‘অদম্য’ দেখায় কেন আজও যুবসমাজ ক্ষুব্ধ
‘অদম্য’ হলো বাংলার মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে আসা এক বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পাস করা বেকার যুবকের কমরেড হয়ে গড়ে ওঠার গল্প। পরিচালক রঞ্জন ঘোষ এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে পুঁজিবাদী সরকার ভোটের সময়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নেয় এবং তারপর দেশের মানুষকে পুঁজির চাকা দিয়ে পিষে মারে।
বাংলা চলচ্চিত্রের এই অকালসময়ে সুকান্ত ভট্টাচার্যের 'দেশলাই কাঠি' কবিতা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে প্রগতিশীল পরিচালক রঞ্জন ঘোষের চলচ্চিত্র 'অদম্য'। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বর্তমান বাংলার যুবসমাজের না-বলা কথা এবং মনের ক্ষোভকে পর্দায় তুলে ধরা হয়েছে।
আজ যখন সারা বাংলায় একের পর এক সিঙ্গল স্ক্রিন হল বন্ধ করে সেগুলিকে পুঁজির নিয়ন্ত্রণে মাল্টিপ্লেক্সে রূপান্তর করা হচ্ছে, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে সাধারণ মানুষের বিনোদনের অধিকার নিয়ে। মাল্টিপ্লেক্সের টিকিটের দাম অতিরিক্ত বেশি হওয়ার কারণে সিনেমা আজ সাধারণ মধ্যবিত্তের হাতের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে। এর ফলে ধীরে ধীরে বাংলা চলচ্চিত্রের কোমর ভেঙে যাচ্ছে।
এর পাশাপাশি আর একটি বড় সংকট তৈরি করেছে পুঁজিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে নিয়ন্ত্রিত সেন্সর বোর্ড এবং মাল্টিপ্লেক্সের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা। এই পরিকাঠামো প্রগতিশীল, রাজনৈতিক ও সমাজকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রগুলিকে প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নানা বাধার সৃষ্টি করছে। অনেক সময় সেন্সর বোর্ড থেকে অনুমোদন মিললেও, পর্দার পিছনের বিভিন্ন রাজনৈতিক কৌশল ও প্রভাবের কারণে এই ধরনের স্বাধীন চলচ্চিত্রগুলি হলের পর্দায় দেখাতেই দেওয়া হয় না।
সব বাধা পেরিয়ে পরিচালক রঞ্জন ঘোষ, উপস্থাপক অপর্ণা সেন এবং প্রযোজনা সংস্থা অরোর ফিল্ম কর্পোরেশন, চ্যানেল বি এন্টারটেইনমেন্ট ও কাইনেটোস্কোপ ফিল্মস এবং তাঁদের সমগ্র দল এই চলচ্চিত্রটি আমাদের সবার সামনে তুলে ধরেছেন।
‘অদম্য’-এর শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা ছিল বড় ঝুঁকি, সীমিত সরঞ্জাম এবং অদম্য সংকল্পে পরিপূর্ণ এক সত্যিকারের অভিযান। দলটি গ্রামাঞ্চল এবং সুন্দরবনের মতো শান্ত জায়গায় শুটিং করেছিল, যেখানে স্থানীয়রা সতর্ক করার আগে তারা জানতই না যে কাছেই কুমিরভর্তি একটি নদী আছে। এমনকী এ কথা জানার পরেও তারা শুটিং থামায়নি; শুধু গ্রামবাসীদের দ্বারা নিরাপদে উদ্ধার হওয়ার অপেক্ষায় ছিল।
শুটিংয়ের দিনগুলিতে তারা যেখানে থাকত, সেই জায়গাগুলি ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। গ্রামবাসীদের বাড়িতে গাদাগাদি করে থাকতে হতো সবাইকে, কখনও কখনও মাটিতে ঘুমাতে হতো, এমনকী ঘরের ভিতরে সাপও ঢুকে পড়ত। প্রায় কোনো দামি সরঞ্জাম ছাড়াই, শুধু একটি ক্যামেরা আর সূর্যের আলো নিয়ে চার মাস ধরে শুটিং চলেছিল। প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হয়েছিল এবং অনেক অপ্রত্যাশিত মুহূর্ত শেষ পর্যন্ত সিনেমার অংশ হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে, এটি ছিল একটি কঠিন, বাস্তব এবং সাহসী অভিজ্ঞতা, যা ‘অদম্য’ নামের আসল অর্থের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।
‘অদম্য’ হলো বাংলার মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে আসা এক বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পাস করা বেকার যুবকের কমরেড হয়ে গড়ে ওঠার গল্প। পরিচালক রঞ্জন ঘোষ এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে পুঁজিবাদী সরকার ভোটের সময়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নেয় এবং তারপর দেশের মানুষকে পুঁজির চাকা দিয়ে পিষে মারে। দেশে কৃত্রিম বেকারত্ব তৈরি করে নিজেদের পুঁজি বৃদ্ধি করা, চাকরি বিক্রি বা অন্য কোনো সরকারি দুর্নীতি, এমনকী নারী নির্যাতনের মতো বাস্তব বিষয়গুলিও এই ছবিতে রাজনৈতিক সততার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
একদিকে রবীন্দ্রসদন বা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস, যেগুলি এখন প্রোসেনিয়াম থিয়েটারের মূল কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে সেই একই চত্বরে অবস্থিত রানু ছায়া মঞ্চ, যা একটি উন্মুক্ত পারফরম্যান্স স্পেস হওয়া সত্ত্বেও নাগরিক নজরে প্রায় অদৃশ্য। অথচ সাম্প্রতিক ‘রিক্লেইম দ্য নাইট’ আন্দোলনের সময় এই চত্বরটিই হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদ, গান, কবিতা ও শরীরী উপস্থিতির এক বিকল্প মঞ্চ।
গল্পের প্রধান চরিত্র এক ২৩ বছরের স্নাতকোত্তর পাস করা বেকার যুবক, যে এই সব দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিপ্লব করতে ঘর ছেড়েছে। নাম তার কমরেড রুদ্র। ঘরে তার বিধবা মা, খালি পেটে স্নাতকোত্তরের শংসাপত্র, আর চোখে এক দুর্নীতিমুক্ত সমাজের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন সফল করতে সে পাড়ি দিয়েছে বাংলার পাহাড় আর সুন্দরবনের ঘন জঙ্গলে।
চলচ্চিত্রটি শুরু হয় কমরেড রুদ্রের এক দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ড দিয়ে, যেখানে সে এক দুর্নীতিগ্রস্ত ও জনগণের শত্রু নেতাকে গুলি করে বাইকে চড়ে পালিয়ে যাচ্ছে এক অজানা বিপ্লবের পথে। এই ছবি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং এক চরম সংকটের গল্প। গল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পরিচালক শুধু বিপ্লবের রাজনৈতিক দিকই নয়, বরং এক বিপ্লবীর মায়ের বুক-ফাটা যন্ত্রণা ও মানবিক দিকটিও অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছেন।
এই চলচ্চিত্রে কমরেডদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, টিকে থাকার সংগ্রাম এবং আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাই মূল সুর হয়ে ওঠে। কলকাতা থেকে পালিয়ে সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে আশ্রয় নেয় কমরেড রুদ্র। সুন্দরবনের গভীর রাতের অন্ধকারে পুঁজিবাদী শক্তির দালাল পুলিশ ও গুন্ডাদের বিরুদ্ধে মাত্র একটি রিভলভার আর একটি ছুরি নিয়ে তার যে লড়াই, এবং সেই সঙ্গে প্রকৃতির নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম—এই সবকিছু মিলেই ছবিটিকে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
এই চলচ্চিত্র বারবার ১৯৪০ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ১৯৪০ থেকে ২০২৬ সালের যুবসমাজের না-বলা কথা একসূত্রে মিলে গিয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে আজও যা একইভাবে প্রবাহমান। বর্তমান পুঁজিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকা সমাজে বেকারত্ব, বাকস্বাধীনতার অভাব এবং শ্রেণি বা জাতি বিভাজনের বিরুদ্ধে বামপন্থী আন্দোলনই যে একমাত্র মুক্তির পথ, তা-ই যেন এই চলচ্চিত্রের দ্বারা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই সিনেমা বর্তমান যুবসমাজকে গর্জে ওঠার মৃতসঞ্জীবনী দেওয়ার পাশাপাশি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পিঠে এক চরম বেত্রাঘাত।
চলচ্চিত্রটিতে বারবার কমরেড রুদ্রের সংলাপে উঠে এসেছে, "দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলার স্বপ্ন, ভয় নয়।" সিনেমার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী সংলাপ—
মারছ যাদের ইচ্ছেমতো জলকামান আর পায়ের তলায়,
ওরাই তোদের বাঁচিয়ে রাখে—আধপেটা খায়, ফসল ফলায়।
এই সংলাপই ছবির রাজনৈতিক মর্মবাণীকে স্পষ্ট করে। এটি দেখায় যে, রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণির দমননীতির বিপরীতে শ্রমজীবী মানুষের অস্তিত্বই সমাজকে টিকিয়ে রাখে। 'অদম্য' সেই নির্মম বাস্তবতাকেই সামনে আনে, যেখানে উৎপাদক শ্রেণি শোষিত এবং ভোগকারী শ্রেণি ক্ষমতার আসনে প্রতিষ্ঠিত।
'অদম্য' শুধুই আলোড়ন সৃষ্টিকারী চলচ্চিত্র নয়, এটি যেন বিপ্লবের ফিনিক্স পাখির ডানা ঝাপটানি, যা নতুন প্রজন্মকে প্রশ্ন করতে শেখায় এবং প্রতিরোধ গড়ার অদম্য প্রয়াস জোগায়। এখানে ১৯৪০ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে একসূত্রে গাঁথা হয়েছে, যেন স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি এবং বর্তমান বাস্তবতার দ্বন্দ্বকে পাশাপাশি দাঁড় করানো যায়। ছবির মূল ভাবনা আরও স্পষ্ট হয় পলাশ নামের এক সমাজচ্যুত তরুণের যাত্রার মাধ্যমে। শহুরে জীবন, আধুনিকতা ও সামাজিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে ধীরে ধীরে শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে জঙ্গল এবং শেষে সমুদ্রতীরে পৌঁছয়, যা তার মানসিক ও অস্তিত্বগত পালানোর এক বড় প্রতীক।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন বাংলা শিশুসাহিত্য মূলত বর্ণপরিচয় বা নীতিশিক্ষার কঠোর আবহে বন্দি ছিল, তখন উপেন্দ্রকিশোর সেখানে নিয়ে এলেন একরাশ মুক্ত বাতাস। তাঁর ‘টুনটুনির বই’, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ বা পৌরাণিক কাহিনিগুলি কেবল নিছক গল্প নয়; বরং সেগুলি সমকালীন সমাজ-রাজনীতি এবং মানব মনের জটিল ক্রিয়াকলাপের এক শৈল্পিক প্রতিফলন।
পলাশ বা কমরেড রুদ্রের এই পথচলা ফরাসি চলচ্চিত্রের বিখ্যাত চরিত্র অ্যান্তোয়েন ডইনেলের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে সমাজের সঙ্গে বেমানান মানুষদের একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা ফুটে ওঠে। সময় পাল্টালেও সমাজের মূল স্রোতের বাইরে থাকা মানুষদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আজ আদৌ বদলায়নি। তাদের কখনও বিদ্রোহী, কখনও বা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বাস্তব জীবনের কিছু নিখোঁজ বা দমিত কণ্ঠের উদাহরণ দিয়ে এই দমন-পীড়নের প্রসঙ্গ ছবিতে আরও জোরালো করা হয়েছে।
পরিচালক রঞ্জন ঘোষ তাঁর সিনেমাটোগ্রাফির মাধ্যমে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন আজকের পুঁজিবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতি কীভাবে এক প্রকার 'সমাজ ধ্বংসের খেলা'-য় পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ জনগণ কেবলই কিছু পরিসংখ্যান। এই নির্মম প্রেক্ষাপটে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের 'দেশলাই কাঠি'-র প্রতীকী শক্তি যেন 'কমরেড রুদ্র' চরিত্রে নতুন করে জন্ম নিয়েছে। সে এমন একটি স্ফুলিঙ্গ, যা যেকোনো মুহূর্তে দাবানলে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা বহন করে।
সিস্টেমের রাক্ষসগুলিকে শেষ করতে নেমেছে সে—
কোনোভাবেই ধরা পড়ব না, কমরেড প্রশ্নই ওঠে না।
এই সংলাপের দ্বারা পরিচালক রঞ্জন ঘোষ আসলে প্রতিফলিত করেছেন সংগ্রামী চেতনা, জেদ এবং বিপ্লবী সাহসের এক অনন্য মিশ্রণ। 'কমরেড রুদ্র' বা পলাশ কেবল একটি সাধারণ চরিত্র নয়; সে একটি জোরালো রাজনৈতিক প্রতীক এবং রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতিমূর্তি। এই ছবির 'কমরেড রুদ্র' যেন নতুন প্রজন্মের কমরেডদের জন্য এক 'ডিজিটাল দেশলাই কাঠি', যা প্রতিটি সচেতন মানুষকে প্রশ্ন করতে, প্রতিবাদ করতে এবং সংগঠিত হতে আহ্বান জানায়। চলচ্চিত্রটি সমাজের সামনে বারবার আয়না তুলে ধরে বৈষম্যের নির্মম বাস্তবতাকে দেখিয়ে দেয়।
চলচ্চিত্রটি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচার না করেও স্পষ্টভাবে শ্রেণিবিভাজন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় ভণ্ডামিকে উন্মোচন করেছে। ভোটের আগে শাসকশক্তির দেওয়া খাদ্য, কাজ বা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি যে আসলে এক প্রহসন, ভোট শেষ হতেই সেই প্রতিশ্রুতি ভেঙে পড়ার বাস্তব চিত্র এখানে স্পষ্ট। একদিকে পুঁজিপতিদের হাতে পুঞ্জীভূত সম্পদ, অন্যদিকে প্রান্তিক মানুষের চরম বঞ্চনা—এই দ্বৈত বাস্তবতাই ছবির কেন্দ্রীয় সংঘাত। আদিবাসী নির্যাতন, বেকারত্ব এবং ক্ষুধার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলিকে পরিচালক শুধু তুলে ধরেননি; বরং এগুলিকে বৃহত্তর শ্রেণিসংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করেছেন। ফলে 'অদম্য' একটি রাজনৈতিক দলিল হয়ে ওঠে, যেখানে শিল্প ও রাজনৈতিক আদর্শ একীভূত হয়েছে।
'অদম্য' চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত কাজ অত্যন্ত অনবদ্য, যেখানে রাতের অন্ধকারে আলো-ছায়ার সূক্ষ্ম খেলা ছবিটিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। স্রেফ চেনা ছকের সিনেমা নয়, বরং গান ও আরিয়ানের দুর্দান্ত অভিনয়ের যুগলবন্দি এই ছবির মূল শক্তি। আরিয়ানের সিগারেট ধরানো থেকে শুরু করে লড়াইয়ের দৃশ্য, মায়ের প্রতি গভীর ভালবাসা এবং তার সঙ্গে র্যাপ মিউজিকের সংমিশ্রণ যেন এই ছবিটিকে এক নতুন প্রাণ দান করেছে।
ভোটের আগে শাসকশক্তি ভোটের বিনিময়ে সাধারণ মানুষের যা কিছু প্রয়োজনীয়, তা দেওয়ার বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেয়; কিন্তু ভোট মিটে গেলে রাতারাতি তাদের ভোলবদল হয়ে যায়। সমাজের একটা শ্রেণির হাতে তখন দেখা যায় রাশি রাশি টাকার পাহাড়, আর অন্যদিকে প্রান্তিক মানুষগুলি যেই তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই পড়ে থাকে। আদিবাসী নির্যাতন থেকে শুরু করে বেকারত্বের তীব্র জ্বালা—এই ছবির মাধ্যমে সমাজের এক অভাবনীয় ও নির্মম দিক পরিচালক অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন।
সবশেষে বলা যায়, 'অদম্য' কেবল একটি সাধারণ চলচ্চিত্র নয়; এটি এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এবং এক আদর্শিক হস্তক্ষেপ। এই সিনেমা বর্তমান প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়, শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম এখনও শেষ হয়ে যায়নি; বরং নতুন রূপে, নতুন ভাষায় তা প্রতিনিয়ত চলমান।
‘অদম্য’ সিনেমাটি সত্যজিৎ রায়ের ‘গণশত্রু’ ছবির ভাবনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, কারণ দুটি ছবিই দেখায় কীভাবে ক্ষমতাশালী ও ধনী ব্যক্তিরা ভণ্ড হতে পারে এবং অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করতে পারে। ‘গণশত্রু’-তে ডাক্তার অশোক গুপ্ত যেমন একা দাঁড়িয়ে সত্যের জন্য লড়াই করেন, ‘অদম্য’-তেও চরিত্রগুলি অন্যায্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঠিক তেমনই এক সাহসী লড়াই দেখায়। সিনেমা দুটির নির্মাণশৈলী অবশ্য ভিন্ন; ‘গণশত্রু’ অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য সংলাপ, ক্লোজ-আপ শট এবং সাধারণ রঙ ব্যবহার করে, অন্যদিকে ‘অদম্য’ বাস্তব স্থান, প্রাকৃতিক আলো এবং ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্য দেখিয়ে বিষয়টিকে অত্যন্ত বাস্তব ও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। কিন্তু দুটি সিনেমাই আমাদের সাহসী হতে শেখায়, কঠিন পরিস্থিতিতেও সত্যের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়।
এই ছবি দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় ক্রমাগত স্কুল পালানো, কারেকশনাল হোম থেকে পালানো সেই বিখ্যাত চরিত্র ‘অ্যান্তোয়েন ডইনেল’-এর (দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ, ১৯৫৯) কথা। সময় পাল্টালেও সমাজচ্যুত হয়ে অন্য পথে হাঁটার তাগিদ এবং তার পিছনের কারণগুলি আজও জিইয়ে আছে। এই ধরনের মানুষদের আমরা কখনও দলছুট, কখনও বা সমাজবিরোধী, কখনও বিপ্লবী, কখনও আইন অমান্যকারী, আবার কখনও দাগি আসামিও বলে থাকি; রাষ্ট্র বা সমাজ তাদের সহজে মেনে নেয় না। তাদের অনেকেই চিরতরে হারিয়ে যায় জেএনইউ থেকে নিখোঁজ হওয়া নাজিব আহমেদের (১৬ অক্টোবর, ২০১৬ সালে নিখোঁজ) মতো, অথবা তাঁদের স্তব্ধ করে দেওয়া হয় নরেন্দ্র দাভোলকর কিংবা গৌরী লঙ্কেশের মতো করে। এমনকি কোনো বিচার ছাড়াই বছরের পর বছর উমর খালিদ বা শারজিল ইমামের মতো তরুণ বিপ্লবীদের মুখ বন্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
চলচ্চিত্র যদি সমাজের আয়না হয়, তবে সেই আয়নাকে রক্ষা করার দায়িত্ব তো আমাদেরই। কিন্তু বর্তমানের এই স্বৈরতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে, যেখানে মুক্ত চিন্তাধারার চলচ্চিত্রের প্রয়োজন।
নানান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত দু’মাস ধরে তাঁরা বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে, পাশাপাশি বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত নানা স্থানে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনের আয়োজন করেছেন। প্রথম প্যারাগ্রাফেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ‘অদম্য’ সিনেমাটি আজ আর শুধু প্রেক্ষাগৃহের চার দেওয়ালে বন্দি নেই, বরং তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও পৌঁছে গেছে। একটি স্বাধীন ও প্রগতিশীল চলচ্চিত্রের পক্ষে এই যাত্রাপথ মোটেও সহজ ছিল না। পুঁজি আর রাজনৈতিক বাধার মুখে দাঁড়িয়ে এটি নিঃসন্দেহে এক অসম লড়াইয়ে জয়লাভের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।









