংশ। এর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী Annals of Internal Medicine-এ।
ভবিষ্যতের চিকিৎসায় কী প্রভাব পড়তে পারে?
এই গবেষণা লং কোভিড নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় নতুন দিশা দেখাতে পারে। বিশেষ করে কোন ধরনের রোগীর সুস্থ হতে বেশি সময় লাগছে এবং কারা তুলনামূলক দ্রুত সুস্থ হচ্ছেন, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের চিকিৎসা সব রোগীর ক্ষেত্রে সমান কার্যকর নাও হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে রোগীর উপসর্গের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসার পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে এই গবেষণা সাহায্য করতে পারে।







