ছাত্র আন্দোলনে বুদ্ধিজীবীরা কে কোথায় দাঁড়িয়ে?
Cockroach Janta Party Jantar Mantar Student Protest India: ২৬ মে ২০২৬ সালে ভারতের ছাত্র ও যুব আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল একটি নাম— ‘কোকরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি (CJP)। নিট (NEET) পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁস, সিবিএসই (CBSE) খাতা মূল্যায়নে কারচুপি, বারবার নিয়োগ পরীক্ষার চরম ব্যর্থতা এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে দিল্লির যন্তর মন্তর। কিন্তু এই আন্দোলন কেবল আর সাধারণ ছাত্র কিংবা পরীক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিনোদন, বুদ্ধিজীবী মহল ও জাতীয় রাজনীতির আঙিনায়।
“শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানো আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার। লাঠির জোর দিয়ে তরুণদের কণ্ঠ রোধ করা যায় না, দরকার মন খুলে আলোচনার।”
যন্তর মন্তরের তপ্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় এই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন প্রবীণ অভিনেত্রী শবানা আজমি।
২৬ মে ২০২৬ সালে ভারতের ছাত্র ও যুব আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল একটি নাম— ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি (CJP)। নিট (NEET) পরীক্ষা প্রশ্নপত্র ফাঁস, সিবিএসই (CBSE) খাতা মূল্যায়নে কারচুপি, বারবার নিয়োগ পরীক্ষার চরম ব্যর্থতা এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে দিল্লির যন্তর মন্তর। কিন্তু এই আন্দোলন কেবল আর সাধারণ ছাত্র কিংবা পরীক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিনোদন, বুদ্ধিজীবী মহল ও জাতীয় রাজনীতির আঙিনায়।
আদালতে বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘ককরোচ’ বা ‘আরশোলা’ শব্দটিকে নিজেদের অপমান ও ক্ষোভের প্রতীক বানিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন দলটির মূল রূপকার অভিজিৎ দীপকে এবং তাঁর সহযোদ্ধা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগকে তাঁরা সশরীরে উপস্থিত রাজপথের গণআন্দোলনে রূপ দেন। তবে তরুণদের এই লড়াইকে এক লহমায় এক অনন্য নৈতিক উচ্চতায় নিয়ে যান প্রখ্যাত পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুক। যন্তর মন্তরে তাঁর অনশন আন্দোলনকে এনে দেয় গান্ধীবাদী আত্মত্যাগের মাত্রা। পরে স্বাস্থ্যের অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেই কঠিন সময়ে আন্দোলন পরিচালনা ও আইনি লড়াইয়ের হাল ধরেন তাঁর স্ত্রী তথা শিক্ষাবিদ গীতাঞ্জলি জে অ্যাংমো।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে বিনোদন জগতের মানুষের সরাসরি রাজপথে নেমে আসা। প্রবীণ অভিনেত্রী শবানা আজমি বারবার যন্তর মন্তরে ছুটে গিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের কথা শুনেছেন। তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়ে প্রখ্যাত গীতিকার ও লেখক জাভেদ আখতার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে একটি চিঠি পাঠান, যেখানে অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে তাঁদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার আর্জি জানানো হয়।
একই সুর শোনা যায় অভিনেত্রী রত্না পাঠক শাহ-এর কণ্ঠেও। তিনি সর্বসমক্ষে অত্যন্ত চাঁচাছোলা ভাষায় সরকারের এই পুলিশি দমনপীড়নের তীব্র প্রতিবাদ জানান। রত্না পাঠক শাহ পরিষ্কার করে বলেন যে, নিজের অধিকারের জন্য সোচ্চার হওয়া তরুণদের গায়ে ‘বিশৃঙ্খলাকারী’ বা ‘দেশবিরোধী’ তকমা দিয়ে তাঁদের দাবিকে দমিয়ে দেওয়া কোনো সুস্থ ও সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
একইভাবে দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা প্রকাশ রাজ সরাসরি দিল্লির ধরণাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি হাতে দেশের সংবিধানের কপি তুলে ধরে স্লোগান তোলেন এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার জটিল আইনি মারপ্যাঁচকে সাধারণ মানুষের কাছে নাগরিক অধিকারের ভাষায় বুঝিয়ে দেন।
রাজনৈতিক ব্যঙ্গ রচয়িতা কুণাল কামরা এবং অভিনেত্রী স্বরা ভাস্কর যন্তর মন্তরে এসে আন্দোলনকারীদের সশরীরে সমর্থন জানান। কুণাল কামরার উপস্থিতি ইন্টারনেট ও মিমের দুনিয়ায় গড়ে ওঠা ক্ষোভকে রাজপথের লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।
অভিনেত্রী হুমা কুরেশি তাঁর ভাই সাকিব সেলিমকে নিয়ে আন্দোলনস্থলে পৌঁছন। সেখানে উপস্থিত সংবাদমাধ্যমের সামনে হুমা অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন যে তিনি সম্পূর্ণভাবে শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে আছেন এবং পরীক্ষা ফাঁসের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতেই হবে। এছাড়া মডেল ও অভিনেত্রী পুনম পাণ্ডেও যন্তর মন্তরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে আসেন।
এঁরা সকলেই তখন ছাত্রদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান যখন তাদের পুলিশদের লাঠির ঘায়ে হাসপাতালে যেতে হয়নি। এঁরা সকলেই তাদের দাবিকে সমর্থন জানিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
তারপর ২০ জুলাই, সংসদ ভবন অভিযানে এই আন্দোলনের রূপে ভয় পেয়ে দিল্লি পুলিশ তার ভয়ঙ্কর লাঠি চালায় শিক্ষার্থীদের উপর। এই ঘটনার পর বহু চেনা মুখ এই ঘটনার নিন্দা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেনি। আবার অনেকেই এখনও বিরত।
কিন্তু কেন? তাঁরা কি জানেন না দেশ কীসে তোলপাড়? নাকি তাঁরা এই ঘটনাকে ভুল মনে করেন না?
সম্প্রতি প্রায় ৭০ হাজার ফলোয়ার থাকা ক্যাটরিনা ক্যাফের একটি ফ্যানপেজ বন্ধ করে দেয় সেই পেজের অ্যাডমিন। কারণ, অভিনেত্রী এই বিষয়ে কোনো মত পোষণ করেননি বলে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Rahul Gandhi: রাহুল গান্ধীর ছাত্র-যুব নেতৃত্বাধীন নিট আন্দোলনে অংশগ্রহণ, তাঁর আটক এবং মুক্তি ভারতের বিরোধী রাজনীতিকে নতুন আলোচনায় নিয়ে এসেছে। কীভাবে একটি ছাত্র আন্দোলন জাতীয় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হলো এবং বিরোধী রাজনীতির সামনে নতুন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করল?

আমরা কয়েকদিন পর পরই শুনতে পাই, শিল্পীদের কাজ হারানোর বিভিন্ন অদ্ভুত সব কারণ। ছবির মাঝপথে শিল্পী বদল, কাজের পরও বিভিন্ন রকম ঝামেলা, এছাড়া কাজ না পাওয়া, চলচ্চিত্র জগতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তো আছেই। এ তো গেল, ইন্ডাস্ট্রির ভিতরের কথা। এর বাইরে চলচ্চিত্র জগতের ক্রমবর্ধমান করপোরেট সংস্কৃতির সঙ্গে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে বিতর্ক মানেই বড়সড় আর্থিক ক্ষতি। তারকারা কেবল অভিনেতা নন, তাঁরা একেকটি ‘ব্র্যান্ড’—যাঁদের বাণিজ্যিক মূল্য বজায় রাখা নির্ভর করে তাঁদের ভাবমূর্তির উপর। এমন পরিস্থিতিতে এই নীরবতাই তাঁদের জন্য ঝুঁকি এড়ানোর উপায়।
তবে একে রাজনৈতিক উদাসীনতা বলা ভুল হবে। অফিসিয়ালি কিচ্ছু বলা বারণ থাকে না,কিন্তু মুখ খুললে তার মাসুল গুনতে হবে।
যন্তর মন্তরের প্রতিবাদের উত্তাপ দিল্লির সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছে। এখন তা দেশজুড়ে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে। মুম্বইয়ের রাজপথেও ছড়াতে সময় নেয়নি। রণবীর সিং অভিনীত বহুচর্চিত সিনেমা ‘ধুরন্ধর’-এর জনপ্রিয় আইটেম গান “শারারাত”-এর মাধ্যমে রাতারাতি নজর কাড়া অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী আয়েশা খান ছাত্রদের সমর্থন করতে পৌঁছন মুম্বইয়ের দাদরে। যেখানে ‘ধুরন্ধর’ সিনেমার মূল তারকাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, সেখানে আয়েশা খান কোনো রাজনৈতিক জটিলতার তোয়াক্কা না করে সরাসরি ছাত্রদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। মুম্বইয়ের দাদারে তিনি ও তাঁর বন্ধুরা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে, কোনো স্লোগান না দিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু মুম্বই পুলিশ অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের জোর করে ধরে পুলিশ ভ্যানে তোলে।
পরবর্তীতে ওয়ার্লি থানায় কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখার পর ছেড়ে দেওয়া হলে আয়েশা ইনস্টাগ্রামে এক আবেগঘন ভিডিও শেয়ার করে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের কথা জানান। কাঁপানো গলায় তিনি বলেন যে তিনি কেবল রাস্তায় চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলেন, কোনো প্রতিবাদ শুরু করার আগেই পুলিশ তাঁকে ভ্যানে তুলে নেয়।
যারা দিল্লিতে সরাসরি পৌঁছতে পারেননি, তাঁদের ভার্চুয়াল প্রতিরোধও কম তীব্র ছিল না। সংগীতশিল্পী অরিজিৎ সিং তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পেজে লেখেন যে, চাইলে তাঁর প্লেলিস্ট ডিলিট করে দিতে পারেন কিন্তু এই কঠিন সময়ে তিনি দেশের শিক্ষার্থীদের পাশে আছেন এবং তাঁদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানান।
মেগাষ্টার সালমান খান আন্দোলনস্থলে সহিংসতার খবর পেয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে এটি একটি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ছিল, এখানে হিংসার কোনো স্থান নেই এবং সরকারের উচিত যুবসমাজের কথা শোনা।
অভিনেতা সোনু সুদ পুলিশি দমনপীড়নের কড়া সমালোচনা করে বলেন যে শিক্ষার্থীদের পুলিশি লাঠি বা শক্তি দিয়ে নয়, বরং সহানুভূতি ও মানবিকতা দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।

সংগীতশিল্পী দিলজিৎ দোসাঞ্জ নিজের বিরুদ্ধে উঠতে থাকা অপপ্রচারের পরোয়া না করে সোজাসাপ্টা জানান যে তরুণদের উপর এমন দমনপীড়ন এক সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ হতে পারে না।

তারকা দম্পতি রিতেশ ও জেনেলিয়া দেশমুখ জানান যে যুবসমাজই এই দেশের হৃৎস্পন্দন, তাই তাঁদের ভয় ছাড়া স্বাধীনভাবে কথা বলতে দেওয়া উচিত।

কমেডিয়ান বীর দাস অন্য বিনোদন তারকাদের আয়না দেখিয়ে প্রশ্ন তোলেন যে, যে তরুণদের উপর ভিত্তি করে আমাদের এই বিনোদন শিল্প চলে, তাদের বিপদের দিনে চুপ থাকা অন্যায়।
এদের পাশাপাশি ভূমি পেডনেকর, দিয়া মির্জা, সোনি রাজদান, অদিতি রাও হায়দারি, অনুরাগ কাশ্যপ, নাসিরুদ্দিন শাহ, জিনাত আমান, আলিয়া ভট্ট, সোনাক্ষী সিনহা এবং অতুল কুলকার্নির মতো ব্যক্তিত্বরা ভিডিও ও বার্তার মাধ্যমে নিরন্তর সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
সংস্কৃতি জগতের এই প্রতিরোধ ধীরে ধীরে সংসদের অলিন্দেও আছড়ে পড়ে। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী যন্তর মন্তরের এই দাবিগুলিকে সংসদের মূল বিতর্কে পরিণত করেন। তিনি ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের কাছে অবস্থান বিক্ষোভে বসে পুলিশের হাতে আটক হন। তাঁদের পাশাপাশি সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর, শিবসেনা (UBT) সাংসদ সঞ্জয় রাউত এবং ভীম আর্মির প্রধান চন্দ্রশেখর আজাদ এই আন্দোলনের পক্ষে এক শক্তিশালী বিরোধী জোট গড়ে তোলেন। এমনকী শাসক জোটের ভিতর থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিরাগ পাসোয়ান প্রকাশ্যে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভ অত্যন্ত বাস্তব এবং বলপ্রয়োগের বদলে আলোচনার মাধ্যমেই এর সমাধান হওয়া দরকার।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক চাপ বাড়ায় কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে. পি. নাড্ডা সিজেপি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনায় বসেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের আশ্বাস দিতে বাধ্য হন। তবে এই আন্দোলনের আসল নায়ক কিন্তু কোনো সেলিব্রিটি বা রাজনেতা নয়। আন্দোলনের আসল মুখ সেইসব অগণিত নিট ও সিবিএসই পরীক্ষার্থী, মধ্যবিত্ত বাবা-মা এবং রোদে পুড়ে রাজপথে বসে থাকা সাধারণ মানুষ। তারকা ও বুদ্ধিজীবীদের এই সোচ্চার অংশগ্রহণ সেই সাধারণ মানুষের লড়াইকেই কেবল এক সর্বভারতীয় মানচিত্র ও নৈতিক মর্যাদা এনে দিয়েছে।








