বেছে বেছে বাঙালিকেই ঘাড়ধাক্কা! বিধানসভা ভোটে 'কি ফ্যক্টর' বাংলাদেশি জুজু?

Migrant Workers: বছর ঘুরলেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। সুতরাং ২৬-এর নির্বাচনে 'বাংলাদেশি হটাও'রাজনৈতিক ইস্যু হতে চলেছে বলে মত ওয়াকিবহল মহলের।

Sangita Ghorai
৯ মিনিট
বেছে বেছে বাঙালিকেই ঘাড়ধাক্কা! বিধানসভা ভোটে 'কি ফ্যক্টর' বাংলাদেশি জুজু?

বাংলাভাষী মানেই 'বাংলাদেশি'। 'অনাগরিক'। অতএব সন্দেহের বশে আটক, নিগ্রহ, ঘাড়ধাক্কা। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে ঠিক এভাবেই হেনস্থার শিকার হচ্ছেন বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকরা। লাগাতার সেই আক্রমণ এতটাই বড় আকার ধারণ করেছে যে, রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সরব হয়েছে নাগরিক সমাজ এবং প্রতিবাদ করছেন সচেতন সাংবাদিকরা।

উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাট, ওড়িশার মতো রাজ্যগুলিতে প্রথমে বাংলাভাষীদের আটক করার ঘটনা সামনে আসছিল। কিন্তু এখন মহারাষ্ট্র, পঞ্জাব, চেন্নাই, হরিয়ানা, আসাম — ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই ভারতীয় বাঙালিদের বাংলাদেশি সন্দেহে আটক ও আক্রমণ করা হচ্ছে। মালদার ৪০ জন পরিযায়ী শ্রমিক সম্বলপুরে সেতু নির্মাণের কাজ করার সময় স্থানীয়রা তাঁদের মারধর করে ওই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য চাপ দেয়। বাংলা ভাষায় কথা বলাই তাঁদের নিগ্রহের কারণ বলে অভিযোগ। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ৪৪৪ জন বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিককে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা সন্দেহে আটক করে ওড়িশা পুলিশ। পরিচয়পত্র খতিয়ে দেখার পর এবং আদালতের হস্তক্ষেপে ২৭৭ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়।

পুলিশি ধরপাকড়ের পাশাপাশি, বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের স্থানীয়রা মারধর করে বলেও অভিযোগও উঠেছে। চেন্নাইয়ের থিরুভেল্লুর এলাকায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতে গিয়ে স্থানীয়দের দ্বারা হিংসার মুখোমুখি হন মুর্শিদাবাদের তিন পরিযায়ী শ্রমিক। মোট নয় জন নির্মাণ শ্রমিকের দলের মধ্যে তিনজনকে আটকে রেখে নিগ্রহ করা হয়। স্থানীয়রা তাঁদের উপর চড়াও হলে তাঁদের অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যান। কিন্তু যাঁরা পালতে পারেননি, তাঁদের নির্মাণ শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি দিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। আক্রান্ত শ্রমিকের বাবা আসাদউল শেখ ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, গুধিয়ার মোড়ল পাড়ায় তাঁদের বাড়ি। রুজি-রুটির টানে চেন্নাইয়ে কাজ করতে গিয়েছিলেন তাঁর দুই ছেলে। সেখানে একটি স্কুলবাড়ি তৈরির কাজ করছিলেন তাঁরা। থাকতেন সেখানেই। ১৫ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ছটা নাগাদ কাজ থেকে ফিরে ভাত রান্না করছিলেন তাঁর ছেলেরা, এমন সময় স্থানীয় প্রায় ৩৫-৪০ জন লোক এসে তাঁদের বলে যে "তোরা তো বাঙালি, এখানে কী করছিস! বাংলায় কাজ নেই?" এই বলে স্থানীয়রা মারধর শুরু করে তাঁদের। আসাদউল শেখ আরও জানান, এতই মারধর করা হয়েছে যে, এক ছেলের বাম হাত ভেঙে গেছে। আর একজনের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়েছে।

চেন্নাইয়ের থিরুভেল্লুরে স্থানীয়দের দ্বারা নিগ্রহের শিকার মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিক

আক্রান্ত শ্রমিকদের চেন্নাই থেকে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে এসে বহরমপুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মুর্শিদাবাদ থানায় অভিযোগ দায়ের করতে গেলে সেই অভিযোগ নিতে পুলিশ অস্বীকার করে বলে জানান আসাদউল শেখ। পরে আইসি আশ্বাস দেন 'তদন্ত হবে'। লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন আসাদউল শেখ, তবে থানা থেকে অভিযোগ জমা পড়ার কোনো প্রতিলিপি পাননি। একই অবস্থা ওড়িশার ঝারসুগদা জেলায় কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিক দেবাশিস দাসের। তাঁকে কর্মস্থল থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আটক করে নানা নথি চাওয়া হয়। ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। গত ১১ জুলাই বাড়ি ফিরে আসেন দেবাশিস।

এই ঘটনা নতুন নয়। ২০১৪ সালের পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা নানাভাবে হেনস্থার শিকার হচ্ছেন বলে মনে করেন পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্যমঞ্চের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক। ক্রমে ঘটনা সামনে আসতে থাকে। ২০২২ সালে বেঙ্গালুরু থেকে ৪০ জন অতিদরিদ্র পরিযায়ী শ্রমিককে বাংলাদেশি সন্দেহে খেদানোর অভিযোগ নথিভুক্ত করে আর্টিকেল ফরটিন। ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে মুর্শিদাবাদের বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলাদেশি দাগিয়ে আক্রমণ করা হয় এবং ট্রেনে তুলে দেওয়া হয়। মালদা মুর্শিদাবাদের শ্রমিকদের সুরক্ষা চেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন মালদা উত্তরের সাংসদ ঈশা খান চৌধুরী। ২০২৫ সালে পহেলগাঁও কাণ্ড ও অপরেশন সিঁদুরের পর সেই আক্রমণ ও পুলিশি ধরপাকড় বেড়েছে বলে দাবি করছেন আসিফ। তিনি ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর আক্রমণের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে দেখে তা বন্ধের দাবিতে ২১ এপ্রিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি দেওয়া হয় তাঁদের সংগঠনের তরফে। কিন্তু কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এরপর পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্যমঞ্চের তরফে দুটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হলে নিয়মিত একাধিক সাহায্যের আবেদন আসতে থাকে তাঁদের কাছে। প্রথমে উত্তরপ্রদেশ ও ওড়িশা রাজ্যে শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার অপরাধে আটকের খবর পান তাঁরা। তবে এই ঘটনা ভারতের বহু রাজ্যেই ঘটছে।

পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের অমিত শাহকে পাঠানো চিঠি

রাজস্থানের শিখর জেলায় ইটভাটায় কাজ করতেন কোচবিহারের ৭ জন পরিযায়ী শ্রমিক। অভিযোগ, বাংলাদেশি সন্দেহে কোচবিহারের দিনহাটার বাসিন্দা ওবাইদুল খন্দেকার ও তাঁর স্ত্রীকে দশ দিন আটক করে রেখেছিল রাজস্থানের শিখর জেলার পাতন থানার পুলিশ। ওবাইদুল খন্দেকারের স্ত্রী বিউটি খন্দেকার ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন যে, পুলিশ তাঁদের আটক করার পর তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ চায় পুলিশ। তখনই ভোটার কার্ড, আধার কার্ডসহ সমস্ত ডকুমেন্ট তাঁরা জমা করেন। কিন্তু তারপরও তাঁদের দশ দিন আটক করে রাখা হয়। তিনি দাবি করেন — থানায় নয়, তাঁদের রাখা হয় এক ধর্মশালায়। নামমাত্র দুবার খেতে দেওয়া হত, সেই খাবারে পেট ভরত না বলে জানান বিউটি খন্দেকার। মেনুতে থাকত এক মুঠো ভাত, তিনটে রুটি ও ডাল। দশদিন পর পুলিশ তাঁদের ছেড়ে দিলে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসে স্থানীয় থানা সাহেবগঞ্জে অভিযোগ দায়ের করেন তাঁরা।

পশ্চিমবঙ্গের মালদা থেকে পঞ্জাবে কাজ করতে গিয়েছিলেন ৬ জন পরিযায়ী শ্রমিকের দল। সেখানে ৬ দিন কাজ করার পর ২ জুলাই পুলিশ তাঁদের আটক করে বলে অভিযোগ। আটক হওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে একজন, জাকির হোসেনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে ইনস্ক্রিপ্ট জানতে পেরেছে যে, গ্রামবাসীরা মারধর করে ৬ বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিককে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এখনও তাঁরা পুলিশের হাতেই আটক। কেন তাঁদের গ্রেফতার করা হলো, এর কোনো কারণ জানা যায়নি। জাকিরের বয়স ৩২ বছর। মালদার চাঁচল থানার মহানন্দপুর অঞ্চলের অন্তর্গত ধাঞ্জনা গ্রামে বাড়ি। গ্রামের বাড়িতে থাকেন তাঁর স্ত্রী, দুই সন্তান ও বাবা-মা। জাকিরের কোনো খবর না পেয়ে দুশ্চিন্তায় গোটা পরিবার।

পঞ্জাবে গ্রেফতার মালদার ৬ পরিযায়ী শ্রমিক

পরিযায়ী শ্রমিক সংক্রান্ত একটি মামলা শুনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে রিপোর্ট চেয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট। কারণ এই ঘটনায় বাংলাদেশি সন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকজন পরিযায়ী শ্রমিককে দিল্লিতে আটক করার পর দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ১০ জুলাই সেই মামলার শুনানি হয় বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চে। বিচারপতিরা জানতে চেয়েছিলেন ওড়িশায় পরিযায়ী শ্রমিক আটকের মামলার সঙ্গে দিল্লি মামলার পার্থক্যটা কোথায়? এক্ষেত্রে মামলাকারী আইনজীবী জানান, ওড়িশায় পরিযায়ী শ্রমিকদের আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু কাউকে দেশের বাইরে পাঠানো হয়নি। কিন্তু দিল্লি মামলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে 'পুশ ব্যাক' করা হয়েছে। এই পরিবারে বাবা-মায়ের সঙ্গে আট বছরের শিশুও রয়েছে। এরপরেই কলকাতা হাই কোর্ট এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়েছে। তারই সঙ্গে দিল্লির পরিযায়ী শ্রমিদের পরিস্থিতি জানতে রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ পন্থকে দিল্লির মুখ্যসচিবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে একই সময়ে কেন বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু হল, এটা কি পূর্বপরিকল্পিত, প্রশ্ন তোলে হাই কোর্ট।

১৮ জুন বাংলাদেশি সন্দেহে দিল্লিতে বীরভূমের পাইকরের ছ'জন শ্রমিককে আটক করে দিল্লির রোহিনী পুলিশ জেলার কে.এন কাটজু থানা। এরপর ওই শ্রমিকরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কিন্তু পরিবারের লোক দিল্লি পৌঁছে জানতে পারে যে, আটক ব্যক্তিদের বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং বলপূর্বক বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের পরিবার শ্রম দফতরেও যোগাযোগ করেছেন বলে জানান।

পশ্চিমবঙ্গ শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদের চেয়ারম্যান তথা রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে হাজার হাজার বাংলাভাষীদের আটক করা হয়েছে। বিজেপি এটা বাংলা বিরোধী অভিযান চালাচ্ছে। এছাড়া নিজের এক্স হ্যান্ডেলে সামিরুল ইসলাম বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদীকে আক্রমণ করে লিখেছেন, আমরা এমন প্রধানমন্ত্রী চাই যিনি আমাদের বিভাজন করবেন না, সুরক্ষা দেবেন। নরেন্দ্র মোদীকে আক্রমণ করে তিনি লিখেছেন, "আপনি বলছেন আপনি নতুন বাংলার স্বাপ্ন দেখেন। অথচ সেই 'নতুন বাংলা' আমাদের বাংলা ভাষায় কথা বললে নিষিদ্ধ করে। আশ্চর্যজনকভাবে আপনি দুর্গাপুর ঘুরে যাওয়ার পর বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষীদের উপর আক্রমণ বেড়েছে। এটা কি পূর্বপরিকল্পিত ছিল?"

Prime Minister

, you came to Bengal and spoke extensively about infiltration. Let me introduce you to a woman named Sweaty Biwi, an Indian citizen from Birbhum—the land of Rabindranath Tagore.

In the video, she shares the painful ordeal she’s going through.

Sweaty…

— Samirul Islam (@SamirulAITC)

সামিরুলই তুলে ধরেছেন বীরভূমের মুরারই-২ ব্লকের পাইকর এলাকার বাসিন্দা দানিশ শেখকে বাংলাদেশি সন্দেহে তাঁর রী ও বছর সাতেকের পুত্রসন্তান-সহ তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। নথি দেখালেও কাজ হয়নি। সামিরুল দাবি করেছিলেন, দানিশ ও তাঁর পরিবারকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বার ভিডিয়ো বার্তায় দানিশের স্ত্রী বলেন, ‘‘আমরা দিল্লিতে কাজ করতে গিয়েছিলাম। ওখানে আমাদের ধরেছিল পুলিশ। আমরা আধার কার্ড দেখালাম। বললাম যে, আমরা বাংলাদেশি নই। কিন্তু আমাদেরকে দিয়ে কী সব লিখিয়ে নিল! তার পর বলল, তোরা বাংলাদেশি না হলেও, তোদের বাংলাদেশি বানিয়ে দেব। পুলিশগুলোই এ সব বলছিল।’’

১৬ জুলাই বংলাভাষীদের বাংলাদেশি সন্দেহে বিভিন্ন রাজ্যে আটকের বিরুদ্ধে কলকাতায় পথে নামে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল। পদযাত্রা শেষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, কেন্দ্র সরকার বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষীদের আটক করার গোপন নির্দেশিকা জারি করেছে। অন্তত ১০০০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, কতজনকে বাংলাদেশে জোর করে পাঠানো হয়েছে সেই তথ্য সংগ্রহ করছি আমরা।

বাংলাভাষীদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটকের প্রতিবাদে পথে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

১৪ জুলাই নিউ দিল্লির বসন্ত কুঞ্জ এলাকায় জয় হিন্দ কলোনিতে প্রতিবাদ করে তৃণমূল। এই কলোনিতে একশো বাঙালি পরিবার বসবাস করে, যারা মূলত অসংঠিত খাতে কাজ করেন। তৃণমূলের দাবি, আধার কার্ড, ভোটার কার্ড দেখালেও তাঁদের বাংলাদেশি বলা হচ্ছে। এমন অনেক পরিবার আছে, যারা ২০ বছর ধরে জয় হিন্দ কলোনিতে বাস করছেন। তাঁদের বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ, জলের সংযোগ কেটে দেওয়া হয়েছে।

রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই নিয়ে বলেন, "মমতা ব্যানার্জি যেটা করছেন রোহিঙ্গা মুসলিমদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য করছেন। কোনো রাজ্যের সরকারই ভারতীয়র বিরুদ্ধে কিছু করছে না। বর্ডারের যেসব জায়গায় বিএসএফ-কে জমি দেয়নি মমতা ব্যানার্জির সরকার, সুযোগ পেয়ে সেসব জায়গা দিয়ে বার্মা, কক্সবাজার, বাংলাদেশ হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে এরা। আর মমতা ব্যানার্জি তুষ্টিকরণ ও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির জন্য ফরজি বার্থ সার্টিফিকেট, আধার কার্ড বানিয়ে দিয়েছে। আর এরা সারা দেশে ছড়িয়ে গেছে। তাই যা হচ্ছ, একদম ঠিক হচ্ছে। রোহিঙ্গা মুসলমানরা ভারতের নাগরিক নয়। ওদের ছুঁড়ে ফেলার কাজ করা প্রয়োজন। মমতা ব্যানার্জি ভোটব্যাঙ্ক বাঁচাতে রাস্তায় নেমেছেন, কিন্তু এতে কোনো কাজ হবে না।"

বাংলাভাষীদের উপর এই আক্রমণের বিরুদ্ধে পথে নামে বামফ্রন্টও। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীমহলও মুখ খুলেছেন এর বিরুদ্ধে।

দীর্ঘদিন ধরে পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে হওয়া অবিচার নিয়ে কাজ করছেন সাংবাদিক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য। বাংলাভাষী দেখেই বাংলাদেশি সন্দেহে আটক এবং বাংলাদেশে 'পুশ ব্যাক' করার মাধ্যমে আসলে ঘুরপথে এনআরসি করা হচ্ছে বলে দাবি তাঁর। তিনি বলেছেন, "এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। পুলিশ এখানে বিচারকের ভূমিকা পালন করছে। যাঁদের আটক করা হচ্ছে, তাঁদের আদালতে তোলা হচ্ছে না। এমনকি যাঁদের আটক করে বেশ কিছুদিন ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখার পর ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের কোনো কাগজ বা ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিন রাজ্যে কাজ করার ক্ষেত্রে ফের নিগ্রহ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে।" ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বাংলাভাষীদের এইভাবে আটক করার ঘটনা ঘটতে দেখা যায়, কিন্তু পহেলগাঁও কাণ্ড ও অপরেশন সিঁদুরের পর তা বেড়েছে বলে দাবি স্নিগ্ধেন্দুরও। বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিমদের আটক হওয়ার সংখ্যা বেশি বলে দাবি তাঁর। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড দিয়ে যদি না হয় তাহলে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ কী ভাবে দেবে এই পরিযায়ী শ্রমিকরা? তাঁদের কেউ কেউ বাড়ির বা জমির দলিল দেখিয়েছেন। কিন্তু সবার কাছে তো তা নেই, সবার জন্ম শংসাপত্রও নেই। এর মধ্যে ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছেন স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, "বিজেপি এভাবে মুসলিমদের ঠেলে দিচ্ছে রাজ্যের শাহকদলের দিকে। এরপর তারা হিন্দুদের বলবে যে মুসলিমরা সব তৃণমূলের দিকে চলে গেছে। হিন্দুরা বিজেপির সঙ্গে এসো, নাহলে পশ্চিমবঙ্গ মুসলিমদের হাতে চলে যাবে।"

পথে নেমেছে বাংলা পক্ষও। বাংলা পক্ষের সাধারণ সম্পাদক গর্গ চট্টোপাধ্যায় বলছেন, "নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিকে, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ভারতের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাদেশি বলে অকথ্য অত্যাচার করা হচ্ছে এবং অত্যাচার পর্যায়ক্রমে বাড়ছে, বাড়ছে বাড়ছে। সেসব নিয়ে নরেন্দ্র মোদী মুখ খোলেননি, এগুলো তাঁদের নির্দেশেই হচ্ছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিকে ভারতে একেবারে কোণঠাসা করে দিতে চান।"

ইতোমধ্যে ত্রিপুরায় অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করতে গঠন করা হয়েছে বিশেষ টাস্ক ফোর্স। পশ্চিম ত্রিপুরা জেলায় পুলিশের ওই টাস্ক ফোর্সে থাকছেন ১৫ জন সদস্য। অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করে তাঁদের ‘ডিপোর্ট’ (দেশ থেকে বিতাড়ন) করার লক্ষ্যেই এই টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে।

পরিযায়ী শ্রমিকদের বেআইনিভাবে আটক করার ঘটনা কার্যত শোরগোল ফেলে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে। বছর ঘুরলেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। সুতরাং ২৬-এর নির্বাচনে 'বাংলাদেশি হটাও'রাজনৈতিক ইস্যু হতে চলেছে বলে মত ওয়াকিবহল মহলের। প্রশ্ন উঠছে শুধুমাত্র ভাষার ভিত্তিতে কি ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশি সন্দেহে আটক করা যায়? উল্লেখ্য গত এক বছর অর্থাৎ বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের আগে-পরে সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশ মিথ্যে খবর ছড়িয়েছে, ফলে বাংলাদেশ ভীতি ছড়িয়েছে দেশজুড়েই। অপরীকরণের জন্যে ধর্ম পরিচয় ব্যবহার আগেই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই তালিকায় পর্যায়ক্রমিক সংযোজন 'বাংলদেশি' ট্যাগ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, মেরুকরণের নতুন আফিম এই তকমা। এভাবে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে সুকৌশলে হিন্দু ভদ্রবিত্তকেও কাছে টানার চেষ্টা চলছে। বুদ্ধিজীবিরা মনে করেন, এই আঘাত বাঙালি অস্মিতার ক্ষতি করছে। এটা শুধু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের অস্তিত্ব সংকট নয়, ভারত-বাংলাদেশের দীর্ঘ সম্পর্কের অবমাননাই নয়, ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির উপর আক্রমণও বটে।

লিখেছেন
Sangita Ghorai
Sangita Ghorai
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘মহাকাব্য যদি কোথাও জন্মে থাকে, তবে তা ফুটপাতে’—কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্তের সঙ্গে 'আড্ডা'য় অত্রি ভট্টাচার্য

The Other Kolkata of krishnapriya Dasgupta: কলকাতার সেই অচেনা ফুটপাতের মানুষরা কীভাবে বেঁচে থাকেন? সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আজকালের প্রাক্তন সাংবাদিক কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত কী দেখেছেন? আর আজকের সংবাদমাধ্যম কেন বদলে গেল তাঁদের দেখার চোখে? তাঁর স্মৃতি, সাংবাদিকতা ও আজকের বদলে যাওয়া শহর নিয়েই তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় অত্রি ভট্টাচার্য।

১৯৭১ থেকে ২০১১: কলকাতার ফুটপাথে থাকা মানুষদের রোজনামচা কেমন ছিল?

Kolkata pavement dwellers survey: ১৯৭১ থেকে ২০১১—এই চার দশকে কলকাতার ফুটপাথবাসীর সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ৭০ হাজারে পৌঁছেছে। ফুটপাথবাসীদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। কেউ থাকেন উড়ালপুলের নীচে, কেউ রেললাইনের পাশে, আবার কেউ পরিত্যক্ত পাইপের ভিতরে। শহরের অসংগঠিত অর্থনীতিতে ফুটপাথবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের জীবনযাপন, কাজ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি নিয়ে অতীতে বেশ কিছু গবেষণা ও সমীক্ষাও হয়েছে।

শুধু আমেরিকা বা আফ্রিকাতেই নয়, বাংলাতেও ছিল দাসপ্রথা

International Day for the Remembrance of the Slave Trade and its Abolition: ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক দাসব্যবসা স্মরণ দিবস। হাইতির দাসবিদ্রোহের পাশাপাশি স্মরণ করতে হবে, বাংলার মাটি থেকে লক্ষাধিক মানুষকে বলপূর্বক নির্বাসিত করার ইতিহাস। চট্টগ্রাম, হুগলি, সুন্দরবন হয়ে আরব, আফ্রিকা, মরিশাসে পৌঁছেছেন বাংলার দাসেরা। শুধু ইতিহাসে নয়, আজও বাঙালির আন্তর্জাতিকতা চর্চায় দাসেদের উল্লেখ প্রাসঙ্গিক।

ঘাড়ধাক্কা খেয়ে ওপারে, বাংলাদেশে যেভাবে বেঁচে আছেন সাইদা ফকির

Saida Fakir Deportation: বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগের পর কী ভাবে দিন কাটছে সাইদা ফকিরের? বাংলাদেশের কোথায় আছেন? কারা আশ্রয় দিল তাঁকে?

সোনালি সুইটির পর এবার সাইদা, 'ঘাড়ধাক্কা'র তালিকায় নতুন নাম যে প্রশ্ন তুলছে

Saida Fakir Case: সাইদা ফকিরকে বাংলাদেশি সন্দেহে সীমান্ত পার করে দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে নাগরিকত্ব যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবির ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি। কাউকে দেশছাড়া করার আগে যথাযথ তদন্ত ও সাংবিধানিক সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেই বিতর্ক ফের উঠে এসেছে।

ফিরে দেখা: সোনালি-সুইটিদের নরক যাত্রা

Sonali Khatun, Sweety Bibi: দু'দশক দিল্লিতে থাকার পরও কেন সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবিদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে সীমান্ত পেরিয়ে পাঠানো হলো? নাগরিকত্বের নথি থাকা সত্ত্বেও কেন জেল, পুশব্যাক ও অপমানের শিকার হতে হলো তাঁদের? সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মানবাধিকার প্রশ্নকে আরও সামনে এনে দিল?

উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম, তবু ফল প্রকাশের দিন হোটেলে কাজে ব্যস্ত সাগর

Sagar Mondal: উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম। মোট ৪৮৮ নম্বর। কিন্তু ফল প্রকাশের দিন বাড়িতে নয়, গুজরাটের আমেদাবাদের একটি হোটেলে কাজে ব্যস্ত ছিল পূর্ব বর্ধমানের সাগর মণ্ডল। পরিযায়ী শ্রমিকের ছেলে সাগরের স্বপ্ন আইএএস হওয়ার।