মা’ নিনি উৎসব এবং মৃত মানুষদের ঘরে ফেরা!

Arunima Mukherjee
৩ মিনিট
মা’ নিনি উৎসব এবং মৃত মানুষদের ঘরে ফেরা!

এই পৃথিবীর বুকে এমন অনেক কিছুই ঘটে থাকে যা মানুষের চিরাচরিত জ্ঞানের বাইরে। যা মানুষের মনে বিস্ময় জাগায়। এমন কিছু যার উত্তর বিজ্ঞান‌ও দিতে পারে না। এই পৃথিবীর যা কিছু মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে উপলব্ধি করতে অক্ষম , তা থেকেই অনেক সময় জন্ম নেয় এক অজানা ভীতির। যুগ যুগ ধরে মানষের মনে, মৃত‍্যু-পরবর্তী কল্পিত জগৎকে ঘিরে আজ‌ও এক ভীতি সম্পূর্ণরূপে বিদ‍্যমান। তাই তো কখনো মৃত ব‍্যক্তির আত্মার শান্তির জন‍্য আবার কখনও তাদের চিরতরে নিজ জীবন থেকে বিতাড়িত করার জন‍্য গোটা পৃথিবীতে নানান আচার-অনুষ্ঠান পালিত হতে দেখা যায়। আজ ইন্দোনেশিয়ার এমন এক রীতির কথা শোনাবো যেখানে মানুষ, মৃত‍ ব‍্যক্তিকে ভয় নয়, বরং তাদের নিজগৃহে ফিরিয়ে আনেন নির্দিষ্ট সময় অন্তর। আশা করি, রোমাঞ্চ প্রিয় মানুষদের এই আচার-রীতি বিশেষভাবে আকর্ষণ করবে।

দক্ষিণ ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থিত সুলায়েসি (Sulawasi Island) নামে পর্বত ঘেরা এক ছোট্ট দ্বীপ। এই দ্বীপেই টানা টোরাজা (Tana Toraja) নামক এক স্থানে বসবাস করে টোরাজা উপজাতি । ইন্দোনেশিয়ার বসবাসকারী মোট টোরাজা উপজাতির অর্ধেকের বেশি মানুষ থাকেন পবর্তঘেরা এই অঞ্চলে। এই টোরাজা জাতির এক বিস্ময়কর অনুষ্ঠানের নাম মা’নিনি ফেস্টিভ্যাল (Ma'nene Festival)। মা’নিনি শব্দের অর্থ হল ‘ শবদেহ পরিষ্কার- পরিচর্যার উৎসব’ (Ceremony of cleaning corpses)। এই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষেরা মূলত খ্রিস্টান অথবা ইসলাম ধর্মাবলম্বী। কিন্তু এই ধর্মের ঊর্ধ্বে গিয়েও কিছু সংখ‍্যক মানুষ এখন‌ও পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করে এই মা’নিনি ফেস্টিভ্যাল পালন করে চলেছেন। টোরাজান মানুষেরা মনে করেন, মৃত‍্যুই জীবনের অন্তিমপর্ব নয় । বরং মৃত‍্যুতেই মানুষের এক নতুন পথ চলা শুরু করে আধ‍্যাত্মিক জীবনের পথে পা রাখে মানুষ।

এবার আসা যাক, এই উৎসবের একেবারের গোড়ার কথায়। বহু শতাব্দী পূর্বে, পং রুমশেক নামক এক পশু শিকারি পাহাড়ী এক গাছের তলায় এক পচা-গলা মানব দেহের সন্ধান পান। তিনি সেই দেহটাকে সযত্নে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করেন এবং দেহটিকে কবর দে‌ন। পরবর্তীকালে এই মানুষটির সৌভাগ্যপ্রাপ্তি ঘটে। এই ঘটনা থেকেই টোরাজান মানুষদের মনে হতে শুরু করে, হয়তো এভাবেই কোন শবদেহের পরিচর্যা করলে তাদের আর্শীবাদে সৌভাগ‍্য যোগ ঘটে। এই থেকেই ইন্দোনেশিয়ার টানা টোরাজান অঞ্চলে শুরু হয় মা’নিনি উত্সব। প্রতি তিনবছর অন্তর অগস্ট মাসে, শস‍্য কাটার পর এই উৎসব উদযাপন করা হয়ে থাকে। এই উৎসবে কবর খুঁড়ে বের করা হয় কফিন। তারপর, কফিনে থাকা মমিস্বরূপ দেহগুলিকে পরিচর্যা করা হয়ে থাকে। মনে করা হয়ে থাকে, ইন্দোনেশিয়ায় প্রতি তিনবছর পর ঘরে ফেরে মৃত প্রিয়জনেরা। প্রিয়জনদের প্রিয় কোন খাবার কিংবা কোন প্রিয় বস্তু তাদের মৃতদেহের পাশে সাজিয়ে পরিবেশন করা হয়ে থাকে। তাদের নিজের পছন্দের জিনিসগুলি দিয়ে সাজানো হয়ে থাকে, তালিকায় বাদ পড়ে না মাদক দ্রব‍্য‌ও। এই উৎসব টোরাজানদের জীবনে খুব‌ই আনন্দের এবং ব‍্যয়সাপেক্ষ‌ও বটে। মৃত‍্যুর পরবর্তী এই উৎসব যাতে পরিবারের মানুষেরা নির্বিঘ্নে পালন করতে পারে তাই বহু মানুষ নিজের জীবদ্দশায় যথাসম্ভব অর্থসঞ্চয় করে যান। পর্বতে ঘেরা এই জায়গায় মানুষগুলি আর্থিকভাবে বিশেষ স্বচ্ছল নয়। জানলে অবাক লাগে, মৃত‍্যুর প‍র ঠিকভাবে যেন প্রিয় মানুষদের কবর দেওয়া হয় তাই পর্যাপ্ত অর্থ জোগাড় হ‌ওয়া পর্যন্ত মৃতদেহকে দীর্ঘদিন অবধি নিজগৃহে‌ই রাখা হয়। মৃতদেহগুলির পচন ক্রিয়া হ্রাস ঘটানোর জন‍্য একাধিক স্তরে কাপড় জড়িয়ে রাখা হয়। এই অঞ্চলে কখনও পাহাড়ের গুহায় কিংবা কখনও পাহাড় কেটে কফিনগুলোকে রাখা হয়। কখনোবা কফিনগুলিকে পাহাড়ের গায়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তাঁরা মনে করেন , কফিনবন্দী দেহগুলি আসলে গভীর নিদ্রায় মগ্ন কিংবা কোন গুরুতর অসুস্থ । তাই এই দেহগুলিকে পাহারা দেওয়ার জন‍্য কাঠের নির্মিত এক পাহারাদার রাখা হয়। কাঠ দ্বারা নির্মিত এই পাহারাদারদের বলা হয় ‘তাও তাও’ ( Tao Tao) । টোরাজানরা জীবনের বেশিরভাগ সময় যেখানে অতিবাহিত করেন, সেখানেই তাদের কবর দেওয়ার ব‍্যবস্থা করা হয়। মৃতব‍্যক্তিদের উৎসর্গ করে বলি দেওয়া হয় অসংখ‍্য ষাঁড় এবং মহিষ। তারা বিশ্বাস করেন এই উৎসর্ণগীকরণ মৃত ব‍্যক্তিদের শান্তি দেবে । এর সঙ্গেই উঠে আসে আরো এক নীতি, টোরাজানরা শুধু এই মহিষ কিংবা ষাড়দের বলিই দেন না বরং তারা নিজের বাড়িতে এই মৃত পশুর শিংগুলিকে সংগ্ৰহ করেন। তাঁদের বিশ্বাস যাঁর গৃহে যত শিং সঞ্চিত থাকবে তারা তত বেশি করে সৌভাগ‍্যের এবং পূণ্যের অধিকারী হবেন

বর্তমানে তিনবছর অন্তর উদযাপিত হ‌ওয়া মা’নিনি উৎসব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষদের আকর্ষণ কেড়েছে। বিভিন্ন দেশের মানুষ আজ তাই এই অনুষ্ঠান চাক্ষুস করার উদ্দেশ‍্যে সেখানে যেতে শুরু করেছেন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা মানুষের ভিড়ে, টোরাজান জাতি সময়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে মানুষ আজ নিজেদের আচার–অনুষ্ঠান ঝেড়ে ফেলে আধুনিকতার পথে পা মিলিয়েছে, এই আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষগুলি আজ‌ও পূর্বপুরুষের দেখানো পথেই হেঁটে চলেছেন দীর্ঘ একশো বছর ধরে অন‍্য। মানুষদের কাছে এই অনুষ্ঠান ভীতির উদ্রেক ঘটালেও টোরাজানদের কাছে অত‍্যন্ত আনন্দের এবং প্রিয়জনকে আরও একবার কাছে ফিরে পাওয়ার...

তথ্যসূত্র:-

elitereader.com

http://curlytales.com

roadsandkingdoms.com

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?