নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন
Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?
নেপালের হড়পা বান ও বন্যার ছবি যত সামনে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এই বিপর্যয়ের ভয়াবহতা। ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মানুষের জীবন—কিছুই রক্ষা পায়নি প্রকৃতির এই তাণ্ডব থেকে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের আর একটি দিক রয়েছে, যা হয়তো ধ্বংসস্তূপের ছবির আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। তা হলো, বন্যায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন নারীরা। রাষ্ট্রপুঞ্জের সংস্থা ইউএন উইমেনের হিসেব বলছে, নেপালের রাসুয়া ও নুওয়াকোট জেলায় প্রায় ১ লক্ষ ৫৭ হাজার ৫০ জন নারী এই বন্যায় সরাসরি বা পরোক্ষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ধাদিং জেলাতেও আরও বহু নারী এই বিপর্যয়ের শিকার। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার।
২৬ অগাস্ট নেপালের পাহাড়ি এলাকায় আচমকাই নেমে এসেছিল ভয়াবহ হড়পা বান। ভোতে কোশি এবং ত্রিশূলী নদীর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা মুহূর্তের মধ্যে জল ও কাদার স্রোতে ভেসে যায়। পাহাড়ি এলাকায় এই ধরনের হড়পা বান এমনিতেই অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। কারণ সাধারণ বন্যার মতো এখানে মানুষের হাতে প্রস্তুতির জন্য খুব বেশি সময় থাকে না। কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর জল কয়েক মিটার বেড়ে গিয়ে বাড়িঘর, রাস্তা, সেতু, গাড়ি, বিদ্যুৎ প্রকল্প—সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। এবারের বিপর্যয়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
বন্যার পর উদ্ধারকাজ শুরু হলেও পরিস্থিতি এখনও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়নি। বহু মানুষ নিখোঁজ। হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া। খাদ্য ও পানীয় জলের সংকট তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছনোও কঠিন হয়ে উঠেছে। ৩১ অগাস্টের প্রতিবেদনে নেপালে মৃতের সংখ্যা ৯০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার কথাও উঠে এসেছে, যদিও উদ্ধারকাজ চলতে থাকায় সংখ্যাটি আরও বদলাতে পারে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই ইউএন উইমেন মহিলাদের নিয়ে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছে। সমাজে আগে থেকেই যে বৈষম্য রয়েছে, দুর্যোগের সময়ে তা আরও গভীর হয়ে ওঠে। যে মহিলা স্বাভাবিক সময়েই অর্থনৈতিক ভাবে পরিবারের উপর নির্ভরশীল, দুর্যোগের পরে তাঁর নিজের প্রয়োজনের কথা বলার সুযোগ আরও কমে যায়। যে মহিলা বাড়িতে শিশু, বয়স্ক মানুষ বা অসুস্থ পরিবারের সদস্যের দেখভাল করেন, বিপর্যয়ের সময় সেই দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।
বন্যার পরে সবচেয়ে জরুরি হয়ে ওঠে খাবার এবং নিরাপদ পানীয় জল। কিন্তু সেই জল সংগ্রহের দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই মহিলাদের উপরেই পড়ে। বন্যায় যখন বাড়ির কাছের জলের উৎস আর জল পাওয়া যায় না, তখন তাঁদের আরও দূরে গিয়ে জল সংগ্রহ করতে হয়। তাতে যেমন শারীরিক পরিশ্রম বাড়ে, তেমনই নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
শুধু খাবার বা জলের সমস্যা নয়, স্বাস্থ্য পরিষেবাও বড় চিন্তার বিষয়। বন্যায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে গর্ভবতী মহিলা, সদ্য মা হওয়া মহিলা কিংবা নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন রয়েছে এমন মহিলাদের সমস্যা সবচেয়ে বেশি হয়। পাশাপাশি শৌচাগার, স্যানিটারি সামগ্রী এবং নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবও তৈরি হয়। ত্রাণশিবিরে পর্যাপ্ত আলাদা জায়গা বা নিরাপদ স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকলে নারীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
এর সঙ্গে রয়েছে আরও ভয়ঙ্কর একটি আশঙ্কা—হিংসা ও শোষণের ঝুঁকি। বাড়িঘর ভেসে গেলে মানুষকে অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকতে হয়। পরিবারের সদস্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থায় নারীরা পাচার, যৌন হেনস্থা, শারীরিক নির্যাতন এবং নানা ধরনের শোষণের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ইউএন উইমেনও জানিয়েছে, বন্যার পরে মহিলাদের বিরুদ্ধে হিংসা, পাচার ও শোষণের আশঙ্কা বেড়ে যায়।
তাছাড়া ত্রাণ পেতে হলে অনেক সময় প্রশাসনের কাছে নাম নথিভুক্ত করতে হয়, পরিচয়পত্র দেখাতে হয় বা নির্দিষ্ট আবেদনপদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী বহু মহিলা এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানেন না। ইউএন উইমেনের হিসাব অনুযায়ী, রসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং, গোরখা ও চিতওয়ান—এই জেলাগুলিতে প্রায় প্রতি তিনজন মহিলার মধ্যে একজন নিরক্ষর। ফলে ত্রাণের খবর জানা, সরকারি সহায়তার জন্য নথিভুক্ত হওয়া কিংবা নিজের অধিকার অনুযায়ী সাহায্য চাওয়া তাঁদের পক্ষে আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ইউএন উইমেন জানিয়েছে, বাগমতীর প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ পরিবারের প্রধান মহিলা। তাঁদের মধ্যে আবার এক-তৃতীয়াংশ পরিবার এমন, যারা ইতোমধ্যেই আর্থিক চাপের মধ্যে থাকা রেমিট্যান্স বা বিদেশে কর্মরত পরিবারের সদস্যদের পাঠানো টাকার উপর নির্ভরশীল। বন্যায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে বা পরিবারের উপার্জনকারী সদস্য নিখোঁজ হলে এই পরিবারগুলি আরও অসহায় হয়ে পড়ে।
তাই কোথায় খাবার পৌঁছল, কতগুলি বাড়ি ভাঙল কিংবা কতজনকে উদ্ধার করা হল—এই হিসাবের পাশাপাশি দেখতে হবে নারীরা কী অবস্থায় রয়েছেন। তাঁরা নিরাপদে রয়েছেন কি না, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা পাচ্ছেন কি না, শিশুদের দেখাশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য মিলছে কি না, শৌচাগার ও স্যানিটারি সামগ্রী রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মহিলাদের নেতৃত্বে পরিচালিত ইউএন উইমেনের ‘কমিউনিটি কিচেন’র মাধ্যমে দুর্গত মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি মহিলাদের নিজেদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে জরুরি খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি মহিলাদের জীবিকা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের পথও তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইউএন উইমেন প্রায় ২০ লক্ষ ডলারের জরুরি সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে। সেই অর্থ মহিলাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং পুনর্বাসনের কাজে ব্যবহার করার কথা। বিশেষ করে যারা ঘর হারিয়েছেন অথবা হিংসা, পাচার ও শোষণের ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাঁদের দিকে আলাদা করে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।






