হাম সংকটে বাংলাদেশ: সতর্কতা জারি WHO-এর
Bangladesh: বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার। হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত, প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা, টিকা সংকট ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতায় কি পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা কি যথেষ্ট, নাকি আরও বড় পদক্ষেপ প্রয়োজন? এই সংকট থেকে বের হওয়ার উপায় কী হতে পারে?
বাংলাদেশে গত দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। রাজধানী ঢাকা-সহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার হাসপাতালগুলিতে প্রতিদিনই হামে আক্রান্ত অথবা হামের মতো উপসর্গ নিয়ে অসংখ্য শিশু ভর্তি হচ্ছে। আগে যেখানে এই রোগ তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে ছিল, এখন সেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং প্রতিদিনই শিশুমৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে দেশটির বিভিন্ন স্থানে মোট ২০৯ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছে ৪২ জন শিশু। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রায় প্রতিদিনই নতুন মৃত্যুর খবর যুক্ত হচ্ছে পরিসংখ্যানে।
২৫ এপ্রিল একদিনেই সারাদেশে অন্তত ১১ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এর ফলে উদ্বেগ আরও বেড়েছে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও এই পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে বাংলাদেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, রোগটি দেশটির প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।
ডব্লিউএইচও-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টি জেলাতেই হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, টিকার ঘাটতি এবং টিকাদান কর্মসূচির দুর্বল হওয়ায় এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
মৃত্যুর হার নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করছে, পরিস্থিতি যেভাবে দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই রিপোর্টে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ সম্পূর্ণভাবে টিকা নেয়নি। কেউ কেউ প্রথম ডোজ টিকা নিলেও দ্বিতীয় ডোজ নেয়নি। ফলে শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি, যার কারণে তারা সহজেই আক্রান্ত হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরও জানিয়েছে, ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলি যেমন ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। এসব এলাকায় জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Climate change India impact: রিপোর্টে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে গরমের কারণে প্রায় ১৯১ বিলিয়ন বা ১৯,১০০ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, যা ১৯৯১ থেকে ২০০০ সালের গড়ের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালেও রোগীর চাপ অনেক বেড়ে গিয়েছে। ঢাকার শিশু হাসপাতাল, শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল-সহ একাধিক বড় হাসপাতালে আলাদা ইউনিট খুলে হামের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিছু হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের থেকে আলাদা করে বিশেষ ওয়ার্ডে হামের রোগীদের রাখা হচ্ছে যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।
ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জেলা হাসপাতালগুলিতেও হামের রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অনেক জায়গায় রোগী সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। কোথাও কোথাও গুরুতর রোগীদের জেলা শহর বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।
চিকিৎসকদের একটি অংশ মনে করছেন, কয়েক বছর ধরে টিকাদান কার্যক্রমে কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অনেক এলাকায় নিয়মিতভাবে শিশুদের টিকা দেওয়া হয়নি বা টিকার সরবরাহে সমস্যা ছিল। এর ফলেই এখন বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত এক মাসে প্রায় ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি রোগীর শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
এই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১২ হাজারের বেশি। আবার অনেক রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়িও ফিরেছে। তবে একই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
ডব্লিউএইচও আরও জানিয়েছে, বিশেষ করে ঢাকায় আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরপর রাজশাহী, চট্টগ্রাম এবং খুলনা বিভাগেও ব্যাপকভাবে সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।
ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী সংখ্যা বাড়ার কারণে অনেক জায়গায় আলাদা হামের ওয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, একসঙ্গে এত রোগী আসার কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থা চাপে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। টিকাদান কর্মসূচিতে ধীরগতি, জনসচেতনতার অভাব এবং কিছু এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি মিলিয়ে এই সংকট তৈরি হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন কোনো রোগকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করে, তখন সেটিকে সাধারণভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি কার্যত মহামারীর মতোই হয়ে উঠেছে, কারণ রোগটি প্রায় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রতিদিনই মৃত্যু হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদফতর এখনই এটিকে মহামারী হিসেবে ঘোষণা করতে রাজি নয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সংস্থা অর্থাৎ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই এ ধরনের ঘোষণা দেয় এবং দেশ আলাদাভাবে তা ঘোষণা করে না।
ডব্লিউএইচও আরও জানিয়েছে, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেও হামের ঝুঁকি বেড়ে গিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত এবং মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি। সীমান্ত এলাকায় মানুষের যাতায়াত বেশি হওয়ায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যেসব এলাকায় টিকা গ্রহণের হার কম, সেসব এলাকায় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। শিশুদের মধ্যে অন্তত ৯৫ শতাংশকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে না পারলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা বলেছে, রোগ শনাক্তের জন্য নজরদারি বাড়াতে হবে এবং সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে আলাদা করতে হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। বরং বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তাদের মতে, আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া, ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি।






