প্রথম বাঙালি কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে কানের রেড কার্পেটে নিরঞ্জন
Laughtersane Cannes Film Festival 2026: সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘লাফটারসেন’ নামে পরিচিত নিরঞ্জন মণ্ডল কানের রেড কার্পেটে হাঁটলেন প্রথম বাঙালি কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে। বাংলা ভাষায় কনটেন্ট তৈরি করেই তিনি পৌঁছে গেলেন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে।
সোশ্যাল মিডিয়ার পর্দায় যাঁকে সবাই চেনেন ‘লাফটারসেন’ নামে, সেই নিরঞ্জন মণ্ডল এবার পৌঁছে গেলেন বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে। ২০২৬ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবের রেড কার্পেটে হেঁটে ইতিহাস গড়লেন তিনি। প্রথম বাঙালি কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে কানের রেড কার্পেটে অংশ নিয়ে নিরঞ্জন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলার সংস্কৃতিকেও তুলে ধরেছেন নতুনভাবে।
আজকের দিনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয়তা অর্জন করা অনেকের কাছেই স্বপ্ন। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে রূপান্তরিত করতে পারেন খুব কম মানুষই। নিরঞ্জন মণ্ডল সেই বিরল ব্যতিক্রম। নিজের সৃজনশীল ভিডিও, অভিনব চরিত্র নির্মাণ এবং বাংলার সমাজ-সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে তৈরি কনটেন্টের মাধ্যমে তিনি ইতোমধ্যেই লক্ষ লক্ষ দর্শকের মন জয় করেছেন। এবার সেই পথ তাঁকে পৌঁছে দিল ফ্রান্সের কানে।
এক সময় মনে করা হতো, আন্তর্জাতিক মঞ্চে জায়গা পেতে গেলে ইংরেজি ভাষা বা মূলধারার বলিউড সংস্কৃতির আশ্রয় নিতে হবে। নিরঞ্জনের সাফল্য আবারও সেই ধারণাকে বদলে দিল। বাংলাতেই তৈরি করা কনটেন্ট তাঁকে এনে দিল বিশ্বের অন্যতম আলোচিত সাংস্কৃতিক মঞ্চে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ।
ইনস্টাগ্রামে কান সফরের খবর জানিয়ে নিরঞ্জন লিখেছিলেন,
We’re going to debut at Cannes Film Festival… It feels like a dream come true.
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
‘অদম্য’ হলো বাংলার মধ্যবিত্ত ঘর থেকে উঠে আসা এক বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পাস করা বেকার যুবকের কমরেড হয়ে গড়ে ওঠার গল্প। পরিচালক রঞ্জন ঘোষ এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে পুঁজিবাদী সরকার ভোটের সময়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নেয় এবং তারপর দেশের মানুষকে পুঁজির চাকা দিয়ে পিষে মারে।
সেই পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। অনুরাগীদের পাশাপাশি অভিনয়জগতের বহু পরিচিত মুখও তাঁকে শুভেচ্ছা জানান।
তবে নিরঞ্জনের কাছে এই সফরের গুরুত্ব শুধুমাত্র গ্ল্যামার বা আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, তিনি কানের মঞ্চে বাংলার সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে চান। তাঁর মতে, বাংলা শুধু একটি ভাষা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সিনেমা, সাহিত্য, গান, শিল্প ও পোশাকের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরাই তাঁর মূল উদ্দেশ্য।
কান চলচ্চিত্র উৎসব বহু দশক ধরেই বিশ্ব সিনেমার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এখানে সাধারণত চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা, প্রযোজক ও ফ্যাশন জগতের তারকারা অংশ নেন। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ডিজিটাল যুগের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও এই মঞ্চে জায়গা করে নিচ্ছেন। ২০২৬ সালের উৎসবে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের একাধিক আঞ্চলিক কনটেন্ট নির্মাতা অংশ নেন, যাঁদের মধ্যে অন্যতম নিরঞ্জন মণ্ডল।
বাংলার সাধারণ পরিবারের ছেলে নিরঞ্জন নিজের পরিশ্রম ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে এই জায়গায় পৌঁছেছেন। তাঁর ভিডিওগুলিতে যেমন হাস্যরস থাকে, তেমনই থাকে সমাজ পর্যবেক্ষণ, আত্মসমালোচনা এবং সমকালীন জীবনের নানা দিক।
ডিজিটাল জগতে জনপ্রিয়তা অর্জনের পাশাপাশি অভিনয়েও পা রেখেছেন নিরঞ্জন। বাংলা ওয়েব সিরিজ ‘বীরাঙ্গনা’-য় তাঁর অভিনয় দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
কানের রেড কার্পেটে তাঁর পোশাকও বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক নকশার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তৈরি পোশাকে তিনি হাজির হন। এই সাজের মধ্যেও ছিল বাঙালি সত্তার ছাপ। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রাখার এই প্রয়াস অনেকের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
নিরঞ্জনের এই সাফল্য তরুণ প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ছোট শহর থেকে উঠে এসেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছনো সম্ভব, যদি থাকে নিজস্ব কণ্ঠস্বর এবং ধারাবাহিক পরিশ্রম। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন সেই সুযোগ তৈরি করেছে।
এক সময় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের রেড কার্পেট মানেই ছিল চলচ্চিত্র তারকাদের দখল। এখন সেখানে জায়গা পাচ্ছেন এমন মানুষও, যাঁরা মোবাইল ফোন ও সামাজিক মাধ্যমকে হাতিয়ার করে লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছেছেন।
বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বে সমাদৃত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে সত্যজিৎ রায়—এই ধারার উত্তরাধিকার বহন করে নতুন প্রজন্মও নিজেদের মতো করে বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিচ্ছে। নিরঞ্জন মণ্ডলের কান যাত্রা সেই উত্তরাধিকারেরই এক নতুন অধ্যায়।







