লুজ লং সেদিন মারা যাননি

Amit Patihar
৪ মিনিট
লুজ লং সেদিন মারা যাননি

সময়টা ছিল ১৯৩৬। বিশ্ব অলিম্পিক দরবারে আর সমস্ত দেশের মতো জার্মানিও অংশীদার এবং আয়োজক দেশও বটে। হিটলার শাসিত নাজি সভ্যতার ধারক ও বাহক জার্মানি তখন বর্ণ বৈষম্যের তুঙ্গে। কালো চামড়ার মানুষদের তখনও সাদা চামড়ার মানুষদের সাথে তুলনায় বসানো যায় না। ক্রীতদাস করে রাখা হয়। এহেন পরিস্থিতিতে অলিম্পিকের প্রতিটা দিন প্যাভিলিয়নের বিশেষ স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতেন স্বয়ং হিটলার। নিজের দেশের ক্রীড়া প্রতিযোগীদের তাঁর তীক্ষ্ণ নির্দেশ, যে কোনও বিভাগে প্রথম হতেই হবে। প্রথম হওয়া ছাড়া কোনও বিকল্প নেই বিশ্ব দরবারে নাজি সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার।

এই একই অলিম্পিকে সেবারের অংশীদার আমেরিকাও। পাখির চোখের মতো আমেরিকার সমস্ত ক্রীড়া প্রেমীদের চোখ নিজেদের দেশের হয়ে মাঠে নামা জেসি ওয়েন্সের দিকে। জেসি ওয়েন্স, কালো চামড়ার এক ২২ বছরের ক্রীতদাস পরিবারে বেড়ে ওঠা যুবক, যার ক্ষিপ্রতা, গতিবেগ, চেহারার গঠন এবং উপস্থিতি সবকিছুই তাকে আলাদা করে দেয় বাকি প্রতিযোগীদের থেকে। প্রতিযোগীতা শুরু হওয়ার পর থেকেই যে একটার পর একটা স্বর্ণ পদক ছিনিয়ে আনছে প্রতিটা ইভেন্ট থেকে। জার্মান শাসক এডোলফ হিটলার স্পষ্টত ভাবে যার উপস্থিতিতে বিরক্ত হয়ে বলেন, 'এদের পূর্বজ রা জঙ্গলে থাকতেন, এদের শারীরিক গঠন স্বাভাবিক মানুষদের থেকে অনেক উন্নত। এদের কে ভবিষ্যতে খেলায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়াই উচিত নয়'।

কিন্তু জার্মানির হয়ে জেসি ওয়েন্সকে টক্কর দেওয়ার মতো কি একেবারেই কেউ ছিলো না? ছিলো, লুজ লং। দীর্ঘকায়, সাদা চামড়া, নীল চোখের অধিকারী এই প্রতিযোগী ১৯৩৬ সালের ৪ঠা আগস্ট লংজাম্পের ট্রায়াল দিতে মাঠে নেমেই ভেঙে দিলেন পুরানো অলিম্পিকের রেকর্ড। স্টেডিয়াম থেকে উচ্ছাসে টগবগ করে ফুঁটে উঠলো জার্মান বাহিনী। সাব্বাশ, এই তো চাই, বাঘের বাচ্চা নাজি উচ্ছাসের বাংলা অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায়। এরপরেই এলেন আমেরিকান ওয়েন্স। যিনি ইতিমধ্যেই তিনটে বিভাগে স্বর্ণ পদকের বিজেতা। মাঠ জুড়ে নীরবতা। ওয়েন্স দৌড়াতে শুরু করলেন। তীর থেকে বেড়ানো ধনুকের মতো ছিটকে এসে লাফ দিলেন নির্দিষ্ট পজিশন থেকেই। বেজে উঠলো রেফারির বাঁশি, ডিস-কোয়ালিফায়েড। উচ্ছাসে ফেটে পড়লো জার্মান সমর্থকেরা। আবার দৌড়ালেন ওয়েন্স, আবার ডিস-কোয়ালিফায়েড। মাঠ জুড়ে হৈ-হৈ, জার্মান সমর্থকেরা ভেবেই নিয়েছেন, এই বিভাগের সোনা তাদের হাতের মুঠোয়। মাঠের মধ্যে হতাশায় মাথা নিচু করে বসে আছেন ওয়েন্স। আর একটা সুযোগ। টেনশনে, জার্মান সমর্থকদের উল্লাসের চাপে তিনি মনোযোগ ফেরাতে ব্যর্থ। ঠিক এই সময়ে ওয়েন্স অনুভব করলেন তার পিছনে এসে কেউ দাঁড়িয়েছেন। মুখ ঘুরিয়ে তিনি দেখলেন, লুজ লং। জার্মান প্রতিযোগী লুজ লং। প্রতিদ্বন্দ্বী লুজ লং। কিন্তু তার চিন্তা ভাবনা মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে লং বলে উঠলেন, 'এই প্রতিযোগিতা তুমি চোখ বন্ধ করে জিততে পারো। একটু পিছন থেকে ঝাঁফ দাও, সহজেই কোয়ালিফাই করবে তুমি। নিশ্চয়ই তোমার মনের মধ্যে ভয় কাজ করছে। তোমার কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই বন্ধু। টেনশন কিসের?'

চিত্রঋণ : Googleউঠে দাঁড়ালেন ওয়েন্স। ফিরে এলেন স্টার্টিং পয়েন্টে। চোখ বন্ধ করে লংয়ের কথা গুলো মনে করলেন, 'এই প্রতিযোগিতা তুমি চোখ বন্ধ করে জিততে পারো...', দৌড়ালেন। লংজাম্পে ওয়েন্স সেবার স্বর্ণ পদক নিয়ে মোট চারটি বিভাগে স্বর্ণ পদক জয়ী হলেন। লং পেলেন লংজাম্প বিভাগে একটি রুপো। নিজের জয় করা চারটে স্বর্ণপদক নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে বললেন, 'এই অলিম্পিকে আমার জয় করা চারটে স্বর্ণ পদকের থেকেও মূল্যবান হলো লুজ লংয়ের বন্ধুত্ব।'

এরপরের সময়কাল ১৯৪৩। বিশ্বযুদ্ধের আবহকালে লুজ লং দেশের হয়ে বাকি সবল পুরুষদের মতোই লড়াই করতে জোরপূর্বক পাঠানো হয়েছে রণক্ষেত্রে। লং কোনও সামরিক বাহিনীর সদস্য ছিলেন না, না ছিলো দেশের হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করার কোনও প্রশিক্ষণ। জুলাই মাসের এক শান্ত বিকালে যখন তার ব্যাটালিয়ন অল্প অল্প করে এগোচ্ছে উত্তর আফ্রিকার মাটি ধরে, ঠিক তখনই তাদের চার পাশ থেকে ঘিরে নেয় আমেরিকান সেনা বাহিনী। মৃত্যু আসন্ন জেনে লং ভয়ভীত হলেন না, বরং তিনি একটা সাদা কাগজ আর পেন নিয়ে চিঠি লিখতে বসলেন প্রিয় আমেরিকান বন্ধু জেসি ওয়েন্সকে,

'জেসি, হয়তো এটাই আমার তোমাকে লেখা শেষ চিঠি। এই মুহূর্তে আমেরিকান সেনা বাহিনী দ্বারা পরিবেষ্টিত আমি এবং আমার সঙ্গীরা। মৃত্যু যে কোনও মুহূর্তে কাছে টেনে নেবে আমায়। আমি তা নিয়ে চিন্তিত নই বিশেষ, বরং এই মুহূর্তে আমার মন উড়ে যাচ্ছে আমার স্ত্রীর কাছে, আমার সদ্যজাত সন্তানের কাছে। সে আমাকে এখনও ঠিকভাবে চেনে না, বাবা বলেও ডাকেনি। জেসি, আর যদি কখনও দেখা না হয়, আমি চাই তুমি যুদ্ধ শেষ হলে জার্মানি এসো, আমার স্ত্রী এর সাথে দেখা করে, আমার সন্তানকে জানিও তোমার আর আমার বন্ধুত্বের ব্যাপারে। ওকে বিশ্বাস করিও মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক দেশ, কাঁটাতার, গায়ের রং, ধর্মের ঊর্ধ্বে।

ইতি,

তোমার ভাই, লুজ।'

চিত্রঋণ : Googleলুজ লং সেদিন মারা যাননি। মারাত্মক চোট আর আঘাত নিয়ে তিনি ভর্তি হন হাসপাতালে। এরপর ১৯৮০ সালের ৩১শে মার্চ তিনি লাং ক্যান্সারে ভুগে মারা যান। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর জেসি আসেন জার্মানি। নিজের বন্ধুর লেখা চিঠির প্রতিটা শব্দ তিনি পালন করেন।

নাজি সভ্যতার উদ্দেশ্যে, জেসি একটা চিঠিতে লিখেছিলেন, 'তোমরা আমার সমস্ত স্বর্ণপদক পুড়িয়ে দিতে পারো, জ্বালিয়ে দিতে পারো সব শংসাপত্র। কিন্তু আমার আর লুজ লংয়ের যে ২৪ ক্যারাটের বন্ধুত্ব, তা কীভাবে ধ্বংস করবে বলতে পারো?'

ক্রীড়া জগতের দুটো মানুষ, জেসি ওয়েন্স আর লুজ লংয়ের এই যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক, তা গোটা বিশ্বের কাছে সম্প্রীতির বার্তা হয়ে খোদিত থেকে গেছে। আসলে, যে মায়াবন দু'জন মানুষ মিলে নিজেদের সম্পর্কে রচনা করতে পারেন, তার থেকে বেশি শাশ্বত আর কীই বা হতে পারে।

তথ্য সূত্র : https://www.independent.co.uk/sport/olympics/jess-owens-anniversary-luz-long-rio-2016-olympics-berlin-1936-nazi-games-7166831.html

লিখেছেন
Amit Patihar
Amit Patihar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

নারী টেস্টে এত অনীহা কেন, লর্ডসের ইতিহাসও বদলাবে না সেই ছবি?

Women’s Test Cricket: লর্ডসে ভারতের নারী ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয় নারী টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বদলানোর সুযোগ এনে দিয়েছে? এত সাফল্য ও জনপ্রিয়তার পরও কেন এই ফরম্যাটে নিয়মিত ম্যাচ নেই?

শিব-পরশুরামের যুদ্ধবিদ্যা কালারিপায়াট্টু থেকেই জন্ম কুংফুর!

Kalaripayattu Indian Martial Art: ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যে কালারিপায়াট্টুকে স্রেফ যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখা হয়নি, বরং এটিকে মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রাণশক্তিকে জাগিয়ে তোলার এক মহান সাধনা বলে মনে করা হয়।

দু'হাজার বছর পুরনো ‘আত্য পাত্যা’: এই খেলাই শিখিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল!

Atya Patya Traditional Indian Game: আনুমানিক ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত প্রাচীন তামিল সাঙ্গম সাহিত্য ‘নাটতৃণৈ’-তে এই খেলার প্রথম লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, এই খেলার বয়স প্রায় দুই হাজার বছরেরও বেশি। সেখানে বলা আছে, প্রাচীন চোল রাজবংশের সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে নিজেদের ক্ষিপ্রতা, দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষমতা আর শরীরকে এক নিমেষে বাঁকানোর চপলতা বাড়াতে এই খেলায় মেতে উঠত।

১৬ বছর পর ফের ভারতের পথে ললিত মোদী

Lalit Modi return to India: দীর্ঘ সময় পর দিল্লির আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আর্থিক অনিয়মের বড় অভিযোগ ও জরিমানা বাতিল করে দেওয়ার পরেই এই আলোচনার সূত্রপাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ললিত মোদী নিজেই স্পষ্ট করেছেন, সমস্ত বড়সড় আইনি জটিলতা কাটার পর ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭-এর শুরুতেই ফের তিনি ভারতে পা রাখতে চলেছেন।

গোলের আড়ালে ঘৃণার খেলা: ২০২৬ বিশ্বকাপে ট্রাম্প, ফিফা আর ফুটবলের পরাজয়

Trump FIFA World Cup: এই বিশ্বকাপ শুধুই একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; মাঠের লড়াই ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, বর্ণবিদ্বেষ এবং বাণিজ্যিক আধিপত্যের এক জটিল ময়দান।

একটা রাজপুত্তুর যার মুকুট হারিয়ে গিয়েছে

Lionel Messi Retirement: তিনটে ফাইনালের বোঝা। একে একে ছেড়ে যায় সহযোদ্ধারা। রক্তাক্ত মাসচেরানো চলে যান, কুন আগুয়েরোর অসুখ... তবু লিও পড়ে থাকে, আমরা পড়ে থাকি আর কিছুদিন। বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজন ছিল একজন স্ক্যালোনির, তিনি সেটুকু সেতু নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। আমরা অপেক্ষা করলাম লুসাইলে। আমরা তো কবেই হেরে গিয়েছিলাম, সৌদি আরব শুধু চিনিয়ে দিয়েছিল আশপাশটা।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: যেভাবে ১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হল ফুটবল

FIFA Revenue 2026: 'কুইন্টেট প্রাইভেট ব্যাংক'-এর সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অনুঘটক হওয়ার চেয়ে বিশ্বকাপ আসলে একটি শক্তিশালী স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক উদ্দীপক হিসেবেই বেশি কাজ করে। ফিফা, সম্প্রচারকারী সংস্থা, স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড এবং আতিথেয়তা (হসপিটালিটি) ক্ষেত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করলেও, কোম্পানির শেয়ারের দামে সেই ইতিবাচক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে রাখা বেশ কঠিন।

যখন ইউরোপে নারীরা গৃহবন্দি, তখন অসমে মেয়েরা খেলছিলেন ধোপখেল

Dhop Khel Assam: আহোম রাজাদের রাজপ্রাসাদ থেকে বিহুর মেঠো মাঠ—অসমের মাটিতে একসময় গমগম করত ধোপখেলের আওয়াজ। ফুটবল, কাবাডি আর দূরন্ত নিশানার এই অদ্ভুত রোমাঞ্চকর খেলাটি শুধু পুরুষদের বীরত্ব প্রমাণের লড়াই ছিল না; যখন ইউরোপে নারীদের জীবন ছিল চার দেওয়ালে বন্দি, তখন অসমে মেয়েরাও মাঠে নেমে মেতে উঠতেন ধোপখেলে।