ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট হয়ে পস্তাচ্ছেন? জেলেনস্কির নয়া সাক্ষাৎকার কোন ইঙ্গিত দিচ্ছে?

ইউক্রেনে হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একেবারে রাজধানী কিয়েভের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল রাশিয়ার বাহিনী। হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল তাঁর স্ত্রী এবং সন্তানদের। এমনকী, আটক অথবা হত্যা করার চেষ্টা হয়েছিল তাঁকেও। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাঁকে দেশ ছাড়ার প্রস্তাব দিলেও প্রত্যাখ্যান করলেন তিনি। বরং পাল্টা জবাব দিলেন, "এখন লড়াই শুরু হয়ে গেছে। আমি পালাতে চাই না। আমি দেশের মানুষের হয়ে লড়াই করতে চাই। আমাকে অস্ত্র দিন।" সেদিন কে জানত, রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আবিশ্ব প্রধান মুখ হয়ে দাঁড়াবেন সেই কৌতুকাভিনেতা!

ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভালদিমির জেলেনস্কি প্রথম থেকেই জানতেন, মানুষের থেকে বড় অস্ত্র আর কিছু হয় না। একদিকে যখন রাশিয়ার মতো একটি সুপার পাওয়ারের সঙ্গে লড়াই করছে তাঁর দেশ, সেই সময় না পালিয়ে গিয়ে সামনের সারিতে দাঁড়িয়েই ইউক্রেনের মনোবল জোরদার করতে নেমেছেন স্বয়ং সেদেশের প্রেসিডেন্ট। বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া কোনও একটি ঘটনাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার দস্তুর দীর্ঘদিনের। কিন্তু এভাবে যে পর্দার প্রত্যেকটি ঘটনা বাস্তবের সঙ্গে একেবারে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাবে, এরকম সচরাচর চোখে পড়ে না। কিন্তু এই ঘটনাটির বিরলতম উদাহরণ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তাই তো আজ বিখ্যাত মার্কিন সংবাদপত্র 'টাইম' ম্যাগাজিনের কভার পেজে স্থান করে নিয়েছেন এই 'সার্ভেন্ট অফ দ্য পিপল'। তাঁর সাইড প্রোফাইলের একটি সাদা-কালো ছবির মোড়কে ছাপানো কথোপকথন জানান দিচ্ছে, এক রাষ্ট্রনায়কের লড়াইয়ের কথা। শিরোনামে- 'কীভাবে নেতৃত্ব দেন জেলেনস্কি?'

একদিকে যখন ইউক্রেনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে গোটা বিশ্ব, সেই সময় রাশিয়ার সঙ্গে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে যাচ্ছেন তিনি। ইউক্রেনের এই কঠিন পরিস্থিতি খানিকটা অস্বাভাবিকভাবেই এক নতুন জন্ম দিয়েছে তাঁকে। মাত্র দুই মাসের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট থেকে রাষ্ট্রনেতা হিসেবে নবজন্ম হয়েছে তাঁর। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাঁড়াশি আক্রমণের সামনে রুখে দাঁড়িয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। প্রাক্তন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির মতো দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া নয়, প্রকৃত রাষ্ট্রনায়কের মতো দাঁড়িয়েছেন বুক চিতিয়ে। পশ্চিমি দুনিয়ার মহারথীরা তাঁর পাশে আছেন কি নেই, তা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে চান না তিনি। জেলেনস্কি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিন দিক থেকে ইউক্রেনকে রুশ সেনা ঘিরে ফেললেও শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য চালাবেন লড়াই। কৌতুক-অভিনয়ের জগৎ থেকে এখন অনেকটাই দূরে থাকলেও সাড়ে চার কোটি দেশবাসীকে এখনও তিনি সাহস যোগাচ্ছেন। রাশিয়াকে হুংকার দিয়েছেন, "আমরা অস্ত্র নামিয়ে রাখব না। আমাদের দেশকে রক্ষা করব। আমাদের দেশ, আমাদের সন্তান- আমরা সব রক্ষা করব।"

আরও পড়ুন: ইউক্রেন কি এবার আত্মসমর্পণ করবে রাশিয়ার কাছে?

'টাইম' ম্যাগাজিনের সাংবাদিক সাইমন শুস্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাশিয়ার হামলার সেই প্রাথমিক দিনগুলোকেই আবারও মনে করলেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। ইউক্রেনের হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাশিয়ার বাহিনী কীভাবে কিয়েভের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, এবং জেলেনস্কিকে হত্যা কিংবা আটক করার চেষ্টা করেছিল- সেই নিয়েই নিজের অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। দিনকয়েক আগে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হামলা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রুশ বাহিনীর অগ্রগতি দেখে কিয়েভের পতনকে অত্যাসন্ন বলে মনে করেছিলেন অনেক যুদ্ধ-বিশেষজ্ঞই। সেই সময় জেলেনস্কিকে দেশ ছাড়ার প্রস্তাব দিয়ে হেলিকপ্টার পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু, সেসব প্রস্তাব নাকচ করে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা করে দিলেন জেলেনস্কি।

তালিবানদের হাতে কাবুলের পতন হতে না হতেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন আফগানিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। সেই সময় গোটা বিশ্বকে তিনি বার্তা দিয়েছিলেন, "জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্ত ছিল দেশ ছেড়ে যাওয়া।" তবে তাঁর মনে হয় তো সম্ভবত কিছুটা ভয় ছিল। তাঁর পূর্বসূরি অর্থাৎ দেশের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ দেশে থেকে যাওয়ার সময় তাঁকে গুলি করে ঝাঁঝরা করে ল্যাম্পপোস্টে ঝুলিয়ে দিয়েছিল তালিবানরা। তাই, দেশ ছাড়তে হয়েছিল গনিকে। আফগানিস্তানের সেই সমস্যার প্রায় ৮ মাসের মাথায় একইরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ইউক্রেনে। সেখানে কিন্তু শত্রুপক্ষের সমরসজ্জা আফগানিস্তানের থেকেও অনেক বেশি তীক্ষ্ণ। কিন্তু গনির মতো দেশ ছেড়ে পালালেন না জেলেনস্কি।

কেমন ছিল ২৪ ফেব্রুয়ারির সেই রাত?

ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ শুরুর ৬৫ দিন অতিবাহিত। যুদ্ধের এতদিন পরেও রাশিয়ার আক্রমণের পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য প্রশংসিত হচ্ছেন জেলেনস্কি। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস, গ্র‍্যামি অ্যাওয়ার্ড এবং বিশ্ব ব্যাংকের উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে সকলের মন জিতে নিয়েছেন জেলেনস্কি। এমনকী, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন-সহ অনেকেই তাঁকে দেখার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। কিন্তু, ২৪ ফেব্রুয়ারির সেই রাত তাঁর কেমন কেটেছিল? যখন চোখের সামনে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে, সেই সময় তাঁর হৃদয়ের গতি ছিল কতটা? কীভাবে সেখান থেকে বেঁচে ফিরলেন জেলেনস্কি? যদিও প্রথম কয়েক ঘণ্টার স্মৃতি অনেকটাই খণ্ডিত, তবুও, ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরের আগের মুহূর্তটা তাঁর এখনও মনে রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার কথাই 'টাইম' ম্যাগাজিনের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভালদিমির জেলেনস্কি।

বোমা বর্ষণ শুরু হওয়ার পর জেলেনস্কি এবং তাঁর স্ত্রী ওলেনা জেলেনস্কি তাদের ১৭ বছর বয়সি মেয়ে ও ৯ বছর বয়সি ছেলেকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। সেই সময়ের কথা মনে করে জেলেনস্কি বললেন, "আমরা তাদের ঘুম থেকে উঠতে বললাম। তখন সেখানে খুবই তীব্র বিস্ফোরণ হয়েছিল। সেখানে খুব তীব্র শব্দ হচ্ছিল।" ইউক্রেনের সেনাবাহিনী তখন জেলেনস্কিকে জানায়, রাশিয়ার স্ট্রাইক টিম তাঁকে হত্যা করার বা আটক করার জন্য বিমান থেকে কিয়েভে নেমেছে। ইউক্রেন সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্টাফ আন্দ্রি ইয়ার্মাক জানান 'টাইম' ম্যাগাজিনকে বলেন, "ওই রাতের আগে এ ধরনের ঘটনা কেবল সিনেমাতেই আমরা দেখেছিলাম।"

এমনকী, আক্রমণের প্রথম রাতে সরকারি কোয়ার্টারের চারপাশে বন্দুকযুদ্ধ পর্যন্ত হয়। 'টাইম' ম্যাগাজিনে সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সাংবাদিক লিখলেন, "ভবনের নিরাপত্তারক্ষীরা ভেতরের সমস্ত আলো বন্ধ করে দেন এবং জেলেনস্কি এবং তাঁর ডজনখানেক সাহায্যকারীর জন্য বুলেটপ্রুফ ভেস্ট এবং অ্যাসল্ট রাইফেল নিয়ে আসেন।" মাত্র যে ক'জন সেনা কর্মকর্তা এই ধরনের অস্ত্র চালাতে পারেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ওলেসকি আস্তেরোভিচ। ওই পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, "ওই সময় বাড়িটি রীতিমতো পাগলাগারদে পরিণত হয়েছিল। সবাই ছিলেন অস্ত্রসজ্জিত।" প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার সেনারা দু'বার প্রেসিডেন্ট ভবনের ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু জেলেনস্কির পরিবার তখনও ভেতরেই ছিল।

এতকিছুর পরেও সুরক্ষিত পরিবেশের প্রস্তাব রাত্রে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন জেলেনস্কি। এই সমস্ত প্রস্তাবের মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় তাঁকে সরিয়ে নিয়ে নির্বাসিত সরকার গঠন করা। তবে এসব কিছুই চাননি তিনি। বরং, সোজা উঠে গিয়ে বাইরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তিনি ফোনের মাধ্যমে রেকর্ড করেন একটি ভিডিও বার্তা। যাতে তিনি বলেন, তিনি যুদ্ধে নিজের ভূমিকা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। "আপনি বুঝতে পারছেন, তাঁরা আপনাকে অনুসরণ করতে চাইছে। আপনি বুঝুন, আপনি অনুকরণযোগ্য, আপনাকে এমন কিছু আচরণ করতে হবে, যা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আপনাকে করতে হয়।" ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝে এই ভিডিও বার্তাটি এখনও পর্যন্ত রয়েছে খ্যাতির শিখরে।

'শুনুন, আমি কিন্তু এখানেই আছি'

তিনি হতে পারতেন একজন দুঁদে উকিল, কিংবা হতে পারতেন একজন বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় কৌতুক-অভিনেতা। কিন্তু কখন কার ভাগ্য কোন পথে তাঁকে নিয়ে যায়, তা তো কেউ জানে না। সেরকমই ঘটেছিল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে। রাজনীতির কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না, কিন্তু শুধুমাত্র অভিনয় করে সকলের মনে হয়ে উঠেছিলেন নায়ক। দেশের প্রেসিডেন্টের সেই মসনদ দখল থেকে শুরু করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই, সবক্ষেত্রেই পয়লা নম্বরে ছিলেন এই 'সার্ভেন্ট অফ দ্য পিপল'।

২০১৯ সালের একটি সাধারণ দিনে উজ্জ্বল আলোর নিচে দাঁড়িয়ে ইউক্রেনীয় জনগণকে একটি বার্তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন জেলেনস্কি। বলেছিলেন, ইউক্রেন আজ ঐক‍্যবদ্ধ, আর এটাই আমাদের বিজয়। বক্তৃতাটি কাল্পনিক হলেও, এই রিয়্যালিটি শো থেকেই জন্ম হয়েছিল এক রাষ্ট্রনায়কের। যার শো-তে দেশের প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন দুর্নীতির কথা ভাইরাল হয়, পরে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন দেশের প্রেসিডেন্ট। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের রুশপন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ গদিচ্যুত হওয়ার পরেই শুরু হয় নতুন শাসক খোঁজার তাগিদ। কিন্তু, জেলেনস্কির শিকে ছেঁড়ে আরও ৫ বছর পর। ভোটে হইহই করে জিতলেও, ওই দিন থেকেই রাশিয়ার রোষানলে চলে আসেন তিনি।

কারণ তিনি ইয়ানুকোভিচের মতো রুশপন্থী প্রেসিডেন্ট নন, তিনি কড়া টক্কর দিতে উদ্যত। প্রায় তিন বছর পরে ইউক্রেন রয়েছে বড়সড় সংকটের মুখে। ধারে-ভারে রাশিয়ার থেকে অনেকটাই ক্ষুদ্র ইউক্রেন। তাই যুদ্ধে ক্ষান্ত দেওয়াটা অনেকেই ভবিতব্য হিসেবে ধরে নিয়েছেন। তবুও খড়কুটো আঁকড়ে শেষ চেষ্টা করে চলেছেন জেলেনস্কি। দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বার্তা দিচ্ছেন, "শুনুন, আমি এখানেই আছি। আমরা আমাদের অস্ত্র ফেলে দেব না। আমরা আমাদের দেশকে রক্ষা করব, কারণ, আমাদের কাছে এখন আমাদের অস্ত্রই সত্য। একই সঙ্গে আমাদের ভূমি, আমাদের দেশ এবং আমাদের সন্তান সত্য এবং আমরা এগুলো সব কিছুকে রক্ষা করব।"

'এই প্রজ্ঞা আমার প্রয়োজন ছিল না'

তিন বছর আগে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি হওয়ার দৌড়ে তিনি ছিলেন একজন সাধারণ অভিনেতা। সেখান থেকেই আজকে তাঁকে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে দেশকে চালাতে হচ্ছে। দুই মাসের মধ্যেই যুদ্ধ তাঁকে করে তুলেছে আরও কঠিন, তিনি আরও ঝুঁকি নিতে চাইছেন। রাশিয়ার মৃত অসামরিক লোকেদের ছবি তাঁকে বারবার তাড়িত করছে। বন্দুকের গুলির শব্দ তাঁর অফিসের দেওয়ালের মধ্যে বারবার শোনা যাচ্ছে। সৈন্যদের কাছে প্রতিদিন আবেদন জানাচ্ছেন, যে-সমস্ত মানুষ আটকে আছেন তাঁদেরকে খাবার, জল এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা যেন দেওয়া হয়। রাত্রে ঘুমোতে যাবার সময়ও তাঁর কানে বাজছে সাইরেনের শব্দ। মুঠোফোনে বারংবার আসছে নোটিফিকেশন, পরিবার-পরিজনের, পরামর্শদাতাদের মেসেজে ভরে যাচ্ছে ফোন। কিন্তু জেলেনস্কি কি এই দিনটা আদৌ দেখতে চেয়েছিলেন?

'টাইম'-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, "এই সমস্ত জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা আমি কখনওই চাইনি। এই ধরনের প্রজ্ঞা, যার সঙ্গে হাজার হাজার লোকের রক্তের ঋণ জড়িয়ে আছে, রাশিয়ার সৈন্যদের অত্যাচার জড়িয়ে আছে, এরকম জ্ঞান অর্জনের আমার কোনও লক্ষ্য ছিল না।" তিনি আরও বলেছেন, "সত্যি বলতে গেলে এরকম জ্ঞান অর্জন করার আমার কোনও ইচ্ছে ছিল না। গত দুই মাস ধরে যুদ্ধ একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে ইউক্রেনকে। ৫৩ মিলিয়ন মানুষকে নিজের ঘরবাড়ি ত্যাগ করে চলে যেতে হয়েছে। ইউক্রেনের সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেক মানুষ মারা গিয়েছেন। এইটা আমি কখনওই কল্পনা করিনি। যদি এভাবেই কাউকে প্রজ্ঞা অর্জন করতে হয়, তাহলে সেই প্রজ্ঞার আমার প্রয়োজন নেই।"

প্রেসিডেন্ট হয়ে কি শেষমেষ আক্ষেপ করছেন জেলেনস্কি?

তাহলে কি ৩ বছর আগে গ্রহণ করা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সেই সিদ্ধান্তকে ভুল সিদ্ধান্ত মনে করছেন তিনি নিজেই? সেই সময় তাঁর কমেডি শো হয়ে উঠেছিল হঠাৎ জনপ্রিয়। নিজের ড্রেসিংরুমে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে তখন দর্শকদের নেতা মনে করছেন। তাঁর বন্ধুরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন পার্টি করার জন্য। ড্রেসিংরুমের বাইরে তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য ভক্তরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। মাত্র ৩ মাস পরেই প্রেসিডেন্ট ইলেকশন। সেই সময়তেও নিজের নাম প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড় থেকে সরিয়ে নিতে পারতেন তিনি। তখনও খুব একটা দেরি হয়নি। কিন্তু তিনি সেরকমটা করলেন না।

এখন কি তাহলে এই সিদ্ধান্তের জন্য আক্ষেপ করছেন তিনি? এই যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছে তাঁর জন্যই, এমনটা মনে করছেন না তো? সাংবাদিকদের প্রশ্নে কিছুটা বিচলিত হলেও, নিজের অবস্থান থেকে টললেন না জেলেনস্কি। বরং, জোর গলাতেই তাঁর জবাব, "এক সেকেন্ডের জন্যও না।" প্রেসিডেন্ট কম্পাউন্ডে দাঁড়িয়ে তাঁর উত্তর, "আমি জানি না, কীভাবে এই যুদ্ধ শেষ হবে, কিংবা ইতিহাস কীভাবে এই জায়গাকে বর্ণনা করবে। কীভাবে আমাকে বর্ণনা করা হবে, আমি সেটাও জানি না। এই মুহূর্তে শুধু আমি একটাই জিনিস জানি, যুদ্ধের সময় ইউক্রেনের সবার আগে প্রয়োজন একজন প্রেসিডেন্টকে। আর আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব নিজের সবটা দেওয়ার। এখান থেকে সরে যাওয়ার মতো আর কোনও রাস্তা নেই।"

More Articles

;