শুভেন্দুর নৌকোয় মুসলিম ভোট?
Nandigram, Rejinagar Bypolls: ভোটগণনার শেষে হাসিরানি রথ পেয়েছেন ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৪২৭টি ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের মিলন প্রধান পেয়েছেন ৪১ হাজার ৬৭৪টি ভোট। বামফ্রন্ট, ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) এবং তৃণমূলের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীরাও অনেক পিছিয়ে রয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের দুই গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রাম ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রেজিনগরের উপনির্বাচনে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ভোটগণনা শেষ হওয়ার পরে নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নন্দীগ্রামে বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ ১ লক্ষ ২২ হাজার ৭৫৩ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে বিজেপি প্রার্থী শংখরাভ সরকার ৭৫ হাজার ৮১৬ ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। দুই কেন্দ্রেই ভোটগণনা শেষ হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় নির্বাচন কমিশনের তরফে আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করা হয়নি।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর, দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হওয়ার পরে ভবানীপুর আসনটি নিজের কাছে রাখেন। ফলে নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়। এবার বিজেপি প্রার্থী করেছে শুভেন্দুর নিহত আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথকে। ৬ মে চন্দ্রনাথ রথ গুলিতে নিহত হন। বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের দু’দিন পরেই এই ঘটনা ঘটেছিল। ফলে তাঁর মায়ের প্রার্থিতা ঘিরে নির্বাচনে একটি আবেগের দিকও তৈরি হয়েছিল।
ভোটগণনার শেষে হাসিরানি রথ পেয়েছেন ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৪২৭টি ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের মিলন প্রধান পেয়েছেন ৪১ হাজার ৬৭৪টি ভোট। বামফ্রন্ট, ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) এবং তৃণমূলের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীরাও অনেক পিছিয়ে রয়েছেন। সিপিআই প্রার্থী শান্তি গোপাল গিরি পেয়েছেন ৫,৭৭৯টি ভোট। ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী এহতেশামুল হক পেয়েছেন মাত্র ৮৫৩টি ভোট।
মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার মুসলিম সম্প্রদায়ের। ফলে এত দিন এই কেন্দ্রে কংগ্রেস, তৃণমূল এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেখানে বিজেপির বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনার অবকাশ তৈরি করেছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Nandigram Election: নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়ে বিতর্ক, মমতা-পন্থী প্রার্থীর সরে দাঁড়ানো, কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের গ্রেফতার—সব মিলিয়ে বদলে গিয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণ? মমতা কেন কংগ্রেসকে সমর্থন করলেন? কংগ্রেস কি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে?
রেজিনগরে বিজেপি প্রার্থী শংখরাভ সরকার পেয়েছেন ১ লক্ষ ২৯ হাজার ৯১৪টি ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেইউপি) প্রার্থী গোলাম নবী আজাদ পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৯৮টি ভোট। তিনি দলের প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রাক্তন তৃণমূল নেতা হুমায়ুন কবীরের ছেলে। কংগ্রেস প্রার্থী আবদুল্লাহিল কাফি পেয়েছেন ৬,১৬৮টি ভোট। তৃণমূলের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরীর ঝুলিতে রয়েছে ৩,৮৪৭টি ভোট। ফলে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর বাইরে থাকা দলগুলি ভোটের লড়াইয়ে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে।
হুমায়ুন কবীর নওদা কেন্দ্র থেকেও জয়ী হয়েছিলেন। দুটি আসনে জয়ী হওয়ার পরে তিনি নওদা আসনটি রেখে রেজিনগর ছেড়ে দেন। সেই কারণেই এখানে উপনির্বাচন হয়। এর আগে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি রেজিনগর থেকে ৫৮ হাজারেরও বেশি ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। এবার তাঁর ছেলের বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়া এজেইউপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর বিজেপিবিরোধী ভোট একজোট করার লক্ষ্যে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করে তৃণমূল। কিন্তু ভোটগণনার পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সেই কৌশল বিজেপির বড় ব্যবধান কমাতে পারেনি। অন্যদিকে, রেজিনগরে ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ভোটের লড়াইয়ে একাধিক রাজনৈতিক শক্তি ছিল। বিরোধীদের মধ্যে এই বিভাজন বিজেপির সুবিধা করে দিয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
উপনির্বাচনের ফল সামনে আসার পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, দুই কেন্দ্রেই মুসলিম ভোটারদের একাংশ বিজেপিকে সমর্থন করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলার মুসলিম ভোটাররা বিজেপির পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাঁরা বুঝতে পেরেছেন যে অতীতে তাঁদের ভুল পথে পরিচালিত করা হয়েছে। তবে এই দুই কেন্দ্রের মোট ভোটের পরিসংখ্যান থেকে নির্দিষ্ট কোনো সম্প্রদায়ের ভোটদানের ধরন নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না। সেই দাবি যাচাই করতে বুথভিত্তিক ভোটের তথ্য এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের প্রয়োজন।
নন্দীগ্রাম এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ২০০৭ সালের জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলন তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানের পথ তৈরি করেছিল। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসানের পিছনেও নন্দীগ্রামের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও তিনি নন্দীগ্রাম থেকে জয়ী হয়েছিলেন।
সেই নন্দীগ্রামেই এবার হাসিরানি রথের বিপুল ব্যবধান বিজেপিকে রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, মুসলিম অধ্যুষিত রেজিনগরে বিজেপির এই সাফল্য রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটের প্রচলিত সমীকরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এই ফলের পিছনে ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তন, বিরোধী দলগুলির মধ্যে বিভাজন, প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির মতো একাধিক কারণ কাজ করে থাকতে পারে।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের ফলের প্রবণতা রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপির অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। পাশাপাশি, বিরোধী দলগুলির ভোট একজোট করার কৌশল কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে মাত্র দুটি কেন্দ্রের ফল থেকে গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। আগামী দিনে রাজ্যের অন্য কেন্দ্রগুলিতে ভোটের প্রবণতা এবং বিরোধী দলগুলির পারস্পরিক সমঝোতা এই রাজনৈতিক সমীকরণ কতটা বদলাতে পারে, সেদিকেই নজর থাকবে।






