তৃণমূলে যোগ দেবেন দিলীপ ঘোষ! কেন দানা বাঁধছে জল্পনা?
একাধিক এই রাজনৈতিক জল্পনা যাঁকে নিয়ে, সেই দিলীপ ঘোষ নিজে কী বলছেন?

সেপ্টেম্বর, ২০১৭! জল্পনা-কল্পনার চূড়ান্ত নাটকীয়তার পর রাজনৈতিক মঞ্চে শুরু হয়েছিল নতুন নাটক। বঙ্গের প্রথম তৃণমূল নেতা মুকুল রায় যোগ দিয়েছিলেন দিলীপ ঘোষের নেতৃত্বাধীন বঙ্গ বিজেপিতে। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি, মুকুল-অস্ত্রে ঘর ভেঙেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। একের পর এক তৃণমূল নেতা-কর্মী ভাঙিয়ে দিলীপদের হাত শক্ত করেছেন মুকুল।
১৯ ডিসেম্বর, ২০২০। অমিত শাহের জনসভায় আচমকা বিস্ফোরণ। ফের জল্পনা সত্যি করে মমতার হাত ছাড়লেন আর এক বৃহৎ তৃণমূল নেতা। কাঁথির 'সম্রাট' শুভেন্দু অধিকারী, বাবা সাংসদ শিশির অধিকারী আর ভাই দিব্যেন্দু অধিকারীকে তৃণমূলে রেখেই যোগ দিলেন বিজেপি-তে। বিধানসভা নির্বাচনের আগের টালমাটাল অবস্থার মধ্যেই ফের ভাঙল তৃণমূল। তবুও হারল বিজেপি। আবার মমতাকে নন্দীগ্রাম আসনে হারিয়ে দিলেন একদা তাঁরই শিষ্য।
বঙ্গের রাজনৈতিক বিবিধ টানাপড়েনের মধ্যে এই দেওয়া-নেওয়া অথবা আসা-যাওয়ার খেলা চলেছে যুগ যুগ ধরে। কংগ্রেস ছেড়ে মমতার তৃণমূল তৈরি, আবার একের পর এক কংগ্রেসের নেতা ভাঙিয়ে তৃণমূলের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, দল ভাঙানোর অভিযোগ উঠেছে বারবার। মমতা-কৌশলে ভেঙেছে সিপিএম-সহ একাধিক বামমনস্ক রাজনৈতিক দলও। অর্থাৎ যে যত ভাঙার খেলায় পটু, তার কপালেই জুটেছে রাজনৈতিক লাভের লোভনীয় পদ। হাতের নাগালে এসেছে সহজে বিরোধী-কাবুর অস্ত্র।
সময় বদলেছে। একদা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় সরব মুকুল ফিরেছেন পুরনো ঘরে! রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে একাধিক বিজেপি-তে যোগ দেওয়া তৃণমূল নেতার ঘরে ফেরার জয়গান প্রোথিত হয়েছে নির্বাচনে গেরুয়া হারের পরেই। কিন্তু বন্ধ হয়নি এই আসা-যাওয়ার খেলা। বঙ্গের রাজনৈতিক ঐতিহ্য বজায় রেখে তা চলেছে জোরকদমে!
তবে কংগ্রেসের প্রাক্তন, বিজেপির প্রাক্তন নেতা 'কচুবনে লাথির মুখ' জয়প্রকাশ ছাড়িয়ে এবার কি ফের মুকুল বা শুভেন্দুর মতো কোনও রাজনৈতিক দামামা ঘটতে চলেছে বঙ্গে? আবার কি দল পরিবর্তনের হাওয়ার মাঝেই উঠতে চলেছে সুনামি? এই জল্পনার পাহাড়ে রং ছড়িয়েছে এই বছরের গোটা অগাস্ট মাস। কেন?
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আরএসএস প্রশংসার মাধ্যমে বঙ্গ বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ-র চোরা অন্তর্বিবাদ খুঁচিয়ে দিলেন, পোড় খাওয়া রাজনীতিক মমতা?
১৮ অগাস্ট, ২০২২। একটা সময়ে কংগ্রেস ছেড়ে মমতার হাত ধরা দমদম কেন্দ্রের তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় মন্তব্য করলেন, "ওঁকে (দিলীপ ঘোষ) নিজের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে ওঁর দল। তারপর থেকেই যোগাযোগ করেছে তৃণমূলের সঙ্গে। অনেকের সঙ্গেই কথা হয়েছে। কিন্তু কথাবার্তা তেমন এগোয়নি।" সৌগতের এই মন্তব্যের পরই চক্ষু ছানাবড়া রাজনৈতিক মহলের! তার মানে, রাজনীতিতে কোনও কিছুই নিশ্চিত না হলেও তৃণমূলে যোগ দিচ্ছেন কট্টর তৃণমূল-বিরোধী দিলীপ ঘোষ! যোগাযোগ করেছেন তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে! তাহলে কি সত্যিই মোহভঙ্গ হয়েছে বঙ্গ বিজেপির অসময়ের এই পথপ্রদর্শকের? যদিও সৌগতের মন্তব্য এবং তা নিয়ে নানা জল্পনার মধ্যেই মুখ খোলেন দিলীপ ঘোষ নিজেই। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই তৃণমূল সাংসদকে কটাক্ষ করে দিলীপের মন্তব্য, "ওঁর (সৌগত রায়) বয়স হয়েছে, বয়স হলে ঠিক থাকে না কিছু। মাঝে মাঝেই কমেডি করছেন। আমি যেখানে আছি, সেখানেই থাকব। তৃণমূলের কার সঙ্গে কথা হয়েছে নাম বলুন!"
যদিও দিলীপ ঘোষ এবং তৃণমূল-যোগ জল্পনা নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে কোনও মন্তব্য করতে দেখা যায়নি বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্বকে। সবটাই দিলীপের ওপর চাপিয়েছেন নেতারা। যদিও বিজেপির অন্দরে কান পাতলেই এখন শোনা যায়, দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ এবং বর্তমান সভাপতি বালুরঘাটের সুকান্ত মজুমদারের মধ্যে খুব একটা ভাল সম্পর্ক নেই আর, ক্রমশ অবনমন ঘটছে সম্পর্কের! এমনকী, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা বর্তমান বিজেপি বিধায়ক, তৃণমূলের প্রাক্তন নেতা শুভেন্দু অধিকারী ও দিলীপ ঘোষের সম্পর্ক খুব একটা সহজ, এমন দাবি করেন না কেউই। এদিকে শুভেন্দু-সুকান্ত মতানৈক্যের উদাহরণ দেখা যায় মাঝে মাঝেই। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বারবার দিলীপ নিয়ে দলীয় অস্বস্তি চাপা থাকেনি অন্দরেই। প্রকাশ্যে দিলীপের মন্তব্য নিয়েও নালিশ গিয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে। দলীয় বৈঠকেও ঢুকতে পারেননি দিলীপ। অর্থাৎ যে দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতার কথায় একটা সময় দল চলত, সেই তাঁকেই করতে হচ্ছে জবাবদিহি দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে দলীয় বৈঠক-কক্ষের বাইরে!
ঠিক এই বিতর্কের মধ্যেই ফের মুখ খোলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি। এবার প্রধানমন্ত্রীর আওতাধীন সিবিআই নিয়েই অসন্তোষের সুর শোনা যায় তাঁর গলায়। ফের অস্বস্তিতে পড়েন সুকান্ত মজুমদার, অমিত মালব্যরা। ২১ অগাস্ট কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানে দিলীপ ঘোষ প্রশ্ন তোলেন সিবিআই-এর ভূমিকা নিয়ে। দিনের পর দিন সিবিআই-এর হাতে থাকা মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া নিয়েও সমঝোতা তত্ত্ব শোনা যায় তাঁর মুখে। যদিও তীব্র বিতর্কের মধ্যেও দিলীপ থাকেন দিলীপেই। দলের তরফে এই মন্তব্যের পরেই ফের শো-কজ করা হয় দিলীপ ঘোষকে। তিনি বহাল থাকেন নিজের অবস্থানেই! ২২ অগাস্ট ফের। ২৩ অগাস্ট আরও একধাপ এগিয়ে সিবিআই নিয়ে তিনি বলেন, "কার অধীনে সিবিআই প্রয়োজন নেই, মানুষের টাকায় চলছে। আমাদের ২০০ কর্মী খুন হয়েছেন, তাঁদের জন্য বিচার চাওয়া দোষ! কাউকে খুশি করার জন্য আমরা রাজনীতি করি না! কারও দিকে তাকিয়ে রাজনীতি করি না, কর্মীদের দিকে তাকিয়ে রাজনীতি করি।"
এখানেই শুরু হয় জল্পনা। সিবিআই নিয়ে বারবার বিরোধীদের করা অভিযোগেই সিলমোহর দেন এই বিজেপি নেতা! দিলীপ-অস্ত্রে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অপব্যবহার নিয়ে সরব হয় তৃণমূল। সেই ইস্যুই লুফে নেন সবুজ-ঘরের নেতারা। বিজেপির দিলীপ-অস্বস্তি কার্যত লাভদান করে তৃণমূলকে।
এদিকে দলবদলের জল্পনার মধ্যেই, সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাৎকারে দিলীপ ঘোষ বলেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইকে সম্মান করি। তিনি লড়েছেন।" একদা তীব্র তৃণমূল-বিরোধী দিলীপ ঘোষের এহেন হঠাৎ ভোলবদল, জল্পনা বাড়িয়ে দেয় রাজনৈতিক মহলের অন্দরে। তাহলে কি সৌগত রায়ের বলা তথ্যই ঠিক? অবশেষে মমতার হাত ধরতে চলেছেন দিলীপ ঘোষ? প্রসঙ্গত, শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে যে গতিতে তৃণমূল, মমতা, অভিষেককে ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন, রাজনৈতিক ভাবে অলআউট খেলছেন- সেখানে দাঁড়িয়ে, দিলীপ ঘোষ সিবিআই প্রশ্ন অথবা তৃণমূলের নেতাদের দুর্নীতি নিয়ে সরব হলেও মমতা, অভিষেককে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি, যে বিষয় নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। তাহলে কি মমতার প্রতি ক্রমশ নরম হচ্ছেন দিলীপ?
সমস্ত প্রশ্নের আবহেই 'গরুর দুধে সোনা' তত্ত্বের স্রষ্টাকে নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন তৃণমূলের 'কালারফুল বয়' মদন মিত্র। মদন বলেন, "দিলীপের জন্য যা প্রয়োজন, তা যদি ওখানে না থাকে তাঁর উচিত অন্যদের সঙ্গে কথা বলা।" মদনের যুক্তি, "আপনি যদি সামনে না এগোতে পারেন, পিছনের দিকে যেতে হবে!" তাহলে কি এবার দিলীপের সেই প্রয়োজন মেটাতে চলেছে তৃণমূল? মুচকি হেসে মদনের জবাব, আপনারাই জানেন!
মদনের এই মন্তব্যের আবহে দিলীপ নিয়ে জল্পনা বাড়িয়েছে তৃণমূল মুখপাত্র 'জাগো বাংলা'-র সম্পাদকীয়। 'খালি কলসি' শিরোনামের ওই লেখায় কার্যত দিলীপের প্রশংসা করা হয়েছে। বিজেপির বঙ্গে বেড়ে ওঠায় দিলীপের অন্যতম ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, "দলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি, বর্তমান সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি, ভোটের লড়াইয়ে সফল দিলীপ ঘোষকে কোণঠাসা করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। হেস্টিংস অফিসে বৈঠক চলছে তাঁর থাকার কথা, অথচ তাঁকে ডাকা হচ্ছে না। কে করছেন? অমিত মালব্য। কার প্ররোচনায় করছেন? দলের বর্তমান রাজ্য সভাপতি।" যা রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক কারবারিরা। আপাতভাবে বিরোধী একটি রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রের, কেন দিলীপের প্রশংসা? বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, প্রকাশ্যে কুণাল ঘোষের নানা মন্তব্যজুড়েই বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধেই আক্রমণ থাকে। সেই প্রেক্ষাপটে দিলীপ ঘোষের বিরুদ্ধে আক্রমণের ঝাঁঝ থাকে অনেক কম । এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তৃণমূলে যদি বিজেপির অন্যতম স্তম্ভ দিলীপ ঘোষের আগমন ঘটে, তাহলে তা মেনে নেওয়া খুব একটা কঠিন কাজ হবে না তৃণমূলের পক্ষে। সেই বিষয়টি আরও সহজ করতেই কি দিলীপের আসার পথ স্পষ্ট করে রাখছে তৃণমূল!
একাধিক এই রাজনৈতিক জল্পনা যাঁকে নিয়ে, সেই দিলীপ ঘোষ নিজে কী বলছেন? বিজেপি নেতার দাবি, তিনি বিজেপিতে ছিলেন, সেখানেই আছেন আর সেই দলেই থাকবেন, যাঁরা জল্পনা করছেন, এর উত্তর দেওয়া তাঁদের দায়িত্ব।







