নারী দিবস কি সবার? ট্রান্স নারীদের সংগ্রাম তুলে ধরছে অন্য বাস্তবতা
Women's Day 2026: প্রতিটি ধাপেই তাঁদের প্রমাণ করতে হয় নিজের অস্তিত্ব। অনেক সময় মৌলিক নাগরিক অধিকার পেতেও বছরের পর বছর আইনি লড়াই চালাতে হয়।
৮ই মার্চ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। কিন্তু এই উদযাপন কি সত্যিই সমস্ত নারীর জন্য সমানভাবে দরজা খুলে দেয়? ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ‘নারী’ পরিচয়টুকু অর্জন করতেই বহু মানুষকে লড়তে হয়েছে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আইনের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে রূপান্তরকামী নারীদের ক্ষেত্রে এই লড়াই আরও দীর্ঘ, আরও কঠিন।
নাগরিক অধিকার, সামাজিক স্বীকৃতি এবং আইনি মর্যাদার প্রশ্নে তাঁদের সংগ্রাম আধুনিক মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নারী দিবসের আলোচনায় সেই ইতিহাস এবং বর্তমান বাস্তবতাকে তুলে ধরা জরুরি।
রূপান্তরকামী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি বড় মোড় আসে ১৯৬৯ সালে নিউ ইয়র্কের Stonewall riots-এর মাধ্যমে। পুলিশের নিয়মিত হয়রানির বিরুদ্ধে সমকামী, ট্রান্সজেন্ডার ও লিঙ্গ-বৈচিত্র্যের মানুষদের প্রতিবাদ সেই রাতেই বিস্ফোরিত হয়েছিল।
এই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন দুই রূপান্তরকামী কর্মী Marsha P. Johnson এবং Sylvia Rivera। তাঁরা শুধু সমকামী অধিকার নয়, ট্রান্সজেন্ডার মানুষের সামাজিক মর্যাদা এবং নারীত্বের স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন।
স্টনওয়ালের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে লিঙ্গ পরিচয়ের প্রশ্নটি মানবাধিকার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। কিন্তু সেই পথ ছিল দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ। কর্মক্ষেত্র, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষা— সব ক্ষেত্রেই ট্রান্সজেন্ডার নারীরা বৈষম্যের মুখোমুখি হন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও বহু রাজ্যে তথাকথিত ‘বাথরুম বিল’ নিয়ে বিতর্ক দেখিয়েছে যে লিঙ্গ পরিচয় এখনও রাজনৈতিক সংঘাতের বিষয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Migrant Women Workers: অভিবাসী শ্রমিক বলতে চোখের সামনে যে ছবিটা ফুটে ওঠে তা হলো বিহার, উড়িষ্যা, বাংলা, উত্তর প্রদেশ থেকে দূরপাল্লার ট্রেনে গাদাগাদি করে জেনারেল কম্পার্টমেন্টে চেপে খাটতে যাচ্ছে কোনো মরদ। কিংবা অতিমারির সময় ট্রাকের ওপর ধুঁকতে ধুঁকতে বাড়ি ফেরা যুবকের দল, যাদের ওপর রাষ্ট্র অসংবেদনশীলভাবে কীটনাশক স্প্রে করেছিল।
ভারতে রূপান্তরকামী মানুষদের ইতিহাস অবশ্য আরও প্রাচীন। হিজড়া সম্প্রদায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয় সমাজে উপস্থিত। মুঘল আমলে প্রশাসনিক পদেও তাঁদের দেখা যেত। কিন্তু ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশরা ১৮৭১ সালের Criminal Tribes Act-এর মাধ্যমে তাঁদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। সেই কলঙ্ক বহু দশক ধরে থেকে যায়।
আধুনিক আইনি স্বীকৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০১৪ সালে। সেই বছর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক NALSA v. Union of India মামলায় রায় দেয় যে, ট্রান্সজেন্ডার মানুষরা ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাবেন। আদালত জানায়, লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণের অধিকার ব্যক্তির নিজস্ব।
এই রায়ের ফলে সরকারি নথি, শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণ এবং সামাজিক সুরক্ষার পথ খুলে যায়। পরে ২০১৯ সালে পাশ হয় Transgender Persons (Protection of Rights) Act, যার লক্ষ্য ছিল বৈষম্য রোধ এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা।
তবে ট্রান্সজেন্ডার কর্মীদের একাংশ মনে করেন, এই আইন এখনও পর্যাপ্ত নয়। কারণ বাস্তবে পরিচয়পত্র তৈরি, চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া বা কর্মসংস্থানের সুযোগ; সব ক্ষেত্রেই নানা বাধা রয়ে গেছে। রূপান্তরকামী নারী দেবিকা বড়ুয়া ইনস্ক্রিপ্টকে জানান, তাঁদের জনতা হিসেবেই ধরা হয় না। তিনি বলেন, “নিজেকে নারী দিবসের অংশ হিসেবে ফিল করতে পারিনা। কারণ সমাজ, প্রতিবেশী, আত্মীয়রা বারবার বুঝিয়ে দেয়— তুমি নারী নও, তুমি নারী হয়ে উঠতে পারেনি।”
আর বাকি পাঁচজন নাগরিকের মতো রূপান্তরকামীরাও ভোট দেন। কিন্তু সরকার কি তাঁদের জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা দেয় না বলে অভিযোগ তোলেন দেবিকা। সাম্প্রতিক যুবসাথী প্রকল্পে ভাতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের আবেদন করার কোনো অপশনই তো নেই। এই সমাজ ভাবে, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা বাসে-ট্রেনে জোর করে টাকা আদায় করে উপার্জন করে। কিন্তু না, ইটভাটায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে কাজ করতে দেখতে পাবেন। অন্যান্য ছেলে-মেয়েদের মতো অভিব্যক্তি না হওয়ার কারণে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা বেশি পড়াশোনা করতে পারেন না। ফলে তাঁদের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ক্ষেত্রেও সমস্যার মুখে পড়তে হয়।”
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gender and Protest Movements: নারীর পোশাককে ঘিরে যে ‘শালীনতার ধারণা’ তৈরি হয়েছে, সমাজবিজ্ঞানীরা সেটিকে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি পদ্ধতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অনেক সমাজে নারীর শরীরকে নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। যেন সমাজের নৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায় মূলত তাদের উপরেই বর্তায়।
আইনি স্বীকৃতি পেলেও সমাজে গ্রহণযোগ্যতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। বহু রূপান্তরকামী নারী পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হন, শিক্ষা মাঝপথে ছাড়তে বাধ্য হন, কিংবা কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন। পাসপোর্ট অফিসে লিঙ্গ পরিচয় সংশোধন করা থেকে শুরু করে অফিসে নিয়োগ পাওয়া, প্রতিটি ধাপেই তাঁদের প্রমাণ করতে হয় নিজের অস্তিত্ব। অনেক সময় মৌলিক নাগরিক অধিকার পেতেও বছরের পর বছর আইনি লড়াই চালাতে হয়।
কিন্তু তাঁরা কি নিজেদের নারী দিবসের উদযাপনের অংশ মনে করেন? এ’প্রসঙ্গে নারী-ট্রান্স-কুয়্যার ঐক্যমঞ্চের শতাব্দী দাস বলেন, রূপান্তরকামীদের একাংশ নারী পরিচয়টাই চান। কিন্তু তাদের মধ্যে আবার একদল মনে করেন যে না, আমি তো জন্মগত নারী নই। ট্রান্স-নারী পরিচয়টা একটা বিশেষ পরিচয়। এই পরিচয়ের সঙ্গে যে লড়াইটা, যে সংগ্রামটা জড়িত আছে, যদি আমি নিজেকে শুধুমাত্র নারী বলি এভাবে, তাহলে সেই লড়াইটাকে অস্বীকার করা হয়।”
তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক নারীর মধ্যে কিছু পুরুষালি ভাব থাকতে পারে, প্রত্যেক পুরুষের মধ্যেও কিছু নারীত্ব থাকতে পারে। এই স্বাভাবিকতা যেটা আমার মধ্যে সহজাতভাবেই ছিল, সেটাকেও অস্বীকার করা হয়— এটা আবার আরেক দল মনে করেন। তো স্বাভাবিকভাবে নারী দিবসের ক্ষেত্রেও প্রথম দল নারী দিবসেই অংশ নিতে চান। আর দ্বিতীয় দল, তারা এই মাসটাকে ঠিক তাঁদের দিন বলে মনে করেন না, তাঁরা সেই দিনের স্বীকৃতিটা নিজেরাই চান না। তাঁরা বরং অনেক বেশি ট্রান্সদের জন্য আলাদা যে দিন আছে— ট্রান্স ভিজিবিলিটি ডে-র দিনটাকে ওঁরা পালন করেন। তো এই দুটো মত ওদের মধ্যে খুব স্পষ্টভাবে আছে, এটা আমি দেখেছি।”
আরও এক রূপান্তরকামী নারী দীপান্বিতার কথায়, যাঁরা দৃশ্যত রূপান্তরকামী হন, কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অনেক অবহেলার শিকার হতে হয়। অসম্মানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকার আদায়ে, তাঁদের দাবিগুলো তুলে ধরার জন্য রাজনীতিতে এবং সংসদে বা বিধানসভাতেও তাঁদের প্রতিনিধি থাকা জরুরি বলে মনে করেন দীপান্বিতা।
প্রসঙ্গত, মেনকা গুরুস্বামী সম্প্রতি চর্চায় তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার প্রার্থী হয়ে। তিনি একজন ঘোষিত সমকামী এবং পেশায় আইনজীবী। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, মেনকা কি দেবিকা বা দীপান্বিতাদের কণ্ঠস্বর হতে পারবেন? দীপান্বিতার কথায়, মেনকা তাঁদের কন্ঠস্বর হতেও পারেন। আবার দেবিকার মনে হয় না, তা সম্ভব।
ভারতে LGBTQIA+ অধিকারের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী। তিনি ঐতিহাসিক Navtej Singh Johar v. Union of India মামলায় অন্যতম প্রধান আইনজীবী ছিলেন, যার ফলে সমকামিতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা ধারা ৩৭৭ বাতিল হয়।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই ধরনের প্রতীকী সাফল্য কি সমাজের প্রতিটি রূপান্তরকামী নারীর জীবন বদলে দিতে পারে? শহরের কিছু অংশে শিক্ষিত ও দৃশ্যমান প্রতিনিধিত্ব তৈরি হলেও দেশের বহু প্রান্তে ট্রান্সজেন্ডার নারীরা এখনও দারিদ্র্য, সহিংসতা এবং সামাজিক বর্জনের মধ্যে জীবন কাটান।
নারী দিবস মূলত বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সমতার দাবির দিন। সেই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, রূপান্তরকামী নারীরা কি এই সংগ্রামের বাইরে থাকবেন? দেবিকার মতো অনেকেই মনে করেন, ‘নারী’ পরিচয়কে যদি কেবল জন্মগত জৈবিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে নারী আন্দোলনের মূল চেতনাই সংকুচিত হয়ে পড়ে। কারণ লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই আসলে ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াই; যেখানে রূপান্তরকামী নারীরা প্রায়শই দ্বিগুণ নিপীড়নের মুখোমুখি হন।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে নারী দিবস উদযাপিত হচ্ছে, তখন রূপান্তরকামী নারীদের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে— সমতা কি সত্যিই সবার জন্য? যদি নারী দিবস কেবল উদযাপন না হয়ে প্রতিবাদের দিন হয়, তবে সেই প্রতিবাদে রূপান্তরকামী নারীদের কণ্ঠস্বরও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাঁদের সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ‘নারী’ হওয়া শুধু শরীরের বিষয় নয়, এটি পরিচয়, অধিকার এবং মর্যাদার প্রশ্ন।







