ইউটিউবে ৫৮%, হোয়াটসঅ্যাপে ৫৬%, এভাবেই খবর পাচ্ছেন ভারতীয়রা
India news consumption: রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, ভারতে ৫৮ শতাংশ মানুষ ইউটিউব এবং ৫৬ শতাংশ মানুষ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে খবর পান। সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রভাব বাড়ছে, আর বদলে যাচ্ছে ভারতীয়দের সংবাদ পড়া, দেখা ও জানার দীর্ঘদিনের অভ্যাস।
ভারতে মানুষ কী ভাবে খবর পড়েন বা দেখেন, সেই অভ্যাসে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। একসময় সংবাদপত্র ছিল খবরের প্রধান মাধ্যম। পরে টেলিভিশনের পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদপোর্টাল গুরুত্ব পেতে শুরু করে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরও বদলেছে। নতুন এক সমীক্ষা জানাচ্ছে, ভারতের বিপুল সংখ্যক মানুষ খবর পাওয়ার জন্য নির্ভর করছেন ইউটিউব ও হোয়াটসঅ্যাপের উপর। সংবাদ সংস্থার নিজস্ব ওয়েবসাইট বা টেলিভিশনের তুলনায় সামাজিক মাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্ম অনেক বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ সাংবাদিকতা গবেষণার প্রতিষ্ঠান ‘রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজম’-এর প্রকাশিত ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, ভারতে সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের ৫৮ শতাংশ খবরের জন্য ইউটিউব ব্যবহার করেন। হোয়াটসঅ্যাপের উপর নির্ভর করেন ৫৬ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে ভিডিও ও মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম এখন মূলধারার অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছে।
শুধু ভারত নয়, বিশ্বজুড়েই এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রিপোর্ট বলছে, সামাজিক মাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্ম প্রথমবারের মতো টেলিভিশন ও সংবাদ ওয়েবসাইটকে পিছনে ফেলে খবর পাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে ৫৪ শতাংশ মানুষ গত সপ্তাহে অন্তত একবার সামাজিক মাধ্যম বা ভিডিও প্ল্যাটফর্ম থেকে খবর পেয়েছেন। তুলনায় টেলিভিশনের সংখ্যা ৫২ শতাংশ এবং সংবাদ ওয়েবসাইট বা অ্যাপের ক্ষেত্রে ৫১ শতাংশ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ভারতেই জন্ম প্রাঞ্জলির। তবে ছোটবেলাতেই, মাত্র ১১ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি আমেরিকার ফ্লোরিডায় চলে যান। প্রাঞ্জলির বাবা ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। বাবার কাজ দেখতে দেখতেই ছোট্ট প্রাঞ্জলির কম্পিউটারের প্রতি ভালবাসা তৈরি হয়।
ভারতের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। ইউটিউব দীর্ঘদিন ধরেই খবরের অন্যতম প্রধান উৎস হলেও তার জনপ্রিয়তা এখনও বজায় রয়েছে। অনেক মানুষ এখন সরাসরি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে না গিয়ে ইউটিউবের ভিডিও, লাইভ স্ট্রিম বা শর্টসের মাধ্যমে খবর জানতে চান। একইভাবে হোয়াটসঅ্যাপ বিভিন্ন সংবাদ লিঙ্ক, ভিডিও এবং ফরোয়ার্ড বার্তার মাধ্যমে মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ২০২১ সালের তুলনায় হোয়াটসঅ্যাপ থেকে খবর পাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, ভারতে ৫২ শতাংশ মানুষ কখনও কখনও বা প্রায়ই খবর এড়িয়ে চলেন। অর্থাৎ তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে সংবাদ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। এর কারণ হিসেবে রাজনৈতিক সংঘাত, নেতিবাচক সংবাদ, তথ্যের অতিরিক্ত চাপ এবং মানসিক ক্লান্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতে সংবাদে সামগ্রিক আস্থার হার নেমে এসেছে ৩৯ শতাংশে। যদিও এটি বৈশ্বিক গড়ের সামান্য উপরে, তবু আগের বছরের তুলনায় আস্থা কমেছে। বিশ্বজুড়েই সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কমছে। ২০২৬ সালে মাত্র ৩৭ শতাংশ মানুষ বলেছেন যে তাঁরা অধিকাংশ সংবাদকে বিশ্বাস করেন। এটি গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তর।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Artificial Intelligence: আমাদের মাঝে এখন স্মার্ট ওয়াচ খুবই জনপ্রিয়; সারাদিন কতটা হাঁটছি, কীভাবে হাঁটছি, এসব নিয়ে আমরা খুবই সচেতন। সেই ট্রেন্ডটাই কাজে লাগাচ্ছে কোম্পানিরা। আর এইসব ডেটায় আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক চ্যাটবট গুলি।
এর পেছনে একটি বড় কারণ, সামাজিক মাধ্যমে ভুয়ো তথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার। ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপে সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও সব তথ্য সমানভাবে যাচাই করা হয় না। ফলে সত্য, মতামত এবং প্রচারের মধ্যে সীমারেখা অনেক সময় অস্পষ্ট হয়ে যায়। তবু ব্যবহারকারীরা এই প্ল্যাটফর্মগুলি বেছে নিচ্ছেন কারণ এগুলি সহজলভ্য, দ্রুত এবং মোবাইল-কেন্দ্রিক।
রিপোর্টে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতার কথা বলা হয়েছে। সংবাদ গ্রহণে ভিডিওর ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে ৭৭ শতাংশ মানুষ প্রতি সপ্তাহে অনলাইন সংবাদ ভিডিও দেখেন। কিন্তু তাঁরা সেই ভিডিও সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব ওয়েবসাইটে নয়, বরং ইউটিউব বা অন্য সামাজিক মাধ্যমেই বেশি দেখেন। এর ফলে সংবাদ সংস্থাগুলির নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে পাঠক বা দর্শক ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
একই সঙ্গে সংবাদ জগতে নতুন প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে উঠে আসছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সাররা। বিশ্বের ২৭ শতাংশ মানুষ এখন সংবাদ বা চলতি ঘটনা সম্পর্কে জানতে কোনো না কোনো কনটেন্ট ক্রিয়েটরের উপর নির্ভর করেন। ভারতে এই প্রবণতা আরও বেশি। অনেক ইউটিউবভিত্তিক সংবাদ বিশ্লেষক ও স্বাধীন সাংবাদিক বিপুল দর্শকসংখ্যা অর্জন করেছেন। তাঁরা মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন।
তবে এই নতুন সংবাদ পরিবেশে একটি বড় প্রশ্ন হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। মানুষ প্রায়ই কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের বেশি আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য মনে করেন, কিন্তু তাঁদের নিরপেক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সংশয়ও থাকে। ফলে দর্শকরা একদিকে নতুন মাধ্যমের দিকে ঝুঁকছেন, অন্যদিকে তথ্যের সত্যতা নিয়ে উদ্বিগ্নও থাকছেন।
রিপোর্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ১০ শতাংশ মানুষ ইতোমধ্যেই এআই চ্যাটবটের মাধ্যমে খবর জানছেন। বিশেষত তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। যদিও এআই-নির্ভর তথ্যের উপর মানুষের আস্থা এখনও তুলনামূলকভাবে কম। অনেকেই চ্যাটবট থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে অন্য উৎসে যান।
আগামী দিনে সংবাদমাধ্যমগুলির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে, কী ভাবে এই নতুন ডিজিটাল পরিবেশে বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রেখে পাঠক ও দর্শকদের কাছে পৌঁছনো যায়। কারণ খবরের মাধ্যম বদলালেও নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজনীয়তা আজও অটুট।








