অতিরিক্ত গরম কেড়ে নিচ্ছে শ্রমিকদের স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা?
Climate change India impact: রিপোর্টে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে গরমের কারণে প্রায় ১৯১ বিলিয়ন বা ১৯,১০০ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, যা ১৯৯১ থেকে ২০০০ সালের গড়ের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি।
জলবায়ু পরিবর্তন মানেই আর স্রেফ হিমবাহ গলে যাওয়া নয়, এটি আমাদের রুটিরুজি, স্বাস্থ্য এবং দেশের অর্থনীতির উপর সরাসরি আঘাত হানছে। সাম্প্রতিক ল্যানসেট কাউন্টডাউন (Lancet Countdown) ২০২৩ রিপোর্ট এবং IMD (ভারত আবহাওয়া অধিদপ্তর)-এর গবেষণায় এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে উঠেছে।
ল্যানসেট কাউন্টডাউন রিপোর্টে ২০২২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে দেখানো হয়েছে, ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম ‘হিট-স্ট্রেস’ প্রবণ দেশ। রিপোর্টে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে গরমের কারণে প্রায় ১৯১ বিলিয়ন বা ১৯,১০০ কোটি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, যা ১৯৯১ থেকে ২০০০ সালের গড়ের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি। এই বিপুল পরিমাণ শ্রমহানির ফলে ভারতের নির্মাণ, কৃষি এবং খনি শিল্পের মতো উৎপাদনশীল খাতগুলিরও ক্ষতি হচ্ছে।
এটি ভারতের ২০২২ সালের মোট জিডিপির প্রায় ৬.৩ শতাংশের সমান, যা যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বিশাল ধাক্কা। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতের এই ক্ষতি অনেক বেশি প্রকট। জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষ এবং অসংগঠিত খাতের শ্রমিকরা, যারা সরাসরি সূর্যের প্রখর তাপের নিচে কাজ করতে বাধ্য হন।
ল্যানসেটের তথ্যমতে, অতিরিক্ত গরমে শ্রমিকদের স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, কারণ ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় ভারতে এখন প্রচণ্ড গরমের দিনের সংখ্যা ৩৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে হিটস্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ এবং হার্ট অ্যাটাকের মতো সমস্যা এখন ঘরে ঘরে দেখা যাচ্ছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী গরমজনিত মৃত্যুও ৬১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kolkata Earthquake: অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, ভূমিকম্পের কেন্দ্র সাতক্ষীরায় হলে কলকাতায় এত তীব্র কম্পন অনুভূত হলো কেন? অথবা এতক্ষণ ধরে কম্পন স্থায়ী হওয়ার কারণ কী? সেজন্য আমাদেরকে কলকাতার পার্শ্ববর্তী এলাকার মাটির চরিত্র বুঝতে হবে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, শুধু থার্মোমিটারের পারদ দেখলে ভারতের প্রকৃত বিপদ বোঝা যাবে না। এখানে প্রয়োজন Wet Bulb Temperature (WBT) বা আর্দ্র তাপমাত্রার পরিমাপ। ডব্লিউবিটি হলো এমন একটি পরিমাপ যেখানে বাতাসের তাপমাত্রার সঙ্গে আর্দ্রতাকেও যুক্ত করা হয়। বিজ্ঞানের ভাষায়, যখন ডব্লিউবিটি ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করে, তখন মানুষের শরীর আর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে শীতল করতে পারে না, যার ফলে সুস্থ মানুষও ছায়ায় বসে থাকা অবস্থায় ৬ ঘণ্টার মধ্যে মারা যেতে পারে।
ভারতের গঙ্গা অববাহিকা এবং উপকূলীয় অঞ্চলগুলিতে বর্তমানে আর্দ্রতার পরিমাণ অত্যন্ত বেশি থাকে, ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে অনুভূত তাপমাত্রা অনেক বেশি হয়। ২০২৪ সালের প্রাথমিক তথ্যে দেখা গিয়েছে, ভারতের কিছু অংশে এই সূচক ইতোমধ্যে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে, যা চরম বিপৎসীমার খুব কাছে।
ভারতের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের পরিস্থিতি বিশেষ করে রাজস্থান, বিহার এবং উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোতে কৃষিকাজ ও খোলা আকাশের নিচে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
ভারত আবহাওয়া অধিদপ্তর বা আইএমডি-র সাম্প্রতিক গবেষণা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু মডেল অনুযায়ী, এই শতাব্দীর শেষে ভারতের শ্রম ক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।
ভারতের প্রায় ৩০ কোটি শ্রমিক (কৃষিতে ৪৫% ও নির্মাণে ১০%) সরাসরি রোদে কাজ করেন। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন-এর ২০২৪ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ২১০০ সাল নাগাদ ভারতের বিশাল একটি অংশে বছরে অন্তত ১০ থেকে ২০ দিন অসহ্য ডব্লিউবিটি বা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অনুভূত হবে। কৃষকদের উৎপাদনশীলতা ৩০% কমে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য সরবরাহে।
ভারতের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট। ২০৩০ সালের মধ্যে ভারত যদি ‘নেট-জিরো’ লক্ষ্যমাত্রা এবং স্থানীয়ভাবে অভিযোজন কৌশল জোরদার না করে, তবে শ্রমশক্তির এই বিপুল ক্ষতি দেশের উন্নয়নকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিতে পারে।
এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে আইএমডি এখন প্রথাগত তাপমাত্রার পরিবর্তে একটি নতুন 'হিট স্ট্রেস ইনডেক্স' বা তাপীয় চাপ সূচক তৈরির কাজ করছে। এতে আর্দ্রতা সেন্সরের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যাতে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য আলাদা সতর্কবার্তা দেওয়া যায়। এর মধ্যেই ভারতের ৫০০টিরও বেশি শহরে 'হিট অ্যাকশন প্ল্যান' কার্যকর করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য হলো গরমের সময় কাজের সময়সূচী পরিবর্তন করা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। আমরা দেখেছি কেরল বা আহমেদাবাদের মতো শহরগুলোতে কীভাবে দুপুরের রোদে কাজ বন্ধ রেখে বা স্কুল-কলেজের সময় পরিবর্তন করে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা হয়েছে। গরমের তীব্রতা বুঝে কাজের সময় পরিবর্তন করা বা দুপুর বেলা বাইরে কাজ বন্ধ রাখার মতো সিদ্ধান্তগুলো হাসপাতালগুলিতে রোগী ভর্তির সংখ্যা অনেকটা কমিয়ে এনেছে। তবে কেবল সাময়িক সতর্কতা দিয়ে এই বিশাল বিপদ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে ভারতকে রক্ষা করতে হলে একদিকে যেমন প্রচুর গাছ লাগানো এবং শহরগুলোকে শীতল রাখার প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লড়াইয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।






