দূরত্ব বাড়াচ্ছে দল, পিছু ছাড়ছে না সিবিআই || কী হতে চলেছে অনুব্রতর ভবিষ্যৎ?

Kanad Dasgupta
৪ মিনিট
দূরত্ব বাড়াচ্ছে দল, পিছু ছাড়ছে না সিবিআই || কী হতে চলেছে অনুব্রতর ভবিষ্যৎ?

এবার অনুব্রত ?

সিবিআইয়ের নিশানায় থাকা বা হেফাজতে যাওয়া- একাধিক নেতার সঙ্গেই অতীতে দূরত্ব বাড়িয়েছিল তৃণমূল৷ এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে একাধিক৷ অনেকের ক্ষেত্রে সেই দূরত্ব এতটাই বেড়েছে যে, তাদের আর দেখাই যায়নি ঘাসফুল শিবিরের কাছাকাছি৷ তাঁদের ক্ষেত্রে, সাময়িকভাবে হলেও, হয়তো দলের মনে হয়েছে অভিযোগের যৌক্তিকতা রয়েছে৷ এঁদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ালেও অন্য কয়েকজনকে নরমে-গরমে রেখেছে তৃণমূল৷ অনেকটা 'ছেড়ে রেখে ধরে রাখা' ফরমুলা৷

দলের নজরে এবার বীরভূম তৃণমূলের সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল৷ গত কয়েক মাস ধরেই সিবিআইয়ের সঙ্গে স্নায়ুর লড়াই চলছে বীরভূমের এই দাপুটে তৃণমূল নেতার। গরু পাচার, কয়লা পাচার, ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাস, বগটুই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য বারবার তাঁকে তলব করেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। কিন্তু অনুব্রত একবারও ওমুখো হননি। অনুব্রত ওরফে কেষ্টর এই আচরণে দল হয়তো যথেষ্টই অস্বস্তিতে৷ কারণ, এর ফলে বিরোধীদের নিশানায় গোটা দল৷ সব মিলিয়ে আপাতত যা দৃশ্যমান, তা হলো, অনুব্রত ওরফে কেষ্টর পাশ থেকে খুবই ধীর পায়ে সরে যাচ্ছেন দলীয় সতীর্থরা৷ অন্তত প্রকাশ্যে তো তেমনই মনে হচ্ছে৷ যেদিন থেকে আস্তিন গুটিয়ে আসরে নেমেছে সিবিআই, সেদিন থেকেই দল আর অনুব্রতর মধ্যে থাকা ফাঁকা জমির আয়তন বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ তবে এখনই পুরোপুরি ব্রাত্য হয়তো করা হয়নি৷ দলের কেউ সম্ভবত দায়িত্ব আছেন ফোনে কেষ্টর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার৷ তবে এটা স্পষ্ট, সর্বশেষ সিবিআই তলব ও এসএসকেএমে ভর্তি হওয়ার আগের অনুব্রত আর এখনকার অনুব্রত দলের নজরে ভিন্ন মানুষ৷ ৬-৭ বার যেভাবে সিবিআইয়ের ডাক এড়িয়েছেন কেষ্ট, তা হয়তো ভালোভাবে নেয়নি তৃণমূল৷

শুধু দলের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই বিচার করলে বলা হতে পারে এটা স্রেফ অনুমান৷ সেক্ষেত্রে সামনে আনতে হয় তৃণমূলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেতার মন্তব্য৷ যেমন, কিছুদিন আগে দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ অনুব্রত-ইস্যুতে বেশ ইঙ্গিতবাহী এবং কৌশলী মন্তব্য করেন৷ সেদিন তিনি বলেছিলেন, "ওঁর (অনুব্রত'র) শরীর অসুস্থ হলে চিকিৎসকরা বুঝবেন৷ তবে আমায় সিবিআই, ইডি ডাকলেই গিয়েছি।" সিবিআইয়ের ডাক এড়ানো প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "অনুব্রতকে ওঁর আইনজীবীরা কী পরামর্শ দিয়েছেন, সেটা তাঁর ব্যাপার। এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারি না।” এছাড়াও এপ্রিলের মাঝামাঝি, এমপি-এমএলএদের বিশেষ আদালতে হাজিরা দিয়ে কুণাল বিচারকের সামনে অনুব্রতের নাম উল্লেখ না করে বলেছিলেন, "আমার দাঁতের চিকিৎসা করা হয়নি, অথচ প্রভাবশালীদের উডবার্নে চিকিৎসা হয়। উডবার্ন কি হাসপাতাল, না কয়েদিদের আশ্রয়খানা?" প্রসঙ্গত, ওই সময়ই এসএসকেএমের উডবার্ন ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন অনুব্রত ৷ দলীয় মুখপাত্রের এই মন্তব্যেই ধরা যায়, অনুব্রত'র এই তলব এড়ানো বিষয়টি পছন্দ করছে না দল৷

বীরভূমের 'বেতাজ-বাদশা' কেষ্ট মণ্ডলকে এড়িয়ে থাকার যে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত এই মুহূর্তে তৃণমূল দিচ্ছে, তা অনুমান করেই এবার আসরে নেমেছেন বিধায়ক মদন মিত্র৷ মদন মিত্রকে এর আগে অর্থলগ্নি সংস্থার মামলায় হেফাজতে নিয়েছিল সিবিআই৷ তার পর থেকে দীর্ঘদিন দলের মূল স্রোতে তাঁকে সামিল হতে দেওয়া হয়নি৷ প্রসঙ্গত,কুণাল ঘোষও একই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন৷ কেষ্টকে খোঁটা দিতে এবার এগিয়ে এসেছেন তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্রও৷ যে দাবি এতদিন বিরোধীরা করছেন, সেটাই যেন কিছুটা শোনা গিয়েছে মদনের গলায়। অনুব্রত এবং সিবিআই প্রসঙ্গে বিতর্ক উসকে মদন মিত্রের ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, "সিবিআই যখন আসে, তখনই অনুব্রত মন্ডল অসুস্থ হয়ে যায়। আবার অনুব্রত মন্ডল অসুস্থ হলেই সিবিআই আসে। কখন অনুব্রত-র পা ফুলছে, সেই খোঁজও রাখে সিবিআই।” মদন মিত্র নিজে সারদা-কাণ্ডে জেলবন্দি থাকাকালীনও যে দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন, সেকথাও উল্লেখ করে বলেন, তাঁর শরীরে '১৩ রকমের রোগ'-এর সন্ধান পেয়েছিলেন চিকিৎসকেরা। এরপর দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে মদন বলেন, "অভিষেকও সিবিআইয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন। অনুব্রতর উচিত সিবিআইকে ফেস করা। অভিষেক যদি মাথা উঁচু করে সিবিআইয়ের মুখোমুখি হতে পারেন, তাহলে অনুব্রত কেন পারবেন না?" পরে অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দিতে ফের তৃণমূলের এই বিধায়ক বলেন, "অনুব্রত আমার ছোট ভাই। সুস্থ হলে ও অবশ্যই সিবিআই দফতরে যাবে।" প্রকাশ্যে মদন মিত্রর এইসব মন্তব্য নিয়ে তৃণমূলের অন্দরে হয়তো অস্বস্তি কিছুটা বেড়েছে।

রাজনৈতিক মহলের অভিমত, এটা স্পষ্ট হয়েছে, দল আজ সেইভাবে অনুব্রতর পাশে নেই৷ এর পর আগামী যে কোনও দিন সিবিআই গোয়েন্দারা যদি অনুব্রতকে জেরার মুখে বসাতে পারেন, তাহলে তো দল আরও পাশে থাকবে না৷ সে কারণে এখন থেকেই দূরত্ব বাড়াচ্ছে তৃণমূল৷

ওদিকে সিবিআই তলব নিয়ে দল যে সেভাবে তাঁর পাশে নেই, তা বেশ টের পাচ্ছেন অনুব্রত মণ্ডল৷ দলীয় সতীর্থদের তির্যক মন্তব্য কানে যাচ্ছে তাঁর৷ কিন্তু চমকপ্রদ কথা বলার 'মাস্টার' কেষ্ট এই স্পর্শকাতর বিষয়ে মুখই খুলছেন না৷

বৃহস্পতিবার তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাংগঠনিক বৈঠকে বসছেন দলের নেতাদের সঙ্গে৷ তিনি যেহেতু বীরভূম জেলা তৃণমূল সভাপতি, তাই অনুব্রতর এই বৈঠকে থাকার কথা৷ দলের অন্দরের জল্পনা, বৈঠকে দলের সর্বভারতীয় কর্মসমিতির সদস্য কেষ্ট মণ্ডলকে অফিসিয়ালি ডাকা হলেও, তিনি আসবেন না৷ অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সিবিআইয়ের কাছ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় নিয়েছেন কেষ্ট৷ কলকাতার চিনার পার্ক এলাকায় নিজের ফ্ল্যাটে এই মুহূর্তে অনুব্রত চিকিৎসকদের নজরবন্দি৷ শরীর ঠিক না থাকায় সিবিআই দফতরে যিনি যেতে পারছেন না, তিনি দলের বৈঠকে হাজির থাকলে এমন বার্তা যাবে, যা কেষ্টর পক্ষে সুখকর নাও হতে পারে৷ অন্দরের জল্পনা, দল সেভাবে চাইছেও না কেষ্ট যোগ দিন এই বৈঠকে৷

ফলে, ধরেই নেওয়া যায় ফের কবে বাংলার মানুষ সেই দাপুটে অনুব্রত মণ্ডলকে ফের দেখতে পাবে, তা সম্পূর্ণভাবেই নির্ভর করছে সিবিআইয়ের ওপর৷ ততদিন পর্যন্ত তাঁকে ঘিরে নানা জল্পনা নিশ্চিতভাবেই পল্লবিত হতেই থাকবে৷

লিখেছেন
Kanad Dasgupta
Kanad Dasgupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নিষিদ্ধ নয়, বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা, কী আছে ফিলিস্তিনপন্থী স্যালি রুনির বইয়ে

Sally Rooney: ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে রয়্যালটি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশের পর ব্রিটেনে স্যালি রুনির বই সরবরাহ বন্ধ করেছে ফ্যাবার।

সিজেপির কর্মসূচির আগে ৬ হাজার পুলিশ, দুর্ভেদ্য দুর্গ কনট প্লেস

Connaught Place protest: সিজেপির কর্মসূচির আগে কনট প্লেস এবং তার আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে দিল্লি পুলিশ। কনট প্লেসের আশপাশে ৬ হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?