তৃণমূলেই কোণঠাসা জহর, প্রাক্তন আমলার রাজনৈতিক ইনিংসের ভবিষ্যৎ কী?
Jawhar Sircar: জহর বনাম সৌগত-তাপস। কী বলবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?

জহরে রতন চেনে, তাপস-সৌগত চেনেন...! বঙ্গ রাজনীতির চর্চিত-বিতর্কিত দেওয়ালে এখন কান পাতলে শোনা যাচ্ছে এমন প্রবাদও! এর কারণ হিসেবে অনেকেই বলছেন, গত কয়েকদিনে তৃণমূল এবং তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ জহর সরকার-পর্ব। যিনি সবেমাত্র এক বছর পূর্ণ করেছেন রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ হিসেবে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাবলিতে দাবি করা হচ্ছে, ২ অগাস্ট, ২০২১ থেকে ২৯ অগাস্ট, ২০২২। মাত্র এক বছরেই মোহভঙ্গ ঘটেছে দেশের প্রাক্তন দুঁদে আইএএস আধিকারিক, কেন্দ্র-রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দফতর সামলানো জহর সরকারের! অনেকেই বলছেন, মাত্র এক বছরেই 'রতন চিনতে ভুল' করেছিলেন, এমন উপলব্ধিই হয়েছে প্রসার ভারতীর প্রাক্তন অধিকর্তার!
কেন বলা হচ্ছে এমন? বাংলার এক সংবাদমাধ্যমে জহর সরকারের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক ওই সাক্ষাৎকারটি গত ২৯ অগাস্ট প্রকাশের পরে তৈরি হয়েছে জোর বিতর্ক। যেখানে জহর সরকার বলেন, ''পার্থ-অনুব্রত দলের পচা অংশ। শরীরের এক পাশে পচা নিয়ে ২০২৪-এ লড়াই করা কঠিন। পার্থকে তো শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দেখেছি। কথাও বলেছি অনেক বার। টিভিতে দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ভদ্রলোকের ইমেজ! তিনি কার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন, তা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু দুর্নীতির টাকা দিয়ে তাঁকে অলঙ্কৃত করা। এটা দেখলে কী রকম গা শিরশির করে।'' ওই সাক্ষাৎকারেই আরও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তৃণমূল সাংসদ। 'দুর্নীতি' নিয়ে অভিজ্ঞ ওই প্রাক্তন আমলার মন্তব্য, ''রাজনৈতিক দলের মোহর লাগিয়ে যত ইচ্ছা টাকা, বান্ধবীর নামে ফ্ল্যাট করব, গাড়ির পরে গাড়ি কিনব, এগুলো মানতে পারছি না।" জহরের আক্ষেপ, "বাড়ির লোকেরা সঙ্গে সঙ্গে বলে, তুমি ছেড়ে (তৃণমূল, সাংসদ পদ) দাও। বন্ধুরা বলছে, তুই এখনও আছিস? কত পেয়েছিস? এই ধরনের লাঞ্ছনা তো জীবনে কখনওই শুনতে হয়নি।''
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
একাধিক এই রাজনৈতিক জল্পনা যাঁকে নিয়ে, সেই দিলীপ ঘোষ নিজে কী বলছেন?
এই মন্তব্যের পরে পার্থ চট্টোপাধ্যায়-অনুব্রত মন্ডল অস্বস্তির মধ্যে ফের অস্বস্তিতে পড়েছে রাজ্যের শাসকদল। আর এই পরিস্থিতিতে প্রায় সব বিষয়ে মুখ খোলার বদনাম নিয়ে ফের সরব হয়েছেন তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়। প্রাক্তন আইএএস আধিকারিকের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছেন প্রাক্তন অধ্যাপক। জহরকে লক্ষ্য করে সৌগত বলেন, "ওঁ যে স্বার্থপর এবং স্বার্থকেন্দ্রিক সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। এই ধরনের আমলারা এমন হন। এঁরা উপকার নেন। তার পরে ক্ষতি করার আগে এক বারও ভাবেন না।'' দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ এই প্রসঙ্গে খুব একটা মুখ খুলতে না চাইলেও সরব তৃণমূল নেতা তাপস রায়-ও। তিনি বলেন, "তৃতীয়বার তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে দল ওঁকে রাজ্যসভায় মনোনয়ন দিয়েছিল। দায়িত্বজ্ঞানহীন অরাজনৈতিক মন্তব্য। আমি জহর সরকারের নির্বাচনী এজেন্ট ছিলাম বলে লজ্জা হচ্ছে। উনি এসব বলার আগে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একবারও কথা বলেছিলেন?'' তাপস আরও বলেন, ''জহর সরকার তো সম্মান বাড়ানোর জন্য রাজ্যসভার সদস্য হয়েছিলেন। পদ ছেড়ে দিন, কে নিষেধ করেছে? উনি যদি মনে করেন ছেড়ে দেওয়া উচিত, ছেড়ে দিন। আমি একবারও মনে করি না জহর সরকার এ সমস্ত কথা বলেছে বলে দলের বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়েছে। কারণ দল জহর সরকারদের ওপর নির্ভর করে না।'' জহর সরকারের প্রতি তাপসের প্রশ্ন, ''রাজ্যসভায় মনোনয়ন পেশের আগে বাড়ির লোক বা বন্ধুবান্ধবের সম্মতি কি নিয়েছিলেন?"
জহরের মন্তব্য এবং সৌগত-তাপস প্রতিক্রিয়ায় স্বভাবতই সরগরম হয়েছে রাজ্য-রাজনীতি। তৃণমূলকে আক্রমনের নতুন অস্ত্র পেয়েছে বিরোধীরা। এই প্রসঙ্গে বিজেপি-র কেন্দ্রীয় নেতা অমিত মালব্য-র ট্যুইট, ''জহর সরকারের মতো মানুষ পার্থ-অনুব্রত কাণ্ডে এমন ভাবছেন, তাহলে মমতার কতটা ক্ষতি হচ্ছে!''
এই আবহেই মুখ খুলেছেন জহর সরকারও। প্রাক্তন এই আমলার দাবি, ''যাঁর অনুরোধে রাজ্যসভায় গিয়েছিলাম তিনি বললেই ছেড়ে দেব।'' অর্থাৎ তৃণমূলের অন্য নেতারা নন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বললেই পদ ছাড়তে রাজি তিনি। এখানেই উঠছে প্রশ্ন, এক ঢিলেই কি দুই পাখি মারলেন জহর সরকার! জীবনের প্রায় ৪০ বছর কেন্দ্র-রাজ্যের প্রশাসনিক কৌশলের অন্যতম কারিগর কি বিতর্ক উসকে দিয়ে সাপ আর লাঠি দু'টোকেই ঠিক রাখলেন! কিন্তু জানা যাচ্ছে, সুখেন্দুশেখর রায়কে মধ্যস্থতার দায়িত্ব দিয়ে তৃণমূল থেকে সম্মানজনক পদত্যাগের কথা বলা হচ্ছে জহর সরকারকে।
কেন উঠছে এই প্রশ্ন? রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত, বরাবর বিজেপি-বিরোধী এই প্রাক্তন আমলা। ২০১৬ নাগাদ বিজেপি সরকারের সঙ্গে কাজ করতে অসুবিধা হচ্ছে, এমন জল্পনার মধ্যেই প্রসারভারতীর অধিকর্তার পদ ছাড়েন। তারপর থেকেই মূলত মোদি সরকারের নানা নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন সামাজিক ইতিহাসের এই মেধাবী ছাত্র। গর্জে উঠেছেন জহর। মনমোহন সিং আমলের অন্যতম শীর্ষকর্তা তাই মোদী বিরোধিতার অন্যতম মুখ মমতার আবেদন ফেরাতে পারেননি। অচিরেই ক্ষমতার প্রসার বাড়িয়ে ফেলতে দীনেশ ত্রিবেদীর ছেড়ে যাওয়া আসনে মনোনীত হয়েছেন রাজ্যসভায়। নিজের ভাবমূর্তি বজায় রেখেই কেন্দ্রের বিরোধিতায় সরব হয়েছেন তিনি। কিন্তু সময় বদলেছে, সাম্প্রতিক একাধিক বিতর্ক, দুর্নীতির অভিযোগ। সর্বোপরি তাঁর দলের নেতা-মন্ত্রীর নামে দুর্নীতি, চুরির অভিযোগ। এর সঙ্গেই কোটি কোটি টাকা উদ্ধারের বেনজির ছবি অস্বস্তিতে ফেলেছে তাঁকে! যে জহর সরকার বরাবর নিজের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রক্ষায় সচেষ্ট হয়েছেন, তাঁকেই পরোক্ষে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে এই অভিযোগের অন্তর্জালে। এখানেই বেঁধেছে গোল। একদিকে মোদি বিরোধিতা এবং অন্যদিকে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রক্ষা, দুইয়ের ক্ষেত্রেই অস্বস্তির দুইয়ে দুইয়ে চার হয়েছে। যে প্রেক্ষাপটে নিজের ভাবমূর্তি আগের মতোই কলিমাহীন থাকলেও পরোক্ষে যে দলীয় গলদের ভার তাঁকে, তাঁর ভাবমূর্তিকে, তাঁর ব্যক্তিত্বকে অস্বস্তিতে ফেলেছে সেই অবস্থা থেকেই একপ্রকার বাঁচতে চেয়েছেন জহর। আর এই তাগিদ থেকেই প্রকাশ্যে দলের নেতাদের দুর্নীতিতে জড়ানো নিয়ে আপত্তি ব্যক্ত করেছেন। দলের নেত্রীর নাম একপ্রকার উহ্য রেখেই নিজের ক্ষোভ, দলের কী করণীয় তা-ও পরোক্ষে ব্যক্ত করেছেন তিনি। এখানেই আসল কাজ করে ফেলেছেন দুঁদে এই প্রাক্তন আমলা। কারণ, একাধারে দলের বর্তমান অবস্থায় তিনি ব্যথিত, এই অভিযোগ যে অত্যন্ত খারাপ এটা বলে দেওয়া গিয়েছে। অন্য দিকে দলের নেতাদের তাঁর মন্তব্য-বিরোধিতার পরেই বল ঠেলে দেওয়া গিয়েছে দলনেত্রীর কোর্টে। অর্থাৎ দুর্নীতির অস্বস্তির বিরুদ্ধে মুখ খুলে দল থেকে জহরকে সাসপেন্ড অথবা পদত্যাগ করতে যদি বলা হয়, তাহলে জনমানসে মমতার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে! আবার মমতার কোনও ব্যবস্থা না নেওয়ার ইঙ্গিতেও অন্তত জনমানসে মৌলিকত্ব বজায় থাকবে জহর সরকারের।/ রাজনৈতিক মহলের ওই অংশের দাবি, যদি তিনি ভাবমূর্তি নিয়ে এতটাই ব্যথিত হতেন, যদি নিজের পুরনো অবস্থান নিয়ে এখনও এতটা চিন্তিত হতেন তাহলে ক্ষমতার লোভ ছেড়ে দিয়ে কি এই মন্তব্য পদত্যাগের পরে করতেন না? তাহলে এই 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি'-র মতো অবস্থার সৃষ্টি হত না। যদিও সূত্রের খবর, জহর-ইস্যুকে খুব একটা সহজভাবে নিচ্ছে না তৃণমূল নেতৃত্ব। সৌগত রায় বা তাপস রায় প্রকাশ্যে এমন বললেও তাঁদের দলের তরফে বারণ করা হয়নি, তবে আর এই বিষয়ে বিতর্ক বাড়ুক তা-ও চাইছে না দল। অর্থাৎ প্রাক্তন আমলা জহর সরকারের সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য দলের অস্বস্তি বাড়ানোর কারণ হবে, এমন আঁচ করতে পারেনি তৃণমূল। সেই প্রেক্ষাপটে এবং বর্তমান টানাপড়েনের মধ্যে এখনই কোনও ব্যবস্থা নিয়ে বিষয়টিকে আরও মাইলেজ দিতে চাইছে না তৃণমূল নেতৃত্ব। পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে এই বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকেই এগোতে পারেন মমতা-অভিষেকরা। তখনই সিদ্ধান্ত হতে পারে জহরকে নিয়ে। কথা বলতে পারে শীর্ষ নেতারা। তাঁকে মুখ খুলতে সরাসরি বারণ না করা হলেও এরকম ইঙ্গিত দেওয়াও হতে পারে- এমনও বলছে ওই সূত্র।
১৯৭৫ সালে আইএএস আধিকারিক হিসেবে কাজ শুরু করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জহর সরকার। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিটেনের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করেন তিনি। ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ববিদ্যায় স্নাতকোত্তর। গবেষণাও করেন এই মেধাবী বাঙালি। আমলা হিসেবে প্রথম জীবনে অবিভক্ত ২৪ পরগনা, বর্ধমানে কাজ। অর্থ দফতরের সচিব হিসেবে কাজ করার পরেই রাজ্য বিপণন শুল্ক কমিশনের প্রধান হন ১৯৯০ সাল নাগাদ। ২০০৬ সালে কেন্দ্রের ক্ষুদ্র, মাঝারি উদ্যোগ মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কাজ করেন। আমলা হিসেবে ব্যর্থতা তাঁকে ছুঁতে পারেনি কোনও দিন। ২০০৮ সালেই কেন্দ্রের সংস্কৃতি মন্ত্রকের প্রধান সচিব হন। দেশজুড়ে একাধিক উদ্যোগে সামিল হন জহর। দীর্ঘকাল সচিবের দায়িত্ব সামলে ২০১২ সালে প্রসারভারতীর অধিকর্তা হিসেবে যোগ দেন তিনি। নরেন্দ্র মোদি জমানা শুরুর দু'বছরের মধ্যেই, ২০১৬ সালে ওই পদ থেকে পদত্যাগ করেন জহর সরকার। সমগ্র এই কার্যকালে সমানতালে চলেছে গবেষণা। রাজ্যের পশ্চিম অঞ্চলের 'ধর্ম ঠাকুর'। আদিম ইতিহাস। জনজাতি সম্পর্কিত কাজ। সঙ্গে দেশ-বিদেশে একাধিক উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়েছে তাঁর নাম। বরাবর প্রশাসনিক ক্ষেত্রে অমলিন থেকেছেন তিনি। সফল হয়েছেন সব ক্ষেত্রেই। ২০১৩ সালে সেরা অধিকর্তা (প্রসার ভারতী) হিসেবে পুরস্কার জুটেছে।
জহরের রাজনৈতিক জীবন গত বছর পর্যন্ত প্রায় নিশ্চিহ্ন ছিল। মনমোহন সরকার অর্থাৎ কংগ্রেস সরকার ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি, সেই কারণেই মোদি বিরোধিতা; এই বিতর্কে মাঝে মাঝে তাঁর নাম এলেও সরাসরি রাজনৈতিক দলের পতাকা নেননি। প্রাক্তন আমলাদের হয়ে প্রতিনিধিত্ব ছাড়া আর কিছুই করেননি জহর সরকার। সেই পরিস্থিতে দাঁড়িয়ে মমতার অনুরোধে রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে নতুন ইনিংস শুরু করেন। অর্থাৎ এতদিন যে বিরোধিতা তাঁর টুইটার হ্যান্ডেল অথবা লেখালেখিতে ছিল, সেই বিরোধিতা করার একটা সরাসরি সুযোগ পান তিনি। রাজ্যসভায় গঠনমূলক বক্তব্যেও মেধার ছাপ রাখেন এই প্রাক্তন আমলা। সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক দুর্নীতি, চুরির অপবাদ তাঁর বৌদ্ধিক টনক নড়িয়েছে! যা জহরের যাবতীয় কার্যকলাপের মধ্যে সরাসরি আঘাত করতে পারেনি কোনও দিন, সেই জহরকেই রাজনৈতিক ইনিংসের প্রথমেই শুনতে হচ্ছে এই অভিযোগ। যেখানে তিনি জড়িত না হয়েও এই অস্বস্তির ভাগিদার হতে হয়েছে তাঁকে। এই কারণেই মুখ খুলেছেন তিনি, নিজের অভিজ্ঞতা, মেধাকে ঠকাতে পারেননি জহর সরকার; এমনও বলছেন কেউ কেউ।







