৭ বছর বয়সে কোডিং, ১৬ বছরেই ১০০ কোটির কোম্পানি! কে এই প্রাঞ্জলি অবস্থি?
ভারতেই জন্ম প্রাঞ্জলির। তবে ছোটবেলাতেই, মাত্র ১১ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি আমেরিকার ফ্লোরিডায় চলে যান। প্রাঞ্জলির বাবা ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। বাবার কাজ দেখতে দেখতেই ছোট্ট প্রাঞ্জলির কম্পিউটারের প্রতি ভালবাসা তৈরি হয়।
প্রাঞ্জলি অবস্থি— আমার, আপনার দেখা আর পাঁচটা মেয়ের মতো নয় সে। আগেও ছিল না। যে ৭ বছর বয়সে আর পাঁচটা মেয়ে বাবার সঙ্গে রান্নাবটি আর পুতুল খেলায় মেতে থাকে, সেই বয়সেই প্রাঞ্জলি নিজের ইঞ্জিনিয়ার বাবার হাত ধরে কোডিং শিখছিল। ইন্টারনেট স্ক্রোল করতে করতে ইদানীং নিশ্চয়ই আপনার চোখে পড়েছে প্রাঞ্জলি অবস্থির নাম। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে চর্চার শেষ নেই। কেউ লিখছেন ‘১৬ বছর বয়সি কোটিপতি’, কেউ আবার বলছেন ‘এআই দুনিয়ার বিস্ময়-কন্যা’।
শুরুটা হয়েছিল যেভাবে
ভারতেই জন্ম প্রাঞ্জলির। তবে ছোটবেলাতেই, মাত্র ১১ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি আমেরিকার ফ্লোরিডায় চলে যান। প্রাঞ্জলির বাবা ছিলেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। বাবার কাজ দেখতে দেখতেই ছোট্ট প্রাঞ্জলির কম্পিউটারের প্রতি ভালবাসা তৈরি হয়। ৭ বছর বয়সে প্রাঞ্জলি বাবার হাত ধরে শিখে ফেলেন ‘কোডিং’-এর অ আ ক খ। সেখান থেকেই তাঁর মাথায় জেঁকে বসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)-এর ভূত!
বয়স যখন মাত্র ১৩, তখন প্রাঞ্জলি সুযোগ পেয়ে যান ‘ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’-তে একটি রিসার্চ ইন্টার্নশিপের। একদিকে স্কুলের পড়াশোনা, অন্যদিকে বড় বড় বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মেশিন লার্নিংয়ের প্রজেক্ট—দুই দিকই সমান তালে সামলাচ্ছিলেন তিনি।
এই ইন্টার্নশিপ করতে গিয়েই প্রাঞ্জলি একটা বড় সমস্যা খেয়াল করলেন। তিনি দেখলেন, গবেষকদের কোনো বিষয় নিয়ে কাজ করতে গেলে ইন্টারনেটের হাজার হাজার সাইট, পিডিএফ আর গাদা গাদা তথ্য ঘেঁটে আসল জিনিসটা খুঁজে বের করতে কালঘাম ছুটে যায়। ঠিক এই সমস্যাটাই প্রাঞ্জলির মাথায় একটা নতুন বুদ্ধি এল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
AI water consumption: তথ্য বলছে, আমাদের ফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে একদিনে মাত্র দশ থেকে বারোবার চ্যাটজিপিটিকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই আমরা হাফ লিটারের একটা পরিশ্রুত জলের বোতল খরচা করে ফেলছি, যে খরচ হওয়া জলের বেশিরভাগটাই আর পুনর্ব্যবহার সম্ভব নয়।
মাত্র ১৬ বছরেই ১০০ কোটির কোম্পানি!
বুদ্ধি তো মাথায় এল, কিন্তু সেটাকে বাস্তবে রূপ দেবেন কীভাবে? প্রাঞ্জলি দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলেন না। হাইস্কুল শেষ করার পর বিখ্যাত ‘জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’-তে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়ার সুযোগ পেলেও, তিনি ঠিক করলেন চেনা ছকের বাইরে হাঁটবেন। কলেজের পড়াশোনা আপাতত সরিয়ে রেখে পুরোপুরি নেমে পড়লেন নিজের ব্যবসা বা স্টার্টআপ তৈরিতে।
২০২২ সালের জানুয়ারি মাস। প্রাঞ্জলির বয়স তখন মাত্র ১৬। মায়ামিতে বসে তিনি তৈরি করে ফেললেন তাঁর প্রথম প্ল্যাটফর্ম—Delv.AI। এটি এমন একটি এআই টুল, যা গবেষকদের চোখের পলকে ইন্টারনেটের বিশাল সমুদ্র থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে, গুছিয়ে এবং সংক্ষেপে সামনে এনে হাজির করে।
এক অল্প বয়সি মেয়ের এমন চমৎকার ভাবনা দেখে মুগ্ধ হলেন মায়ামির বড় বড় বিনিয়োগকারীরা। মায়ামির একটি স্টার্টআপ এক্সিলারেটর প্রোগ্রামে জায়গা পাওয়ার পর প্রাঞ্জলিকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বড় বড় ইনভেস্টরদের কাছ থেকে প্রায় ৩.৭ কোটি টাকার ফান্ড চলে আসে তাঁর ঝুলিতে। আর দেখতে দেখতে ২০২৩ সালের মধ্যেই তাঁর এই কোম্পানির বাজারমূল্য বা ভ্যালুয়েশন ছুঁয়ে ফেলে প্রায় ১০০ কোটি টাকা!
এত কম বয়সে এই সাফল্য রাতারাতি প্রাঞ্জলিকে গ্লোবাল ইন্টারনেটের তারকা বানিয়ে দেয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Artificial Intelligence: আমাদের মাঝে এখন স্মার্ট ওয়াচ খুবই জনপ্রিয়; সারাদিন কতটা হাঁটছি, কীভাবে হাঁটছি, এসব নিয়ে আমরা খুবই সচেতন। সেই ট্রেন্ডটাই কাজে লাগাচ্ছে কোম্পানিরা। আর এইসব ডেটায় আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক চ্যাটবট গুলি।
‘বয়স কম’ বলে শুনতে হয়েছিল খোঁটা
বাইরে থেকে এই সাফল্য যতটা ঝকঝকে দেখায়, ভিতরে লড়াইটা কিন্তু ততটা সহজ হয় না। প্রাঞ্জলি নিজেই এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, এত কম বয়সে ব্যবসার দুনিয়ায় আসায় অনেকেই তাঁকে প্রথমে গুরুত্ব দিতে চাননি, বাঁকা চোখে দেখতেন। কিন্তু প্রাঞ্জলি নিজের কাজে অনড় ছিলেন। কোডিং করা থেকে শুরু করে গ্রাহকদের সার্ভিস দেওয়া—কোম্পানির সব কাজ তিনি নিজে হাতে করতেন। আর এই জেদই সমস্ত সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাঁকে সফল করে তোলে।
২০২৬-এ দাঁড়িয়ে প্রাঞ্জলি এখন কোথায়?
সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল পোস্টে মানুষ এখনও প্রাঞ্জলিকে সেই ‘১৬ বছরের কিশোরী’ হিসেবেই দেখছেন। কিন্তু বাস্তবে সময় তো থেমে থাকেনি। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রাঞ্জলির বয়স ১৯ বছর। আর এই তিন বছরে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়েছেন।
Delv.AI-এর সাফল্যের পর প্রাঞ্জলি এখন মনোনিবেশ করছেন এক্কেবারে নতুন একটি প্রজেক্টে। দুই বন্ধু (ধ্রুব রুংটা ও হর্ষ গাড্ডিপতি)-র সঙ্গে মিলে তিনি এখন তৈরি করেছেন Slashy নামের একটি নতুন এআই স্টার্টআপ, যার বর্তমান সিইও (CEO) প্রাঞ্জলি নিজেই।
কী এই ‘Slashy’?
প্রাঞ্জলি মজা করে এটিকে বলেন—“হাত-পা থাকা চ্যাটজিপিটি” (ChatGPT with hands)! অর্থাৎ, এই এআই শুধু আপনার সঙ্গে চ্যাট করবে না বা প্রশ্নের উত্তর দেবে না, বরং মানুষের মতো নিজে থেকে কাজও করে দেবে। যেমন: আপনার হয়ে ইমেল লিখে দেওয়া, মিটিংয়ের শিডিউল ঠিক করা, অফিসের দরকারি ফাইল গুছিয়ে রাখা কিংবা রোজকার একঘেয়ে কাজগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামলে দেওয়া। এটি একটি দুর্দান্ত এআই পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। ইতিমধ্যেই আমেরিকার সিলিকন ভ্যালির বিখ্যাত স্টার্টআপ মেন্টর ‘Y Combinator’-এর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে প্রাঞ্জলির এই নতুন উদ্যোগ।
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই প্রাঞ্জলি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, বড় স্বপ্ন দেখার বা তা সত্যি করার কোনো নির্দিষ্ট বয়স হয় না। দরকার শুধু সঠিক জেদ আর সমস্যার সমাধান খোঁজার মানসিকতা। আমেরিকার সিলিকন ভ্যালিতে বসে আজ টেক দুনিয়া কাঁপাচ্ছেন ভারতের এই মেয়ে। প্রযুক্তির জগতে লিঙ্গ বা বয়সের যে দেওয়াল এতদিন ছিল, তা এক ঝটকায় ভেঙে চুরমার করে দিয়ে প্রাঞ্জলি অবস্থি আজ দুনিয়ার লাখো তরুণ-তরুণীর কাছে এক নতুন অনুপ্রেরণার নাম।






