দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের অন‍্যায় থেকে রবীন্দ্রনাথের সৌভ্রাতৃত্ব, একশো কোটিকে আজও জুড়ে রেখেছে রাখিবন্ধন

১৯০৫ সালের রাখিবন্ধন উৎসব যেন সবার মনে গাঁথা হয়ে আছে। বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধে এই রাখি কবিগুরুর এক মোক্ষম অস্ত্র ছিল।

Ravhali Biswas
৩ মিনিট
দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের অন‍্যায় থেকে রবীন্দ্রনাথের সৌভ্রাতৃত্ব, একশো কোটিকে আজও জুড়ে রেখেছে রাখিবন্ধন

আজ রাখিপূর্ণিমার দিন। এই বছর দু'দিন রাখিপূর্ণিমা পড়েছে। বাংলায় আজ খুশির রব। শুধু বাংলা কেন, সারা ভারতেই আজকের দিনটি সাড়ম্বরে পালিত হয়। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে এটিও একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। বাংলায়, বলতে গেলে পশ্চিমবঙ্গে, খুব বড় করে পালিত হয় রাখিবন্ধন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন রোধ করতে এবং জাতপাতের বিভেদ মেটাতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই রাখিবন্ধন উৎসবের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর চেষ্টা ব্যর্থ হয় কী করে? আর সেই কারণেই যে শুধু রাখির আয়োজন তা কিন্তু নয়। আজ ভাই-বোনদেরও দিন। ভাই আর বোনের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় করতে এই উৎসব পালিত হয়। রাখিবন্ধন এক শক্তির বন্ধনের প্রতিরূপ, যা ভাই-বোনকে সমস্ত বাধাবিপত্তি, প্রতিকূলতা কাটিয়ে জীবনে জয়ী হতে শেখায়।

সময়, নিয়ম, বিধি

পঞ্চাঙ্গ অনুযায়ী শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে রাখিবন্ধন উৎসব পালিত হয়। ভাইকে রাখি পরানোর সব থেকে শুভ সময় হলো বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা বেজে ৩৮ মিনিট থেকে শুরু হবে। আর শুক্রবার ১২ আগস্ট, ২০২২ সকাল ৭টা বেজে ০৫ মিনিট পর্যন্ত থাকবে।

শুভ সময় তো হলো, এবার জেনে নেওয়া যাক, ভাইয়ের হাতে রাখি বাঁধার আগে ঠিক কোনদিকে মুখ করে বসতে হবে। শাস্ত্র অনুযায়ী, যখন কোনও বোন বা দিদি তাঁর ভাইকে রাখি পরাবেন, তখন বোনের মুখ যেন পশ্চিম দিকে থাকে। আর ভাইয়ের মুখ থাকবে পূর্বদিকে, তাহলে কারও ওপরেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে না।

এরপর আসা যাক আরও কিছু নিয়মকানুনে। রাখি বাঁধার সময় অবশ্যই ভাই এবং বোন- দু'জনের মাথাই যেন ঢাকা থাকে। তারপর ভাইয়ের কপালে তিলক কেটে তাতে চাল লাগিয়ে দিন এবং ভাইয়ের হাতে রাখি পড়িয়ে দিন। কিন্তু জানেন কি, শাস্ত্র বলে, ভাইয়ের হাতে রাখি পরালে তাতে যেন তিনটি গিঁট অবশ্যই থাকে। কারণ তিনটি গিঁটই পৃথক তাৎপর্য বহন করে। রাখির প্রথম গিঁট ভাইয়ের দীর্ঘায়ুর জন্য, দ্বিতীয় গিঁট বোনের দীর্ঘায়ুর জন্য এবং তৃতীয় গিঁট ভাই-বোনের পবিত্র সম্পর্ক দীর্ঘজীবী করার জন্য। তাই রাখি বাঁধার সময় তিনটি গিঁটের কথা ভুললে চলবে না কিন্তু।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রাধাকৃষ্ণর দোলের সঙ্গে ওঠে-নামে সূর্য ও চাঁদ, কলকাতার এই বনেদিবাড়ির ঝুলন আজও অনন্য

৬৩, ধীরেন ধর সরণির এই বাড়িটি ঝুলনের যাত্রাপথে ৮০ বছর পেরিয়ে গেছে বেশ কয়েকবছর আগেই। প্রথম শুরু ১৯৩৫ সালে, বাড়ির বারান্দায় কিছু পুতুল সাজিয়ে।

পৌরাণিক-ঐতিহাসিক কথা

কিন্তু রাখিবন্ধনের নেপথ্যে আছে অনেক পৌরাণিক ইতিহাসও। ভাবা যায়, মহাভারতের সময় থেকেই রাখির জন্মকাল। মহাভারতের যুদ্ধে কৃষ্ণের কবজিতে আঘাত লেগে রক্তক্ষরণ হলে দ্রৌপদী তার শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দেয়। এই ব্যবহারে কৃষ্ণ খুবই আপ্লুত হন এবং দ্রৌপদীকে নিজের বোন বলে ঘোষণা করেন এবং বলেন যে, ভবিষ্যতে তিনি দ্রৌপদীকে রক্ষা করবেন। ঠিক কয়েক বছর পর কৌরবদের কাছে পাশা খেলায় হেরে পাণ্ডবরা সর্বস্বান্ত হলে যখন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে উদ্যত হয় দুঃশাসন, তখন কৃষ্ণ তাঁর বোনের সম্মান রক্ষা করেন এবং রাখির যোগ্য প্রতিদান দেন।

আর একটি কাহিনি শোনা যায় যে, দৈত্যরাজা বলি ছিলেন বিষ্ণুর ভক্ত। একসময় বিষ্ণু বৈকুণ্ঠ ছেড়ে বলির রাজ্য রক্ষা করতে চলে আসেন। ওদিকে বিষ্ণু-পত্নী লক্ষ্মী স্বামীকে ফিরে পেতে আকুল। তিনি ছদ্মবেশে বলি রাজ্যে গিয়ে বলিরাজের কাছে যান এবং জানান যে, তাঁর স্বামী নিরুদ্দেশ। তিনি যতদিন না ফিরছেন, বলিরাজ তাঁকে তাঁর রাজ্যে আশ্রয় প্রদান করেন। বলি এতে রাজি হন। শ্রাবণ পূর্ণিমা উপলক্ষে লক্ষ্মী বলিরাজার হাতে একটি সুতলি বা সুতোর দড়ি বেঁধে দিলে বলিরাজ এর কারণ জানতে চান। তখন মা লক্ষ্মী তাঁকে সব খুলে বললে বলিরাজা মুগ্ধ হয়ে বিষ্ণুকে বৈকুণ্ঠ ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। আর সেই থেকে শ্রাবণ মাসের তিথিতে রাখি উৎসব পালিত হয়।

আবার আরেকটি ঐতিহাসিক কাহিনি থেকে জানা যায়, আনুমানিক ৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করলে আলেকজান্ডারের স্ত্রী রাজা পুরুকে এক পবিত্র সুতো পাঠিয়ে অনুরোধ করেছিলেন রাজা পুরু যেন আলেকজান্ডারের কোনও ক্ষতি না করেন। রাজা পুরু রাখিকে সম্মান করতেন এবং তিনি তাঁর বোনের অমর্যাদা হতে দেননি। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে আলেকজান্ডারকে কোনও আঘাত করেননি।

এমন হাজার একটা মতামত আছে রাখি নিয়ে। কিন্তু ১৯০৫ সালের রাখিবন্ধন উৎসব যেন সবার মনে গাঁথা হয়ে আছে। বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধে এই রাখি কবিগুরুর এক মোক্ষম অস্ত্র ছিল। তিনি কলকাতা, ঢাকা, সিলেট থেকে হাজার হাজার হিন্দু-মুসলিম ভাই-বোনকে আহ্বান করেছিলেন একতার প্রতীক হিসেবে রাখিবন্ধন পালন করতে, পরস্পরের হাতে রাখি পড়িয়ে দিতে। ওই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ধ্বনিত হয়েছিল ঐক্যের সুর, আর বিভেদের তীব্র প্রতিবাদ। আর বাঙালির মধ্যে জাগ্রত হয়েছিল জাতীয়তাবোধ। কবির সঙ্গে তাঁরা শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন। কবির রচিত সেই গান-

বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল

পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।

এই গান বাঙালিকে এক নতুন দিগন্তের পথে নিয়ে গিয়েছিল। এইভাবে রাখিবন্ধন বিভিন্ন রূপে আমাদের পারিবারিক মিলন-বন্ধনের স্বরূপ হয়ে আছে। আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। শুধু তা ভাই-বোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, দিদি-বোন, দাদু-নাতনি, এমনকী, রাজনৈতিক জগতেও অনেকে নিজেদের মধ্যে মিলনের ঐক্যবন্ধনের সুতোটি বেঁধে নিজেদের সম্পর্ককে দৃঢ় করে তুলছে।

লিখেছেন
Ravhali Biswas
Ravhali Biswas
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।