দুই কাঁধে বিশাল ব্যাগ নিয়ে লোকাল ট্রেনে প্রতিদিন চৈতালিদির লড়াই
International Women’s Day story: ব্যবসার খাতিরে অনেক সময় তাঁকে কড়া কথা বা বিরক্তিও সহ্য করতে হয়। কেউ হয়তো দাম বেশি হওয়ার অনুযোগ করেন, কেউ বা অপছন্দ করেন। কিন্তু চৈইতালদি সবকিছুই সামলে নেন অসীম ধৈর্যের সঙ্গে।
৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯৭৭ সাল থেকে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ এই দিনটিকে বিশ্বব্যাপী নারী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই উদযাপনের শিকড় আরও গভীরে; ১৯১৭ সালের ৮ মার্চ রাশিয়ার একদল নারী সুরক্ষা ও ভোটাধিকারের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছিলেন। ফলে দিনটি ঐতিহাসিকভাবেই নারী মুক্তি ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে এই দিনে স্কুল, কলেজ ও অফিস-আদালতে সেমিনার বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নারীর কৃতিত্বকে সম্মান জানানো হয়।
তবে উৎসবের এই চেনা ছবির বাইরেও কিছু নারী আছেন, যাদের জন্য বছরের প্রতিটি দিনই লড়াইয়ের, প্রতিটি দিনই ৮ মার্চ। নিজের কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের সুবাদে লোকাল ট্রেনে প্রতিদিন এমনই কিছু হার না মানা মানুষের মুখোমুখি হই আমি। আজ শিয়ালদহ-হাসনাবাদ লোকালের চেনা মুখ চন্দনা মণ্ডলের কথা বলব, যাঁকে নিত্যযাত্রীরা ভালবেসে 'চৈতালিদি' বলে ডাকেন। মধ্যমগ্রামের এই মানুষটির দিনের অধিকাংশ সময় কাটে ট্রেনের কামরাতেই।
অফিস টাইমের ভিড় ঠেলে লোকাল ট্রেনে একচিলতে জায়গা পাওয়াই যেখানে দুঃসাধ্য, সেখানে চৈতালিদি-র বিরামহীন যাতায়াত ট্রেনের বারোটি কামরা জুড়ে। স্টেশনে ট্রেন থামলেই দ্রুত কামরা বদলে নেন তিনি। ছোটখাটো গড়ন আর মিষ্টি হাসির এই মানুষটির দুই কাঁধে ঝোলে বিশাল দুটি ব্যাগ। সেই ব্যাগভর্তি কুর্তি আর চুড়িদার নিয়ে তিনি হাজির হন স্কুল-কলেজের দিদিমণিদের ভিড়ে।
ট্রেনের কামরায় তাঁর প্রবেশ মানেই এক চেনা হাঁকডাক—
চৈতালিদি, এটা দেখিয়ে যাও!
বা
এটার দাম কত?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
International Women's Day: এক চৈত্র মাসের শেষ দিনে সব প্রত্যাশা ছাপিয়ে ঘর আলো করে জন্ম নিল এক কন্যাসন্তান। পরিবারের অন্য সদস্যরা তখন কিছুটা হতাশ।
ক্রেতাদের আবদার মেটানো আর হাসিমুখে দরদাম করার মাঝেই চলে তাঁর জীবনযুদ্ধ। ভিড়ের চাপে পিষ্ট হয়েও তাঁর মুখের হাসি ম্লান হয় না। চৈতালিদি-র দুই কাঁধে বিশালাকার ব্যাগের বোঝা। ট্রেনের কামরায় তিনি ঢোকামাত্রই দিদিমণিদের ভিড় জমে যায়। তাঁর ঝোলা থেকে বেরিয়ে আসে নিত্যনতুন কুর্তি আর চুড়িদার। শুধু কাপড় বিক্রি নয়, ক্রেতার পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে তিনি রীতিমতো পড়াশোনা করে আসেন। কেউ কোনো প্রশ্ন করলেই শুরু হয়ে যায় তাঁর নিখুঁত বর্ণনা। ৩৮ থেকে ৪৪—প্রতিটি সাইজ তাঁর নখদর্পণে। ক্রেতার প্রয়োজন বুঝে নিমেষেই বের করে দেন সঠিক পোশাকটি।
রং পছন্দ না হলে তিনি ক্লান্ত হন না, বরং অবিরাম দেখিয়ে যান। পরম মমতায় বলেন,
এটা নিন দিদিভাই, এই রঙটা আপনাকে চমৎকার মানাবে। কী লাগবে বলুন? আমি কালই এনে দেব।
ব্যবসার খাতিরে অনেক সময় তাঁকে কড়া কথা বা বিরক্তিও সহ্য করতে হয়। কেউ হয়তো দাম বেশি হওয়ার অনুযোগ করেন, কেউ বা অপছন্দ করেন। কিন্তু চৈতালিদি সবকিছুই সামলে নেন অসীম ধৈর্যের সঙ্গে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তাঁর সেই 'লাল খাতা'টি। সেখানে যত্ন করে লেখা থাকে দিদিমণিদের নাম আর তাঁদের বকেয়া টাকার হিসেব। লোকাল ট্রেনের এই ব্যস্ততার মাঝেও সম্পর্কের এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে আছে তাঁর ব্যবসা। খুব মিষ্টি করে যখন তিনি জিজ্ঞেস করেন,
দিদি, আজ কি কিছু দেবেন?
—তখন সেই প্রশ্নের মধ্যে কোনো তাগাদা থাকে না, বরং থাকে এক পরম ভরসা। এই ভরসা আর শ্রমের উপর ভর করেই প্রতিদিন ৮ মার্চের লড়াই লড়ে যাচ্ছেন চৈতালিদি-র মতো অসংখ্য নারী।
চৈতালিদি করে চলেন তাঁর কাজ হাসি মুখে, তার আছে একটি লাল খাতা, যেখানে লেখা থাকে, দিদিমণিদের নাম, ও বকেয়া টাকার অংশ। খুব মিষ্টি করে বলেন, দিদি আজ কিছু দেবেন?
অগোছালো কুর্তিগুলো ব্যাগে গুছিয়ে নিতে নিতেই ট্রেন টাকি স্টেশনে এসে থামে। চৈতালিদি নেমে যান ভিড় ঠেলে। এই হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কঠিন জীবনসংগ্রাম। ২০০৫ সালে পথ দুর্ঘটনায় স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। একমাত্র ছেলে ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত, ভারী কাজ তিনি করতে পারেন না। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, তৈরি করেছেন নিজের একটি ছোট্ট আস্তানা।
দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে চলতে থাকা এই লড়াইকে কোনো নির্দিষ্ট একটি দিনের গণ্ডিতে বাঁধা যায় না। শিয়ালদহ-হাসনাবাদ লোকাল এমন বহু লড়াকু মানুষের নীরব সাক্ষী। আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে চৈতালিদির কথা মনে পড়ে, যাঁর ফোনের কলার টিউন বাজে—
আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ, সুরের বাঁধনে।
সামান্য রোজগারেও যে প্রাণভরে বাঁচা যায়, তিনি তার অন্যতম এক নিদর্শন।
নারী দিবসের ইতিহাসের সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের এক নিবিড় যোগ রয়েছে। সমকাজে সমবেতনের দাবি ছিল সেই আন্দোলনের মূল ভিত্তি। ক্ষুদ্র নারী ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার আকাশটা হয়তো একটু বড়, কিন্তু তাঁদের লড়াইটাও অনেক বেশি অনিশ্চিত; কারণ এখানে লাভ-লোকসানের সমস্ত দায়ভার তাঁদের একার কাঁধেই থাকে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে লোকাল ট্রেনের এই অকুতোভয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জানাই বিশেষ সম্মান।







