সিআইডির এক এপিসোডের টাকায় তিন মাস! ১৩ বছর ক্যামেরা থেকে দূরে, তবু হারিয়ে যাননি মানব কৌল
Manav Kaul: একটা 'সিআইডি' (CID) সিরিয়ালের এপিসোডে অভিনয় করে যে টাকা পেতেন, তা দিয়ে তিন মাস টেনেটুনে চালাতে হতো। পেট চালাতে বিস্কুট বিক্রি করা, ঘুড়ি ওড়ানো, ব্রেকড্যান্স শেখানোর কাজও করেছেন তিনি।
প্যাশন— এই শব্দের সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের সম্পর্ক বড় নিবিড়। প্যাশনকে বাঁচিয়ে রাখতে তারা সবকিছু করতে পারে। কখনো কখনো তারা পেটের ভাত জোটাতে পারে না, পকেটে এনে দেয় না একটা টাকাও। অথচ, তারা একে মন থেকে ঝেড়ে ফেলতেও পারে না। কিন্তু খালি পেটে আর কতদিন কাটানো যায়? তাই বেশির ভাগই বাস্তবতার কাছে হার মেনে চেনা, নিরাপদ কোনো রাস্তা বেছে নেন কিছুদিন পর। কিন্তু সবাই তো এক রকম হন না। কেউ কেউ থাকেন, যাঁরা নিজের স্বপ্ন আর মূল্যবোধের সঙ্গে কোনো আপস করতে পারেন না। ঠিক তেমনই এক জেদি, লড়াকু আর ভীষণ প্রতিভাবান মানুষের নাম মানব কৌল।
আজ আমরা যাঁকে 'কাই পো চে!', 'তুমহারি সুলু' বা ওটিটি-র পর্দায় দুর্দান্ত সব চরিত্রে অভিনয় করতে দেখি, তাঁর এই সাফল্যের পিছনের গল্পটা কিন্তু কোনো সিনেমার চেয়ে কম নয়।
১৯৭৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর জম্মু-কাশ্মীরের বারামুল্লায় এক কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারে জন্ম হয় মানবের। শৈশবটা সেখানে বেশ ভালোই কাটছিল। কিন্তু হুট করেই বদলে গেল সব। ১৯৯৯-৯০ সালের দিকে কাশ্মীরের অশান্ত পরিস্থিতির কারণে রাতারাতি তাঁদের চেনা ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়। মা মায়াদেবী একটা মাত্র স্যুটকেস আর দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে চলে আসেন মধ্যপ্রদেশের হোশাঙ্গাবাদে (এখন যার নাম নর্মদাপুরম)। বাবা মনোহর দাস কৌল ছিলেন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, তিনি ওখানেই থেকে যান।
নতুন জায়গায় এসে শুরু হলো এক চরম অস্তিত্বের লড়াই। একদিকে তীব্র আর্থিক কষ্ট, অন্যদিকে চেনা পরিবেশ হারিয়ে ফেলার বেদনা। স্কুলের দিনগুলি মানবের জন্য খুব একটা সহজ ছিল না। কাশ্মীরি চেহারার জন্য বন্ধুরা প্রায়ই বিদ্রূপ করতেন। এমনকী নিজের চেনা ভাষাটুকুও তিনি একসময় ভুলতে বসেছিলেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কর্ণাটকের এক কৃষক পরিবারের ছেলে আঙ্কে গৌড়া বহু বছর ধরে বিভিন্ন কাজ করার পাশাপাশি বই সংগ্রহ করে গিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি বিনামূল্যের লাইব্রেরির। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিয়েছে 'পুস্তক মানে' (Pustak Mane) নামক একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য লাইব্রেরিতে, যেখানে রয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ বই। সেখানে এখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, গবেষকদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়।
সেই সময় মানব নিজের ভিতরের জেদটাকে উগরে দিয়েছিলেন সাঁতারের পুলে। তিনি চমৎকার একজন প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারু হয়ে উঠেছিলেন। রাজ্য ও জাতীয় স্তরে লড়াই করে জিতে নিয়েছিলেন ১৪টি জাতীয় পদক।

এই খেলাধুলোই তাঁর মধ্যে একটা অদ্ভুত মানসিক শক্তি আর শৃঙ্খলা তৈরি করে দিয়েছিল, যা পরবর্তী জীবনে মুম্বইয়ের কঠিন দিনগুলিতে টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল।
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে চোখে থিয়েটার আর সিনেমার স্বপ্ন নিয়ে মানব চলে এলেন রূপালী শহর মুম্বইয়ে। কিন্তু মুম্বই তো আর সহজে কাউকে জায়গা দেয় না! শুরু হলো ফুটপাথ আর বস্তির জীবন। পারেলের বস্তির একটা ছোট ঘরে থাকতেন তিনি। অবস্থা এমন ছিল যে, দিনে মাত্র ৩০ টাকা খরচ করার সামর্থ্য ছিল তাঁর। একটা 'সিআইডি' (CID) সিরিয়ালের এপিসোডে অভিনয় করে যে টাকা পেতেন, তা দিয়ে তিন মাস টেনেটুনে চালাতে হতো। পেট চালাতে বিস্কুট বিক্রি করা, ঘুড়ি ওড়ানো, ব্রেকড্যান্স শেখানোর কাজও করেছেন তিনি।
২০০৩ সালে মানব সুযোগ পেলেন 'জাজান্তারাম মামান্তারাম' নামের একটি বড় বাজেটের সিনেমায়। ছবি হিট হলো, তাঁর কাজও নজর কাড়ল।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আজকের দিনে বলপয়েন্ট বা ডট পেন ব্যবহারের সময় এই সমস্যায় আমাদের খুব একটা পড়তে হয় না। কিন্তু গত শতাব্দীর তিরিশের দশকেও এই একটা যন্ত্রণায় দুনিয়ার সমস্ত লেখক, সাহিত্যিক আর সাংবাদিকদের রাতের ঘুম উড়ে যেত। ঠিক এই সাধারণ বিরক্তি থেকেই জন্ম নিয়েছিল ডট পেন।
'জাজান্তারাম মামান্তারাম' ছবিতে মানব কৌল
সাধারণ কেউ হলে এই সুযোগে একের পর এক সিনেমার অফার লুফে নিতেন। কিন্তু মানব আলাদা। তিনি দেখলেন, যেসব চরিত্রে অভিনয়ের অফার আসছে, সেগুলিতে কোনো সৃজনশীল তৃপ্তি নেই। সেটে গিয়ে তাঁর দমবন্ধ লাগছিল।
নিজের মূল্যবোধ আর আত্মসম্মানের সঙ্গে আপস না করে তিনি এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলেন। অভিনয় জগৎ থেকে এক ধাক্কায় নিজেকে সরিয়ে নিলেন দীর্ঘ ১৩ বছরের জন্য! লোকে ভাবল মানব পাগল হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তিনি তখন অন্য এক জগতে ডুব দিয়েছেন—সেটি হলো লেখালেখি এবং থিয়েটারের জগত।
২০০৪ সালে তিনি গড়ে তুললেন তাঁর নিজস্ব থিয়েটার গ্রুপ 'অরণ্য'। একের পর এক অসাধারণ সব নাটক লিখলেন এবং পরিচালনা করলেন। তাঁর লেখা 'শক্কর কে পাঁচ দানে', 'পিল স্কুটার ওয়ালা আদমি' বা 'বালি অউর শম্ভু' নাটকের মহলে হইচই ফেলে দিল। থিয়েটারের সেরা সম্মান 'মাহিন্দ্রা এক্সিলেন্স ইন থিয়েটার অ্যাওয়ার্ড' (META)-ও চলে এলো তাঁর ঝুলিতে। যখন পকেটে টাকা থাকত না, তখন বন্ধুদের বলতেন, “আমি তো লেখক, আমার একটু নিজের মতো জায়গা দরকার।” এই বলে পাহাড়ে চলে যেতেন, সেখানে প্রকৃতির কোলে নিখরচায় ঘুরে বেড়াতেন আর লিখতেন।
মানব নিজেকে সবসময় বলেন, “আমি ৯৮ শতাংশ লেখক, আর বাকি ২ শতাংশ অভিনেতা।” তিনি লিখতেন নিজের মনের আনন্দের জন্য, পাঠক বা দর্শকের কথা ভেবে নয়। একাকিত্ব, নস্টালজিয়া, ফেলে আসা শিকড়ের টান আর মানুষের সম্পর্কের জটিলতা—এসবই সহজ সরল ভাষায় উঠে আসত তাঁর কলমে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
প্রায় এক শতাব্দী দীর্ঘ জীবনে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন সমাজের নানা পরিবর্তন—ব্রিটিশ শাসনের অন্তিম পর্ব থেকে স্বাধীন ভারতের গঠন, তারপর আধুনিকতার দ্রুত বিস্তার। কিন্তু এই পরিবর্তনের ভিড়ে তিনি কখনও নিজের শিকড় ভুলে যাননি।
তাঁর লেখা প্রথম বই 'ঠিক তুমহারে পিছে' এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, আজ ২০২৬ সালেও সেটির ১৭ নম্বর রিপ্রিন্ট চলছে বাজারে। এছাড়া 'চলতা ফিরতা প্রেত', 'অন্তিমা', 'রূহ' (কাশ্মীরে ফিরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা)-এর মতো বইগুলি হিন্দি সাহিত্যের জগতে তাঁকে এক আলাদা আসনে বসিয়েছে। ২০২৪ সালেও তাঁর 'সাক্ষাৎকার' বইটি দারুণ সাড়া ফেলেছে।

অভিনয় ছাড়লেও অভিনয় কিন্তু মানবকে ছাড়েনি। ২০১৩ সালে পরিচালক অভিষেক কাপুর তাঁকে 'কাই পো চে!' সিনেমায় 'বিত্তু জোশী' চরিত্রের জন্য প্রস্তাব দেন। ব্যস, দীর্ঘ ১৩ বছর পর আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন মানব। এই একটি চরিত্র তাঁর খরা কাটিয়ে দিল।
এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৭ সালে 'তুমহারি সুলু' সিনেমায় বিদ্যা বালানের স্বামীর চরিত্রে তাঁর সহজ-সরল অভিনয় দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায়, যার জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের মনোনয়নও পান।
'তুমহারি সুলু' সিনেমায় বিদ্যা বালানের স্বামীর চরিত্রে মানব কৌল
এরপর নেটফ্লিক্সের 'অজিব দাস্তানস'-এর 'আনকাহি' পর্বে এক বাকপ্রতিবন্ধী চরিত্রের মুখে কোনো কথা না বলেও শুধু চোখের ভাষায় যে অভিনয় তিনি করেছিলেন, তা ভোলার নয়। সাম্প্রতিক সময়ে 'থাপ্পড়', 'সাইনা' কিংবা ওটিটি-র 'ত্রিভুবন মিশ্র সিএ টপার'-এ তাঁর কাজ দারুণ প্রশংসিত হয়েছে। ২০২৫-২০২৬ সালের দিকেও তাঁর 'বারামুল্লা', 'রিয়েল কাশ্মীর ফুটবল ক্লাব' এবং 'সুবেদার'-এর মতো বড় বড় প্রজেক্ট রয়েছে তাঁর কাছে।
শুধু তা-ই নয়, দীর্ঘ ১৩ বছর পর তিনি আবারও চলচ্চিত্র পরিচালনায় ফিরছেন তাঁর নিজের বই থেকে তৈরি 'সাক্ষাৎকার' সিনেমার মাধ্যমে, যার শুটিং চলছে উত্তরাখণ্ডের সুন্দর পাহাড়ি অঞ্চলে।
মানবের জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তাঁর মা মায়াদেবী। শূন্য হাতে কাশ্মীর থেকে এসেও যিনি হার মানেননি। অঙ্গনওয়াড়ির কাজের মাধ্যমে গ্রামের মহিলাদের স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। আজ ৭৩ বছর বয়সেও তিনি প্রায় ৬০টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র দেখাশোনা করেন। মায়ের এই লড়াই মানবকে নারী চরিত্রগুলোলিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবনে মানব বিয়ে করেননি। তিনি একা থাকতে ভালোবাসেন। মুম্বইয়ের কোলাহল ছেড়ে বছরের একটা বড় সময় তিনি কাটান পাহাড়ের নির্জনতায়, ডায়েরি আর কলম নিয়ে। ২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি হেসে বলেছিলেন, “আমি সিঙ্গেল এবং খুব শান্তিতে আছি। আমি এভাবেই জীবনটা চেয়েছিলাম।” কোনো পিআর (PR) বা ম্যানেজার ছাড়াই তিনি নিজের সব কাজ সামলান।
মানব কৌল বিশ্বাস করেন, “সাফল্য এলেই জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়—এটা একটা মস্ত বড় ভুল ধারণা।” জীবনটাকে তিনি ছোট ছোট গল্পের কালেকশন হিসেবে দেখতে ভালোবাসেন।







