দুই কাঁধে বিশাল ব্যাগ নিয়ে লোকাল ট্রেনে প্রতিদিন চৈতালিদির লড়াই

International Women’s Day story: ব্যবসার খাতিরে অনেক সময় তাঁকে কড়া কথা বা বিরক্তিও সহ্য করতে হয়। কেউ হয়তো দাম বেশি হওয়ার অনুযোগ করেন, কেউ বা অপছন্দ করেন। কিন্তু চৈইতালদি সবকিছুই সামলে নেন অসীম ধৈর্যের সঙ্গে।

Soumita Mallick
৫ মিনিট
দুই কাঁধে বিশাল ব্যাগ নিয়ে লোকাল ট্রেনে প্রতিদিন চৈতালিদির লড়াই

৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯৭৭ সাল থেকে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ এই দিনটিকে বিশ্বব্যাপী নারী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই উদযাপনের শিকড় আরও গভীরে; ১৯১৭ সালের ৮ মার্চ রাশিয়ার একদল নারী সুরক্ষা ও ভোটাধিকারের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছিলেন। ফলে দিনটি ঐতিহাসিকভাবেই নারী মুক্তি ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে এই দিনে স্কুল, কলেজ ও অফিস-আদালতে সেমিনার বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নারীর কৃতিত্বকে সম্মান জানানো হয়।

তবে উৎসবের এই চেনা ছবির বাইরেও কিছু নারী আছেন, যাদের জন্য বছরের প্রতিটি দিনই লড়াইয়ের, প্রতিটি দিনই ৮ মার্চ। নিজের কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের সুবাদে লোকাল ট্রেনে প্রতিদিন এমনই কিছু হার না মানা মানুষের মুখোমুখি হই আমি। আজ শিয়ালদহ-হাসনাবাদ লোকালের চেনা মুখ চন্দনা মণ্ডলের কথা বলব, যাঁকে নিত্যযাত্রীরা ভালবেসে 'চৈতালিদি' বলে ডাকেন। মধ্যমগ্রামের এই মানুষটির দিনের অধিকাংশ সময় কাটে ট্রেনের কামরাতেই।

অফিস টাইমের ভিড় ঠেলে লোকাল ট্রেনে একচিলতে জায়গা পাওয়াই যেখানে দুঃসাধ্য, সেখানে চৈতালিদি-র বিরামহীন যাতায়াত ট্রেনের বারোটি কামরা জুড়ে। স্টেশনে ট্রেন থামলেই দ্রুত কামরা বদলে নেন তিনি। ছোটখাটো গড়ন আর মিষ্টি হাসির এই মানুষটির দুই কাঁধে ঝোলে বিশাল দুটি ব্যাগ। সেই ব্যাগভর্তি কুর্তি আর চুড়িদার নিয়ে তিনি হাজির হন স্কুল-কলেজের দিদিমণিদের ভিড়ে।

ট্রেনের কামরায় তাঁর প্রবেশ মানেই এক চেনা হাঁকডাক—

চৈতালিদি, এটা দেখিয়ে যাও!

বা

এটার দাম কত?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জিজীবিষা: এক অসামান্যা মায়ের অদম্য লড়াই

International Women's Day: এক চৈত্র মাসের শেষ দিনে সব প্রত্যাশা ছাপিয়ে ঘর আলো করে জন্ম নিল এক কন্যাসন্তান। পরিবারের অন্য সদস্যরা তখন কিছুটা হতাশ।

ক্রেতাদের আবদার মেটানো আর হাসিমুখে দরদাম করার মাঝেই চলে তাঁর জীবনযুদ্ধ। ভিড়ের চাপে পিষ্ট হয়েও তাঁর মুখের হাসি ম্লান হয় না। চৈতালিদি-র দুই কাঁধে বিশালাকার ব্যাগের বোঝা। ট্রেনের কামরায় তিনি ঢোকামাত্রই দিদিমণিদের ভিড় জমে যায়। তাঁর ঝোলা থেকে বেরিয়ে আসে নিত্যনতুন কুর্তি আর চুড়িদার। শুধু কাপড় বিক্রি নয়, ক্রেতার পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে তিনি রীতিমতো পড়াশোনা করে আসেন। কেউ কোনো প্রশ্ন করলেই শুরু হয়ে যায় তাঁর নিখুঁত বর্ণনা। ৩৮ থেকে ৪৪—প্রতিটি সাইজ তাঁর নখদর্পণে। ক্রেতার প্রয়োজন বুঝে নিমেষেই বের করে দেন সঠিক পোশাকটি।

রং পছন্দ না হলে তিনি ক্লান্ত হন না, বরং অবিরাম দেখিয়ে যান। পরম মমতায় বলেন,

এটা নিন দিদিভাই, এই রঙটা আপনাকে চমৎকার মানাবে। কী লাগবে বলুন? আমি কালই এনে দেব।

ব্যবসার খাতিরে অনেক সময় তাঁকে কড়া কথা বা বিরক্তিও সহ্য করতে হয়। কেউ হয়তো দাম বেশি হওয়ার অনুযোগ করেন, কেউ বা অপছন্দ করেন। কিন্তু চৈতালিদি সবকিছুই সামলে নেন অসীম ধৈর্যের সঙ্গে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তাঁর সেই 'লাল খাতা'টি। সেখানে যত্ন করে লেখা থাকে দিদিমণিদের নাম আর তাঁদের বকেয়া টাকার হিসেব। লোকাল ট্রেনের এই ব্যস্ততার মাঝেও সম্পর্কের এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে আছে তাঁর ব্যবসা। খুব মিষ্টি করে যখন তিনি জিজ্ঞেস করেন,

দিদি, আজ কি কিছু দেবেন?

—তখন সেই প্রশ্নের মধ্যে কোনো তাগাদা থাকে না, বরং থাকে এক পরম ভরসা। এই ভরসা আর শ্রমের উপর ভর করেই প্রতিদিন ৮ মার্চের লড়াই লড়ে যাচ্ছেন চৈতালিদি-র মতো অসংখ্য নারী।

চৈতালিদি করে চলেন তাঁর কাজ হাসি মুখে, তার আছে একটি লাল খাতা, যেখানে লেখা থাকে, দিদিমণিদের নাম, ও বকেয়া টাকার অংশ। খুব মিষ্টি করে বলেন, দিদি আজ কিছু দেবেন?

অগোছালো কুর্তিগুলো ব্যাগে গুছিয়ে নিতে নিতেই ট্রেন টাকি স্টেশনে এসে থামে। চৈতালিদি নেমে যান ভিড় ঠেলে। এই হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কঠিন জীবনসংগ্রাম। ২০০৫ সালে পথ দুর্ঘটনায় স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। একমাত্র ছেলে ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত, ভারী কাজ তিনি করতে পারেন না। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, তৈরি করেছেন নিজের একটি ছোট্ট আস্তানা।

দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে চলতে থাকা এই লড়াইকে কোনো নির্দিষ্ট একটি দিনের গণ্ডিতে বাঁধা যায় না। শিয়ালদহ-হাসনাবাদ লোকাল এমন বহু লড়াকু মানুষের নীরব সাক্ষী। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে চৈতালিদির কথা মনে পড়ে, যাঁর ফোনের কলার টিউন বাজে—

আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, সুরের বাঁধনে।

সামান্য রোজগারেও যে প্রাণভরে বাঁচা যায়, তিনি তার অন্যতম এক নিদর্শন।

নারী দিবসের ইতিহাসের সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের এক নিবিড় যোগ রয়েছে। সমকাজে সমবেতনের দাবি ছিল সেই আন্দোলনের মূল ভিত্তি। ক্ষুদ্র নারী ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার আকাশটা হয়তো একটু বড়, কিন্তু তাঁদের লড়াইটাও অনেক বেশি অনিশ্চিত; কারণ এখানে লাভ-লোকসানের সমস্ত দায়ভার তাঁদের একার কাঁধেই থাকে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে লোকাল ট্রেনের এই অকুতোভয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জানাই বিশেষ সম্মান।

লিখেছেন
Soumita Mallick
Soumita Mallick
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।