সংখ্যাগরিষ্ঠতার গরিমা অধরা, নেতানিয়াহুর দল কী কী অভিযোগ করছে?

Israel election: ইজরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে আরব দলগুলির বিরুদ্ধে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনেছে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ।

inscript
৩ মিনিট
সংখ্যাগরিষ্ঠতার গরিমা অধরা, নেতানিয়াহুর দল কী কী অভিযোগ করছে?

ইজরায়েলের রাজনীতিতে ফের অনিশ্চয়তা। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথ কঠিন হয়ে পড়ায় প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর দল লিকুদকে নতুন করে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। একদিকে বিরোধী শিবিরের শক্তি বৃদ্ধি, অন্যদিকে আরব রাজনৈতিক দলগুলির ভোট এবং তাদের সম্ভাব্য ভূমিকা—সব মিলিয়ে সরকার গঠনের অঙ্ক জটিল হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে নেতানিয়াহুর শিবির। বিশেষ করে আরব দলগুলির ভূমিকা এবং ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নির্বাচনের ফলাফলকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

তবে ভোটে জালিয়াতির অভিযোগ তোলা আর সেই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। নেতানিয়াহুর দল যে অভিযোগ করছে, তার পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ কী বলছে এবং এই বিতর্ক সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে, তা বুঝতে হলে ইজরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণটি দেখা জরুরি।

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর লিকুদ দাবি করেছে, আরব রাজনৈতিক দলগুলি ভোটে ব্যাপক কারচুপি করেছে। তাদের অভিযোগ, ঘুষ দেওয়া, ভোটারদের ভয় দেখানো, হিংসা, জালিয়াতি এবং বেআইনি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভোটের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে। নেতানিয়াহুর দল এই ঘটনাকে শুধু নির্বাচনী অনিয়ম হিসেবে দেখাতে চাইছে না, বরং তাদের বক্তব্য, আরব দলগুলির এই কাজের ফলে ইজরায়েলের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নষ্ট হয়েছে।

লিকুদের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ভোটকেন্দ্রে নগদ টাকা এবং রা'আম দলের নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে যুক্ত কাগজপত্র পাওয়ার দাবি। পাশাপাশি ভোটকেন্দ্রের কর্মীদের হুমকি দেওয়া, তাঁদের উপরে হামলা, ভোট দেওয়ার গোপন কক্ষে একাধিকবার ভোট দেওয়া, ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে ভোট দেওয়া এবং ভোটারসংখ্যার সঙ্গে জমা পড়া ব্যালটের সংখ্যায় অসংগতি থাকার অভিযোগও তুলেছে দলটি।

এ ছাড়া ভোটারদের একত্রিত করে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার কাজে নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে লিকুদ। দলটির দাবি, এই সব অভিযোগের পক্ষে কয়েকশো সাক্ষ্য এবং নথি তারা ইজরায়েলি পুলিশ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির কাছে জমা দিয়েছে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তও দাবি করেছে তারা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইজরায়েল নির্বাচন: আরব ইজরায়েলি কারা? কেন এত ভোট পেল আরব দলগুলি?

Israel elections: আরব ইজরায়েলি কারা? বৈষম্য ও অপরাধের প্রতিবাদে তাঁদের রেকর্ড ভোট আরব দলগুলোকে ইজরায়েলের নেসেটে সরকার গঠনের মূল চাবিকাঠি বানিয়ে দিল?

তবে এই অভিযোগগুলিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইজরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির এক আধিকারিক ভোটে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ খারিজ করেছেন। পুলিশের বক্তব্যও লিকুদের দাবির সঙ্গে মেলেনি। ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইজরায়েলি পুলিশের সূত্র জানিয়েছে, বিগত নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের ঘটনা ছিল অত্যন্ত কম এবং লিকুদের তোলা দাবির সপক্ষে কোনো গোয়েন্দা বা তদন্তভিত্তিক তথ্যপ্রমাণ মেলেনি।

ইজরায়েলের সংসদ নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন দক্ষিণপন্থী, অতি-দক্ষিণপন্থী এবং অতি-ধর্মীয় দলগুলির জোট প্রায় ৫৩টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে, গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের আসনসংখ্যা ৪৮। আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলি সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে।

ইজরায়েলের আরব রাজনৈতিক দল বালাদ-এর নেতা সামি আবু শেহাদেহ আল জাজিরাকে বলেন,

নির্বাচনে ইজরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা এত বিপুল সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন কারণ তাঁরা 'একটি ভিন্ন রাজনৈতিক বিকল্প' তুলে ধরতে চান, যা নদী থেকে সমুদ্র পর্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী ইজরায়েলি ও ফিলিস্তিনি উভয় জনগোষ্ঠীর জন্যই স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও সমতা নিশ্চিত করবে।

নির্বাচনের আগে থেকেই নেতানিয়াহু আরব দলগুলির সমর্থনের উপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইজরায়েলের নিরাপত্তা এবং ইহুদি রাষ্ট্রের চরিত্রের জন্য আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলির উপর নির্ভরশীল সরকার বিপজ্জনক। নির্বাচনের পরে এই অবস্থান আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। যে দলগুলির সমর্থন সরকার গঠনের অঙ্কে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধেই এখন ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলছে লিকুদ।

এই তথ্য থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে লিকুদের প্রতিটি অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নির্বাচনে অনিয়মের নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হওয়া জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, ভোটে কারচুপির অভিযোগ তোলার দায় এবং সেই অভিযোগ প্রমাণ করার দায় আলাদা। শুধু রাজনৈতিক দলের বক্তব্যের ভিত্তিতে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।

বিশেষ করে যখন পুলিশের বক্তব্য এবং নির্বাচন কমিটির প্রাথমিক অবস্থান লিকুদের দাবিকে সমর্থন করছে না, তখন অভিযোগগুলির স্বাধীন তদন্ত এবং প্রকাশ্য প্রমাণের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ভোটারদের পরিচয়, ব্যালটের সংখ্যা কিংবা ভোটকেন্দ্রে হিংসার মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা, নথি এবং তদন্তের ফল সামনে আসা দরকার।

সংখ্যাগরিষ্ঠতার অঙ্কে পিছিয়ে থাকা লিকুদ এখন ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। কিন্তু সেই অভিযোগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, তদন্তে উঠে আসা প্রমাণ। আর সরকার গঠনের প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে সেই আরব দলগুলিই, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নেতানিয়াহুর শিবির এখন নির্বাচনের ফলকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে চাইছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
17 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ইজরায়েল নির্বাচন: আরব ইজরায়েলি কারা? কেন এত ভোট পেল আরব দলগুলি?

Israel elections: আরব ইজরায়েলি কারা? বৈষম্য ও অপরাধের প্রতিবাদে তাঁদের রেকর্ড ভোট আরব দলগুলোকে ইজরায়েলের নেসেটে সরকার গঠনের মূল চাবিকাঠি বানিয়ে দিল?

কেমন হলো বাংলাদেশের দুর্গাপুজো?

Durga Puja Bangladesh: পুজোর আগে ভাঙচুর ও নিরাপত্তা উদ্বেগের অভিযোগ সত্ত্বেও, ব্যাপক নজরদারি এবং সর্বধর্মের সহযোগিতায় বাংলাদেশে দুর্গাপুজো কতটা শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিময় পরিবেশে সম্পন্ন হতে পেরেছে?

ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে ২১ সংবাদমাধ্যম, কেন আপত্তি প্রকাশকদের?

Silencing the Newsroom: ভারত সরকারের তথ্য সুরক্ষা আইনের বিরুদ্ধে ২১টি সংবাদমাধ্যমের প্রাইভেসি বনাম সাংবাদিকতার লড়াই পৌঁছল সুপ্রিম কোর্টে। মামলাকারীদের মধ্যে রয়েছে আম্বানির নেটওয়ার্ক১৮, আদানির এনডিটিভি।

হামলার অভিযোগের এক মাস পরেও বিচার অধরা? যে যে প্রশ্ন তুলছেন SRFTI-র পড়ুয়ারা

SRFTI Student Protest: আন্দোলনের এক মাসে ছাত্রদের অভিযোগ, তাঁদের দাবি পূরণের পরিবর্তে প্রশাসনিক পদক্ষেপের মুখে পড়তে হচ্ছে। শোকজ নোটিশ, বহিষ্কার এবং এফআইআরের মাধ্যমে আন্দোলন দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।

পুলিশি এনকাউন্টার কি ন্যায়বিচার? যা বলছে সুপ্রিম কোর্ট

Justice or Execution: সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান স্পষ্ট, এনকাউন্টার কোনো ‘বিচার’ নয়। আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কাউকে হত্যা করা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ (এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কিলিং), যা সরাসরি সংবিধানের ২১ নং ধারার লঙ্ঘন।

বিজেপির মডেলেই কংগ্রেসের মুখে 'রেজিম চেঞ্জ'? কী বলে ইতিহাস?

SIR voter list protest: একদিন ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে পথে নেমেছিল জনসংঘ ও আরএসএস। আজ বিজেপি ক্ষমতায় থেকে বিরোধীদের আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র বলছে কেন?

‘হাত বাঁধা অবস্থায় কীভাবে বন্দুক ছিনিয়ে নিল?’ গাইঘাটায় ছেলের এনকাউন্টার নিয়ে প্রশ্ন মায়ের

Gaighata case: গাইঘাটায় কিশোরী ধর্ষণ ও খুনে ধৃত প্রহ্লাদ দাসের পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যু ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পুলিশের দাবি আত্মরক্ষার্থে গুলি, তবে হাত বাঁধা অবস্থায় পালানোর তত্ত্ব উড়িয়ে ‘খুন’-এর অভিযোগ তুলেছে পরিবার।