হাম আতঙ্কে বাংলাদেশ, ৫০০-রও বেশি মৃত্যুর দায় কার?
Bangladesh measles outbreak: বাংলাদেশে হামে মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়াল । টিকার সংকট, টিকাদানে ব্যাঘাত নাকি প্রশাসনিক গাফিলতি—কোন কারণ পরিস্থিতিকে এত ভয়াবহ করে তুলল? হাম প্রাদুর্ভাব নিয়ে ডব্লিউএইচও তদন্ত চাইছে সরকার, দায় কার?
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি এখন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে ৮৬ শিশু। পাশাপাশি হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪২৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মোট মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ জুড়ে ৬২ হাজারের বেশি শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। এই পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো, কেন এত শিশুর মৃত্যু হলো এবং কোথায় কোথায় ব্যর্থতা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সব মহলেই।
পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছে যে সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচওকে একটি 'স্বাধীন তদন্ত' চালানোর জন্য অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। একই সঙ্গে দেশে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দোষারোপ, আদালতে হয়েছে রিট, রাস্তায় নেমেছে বিভিন্ন সংগঠন।
বাংলাদেশে সাধারণত শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকার দু'টি ডোজ দেওয়া হয়। এছাড়া প্রতি চার বছর পরপর বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে যেসব শিশু টিকা থেকে বাদ পড়ে, তাদেরও টিকার আওতায় আনা হয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই বিশেষ ক্যাম্পেন হয়নি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, ওই সময় টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।
অভিযোগ, ২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের পুরনো ব্যবস্থা থেকে সরে এসে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির দিকে যায়। সমালোচকদের দাবি, এই সিদ্ধান্তের কারণেই সময়মতো টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে দেশটিতে টিকার ঘাটতি তৈরি হয় এবং বিপুল সংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হয়।
এই অভিযোগের জেরেই হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আশরাফুল ইসলাম। রিটে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস-সহ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়। হাইকোর্ট এ ঘটনায় তদন্ত কমিশন গঠনের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Bangladesh: বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার। হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত, প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা, টিকা সংকট ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতায় কি পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা কি যথেষ্ট, নাকি আরও বড় পদক্ষেপ প্রয়োজন? এই সংকট থেকে বের হওয়ার উপায় কী হতে পারে?
রাজনৈতিক সংগঠনগুলিও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে। বাম ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকায় মানববন্ধন করে অভিযোগ করেছে, হাম পরিস্থিতির দায় ইউনুস সরকার এড়াতে পারে না। তাদের বক্তব্য, টিকা কেনার ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সে সময়ের প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী মোহম্মদ সায়েদুর রহমান সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, সব টিকাই ইউনিসেফের মাধ্যমেই সংগ্রহ করা হয়েছিল। তিনি আরও লেখেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা নেওয়া হয় এবং পরে তার মূল্য পরিশোধ করা হয়। তাঁর দাবি, সে সময় টিকা না পেয়ে মানুষ ফিরে গিয়েছে, এমন তথ্যও নেই।
কিন্তু ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স ভিন্ন কথা বলেছেন। তিনি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, অন্তর্বর্তী সরকার উন্মুক্ত টেন্ডারে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ায় বিলম্ব তৈরি হয়। পরে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সেই জটিলতা কাটাতে সময় লাগে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রাক্তন কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান, শুরুতে ইউনিসেফের মাধ্যমেই টিকা কেনার কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু পরে পরিকল্পনা কমিশনের পরামর্শে উন্মুক্ত দরপত্রের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর অর্থ বরাদ্দ হলেও ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হয়। ফলে সময়মতো পর্যাপ্ত টিকা দেশে পৌঁছানো অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Climate change India impact: রিপোর্টে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে গরমের কারণে প্রায় ১৯১ বিলিয়ন বা ১৯,১০০ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, যা ১৯৯১ থেকে ২০০০ সালের গড়ের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, পুরো পরিস্থিতির জন্য এককভাবে কোনো সরকার বা ব্যক্তিকে দায়ী করা ঠিক হবে না। কারণ, হামের পুনরুত্থান এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবার হাম ছড়িয়ে পড়ছে।
চিকিৎসাবিষয়ক জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাম প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছে। এপ্রিলের শেষ দিকে ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে 'জাতীয়ভাবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ' বলেও উল্লেখ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। প্রথমত, কোভিড মহামারির সময়ে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। অনেক পরিবার ভয় বা অনিশ্চয়তার কারণে শিশুদের হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেয়নি। ফলে বহু শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি।
দ্বিতীয়ত, টিকাবিরোধী প্রচারণাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ বিভিন্ন দেশে যেমন টিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচার বেড়েছে, বাংলাদেশেও কিছু গোষ্ঠী ধর্মীয় বক্তব্যের মাধ্যমে টিকা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর প্রভাব গ্রামীণ এলাকা-সহ বিভিন্ন জায়গায় পড়েছে।
তৃতীয়ত, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সহিংসতা ও অস্থিরতার সময় টিকাদান কর্মসূচি আরও ব্যাহত হয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেক এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বহু শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়।
চিকিৎসকদের কথায়, হাম এমন একটি রোগ যা খুব দ্রুত ছড়ায়। কোনো এলাকায় টিকাদানের হার কমে গেলে সেখানে বড় আকারে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। আর শিশুদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হলে পরিস্থিতি মারাত্মক হয়ে ওঠে। হাম শুধু জ্বর বা ফুসকুড়ির রোগ নয়; এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণ-সহ নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে। অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
এখন সরকার ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের জন্য ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। নতুন করে টিকা সংগ্রহের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি টিকা দিলেই হবে না; দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে টিকা নিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনাও জরুরি।
বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই টিকাদান কর্মসূচিতে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সফল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমান হাম পরিস্থিতি দেখিয়ে দিল, সামান্য প্রশাসনিক ব্যর্থতা, সিদ্ধান্তহীনতা বা সচেতনতার ঘাটতিও কত বড় সংকট ডেকে আনতে পারে। সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে শিশুদের।








