জুলাই সনদ: কেন নতুন অধ্যায় বলছেন মুহাম্মদ ইউনূস?
July National Charter Bangladesh: তবে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP) এবং বামপন্থা ঘরানার চারটি দল অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ায় বিষয়টি নানা রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের মাধ্যমে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা এ সনদে স্বাক্ষর করেছেন। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরাও অংশ নিয়েছেন। তাঁরা এই সনদকে 'ঐতিহাসিক অর্জন' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (NCP) এবং বামপন্থা ঘরানার চারটি দল অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ায় বিষয়টি নানা রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জুলাই সনদ তৈরিতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংলাপের ইতিহাস রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মধ্যস্থতায়, ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি সদস্য সচিব আক্তার হোসেন বিবিসি-কে বলেছেন, তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য তাঁরা শেষ পর্যন্ত ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চান।
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান ঘিরে শুক্রবার সকাল থেকেই জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। বেলা তিনটার পর থেকেই অতিথিরা অনুষ্ঠানস্থলে আসতে শুরু করেন। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, রাজনৈতিক দলের নেতা, দেশের এবং বিদেশের আমন্ত্রিতরা মূল মঞ্চের সামনে বসেন। বিকেল ৪টের সময় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকেই জাতীয় সংসদ এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়।
‘জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধা’ ব্যানারে কয়েকশ মানুষ মূল মঞ্চের সামনে অবস্থান নেন এবং সনদ সংশোধন, সংবিধানে অন্তর্ভুক্তি ও জুলাই যোদ্ধাদের স্বীকৃতির দাবি জানান। বেলা ১২টার পরও তাঁরা চলে না যাওয়ায় পুলিশ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও সাউন্ডগ্রেনেড বিস্ফোরণের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। কয়েকটি গাড়িও ভাঙচুরের করা হয়, এবং অনুষ্ঠানস্থলের বাইরের তাবু ও ব্যানারে আগুন ধরানো হয়। সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন। বিকেল সোয়া চারটের সময় গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে রাজনৈতিক নেতারা মূল মঞ্চে বসেন, এবং বিকেল পাঁচটা পাঁচ মিনিটে শুরু হয় জুলাই জাতীয় সনদের স্বাক্ষর পর্ব।
বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে শুক্রবার দুপুরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকারনামার পঞ্চম দফা সংশোধনের ঘোষণা দেয়। কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ এই সময় জুলাই যোদ্ধাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চান। তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে দফাটি সংশোধন করা হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Tareq Rahman Returns After 26 Years: অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিষয়টি রাজনৈতিক, এটি কোনো ব্যক্তির বিষয় নয়। আমরা চাই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সফল হোক।”
সংশোধিত দফায় বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানপূর্ব বাংলাদেশে ১৬ বছরের আওয়ামী 'ফ্যাসিবাদ' বিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্ট গণঅভ্যুত্থান কালে 'ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ' ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে। শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান, শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই বীর যোদ্ধাদের মাসিক ভাতা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ব্যবস্থা এবং আইনগত দায়মুক্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এই সংশোধনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের মূল দাবি অংশিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
সনদ চূড়ান্ত হওয়ার পর তা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছে। এই বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবৈষম্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর 'নোট অব ডিসেন্ট' অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দলগুলোর ভিন্নমতকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগে ৪৭টি প্রস্তাব সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। দ্বিতীয় ভাগে ৩৭টি প্রস্তাব নির্বাহী আদেশ বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। সনদ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত যে কোনো সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাস্তবায়ন করবে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্যের উদাহরণ:
•একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন,
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
India Bangladesh relations: মিস্রীর বক্তব্যে ভারত পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে— ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং দুই দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থই প্রাধান্য পাবে।
•ডেপুটি স্পিকার ও বিরোধী দলের কাঠামো নির্ধারণে ৩১টি দল একমত হয়েছে,
•তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সমর্থনে ৩০টি দল একমত হয়েছে,
•রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে ৩০টি দল একমত হয়েছে, যদিও ৯টি দল 'নোট অব ডিসেন্ট' দিয়েছে,
•নারী প্রতিনিধিত্ব ধাপে ধাপে ১০০ পর্যন্ত উন্নীত করার প্রস্তাবে সব দল একমত হয়েছে।
মতপার্থক্য থাকা প্রস্তাবগুলি হলো— একজন ব্যক্তি একসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধানের পদে থাকতে পারবে না, এ বিষয়ে বিএনপি-সহ পাঁচটি দল ভিন্নমত পোষণ করেছে। এছাড়া, সংখ্যানুপাতিক বা পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনে সাতটি দল ও জোটের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। 'ধর্ম নিরপেক্ষতা'র শব্দবন্ধ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবে গণফোরাম ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (JSD) ভিন্নমত পোষণ করেছে।
সনদে 'নোট অব ডিসেন্ট' অন্তর্ভুক্ত করার কারণে রাজনৈতিক দলগুলির ভিন্নমত স্বীকৃতি পেয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের একজন সদস্য জানিয়েছেন, এই প্রস্তাবনাগুলি নির্বাচিত হলে সেই দলগুলো মানতে বাধ্য নয়। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, যদি গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার প্রবর্তন করা হয়, তবে ভোটকক্ষ সংখ্যা ও জনবল বাড়াতে হবে। গণভোট ইস্যুতে সরকার বা নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও না আসায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবৈষম্য চলছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো দলগুলোর মধ্যে মতবৈষম্য এবং গণভোটের দিন ও পথ-পদ্ধতি নিয়ে ভিন্নমত। বিএনপি চায় নির্বাচনের দিন গণভোট, তবে জামায়াত, এনসিপি নির্বাচনের আগে গণভোটের পক্ষে।
উল্লেখ্য, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সনদ আগামী নির্বাচনের জন্য মাইলফলক। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিতকরণ, নারী প্রতিনিধিত্ব এবং স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য সনদ গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই সনদ আন্তর্জাতিক মহলেও নজর কেড়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার সংরক্ষণের দিক থেকে এটি জরুরি পদক্ষেপ। তবে, সনদ বাস্তবায়নে গণভোট এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতবৈষম্য ও ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে আশা করা হচ্ছে এই সনদ বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ সরকারের পথ সুগম করবে, কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিক অংশগ্রহণ ও জনগণের সমর্থনের উপর। আগামী জাতীয় নির্বাচন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ এই প্রক্রিয়ার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হবে।







