একজন সাংবাদিকের ৩ বছরের গবেষণায় তৈরি হলো বছরের সবচেয়ে সফল ওয়েব সিরিজ
Made in India A Titan Story: আমাজন এমএক্স প্লেয়ারে (Amazon MX Player) রিলিজ হওয়া ৬ এপিসোডের এই সিরিজটি মাত্র তিন সপ্তাহেই বাজিমাত করেছে। ওরম্যাক্স মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, ১ কোটি ৩৭ লক্ষেরও বেশি ভিউ নিয়ে এটি এই বছরের অন্যতম সফল এবং সবচেয়ে বেশি দেখা ভারতীয় ওয়েব সিরিজ হয়ে উঠেছে।
সত্তর-আশির দশক। এক বিখ্যাত সুইস ঘড়ি নির্মাতা কোম্পানি জেআরডি টাটাকে অহংকার করে বলেছিল, " ভারতীয়রা সুইসদের মতো এত উন্নত প্রযুক্তি সামলাতে পারবে না"। ব্যাস অমনি জেদ চেপে যায় তাঁর মধ্যে। যতদিন না ভারত নিজের ক্ষমতায় বিশ্বমানের ঘড়ি তৈরি করছে, ততদিন তিনি নিজে হাতে কোনো ঘড়িই পরবেন না, তিনি পণ করেছিলেন। সেই থেকেই জন্ম আমাদের সবার চেনা ব্র্যান্ড—‘টাইটান’-এর।
আর বাস্তব জীবনের এই টানটান, রোমাঞ্চকর এবং দেশ গড়ার গল্প নিয়েই ২০২৬ সালের ওটিটি দুনিয়ায় আসে একটি নতুন ওয়েব সিরিজ—‘মেড ইন ইন্ডিয়া: আ টাইটান স্টোরি’ (Made in India: A Titan Story) এবং এসেই রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছে । আমাজন এমএক্স প্লেয়ারে (Amazon MX Player) রিলিজ হওয়া ৬ এপিসোডের এই সিরিজটি মাত্র তিন সপ্তাহেই বাজিমাত করেছে। ওরম্যাক্স মিডিয়ার (Ormax Media) রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রথম তিন সপ্তাহেই ১ কোটি ৩৭ লক্ষেরও বেশি ভিউ নিয়ে এটি এই বছরের সবচেয়ে বেশি দেখা এবং সফল ভারতীয় ওয়েব সিরিজ হয়ে উঠেছে।
মারপিট, ক্রাইম থ্রিলার বা গ্ল্যামারের চেনা ছক ভেঙে এক্কেবারে ছিমছাম, অনুপ্রেরণামূলক এক কর্পোরেট লড়াইয়ের গল্প নিয়ে তৈরি এই সিরিজ।এবং এর পর্দায় আসার নেপথ্যে রয়েছেন চেন্নাইয়ের একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক এবং তাঁর দীর্ঘ তিন বছরের কঠোর পরিশ্রম।

যেভাবে তৈরি হলো মূল ভিত্তি
২০১৮ সাল। প্রকাশিত হয় একটি বই—‘টাইটান: ইনসাইড ইন্ডিয়াস মোস্ট সাকসেসফুল... ব্র্যান্ড’। বইটির লেখক বিনয় কামাথ, অর্থনৈতিক সংবাদপত্র ‘দ্য হিন্দু বিজনেসলাইন’-এর অ্যাসোসিয়েট এডিটর।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
‘অদম্য’ হলো বাংলার মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে আসা এক বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পাস করা বেকার যুবকের কমরেড হয়ে গড়ে ওঠার গল্প। পরিচালক রঞ্জন ঘোষ এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে পুঁজিবাদী সরকার ভোটের সময়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নেয় এবং তারপর দেশের মানুষকে পুঁজির চাকা দিয়ে পিষে মারে।
বিনয় কামাথ ১৯৮৯ সাল থেকেই টাইটান কোম্পানিকে খুব কাছ থেকে দেখছেন। নিজের নিয়মিত সাংবাদিকতার কাজের পাশাপাশি তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন মানুষের দুয়ারে। উদ্দেশ্য— তিনি মানুষের গল্প বলতে চান। তাই বোর্ডরুমের বড় বড় মাথা থেকে শুরু করে ব্যাকরুমের সাধারণ কর্মী—যারা রক্তজল করে টাইটানকে নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন, তাঁদের সকলের সঙ্গে সামনাসামনি বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইন্টারভিউ নিয়েছেন। টাইটানের প্রতিষ্ঠাতা জারক্সিস দেশাইয়ের পাশাপাশি অনিল মাঞ্চান্দা, ভাস্কর ভাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের স্মৃতিচারণ উঠে এসেছে তাঁর এই গভীর ও দীর্ঘ কথোপকথনে।
তিনি বইটিতে টাইটানের শুধু সাফল্যের গল্প লেখেননি; লিখেছেন কোম্পানির শুরুর দিকের ধাক্কা, লাইসেন্স রাজের সরকারি লাল ফিতের ফাঁস (MRTP Act), ঋণের বিপুল চাপ এবং নব্বইয়ের দশকে ইউরোপের বাজারে ঘড়ি লঞ্চ করতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ার কথাও।
বইয়ের পাতা থেকে ওটিটির পর্দা
২০২২ সাল। ‘অলমাইটি মোশন পিকচার্স’-এর প্রযোজক সুনীল বোহরা ও প্রভলীন সান্ধু এই বইটির স্বত্ব কিনে নিলেন। বিনয় কামাথ এই সিরিজের চিত্রনাট্য লেখেননি, তবে পরিচালনায় তাঁর সংগৃহীত ঘটনাগুলিকেই পরম যত্নে ব্যবহার করা হয়েছে।
দর্শকরা যখন সিরিজটি দেখে আবেগতাড়িত, তখন বিনয়বাবু নিজেও ভীষণ আপ্লুত। তাঁর মতে, বইয়ের পাতায় তিনি যে ঘটনাগুলি লিখেছিলেন—তা সে জেআরডি টাটার সেই অপমান হোক বা কনসার্ট থেকে মোজার্টের সুরের অনুপ্রেরণা—সেগুলি ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে এসে যেন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Family Man season 3 review: বিশ্বাসঘাতক গুপ্ত শত্রুদের মাঝে একজন প্রকাশ্য ভিলেন রুকমা। গল্পের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় চরিত্র। গল্পে 'ভিলেন' হলেও রুকমা ঘৃণা কুড়োয় না।
পরিচালক রবি গ্রেওয়ালের নিখুঁত পরিচালনায় এবং করণ ব্যাসের চমৎকার লেখনীতে এই সিরিজটি সত্তর ও আশির দশকের বোম্বে এবং তামিলনাড়ুর হোসুর শহরের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে। সেই সময়ে ভারতের ঘড়ির বাজারে রাজত্ব করত সরকারি সংস্থা এইচএমটি (HMT), আর ফ্যাশনেবল ঘড়ির জন্য মানুষ তাকিয়ে থাকত স্মাগলারদের এনে দেওয়া বিদেশি ঘড়ির দিকে।
এই সময় টাইটানের প্রথম ম্যানেজিং ডিরেক্টর জারক্সিস দেশাই একটি স্বপ্ন দেখেন। অক্সফোর্ডে পড়া এই মার্জিত রুচির মানুষটি নিজে কোনো মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না, কিন্তু তাঁর ছিল জহুরির চোখ। তিনি দেশ-বিদেশ থেকে সেরা প্রতিভাদের খুঁজে এনে একটি টিম তৈরি করেন এবং ভারতে প্রথমবার ‘কোয়ার্টজ’ (Quartz) প্রযুক্তির আধুনিক ঘড়ি নিয়ে আসেন।
পুরনো দিনের বোম্বের পরিবেশ, আর্কাইভাল ফুটেজ আর রেট্রো হিন্দি গান এবং টাটা গ্রুপের সদর দপ্তর ‘বোম্বে হাউস’, টাইটানের আসল হোসুর ফ্যাক্টরির ভিতরে দৃশ্যায়ন— সব মিলিয়ে এই সিরিজ যেন সত্যি সত্যিই পৌঁছে দেয় সেই সময়ের টাইটানের অন্দরমহলে।
জারক্সিস দেশাইয়ের চরিত্রে জিম সর্ভ এক কথায় অনবদ্য। একজন দূরদর্শী, জেদি, আবেগপ্রবণ লিডারকে তিনি পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছেন। মেন্টর ও ফাদার ফিগার জেআরডি টাটার চরিত্রে নাসিরুদ্দিন শাহ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ গাম্ভীর্য ও আভিজাত্য দিয়ে দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন। সহ-অভিনেতা বৈভব তত্ত্ববাদী (আকাশ দীক্ষিতের চরিত্রে), নমিতা দুবে বা কাভেরী শেঠ—প্রত্যেকেই ভীষণ সাবলীল।
ওগিলভি অ্যান্ড ম্যাথারের তৈরি করা মোজার্টের ২৫ নম্বর সিম্ফনি থেকে অনুপ্রাণিত টাইটানের সেই আইকনিক টিউনটি যেভাবে তৈরি হয়েছিল—তা যখন পর্দায় আসে, তখন দর্শকের গায়ে কাঁটা দেয়।
টাটা ও টাইটানের সেই জাদুকরী কৌশল
টাইটান আসার আগে ঘড়ি ছিল শুধুই সময় দেখার একটা দরকারি যন্ত্র। টাইটান এসে ভারতীয়দের শেখাল, ঘড়ি আসলে একটা ‘লাইফস্টাইল’ বা ফ্যাশনের অঙ্গ। এই সিরিজ তা দেখায় দেখায়। এবং এটিই সিরিজের মূল আকর্ষণ।
তারা প্রতিটি মানুষের জন্য আলাদা ব্র্যান্ড তৈরি করল—নারীদের আভিজাত্য প্রকাশের জন্য ‘রাগা’, তরুণ প্রজন্মের জন্য ‘ফাস্ট্র্যাক’, আর কম বাজেটের জন্য ‘সোনাটা’। পরবর্তীতে তারা গয়নার বাজারে নিয়ে আসে ‘তানিষ্ক’। টাইটান ঘড়িকে যেকোনো উৎসবে উপহার দেওয়ার সবচেয়ে সেরা মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে— “Rediscover the joy of gifting”—এর মাধ্যমে।
টাটা গ্রুপ বরাবরই ভারতের মানুষের কাছে এক বিশ্বাসের নাম। আজ টাইটান মার্কেট ক্যাপিটালের দিক থেকে টাটা গ্রুপে টিসিএস (TCS)-এর পরেই স্থান করে নিয়েছে। ‘মেড ইন ইন্ডিয়া: আ টাইটান স্টোরি’ শুধু একটা কোম্পানির এগিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটা আসলে ভারতীয় মেধা, জেদ এবং আত্মনির্ভরতার গল্প।







