ইরান সংকটে কেন গুরুত্বপূর্ণ গালিবাফ ও আরাঘচি?
Iran Israel conflict: ইরান সংকটে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ গালিবাফ ও আরাঘচি? এই দুই ব্যাক্তিই কি ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছেন?
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরানকে ঘিরে যে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা ক্ষমতার কাঠামো, কূটনীতি এবং নেতৃত্বের মধ্যে এক জটিল লড়াইকে তুলে ধরে। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে উঠে এসেছে দু'টি নাম—মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং আব্বাস আরাঘচি। কেন এই দুই ব্যক্তি এত গুরুত্বপূর্ণ, এবং কেন তাঁদের ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতির এত আগ্রহ?
প্রথমেই বোঝা দরকার, বর্তমান ইরান যুদ্ধের পরিস্থিতি আগের যে কোনো সংঘর্ষের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের আক্রমণে ইরানের বহু শীর্ষ নেতা নিহত এবং আহত হয়েছেন। ফলে দেশের ক্ষমতার কাঠামোয় তৈরি হয়েছে এক ধরনের শূন্যতা। কিন্তু এই শূন্যতা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা তৈরি করেনি। বরং ইরান এমনভাবে তার প্রশাসনিক ও সামরিক কাঠামো তৈরি করেছে, যাতে নেতৃত্ব হারালেও রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Iran Conflict: ইরান-আমেরিকা সংঘাতে আদৌ কি কোনো পক্ষ জিততে পারবে?শেষ পর্যন্ত কে এগিয়ে থাকবে? এই যুদ্ধের শেষ কোথায়?
এই পরিস্থিতিতে গালিবাফ এবং আরাঘচি, এই দুই ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ। কারণ তাঁরা শুধু রাজনৈতিক নেতা নন, বরং ক্ষমতার দুই ভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিত্ব করেন। গালিবাফ মূলত শক্তিনির্ভর রাজনীতি ও সামরিক প্রভাবের প্রতিনিধিত্ব করেন, আর আরাঘচি কূটনীতি ও আলোচনার মুখ।
মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বর্তমানে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার হলেও, তাঁর পেশাগত অতীত মূলত সামরিক ক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত। তিনি ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরে তেহরানের মেয়র হিসেবেও কাজ করেছেন। ফলে তাঁর মধ্যে সামরিক ও প্রশাসনিক দু'ধরনের অভিজ্ঞতাই রয়েছে। বর্তমান যুদ্ধপরিস্থিতিতে এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ইরানের ভিতরে এখন কার্যত তিনিই সবচেয়ে শক্তিশালী সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের একজন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Middle East oil conflict: কেন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক-এর জাতীয়করণ ভেঙে দিল সিআইএ-এমআই৬-এর চক্রান্ত? কীভাবে ক্ষমতায় এলেন খামেনি? আজ ইরান কি শেষ ফ্রন্টিয়ার, নাকি নতুন সংঘর্ষের সূচনা?
শুধু তাই নয়, যুদ্ধের সময় গালিবাফকে সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকাতেও দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণত একজন পার্লামেন্ট স্পিকারের কাজ নয়। এতেই কিছুটা আন্দাজ করা যায়, ইরানের ক্ষমতার কাঠামো কতটা বদলে গিয়েছে। অন্যদিকে, আব্বাস আরাঘচি হলেন কূটনৈতিক ফ্রন্টের প্রধান মুখ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় যুক্ত এবং বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও তিনিই বিশ্বের সামনে ইরানের অবস্থান তুলে ধরছেন।
যুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন আলোচনা, মধ্যস্থতা এবং সম্ভাব্য সমঝোতার প্রচেষ্টাও চলে। এই জায়গাতেই আরাঘচির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনার ক্ষেত্রে তিনিই প্রধান মুখ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Iran oil politics: ইরান কেন পশ্চিমের চেয়ে পূর্বকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল? রেশমপথ কীভাবে ইরানকে সমৃদ্ধ করেছিল? তেল নিয়ে ব্রিটেন-আমেরিকার হস্তক্ষেপ কেন বাড়ল? মোসাদ্দেকের জাতীয়করণ উদ্যোগ কেন বাধার মুখে পড়ে? এই ইতিহাস কি আজকের ইরান-রাজনীতির ভিত গড়ে দিয়েছে?
তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। একদিকে যুদ্ধ চলছে, অন্যদিকে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। কিন্তু ইরান প্রকাশ্যে বারবার বলছে, তারা কোনো আলোচনায় রাজি নয়, অন্তত এখনই নয়। এই দ্বৈত অবস্থানই পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। খবর অনুযায়ী, ইজরায়েল এই দুই নেতাকে টার্গেট করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু পরে তাদের ‘হিট লিস্ট’ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কারণ স্পষ্ট, যদি এই দুই নেতাকেও হত্যা করা হয়, তাহলে আলোচনার জন্য আর কোনো কার্যকর নেতৃত্ব থাকবে না।
এই ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বোঝায় যুদ্ধ চললেও কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। ভবিষ্যতে আলোচনার সুযোগ রাখতে কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বাঁচিয়ে রাখা রাজনৈতিকভাবে জরুরি হয়ে ওঠে।
বর্তমান ইরানের ক্ষমতার কাঠামো বুঝতে গেলে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, IRGC বা রেভলিউশনারি গার্ডের ভূমিকা। এই সংগঠনটি শুধু সামরিক শক্তি নয়, অর্থনীতি ও রাজনীতির উপরও ব্যাপক প্রভাব রাখে। যুদ্ধের সময় তাদের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচিত সরকার বা প্রেসিডেন্টের চেয়েও IRGC-র নেতাদের প্রভাব বেশি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গালিবাফ এবং আরাঘচিকে আলাদা করে দেখা যায় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইজরায়েল, এমনকী পাকিস্তান বা তুরস্কের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলিও বুঝতে পারছে, যুদ্ধ শেষ করতে হলে এই দুই নেতার সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে হবে। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চিত্রও তুলে ধরে। একদিকে কঠোর অবস্থান নেওয়া শক্তিশালী গোষ্ঠী, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজার প্রবণতা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। এই সমীকরণেরই কেন্দ্রে রয়েছেন গালিবাফ এবং আরাঘচি। একজন যুদ্ধের বাস্তবতা সামলাচ্ছেন, অন্যজন সম্ভাব্য শান্তির পথ তৈরি করছেন।






