নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?

inscript
৩ মিনিট
নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

নেপালের হড়পা বান ও বন্যার ছবি যত সামনে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা। ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মানুষের জীবন—কিছুই রক্ষা পায়নি প্রকৃতির এই তাণ্ডব থেকে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের আর একটি দিক রয়েছে, যা হয়তো ধ্বংসস্তূপের ছবির আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। তা হলো, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন নারীরা। রাষ্ট্রপুঞ্জের সংস্থা ইউএন উইমেনের হিসেব বলছে, নেপালের রাসুয়া ও নুওয়াকোট জেলায় প্রায় ১ লক্ষ ৫৭ হাজার ৫০ জন নারী এই বন্যায় সরাসরি বা পরোক্ষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ধাদিং জেলাতেও আরও বহু নারী এই বিপর্যয়ের শিকার। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার।

২৬ অগাস্ট নেপালের পাহাড়ি এলাকায় আচমকাই নেমে এসেছিল ভয়াবহ হড়পা বান। ভোতে কোশি এবং ত্রিশূলী নদীর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা মুহূর্তের মধ্যে জল ও কাদার স্রোতে ভেসে যায়। পাহাড়ি এলাকায় এই ধরনের হড়পা বান এমনিতেই অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। কারণ সাধারণ বন্যার মতো এখানে মানুষের হাতে প্রস্তুতির জন্য খুব বেশি সময় থাকে না। কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর জল কয়েক মিটার বেড়ে গিয়ে বাড়িঘর, রাস্তা, সেতু, গাড়ি, বিদ্যুৎ প্রকল্প—সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এবারের বিপর্যয়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

বন্যার পর উদ্ধারকাজ শুরু হলেও পরিস্থিতি এখনও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়নি। বহু মানুষ নিখোঁজ। হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া। খাদ্য ও পানীয় জলের সংকট তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছনোও কঠিন হয়ে উঠেছে। ৩১ অগাস্টের প্রতিবেদনে নেপালে মৃতের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার কথাও উঠে এসেছে, যদিও উদ্ধারকাজ চলতে থাকায় সংখ্যাটি আরও বদলাতে পারে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই ইউএন উইমেন মহিলাদের নিয়ে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছে। সমাজে আগে থেকেই যে বৈষম্য রয়েছে, দুর্যোগের সময়ে তা আরও গভীর হয়ে ওঠে। যে মহিলা স্বাভাবিক সময়েই অর্থনৈতিক ভাবে পরিবারের উপর নির্ভরশীল, দুর্যোগের পরে তাঁর নিজের প্রয়োজনের কথা বলার সুযোগ আরও কমে যায়। যে মহিলা বাড়িতে শিশু, বয়স্ক মানুষ বা অসুস্থ পরিবারের সদস্যের দেখভাল করেন, বিপর্যয়ের সময় সেই দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।

বন্যার পরে সবচেয়ে জরুরি হয়ে ওঠে খাবার এবং নিরাপদ পানীয় জল। কিন্তু সেই জল সংগ্রহের দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই মহিলাদের উপরেই পড়ে। বন্যায় যখন বাড়ির কাছের জলের উৎস আর জল পাওয়া যায় না, তখন তাঁদের আরও দূরে গিয়ে জল সংগ্রহ করতে হয়। তাতে যেমন শারীরিক পরিশ্রম বাড়ে, তেমনই নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হয়।

শুধু খাবার বা জলের সমস্যা নয়, স্বাস্থ্য পরিষেবাও বড় চিন্তার বিষয়। বন্যায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে গর্ভবতী মহিলা, সদ্য মা হওয়া মহিলা কিংবা নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন রয়েছে এমন মহিলাদের সমস্যা সবচেয়ে বেশি হয়। পাশাপাশি শৌচাগার, স্যানিটারি সামগ্রী এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবও তৈরি হয়। ত্রাণশিবিরে পর্যাপ্ত আলাদা জায়গা বা নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকলে নারীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

এর সঙ্গে রয়েছে আরও ভয়ঙ্কর একটি আশঙ্কা—হিংসা ও শোষণের ঝুঁকি। বাড়িঘর ভেসে গেলে মানুষকে অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকতে হয়। পরিবারের সদস্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থায় নারীরা পাচার, যৌন হেনস্থা, শারীরিক নির্যাতন এবং নানা ধরনের শোষণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ইউএন উইমেনও জানিয়েছে, বন্যার পরে মহিলাদের বিরুদ্ধে হিংসা, পাচার ও শোষণের আশঙ্কা বেড়ে যায়।

তাছাড়া ত্রাণ পেতে হলে অনেক সময় প্রশাসনের কাছে নাম নথিভুক্ত করতে হয়, পরিচয়পত্র দেখাতে হয় বা নির্দিষ্ট আবেদনপদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী বহু মহিলা এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানেন না। ইউএন উইমেনের হিসাব অনুযায়ী, রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা ও চিতওয়ান—এই জেলাগুলিতে প্রায় প্রতি তিনজন মহিলার মধ্যে একজন নিরক্ষর। ফলে ত্রাণের খবর জানা, সরকারি সহায়তার জন্য নথিভুক্ত হওয়া কিংবা নিজের অধিকার অনুযায়ী সাহায্য চাওয়া তাঁদের পক্ষে আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

ইউএন উইমেন জানিয়েছে, বাগমতীর প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ পরিবারের প্রধান মহিলা। তাঁদের মধ্যে আবার এক-তৃতীয়াংশ পরিবার এমন, যারা ইতোমধ্যেই আর্থিক চাপের মধ্যে থাকা রেমিট্যান্স বা বিদেশে কর্মরত পরিবারের সদস্যদের পাঠানো টাকার উপর নির্ভরশীল। বন্যায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বা পরিবারের উপার্জনকারী সদস্য নিখোঁজ হলে এই পরিবারগুলি আরও অসহায় হয়ে পড়ে।

তাই কোথায় খাবার পৌঁছল, কতগুলি বাড়ি ভাঙল কিংবা কতজনকে উদ্ধার করা হল—এই হিসাবের পাশাপাশি দেখতে হবে নারীরা কী অবস্থায় রয়েছেন। তাঁরা নিরাপদে রয়েছেন কি না, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা পাচ্ছেন কি না, শিশুদের দেখাশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য মিলছে কি না, শৌচাগার ও স্যানিটারি সামগ্রী রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মহিলাদের নেতৃত্বে পরিচালিত ইউএন উইমেনের ‘কমিউনিটি কিচেন’র মাধ্যমে দুর্গত মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি মহিলাদের নিজেদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে জরুরি খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি মহিলাদের জীবিকা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের পথও তৈরি হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ইউএন উইমেন প্রায় ২০ লক্ষ ডলারের জরুরি সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে। সেই অর্থ মহিলাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসনের কাজে ব্যবহার করার কথা। বিশেষ করে যারা ঘর হারিয়েছেন অথবা হিংসা, পাচার ও শোষণের ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাঁদের দিকে আলাদা করে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের হড়পা বান: হিমালয়ে কেন বাড়ছে হিমবাহধস ও আকস্মিক বন্যা?

Nepal glacier disaster: নেপাল-তিব্বত সীমান্তের লাংতাং উপত্যকায় হিমবাহ ধসে প্রাণহানি ৩৮৯ জনের, নিখোঁজ ১,৪০০-র বেশি। ইউএসজিএস জানিয়েছে, ভূমিকম্প নয়, বরফের স্তূপ ভেঙেই বিপর্যয়। আইসিআইএমওডির তথ্য বলছে, প্রতি ৩০ মিনিটে নদীর জল ৯ মিটার বেড়ে গিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রত্যক্ষ ফল আজ হিমালয় থেকে সারা বিশ্বকে সতর্ক করছে।