স্কুল ছাড়তে হয়েছিল দারিদ্র্যের কারণে, ৬৮ বছর বয়সে সেই স্বপ্নই পূরণ করলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা
Malayalam actor Indrans: দর্জির এই কাজই ১৯৮১ সালে সুরেন্দ্রনকে নিয়ে এল মালায়লাম সিনেমার সেটে। তবে অভিনেতা হিসেবে নয়, কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে। পর্দার পিছনে কাজ করতে করতেই তাঁর নিষ্ঠা, চমৎকার রসবোধ আর দুর্দান্ত উপস্থিত বুদ্ধি সবার নজর কাড়তে শুরু করল।
একটি স্বপ্ন কতদিন বেঁচে থাকতে পারে? এক বছর, দু-বছর, এক দশক? কে সুরেন্দ্রন—যাঁকে আজ ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষ ‘ইন্দ্রন্স’ নামে চেনেন—তাঁর জন্য এই উত্তরটা ছিল ছয় দশকেরও বেশি সময়।
যে বয়সে মানুষ কাজ থেকে অবসর নিয়ে শান্তিতে দিন কাটানোর কথা ভাবেন, সেই বয়সে (৬৮ বছর) এসে কে সুরেন্দ্রন পিঠে স্কুলের ব্যাগ ঝুলিয়ে সোজা গিয়ে হাজির হলেন ক্লাসরুমে। চারপাশে তখন তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের ঝলমলে দুনিয়া বা পুরস্কারের মঞ্চ থেকে এই পরিবেশটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তবুও, বহু দিক থেকে দেখতে গেলে, এটাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মাইলফলক।
১৯৫৬ সালের ১৬ মার্চ। পালাভিলা কোচুভেলু ও গোমতীর সাত সন্তানের সংসারে যখন সুরেন্দ্রন এলেন, তখন অভাব ছিল তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। অভাব থাকলেও সুরেন্দ্রনের মনে ছিল পড়াশোনার তুমুল জেদ। স্কুলে তিনি ছিলেন ক্লাসের টপার। শিক্ষাই তাঁর ভবিষ্যৎ বদলে দেবে—এই বিশ্বাস নিয়ে রোজ ক্লাসরুমের একদম প্রথম বেঞ্চে গিয়ে বসতেন তিনি। কিন্তু দারিদ্র্য সঙ্গ ছাড়েনি।
যখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে তাঁর পরিবারের পক্ষে স্কুলের একটা ইউনিফর্ম বা বই কেনার ন্যূনতম খরচটুকুও চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ল, তখন সুরেন্দ্রন স্কুল ছাড়তে বাধ্য হতে হলো। সুরেন্দ্রন তখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। অন্য বন্ধুরা যখন পড়তে যাচ্ছে, তখন মাত্র ১০-১১ বছর বয়সেই সুরেন্দ্রনকে পা রাখতে হলো কঠোর কর্মজগতে। কাঁধে চেপে বসল বয়সের চেয়ে অনেক বড় দায়িত্ব। সিদ্ধান্তটি তাঁর নিজের ছিল না, কিন্তু এই একটা ঘটনাই তাঁর জীবনের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিল।
সংসার বাঁচাতে কাকার কাছে দর্জির কাজ শিখতে শুরু করলেন সুরেন্দ্রন। যা কেবল টিকে থাকার লড়াই হিসেবে শুরু হয়েছিল, তা-ই আস্তে আস্তে তাঁর পেশা হয়ে উঠল। কাজটা তিনি মন দিয়ে শিখেছিলেন। পরে ভাই কে. জয়কুমারের সঙ্গে মিলে কুমারপুরমেই খুলে ফেললেন একটা ছোট্ট দর্জির দোকান—নাম দিলেন ‘ইন্দ্রন্স ব্রাদার্স টেইলর্স’। এই সাধারণ দোকানটিই যে একদিন অজান্তেই তাঁকে এমন একটি নাম দেবে, যা পুরো দেশ একনামে চিনবে—সেটা তখন কেই-বা জানত!
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আজকের দিনে বলপয়েন্ট বা ডট পেন ব্যবহারের সময় এই সমস্যায় আমাদের খুব একটা পড়তে হয় না। কিন্তু গত শতাব্দীর তিরিশের দশকেও এই একটা যন্ত্রণায় দুনিয়ার সমস্ত লেখক, সাহিত্যিক আর সাংবাদিকদের রাতের ঘুম উড়ে যেত। ঠিক এই সাধারণ বিরক্তি থেকেই জন্ম নিয়েছিল ডট পেন।
দর্জির এই কাজই ১৯৮১ সালে সুরেন্দ্রনকে নিয়ে এল মালায়লাম সিনেমার সেটে। তবে অভিনেতা হিসেবে নয়, কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে। পর্দার পিছনে কাজ করতে করতেই তাঁর নিষ্ঠা, চমৎকার রসবোধ আর দুর্দান্ত উপস্থিত বুদ্ধি সবার নজর কাড়তে শুরু করল। আর এই গুণগুলিই খুব তাড়াতাড়ি তাঁর সামনে অভিনয়ের এক নতুন অপ্রত্যাশিত দরজা খুলে দিল।
শুরুর দিকের চরিত্রগুলি ছিল ভীষণ ছোট। রোগা-পাতলা চেহারার জন্য অনেক সময় বডি-শেমিং-এর শিকারও হতে হয়েছে তাঁকে। বছরের পর বছর ইন্দ্রন্স সিনেমার মূল স্রোতের বাইরেই রয়ে গেলেন। এমন সব পার্শ্বচরিত্র আর কৌতুক চরিত্রে অভিনয় করতেন, যা খুব একটা মন কাড়ত না। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। ১৯৯৪ সালে এল ‘সিআইডি উন্নিকৃষ্ণন বি.এ, বি.এড’। এই সিনেমায় ‘কুঞ্জু’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি রাতারাতি কেরলের ঘরে ঘরে এক পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন।
নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে পরের প্রায় দুটো দশক হরিশ্রী অশোকানের সঙ্গে তাঁর কমেডি জুটি ছিল সুপারহিট। ‘পাঞ্জাবি হাউস’, ‘মিশামাধবন’, ‘কল্যাণরামন’-এর মতো ছবিতে তাঁর কমেডি মানুষকে হাসিয়ে লুটিয়ে পড়তে বাধ্য করেছে। ৫০০-রও বেশি সিনেমায় অভিনয় করে তিনি মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম চেনা চরিত্রাভিনেতা হয়ে উঠলেন। কিন্তু এত জনপ্রিয়তার পরেও একটা আফসোস তাঁর মনে রয়েই গিয়েছিল। বারবার তাঁকে কেবল হাসির চরিত্রেই কাস্ট করা হচ্ছিল, অথচ তিনি জানতেন—অভিনেতা হিসেবে তাঁর আরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Manav Kaul: একটা 'সিআইডি' (CID) সিরিয়ালের এপিসোডে অভিনয় করে যে টাকা পেতেন, তা দিয়ে তিন মাস টেনেটুনে চালাতে হতো। পেট চালাতে বিস্কুট বিক্রি করা, ঘুড়ি ওড়ানো, ব্রেকড্যান্স শেখানোর কাজও করেছেন তিনি।
২০১৭ সালটা ইন্দ্রন্সের জীবনের চাকাটা আবার ঘুরিয়ে দিল। মুক্তি পেল ‘আলোরুক্কম’। এই ছবিতে নিজের নিখোঁজ মেয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়ানো এক অসহায়, বৃদ্ধ বাবার চরিত্রে অভিনয় করলেন তিনি। তাঁর সেই সূক্ষ্ম, আবেগঘন আর গভীর পারফরম্যান্স দর্শক থেকে শুরু করে বড় বড় সমালোচক—সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল। যে মানুষটাকে এতদিন লোকে শুধু হাসাতে দেখেছে, তিনি এবার সবার চোখে জল এনে দিলেন।
এই অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি পেলেন ‘কেরল স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড’-এ সেরা অভিনেতার পুরস্কার। যে কেরিয়ারে তিনি দশকের পর দশক একটা বড় সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন, এই পুরস্কার ছিল তার যোগ্য জবাব। এরপর ২০২১ সালে ‘হোম’ সিনেমায় দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য পেলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ‘স্পেশাল মেনশন’। কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে শুরু করে দেশের অন্যতম সেরা অভিনেতা হয়ে ওঠার এই জার্নিটা ছিল এক রূপকথার মতো।
শান্তাকুমারীর সঙ্গে বিবাহিত জীবন, দুই সন্তান মাহিথা ও মাহেন্দ্রনকে নিয়ে তাঁর সংসার ছিল ছিমছাম আর সুখী। সিনেমা জগতে এত নামডাকের পরেও তিনি থেকে গিয়েছেন কেরল মাটির সেই অতি সাধারণ, বিনয়ী মানুষটি।
কিন্তু সব পাওয়ার পরেও, জীবনের একটা অধ্যায় মনের কোণে খচখচ করত। ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সব সম্মান পাওয়ার পরেও তিনি ভুলতে পারছিলেন না তাঁর সেই ফেলে আসা চতুর্থ শ্রেণির ক্লাসরুমটা।
অবশেষে ২০২৪ সালে, ৬৮ বছর বয়সে এসে ইন্দ্রন্স নিলেন এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। তিনি ভর্তি হলেন ‘কেরালা স্টেট লিটারেসি মিশন’-এর অধীনে ক্লাস সেভেন ইকুইভ্যালেন্সি কোর্সে। যে বয়সে মানুষ নাতি-নাতনিদের গল্প শোনান, সেই বয়সে তিনি পরীক্ষার হলে বসলেন এবং সফলভাবে পাসও করলেন। এখানেই শেষ নয়, এরপর তিনি অষ্টম শ্রেণি পাস করে এখন দশম শ্রেণির দিকে এগিয়ে চলেছেন।
কেন এই বয়সে এসে আবার পড়াশোনা? এই প্রশ্নের উত্তরে ইন্দ্রন্স যা বলেছিলেন, তা শুনে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। তিনি বলেছিলেন:
"নিরক্ষর হওয়া মানে অন্ধ হয়ে থাকার মতো। আমি তো শুধু এই পৃথিবীটাকে নিজের চোখে ভালো করে দেখতে চেয়েছিলাম।"
ইন্দ্রন্সের কাছে পড়াশোনা কখনোই কেবল পরীক্ষা দেওয়া বা কোনো সার্টিফিকেটের কাগজ পাওয়ার লড়াই ছিল না। এটা ছিল পরিস্থিতির চাপে নিজের হারিয়ে ফেলা শৈশবকে আর নিজের আত্মসম্মানকে আবার ফিরে পাওয়ার জেদ। এটা ছিল ছোটবেলা থেকে নিজের বুকের গভীরে জমিয়ে রাখা এক নীরব প্রতিজ্ঞা পূরণের গল্প।
তিনি আজ ‘আশান’ বা ‘করুপ্পু’-র মতো সিনেমায় সুরিয়াদের মতো বড় তারকাদের সঙ্গে দাপিয়ে অভিনয় করছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সুপারহিট সিনেমাটি কোনো থিয়েটারে রিলিজ হয়নি, সেটি লেখা হয়েছে স্কুলের ক্লাসরুমে। স্কুলছুট হতে বাধ্য হওয়া এক ছোট ছেলে, তারপর পরিবারের হাল ধরা এক দর্জি, সেখান থেকে জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী অভিনেতা এবং সবশেষে আবারও একজন ছাত্র—ইন্দ্রন্সের এই জীবনকাহিনি আমাদের শেখায় যে, বয়স কেবলই একটা সংখ্যা মাত্র। যদি মনের জোর আর জেদ থাকে, তবে স্বপ্নের মেয়াদের কোনো শেষ তারিখ হয় না।








