এক বামহাতি সাংবাদিকের জেদে যেভাবে জন্ম নিয়েছিল ডট পেন
আজকের দিনে বলপয়েন্ট বা ডট পেন ব্যবহারের সময় এই সমস্যায় আমাদের খুব একটা পড়তে হয় না। কিন্তু গত শতাব্দীর তিরিশের দশকেও এই একটা যন্ত্রণায় দুনিয়ার সমস্ত লেখক, সাহিত্যিক আর সাংবাদিকদের রাতের ঘুম উড়ে যেত। ঠিক এই সাধারণ বিরক্তি থেকেই জন্ম নিয়েছিল ডট পেন।
কাগজের বুকে কলম চালাতে চালাতে হুট করে কালির এক মস্ত বড় দাগ লেপ্টে গেল, আর আপনার সাধের লেখাটা এক নিমেষে বরবাদ! মেজাজটাই খারাপ হয়ে যায়, তাই না?
আজকের দিনে বলপয়েন্ট বা ডট পেন ব্যবহারের সময় এই সমস্যায় আমাদের খুব একটা পড়তে হয় না। কিন্তু গত শতাব্দীর তিরিশের দশকেও এই একটা যন্ত্রণায় দুনিয়ার সমস্ত লেখক, সাহিত্যিক আর সাংবাদিকদের রাতের ঘুম উড়ে যেত। ঠিক এই সাধারণ বিরক্তি থেকেই জন্ম নিয়েছিল ডট পেন।
১৮৯৯ সালে হাঙ্গেরির বুডাপেস্টে লাসলো জোসেফ বিহোর (László József Bíró) জন্ম। পেশায় তিনি ছিলেন একজন সাংবাদিক। শুধু সাংবাদিক বললে অবশ্য ভুল হবে, বিহো ছিলেন একাধারে শিল্পী, রেস কার ড্রাইভার, হিপনোটিস্ট এবং আপাদমস্তক একজন উদ্ভাবক! তাঁর মাথায় সারাক্ষণ নতুন নতুন বুদ্ধি ঘুরত।
সাংবাদিকতার খাতিরে বিহো-কে রোজ প্রচুর লিখতে হতো। আর তখনকার দিনে লেখার একমাত্র ভরসা ছিল ফাউন্টেন পেন বা ঝরনা কলম। এই কলমগুলির মস্ত বড় সমস্যা ছিল—এর কালি ভীষণ পাতলা। লিখলেই কাগজের উপর কালি শুকাতে অনেক সময় নিত। তার উপর বিহো ছিলেন বামহাতি। ফলে লিখতে লিখতে তাঁর নিজের হাতই চলে যেত সদ্য লেখা লাইনের উপর, আর ব্যস! পুরো কাগজ জুড়ে কালির বিশ্রী নোংরা দাগ লেপ্টে যেত।
রোজকার এই ঝামেলা সহ্য করতে করতে একদিন বিহো ভাবলেন, "এর কি কোনো সমাধান সত্যিই নেই? এই সমস্যা কি মেনে নিতেই হবে?"
একদিন নিজের খবরের কাগজের ছাপাখানায় (প্রেসে) দাঁড়িয়ে কাজ দেখছিলেন বিহো। হঠাৎ তাঁর চোখ গেল সদ্য ছাপা হয়ে বেরিয়ে আসা খবরের কাগজগুলির দিকে। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, রোটোগ্র্যাভিউর প্রেসে যে কালি ব্যবহার করা হচ্ছে, তা কাগজের বুকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুকিয়ে যাচ্ছে! হাত দিলেও একটুও রঙ বা দাগ ছড়াচ্ছে না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কর্ণাটকের এক কৃষক পরিবারের ছেলে আঙ্কে গৌড়া বহু বছর ধরে বিভিন্ন কাজ করার পাশাপাশি বই সংগ্রহ করে গিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি বিনামূল্যের লাইব্রেরির। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ নিয়েছে 'পুস্তক মানে' (Pustak Mane) নামক একটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য লাইব্রেরিতে, যেখানে রয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ বই। সেখানে এখন রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, গবেষকদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়।
বিহোর মাথায় সঙ্গে সঙ্গে এক বিদ্যুৎ খেলল। তিনি ভাবলেন, খবরের কাগজের এই চটজলদি শুকিয়ে যাওয়া কালি যদি কোনোভাবে কলমের ভিতরে পুরে দেওয়া যায়, তাহলেই তো কেল্লাফতে! ফাউন্টেন পেনের ওই কালির দাগ লেপ্টে যাওয়ার সমস্যা উবে যাবে।
কিন্তু ভাবনা যতটা সহজ ছিল, কাজে তা প্রয়োগ ছিল ততটাই কঠিন। খবরের কাগজের কালি ফাউন্টেন পেনে ভরতেই দেখা গেল উল্টো বিপদ। সেই কালি এত ঘন আর চটচটে যে, কলমের সরু নিব বেয়ে তা নিচে নামতেই চায় না। কলম পুরোপুরি অচল হয়ে গেল।
বিহো দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। এই কাজে তিনি পাশে টেনে নিলেন তাঁর ভাই গিয়র্গি বিহো-কে। গিয়র্গি ছিলেন পেশায় দন্তচিকিৎসক, কিন্তু রসায়নে তাঁর দারুণ জ্ঞান ছিল। দুই ভাই মিলে ল্যাবরেটরিতে বসে গেলেন কলমের জট খুলতে।
তাঁরা বুঝতে পারলেন, ফাউন্টেন পেনের পুরনো ডিজাইনে এই ঘন কালি কাজ করবে না। এর জন্য সম্পূর্ণ নতুন মেকানিজম চাই। রসায়নের বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা এমন এক কালির ফর্মুলা তৈরি করলেন, যা কলমের ভিতর শুকাবে না, কিন্তু কাগজের ছোঁয়া পেতেই বাতাসে থাকা সলভেন্ট বা তরল উপাদান নিমেষে বাষ্পীভূত হয়ে লেখাটিকে শুকিয়ে দেবে।
এবার দরকার ছিল এমন একটা মেকানিজম, যা দিয়ে এই ঘন কালিকে কাগজের বুকে মসৃণভাবে নামিয়ে আনা যায়। ঠিক এইখানেই তাঁরা ব্যবহার করলেন একটি ছোট্ট ম্যাজিক—একটি ক্ষুদ্র ইস্পাতের ঘূর্ণায়মান বল বা গোলক। কলমের ডগায় একটা সকেটের মধ্যে এই বলটি এমনভাবে আটকে দেওয়া হলো, যাতে সেটি অনায়াসে ঘুরতে পারে।
মেকানিজমটা ছিল চমৎকার—কলম যখন কাগজের উপর চালানো হবে, বলটি ঘুরবে। ঘোরার সময় বলের ভিতরের অংশটি কালির রিজার্ভার থেকে কালি মেখে নেবে, আর ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে সেই কালি কাগজের বুকে লেপ্টে দেবে। আর যখন কলম চালানো বন্ধ থাকবে, বলটি কালির মুখটা আটকে রাখবে, ফলে কালি উপচে পড়ার বা লিক করার কোনো সুযোগই থাকবে না।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
খননকার্যে প্রমাণিত হয়েছে, আজ থেকে প্রায় ২৯০০ বছর আগে (খ্রিস্টপূর্ব ৯০০ অব্দে) এই স্থানে মানুষের নিয়মিত বসবাস ছিল। অর্থাৎ, জব চার্নক কলকাতা শহর আবিষ্কার করার অনেক অনেক আগে থেকেই এখানে এক উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল।
১৯৩১ সালে বুডাপেস্ট আন্তর্জাতিক মেলায় এই দুই ভাই তাঁদের প্রথম প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক মডেলটি দুনিয়ার সামনে আনলেন, যার নাম ছিল "গো-পেন" (Go-Pen)। মানুষ অবাক হয়ে দেখল এক অদ্ভুত কলম, যা থেকে কালি লিক করে না, আবার লিখলেই ম্যাজিকের মতো শুকিয়ে যায়!
সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু এর মধ্যেই ইউরোপে শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বিহো ছিলেন ইহুদি বংশোদ্ভূত। ফলে হাঙ্গেরিতে থাকা তাঁর জন্য ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল। ১৯৩৮ সালে হাঙ্গেরি ছেড়ে তিনি প্রথমে ফ্রান্স ও ব্রিটেনে যান এবং সেখানে এই কলমের পেটেন্ট বা সরকারি স্বত্ব নিজের নামে নথিভুক্ত করেন।
এরপর ১৯৪১ সালে ভাই গিয়র্গি এবং বন্ধু জুয়ান জর্জে মেইন-কে সঙ্গে নিয়ে বিহো একেবারে দেশ ছেড়ে পালিয়ে চলে যান সুদূর আর্জেন্টিনায়। সেখানে গিয়ে তাঁরা নতুন করে কলম তৈরির ফ্যাক্টরি খোলেন। ১৯৪৩ সালে আর্জেন্টিনায় নতুন পেটেন্ট পাওয়ার পর তাঁরা বাণিজ্যিকভাবে কলমটি বাজারে ছাড়েন।
বিহো এবং মেইন—এই দুই বন্ধুর নাম মিলিয়ে কলমটির ব্র্যান্ড নাম রাখা হলো "বায়রোম" (Birome)। এই কলম সেখানে এতটাই সাড়া ফেলেছিল যে, আজও আর্জেন্টিনায় যেকোনো বলপয়েন্ট কলমকে মানুষ ভালোবেসে 'বায়রোম' বলেই ডাকে। এমনকী অনেক ইংরেজিভাষী দেশেও বলপয়েন্ট পেনকে সংক্ষেপে শুধু "বায়রো" (Biro) বলা হয়।
বলপয়েন্ট কলম সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনোর আগে এর কার্যকারিতা প্রথম টের পেয়েছিল ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স (RAF)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিমানের পাইলটদের আকাশে ওড়ার সময়ও অনেক কিছু লিখতে হতো। কিন্তু ফাউন্টেন পেন নিয়ে আকাশে উঠলেই বায়ুমণ্ডলীয় চাপের তারতম্যের কারণে কলম থেকে কালি লিক করে পাইলটদের জামাকাপড় আর দরকারি ম্যাপ নষ্ট হয়ে যেত।
পাইলটদের এই মহা বিপদ থেকে উদ্ধার করল বিহোর বলপয়েন্ট পেন। যেহেতু এর ভিতরে কালি বায়ুচাপের উপর নির্ভর করে না, তাই যত উঁচুতেই যাওয়া হোক না কেন, এই কলম একদম নিখুঁতভাবে চলত। ব্রিটিশ সরকার পাইলটদের জন্য এক ধাক্কায় ৩০,০০০ বায়রো কলমের অর্ডার দেয়। আর এই সামরিক সাফল্যই বলপয়েন্ট পেনকে রাতারাতি বিখ্যাত করে তোলে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৯৪৫ সালে আমেরিকার বাজারে যখন প্রথম বলপয়েন্ট কলম আসে, তখন তার দাম ছিল আকাশছোঁয়া—এক একটা কলমের দাম ছিল সাড়ে বারো ডলার! সাধারণ মানুষের পক্ষে তা কিনে লেখা ছিল বিলাসিতা।
বিহো নিজে এই আবিষ্কার থেকে খুব বেশি বড়লোক হতে পারেননি। কিন্তু এই কলমকে পৃথিবীর ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কৃতিত্ব যাঁর, তিনি হলেন ফরাসি উদ্যোক্তা মার্সেল বিচ (Marcel Bich)। তিনি বিহোর এই ডিজাইনটিকে আরও সহজ ও সস্তা করার উপায় খুঁজে বের করেন। ১৯৫০ সালে তিনি বাজারে নিয়ে আসেন আইকনিক "BIC Cristal" কলম। প্লাস্টিকের তৈরি এই স্বচ্ছ, সস্তা এবং চরম টেকসই কলমটি পুরো দুনিয়ায় ঝড় তোলে। আজ পর্যন্ত সারা বিশ্বে এই ব্র্যান্ডের ১০০ বিলিয়নেরও বেশি কলম বিক্রি হয়েছে!
আজকের দিনে আমরা যে ডট পেন ব্যবহার করি, তার ডগায় থাকে টাংস্টেন কার্বাইডের অত্যন্ত শক্ত বল। আর কালির কেমিস্ট্রি এতটাই উন্নত যে, সলভেন্ট, লুব্রিকেন্ট, রেজিন আর বাইন্ডারের নিখুঁত ভারসাম্যে লেখা হয় একদম মাখনের মতো মসৃণ।
বলপয়েন্ট কলম দিয়েই আমরা লাস্লো বিহো-কে চিনি ঠিকই, কিন্তু এই সাংবাদিক আরও প্রায় ৩১টি বড় বড় আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ওয়াশিং মেশিনের শুরুর দিকের একটি মডেল তিনি বানিয়েছিলেন।
গাড়ির অটোমেটিক গিয়ারবক্স তৈরি করে তিনি জার্মানিতে মোটরবাইকে টেস্ট করেছিলেন।
এমন এক তালা বানিয়েছিলেন যা চোরেরা কোনোভাবেই ভাঙতে পারত না।
কব্জিতে বেঁধে রক্তচাপ আর তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রের বুদ্ধির পিছনেও ছিলেন তিনি।
এমনকী আজকে আমরা যে রোল-অন ডিওডোরেন্ট ব্যবহার করি, তার ভিতরের ঘূর্ণায়মান বলের বুদ্ধিটিও কিন্তু এই বলপয়েন্ট কলমের মেকানিজম থেকেই অনুপ্রেরিত!
লাস্লো বিহো কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থায় কোনো মহাবিপ্লব ঘটানোর উদ্দেশ্যে কলম বানাতে যাননি। তিনি শুধু নিজের চারপাশের একটা ছোট, বিরক্তিকর সমস্যাকে মন দিয়ে লক্ষ্য করেছিলেন। বাকিরা যেখানে ফাউন্টেন পেনের কালির দাগকে নিয়তি বলে মেনে নিয়েছিল, বিহো সেখানে সেই সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন।
আজ আমরা দোকান থেকে পাঁচ-দশ টাকায় যে ডট পেনটা কিনে আমরা পকেটে পুরে নিশ্চিন্তে পরীক্ষা দিতে যাই, তার পিছনে লুকিয়ে আছে এক বামহাতি সাংবাদিকের জেদ।








