নেপথ্যে অদ্ভুত এক প্রেমকাহিনি! বর্ধমানের বিদ্যাসুন্দর কালীর ইতিহাস আজও রহস্যে ভরা

Kalipuja 2022: একদিন চরের মাধ্যমে তেজচাঁদ বিদ্যা ও সুন্দরের প্রণয়ের ব্যাপারে জেনে ফেলেন। খবর কানে যেতেই রাজা প্রচণ্ড রেগে যান। বিদ্যা-সুন্দরের প্রেমের খবর পেয়ে ফাঁদ পাতেন রাজা।

Ravhali Biswas
৩ মিনিট
নেপথ্যে অদ্ভুত এক প্রেমকাহিনি! বর্ধমানের বিদ্যাসুন্দর কালীর ইতিহাস আজও রহস্যে ভরা

বাংলার ইতিহাস আর সমাজ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত আছে অসংখ্য কালী মন্দির এবং কালী সংক্রান্ত নানা পৌরাণিক ঘটনাবলী। আজ কালীপুজো। প্রতিবছর কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতা কালীপুজো বিশেষ জাঁকজমক করেই পালিত হয়। আলোকসজ্জা ও আতসবাজির উৎসবের মধ্য দিয়ে সারা রাত্রিব্যাপী কালীর আরাধনা করা হয়। আর এই দীপান্বিতা কালীপুজোর সময় ভারতের অন্যান্য জায়গায় মহা সমারোহে দীপাবলি বা দিওয়ালি উৎসব উদযাপিত হয়। মূলত বাঙালি, অসমিয়া ও ওড়িয়ারা দীপাবলির সময় কালীপুজো করে থাকেন।

হিন্দু ধর্মের অন্যতম আরাধ্য কালিকা বা কালীমূর্তিকে নগ্নিকা হিসেবেই দেখা যায়। দশমহাবিদ্যা নামে পরিচিত তন্ত্রমতে পূজিত প্রধান দশ জন দেবীর মধ্যে প্রথম হলেন কালী। শাক্ত মতে, কালী বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদি কারণ। প্রকৃত অর্থে কালকে কলন করেন যিনি তিনিই কালী। কালী তাঁর ভক্তদের যেমন রক্ষা করেন, তেমনই মনোবাঞ্ছাও পূর্ণ করেন। কালী অনন্তের প্রতীক। একদিকে যেমন বিনাশাকারী, অন্যদিকে তেমন সৃষ্টিকারী। কালী তাই শক্তির প্রতীক। দুষ্টের দমনে কালী যেমন রণমূর্তি ধারণ করেন, তেমনই আবার ভক্তের রক্ষার্থে তিনি মমতাময়ী। কালীর এমন মমতাময় রূপের নিদর্শনই মেলে বর্ধমানের বিদ্যাসুন্দর কালীবাড়ির ইতিহাসে।

ঘন জঙ্গলে ঘেরা এক কালী মন্দির। প্রণাম ঠুকে লুঠপাটে বেরোত ডাকাতরা। কান পাতলে মন্দির ঘিরে শোনা যায় বিভিন্ন লোককথা। দিনের বেলায় সুন্দর নামের এক তরুণ পূজারি উপাসনা করতেন কালীর, তাঁর সঙ্গে রাজকন্যা বিদ্যার প্রেমকাহিনী। বর্ধমান শহর সংলগ্ন দামোদর তীরে তেজগঞ্জে জঙ্গল থেকে রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত প্রেমের পথটা সহজ ছিল না। আর সেই প্রণয়ের গল্পই আজকের পুজোর প্রেক্ষাপট।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কালো বা নীল নয়! অবাক করবে বাংলার এই তিন অঞ্চলের সাদা কালীর কাহিনি

White Kali Puja 2022: মাঝে মাঝে রাতে হঠাৎ তামাক সেবনের ইচ্ছাও হয় দেবীর। তাই মন্দিরের এক কোণেই প্রস্তুত রাখা থাকে গড়গড়া।

তখন বর্ধমানের মহারাজা তেজচাঁদের আমল। বর্ধমানের বেশিরভাগ এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ভর্তি। বিশেষ করে দামোদর তীরবর্তী তেজগঞ্জ এলাকায় ছিল আরও গভীর জঙ্গল। সেখানেই কালী মন্দিরে পুজো করতেন রাজা। রাজার বিদ্যা নামে এক মেয়ে ছিল। আর রাজবাড়ির পূজারি ছিলেন সুন্দর নামে এক গরীব ব্রাহ্মণ যুবক। সুন্দরের আর্থিক অবস্থা মোটেই ভাল ছিল না। রাজবাড়িতে ফুল দিতেন মালিনী নামে এক মহিলা। মালিনীর আনা এক মালা দেখে খুব ভাল লাগে সুন্দরের। তিনি জিজ্ঞেস করেন, মালা কে গেঁথেছে? মালিনী জানান, রাজকুমারী বিদ্যা গেঁথেছেন। সেই প্রেমের সূত্রপাত কীভাবে, তাও শুনিয়েছেন মন্দিরের এক সেবায়েত আভা বটব্যাল। তিনি বলেন, “রাজকুমারী বিদ্যার গাঁথা মালা দেখেই মন্দিরের পূজারির মনে প্রেমভাবের উদয় হয়। পূজারি ভেবেছিলেন, এমন সুন্দর মালা যিনি গেঁথেছেন, তিনি নিশ্চয়ই অতি সুন্দরী!”

আভা জানিয়েছেন, বিদ্যা এবং সুন্দরের প্রেম শুরু হয়েছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। পরবর্তীকালে বিদ্যার সঙ্গে সুন্দরের পরিচয় হয় এবং তাঁদের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এমনকী তারা নাকি মন্দিরের পাশ থেকে রাজবাড়ি পর্যন্ত একটা সুড়ঙ্গ বানিয়ে তার ভিতর দিয়ে একে-অপরের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতে যেতেন। কিন্তু তাঁদের প্রণয় খুব বেশিদিন গোপন থাকেনি। একদিন চরের মাধ্যমে তেজচাঁদ বিদ্যা ও সুন্দরের প্রণয়ের ব্যাপারে জেনে ফেলেন। খবর কানে যেতেই রাজা প্রচণ্ড রেগে যান। বিদ্যা-সুন্দরের প্রেমের খবর পেয়ে ফাঁদ পাতেন রাজা। ধরা পড়েন প্রেমিক-প্রেমিকা। তিনি বিদ্যা এবং সুন্দরকে কালীর সামনে বলি দেওয়ার আদেশ দেন। সেই সময়ে বর্ধমানের বেশিরভাগ এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ভর্তি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
খাসি বা ইলিশ নয়! ইছামতির গলদা চিংড়ি ভোগে সন্তুষ্ট কৃষ্ণচন্দ্রের সাধের ইটিন্ডার সিদ্ধেশ্বরী কালী

Kali Puja 2022: মন্দির পার্শ্ববর্তী যে পুকুর রয়েছে সেখানে নাকি কালী স্নান করতেন এবং একাধিক পূণ‍্য তিথিতে খাঁড়া হাতে কালীকে নাকি রাস্তায় প্রদক্ষিণ করতেও দেখা যেত।

কিন্তু ওই কালী মন্দিরে কেউ সচরাচর যেতেন না। কথিত আছে, যারা অন্যায় অত্যাচার করত, তাদের এই মন্দিরে দেবীর সামনে হাঁড়িকাঠে নরবলি দেওয়া হত। তাই সেই সময় এই কালী দক্ষিণ মশান কালী নামেও পরিচিত ছিল। রাজার হুকুম মতো বিদ্যা এবং সুন্দরকে বলি দিতে নিয়ে যাওয়া হয় সেই মন্দিরে। বলি দেওয়ার আগের মুহূর্তে বিদ্যা ও সুন্দর সেই মন্দিরের কাপালিকের কাছে অনুরোধ জানান, মৃত্যুর আগে তাঁরা দেবীকে প্রণাম করে আসতে চান। কাপালিক সেই অনুমতি দেন। প্রণাম করে আসার পর হাঁড়িকাঠে বিদ্যা ও সুন্দরকে ঢোকানোর পর খাঁড়া হাতে বলি দেওয়ার সময় কাপালিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। বিদ্যা আর সুন্দর, প্রেমিক–প্রেমিকা যুগল মন্দির থেকে উধাও হয়ে যান। এরপর থেকে তাঁদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। সেই সময় থেকেই মন্দিরের নামকরণ হয় বিদ্যাসুন্দর কালী মন্দির। তারপর থেকে বন্ধ হয়ে যায় নরবলিও।

এখানে কালী মন্দির ছাড়াও দুটো শিব মন্দির আছে, যা ভৈরব ও পঞ্চানন্দ নামে পরিচিত। নরবলি বন্ধের পরে মন্দিরে মেষ বলি ও পরে ভেড়া বলি দেওয়া হত। এখন ছাগল বলি দেওয়া হয়। প্রাচীন সেই সুড়ঙ্গ নাকি ছিল তবে এখন নেই, তা বুজিয়ে ফেলা হয়েছে। প্রচলিত এই প্রাচীন অলৌকিক ঘটনা আজও মানুষের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। বহু দুর থেকে মানুষ আসেন এই মন্দিরে কালীর দর্শন করতে।

মালা গেঁথে তৈরি হয়েছিল কালীপুজোর গাথা। প্রেমের শক্তিকে পূর্ণতা দিয়েছিল মাতৃশক্তি। বিদ্যা আর সুন্দর একে অন্যের পরিপূরক হয়েছিলেন। সেই থেকে বর্ধমান শহর সংলগ্ন দামোদর তীরে কালী মন্দির পায় বিদ্যাসুন্দরের নাম। কালীর নির্দেশেই বন্ধ হয়েছিল নরবলি। রাজ্যপাট নেই। তবে এখনও প্রাচীন রীতি মেনেই কালীপুজো হয় বলে জানান সেবাইত আভা বটব্যাল। তবে জাঁকজমক আর আগের মতো নেই। কালী এখানে পাষাণ মূর্তি। নিত্যদিন পুজো হয়, সন্ধ্যা আরতি হয়। নরবলি বন্ধ হলেও কার্তিক মাসের অমাবস্যায় ছাগ বলি দেওয়া হয়।

লিখেছেন
Ravhali Biswas
Ravhali Biswas
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।