'ও তোতা পাখি রে...' বাঙালির হাসিকান্নাকে কণ্ঠে ধরে রেখেছিলেন নির্মলা মিশ্র

যে গানগুলি কোনও দিন বাংলা গানের শ্রোতাকে ভুলতে দেবে না নির্মলা মিশ্রকে, তার মধ্যে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়- 'এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’, 'সেই একজন দিও না তাকে মন’, `বলো তো আরশি'...

tiasa gupta
৪ মিনিট
'ও তোতা পাখি রে...' বাঙালির হাসিকান্নাকে কণ্ঠে ধরে রেখেছিলেন নির্মলা মিশ্র

এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না...

বাঙালির শিরায়-ধমনিতে এখনও অনুরণিত হয় তাঁর সুরেলা সফর। 'এমন একটা মানুষ খুঁজে পেলাম না, যাঁর মন আছে’, এই অন্বেষণ করেছেন গানের অলিগলিতে। কিন্তু গানের সাধনাকে নির্মলা মিশ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। হৈমন্তী শুক্লার গাওয়া এই গানটিই যেন ছিল তাঁর জীবনমন্ত্র,

গানই সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা

লাগে না ফুলচন্দন, মন্ত্রতন্ত্র লাগে না

৩০ জুলাই রাতে বিদায় নিলেন 'হাসিকান্নার চিরদিনের সাথী’। বাংলা গানের ভান্ডারকে অমৃতকুম্ভ করে চলে গেলেন সুরলোকে। বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। জীবনমৃত্যুর সীমানায় দাঁড়িয়ে বার বার লড়াই করেছেন। তাঁর চিকিৎসক কৌশিক চক্রবর্তী জানিয়েছেন, আগে অনেকবার লড়াই করে হাসপাতাল থেকে বাড়ি এসেছেন। এবার আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী হলেন না। চেতলার বাড়িতেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

পরাধীন ভারতে ১৯৩৮ সালে দক্ষিণ ২৪ পরগণার মজিলপুরে জন্মগ্রহণ করেন নির্মলা। পরে বাবার চাকরির সূত্রে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের পরিবেশে বড় হয়েছেন তিনি। কাশী সংগীত সমাজ তাঁর বাবাকে পণ্ডিত, সংগীতরত্ন-সহ একাধিক উপাধিতে ভূষিত করে। জন্মের পর থেকেই সংগীতের প্রতি অসীম আগ্রহ ছিল তাঁর। কৈশোর থেকেই দুর্দান্ত গান গাইতেন তিনি। তখনই জানান দিয়েছিলেন, তিনি আগামীর উজ্জ্বল মুক্ত। তাঁরা সুরেলা কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হয় আপামর বাংলা। মণিমুক্তোর মতো তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য ছড়িয়ে পড়ে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। তাই তো তাঁর শিল্পী সত্তার মৃত্যু নেই।

আধুনিক বাংলা এবং ফিল্মি গানের জন্য তাঁর সময়ে তো বটেই, সময় অতিক্রম করেও দর্শক মনে তাঁর জায়গা পাকাপাকি। দক্ষিণ কলকাতার চেতলার বাসিন্দা নির্মলা মিশ্রর ডাকনাম `ঝামেলা’। সংগীতজগতের অনেকেই তাঁকে 'ঝামেলাদি’ বলে ডাকতেন।

যে গানগুলি কোনও দিন বাংলা গানের শ্রোতাকে ভুলতে দেবে না নির্মলা মিশ্রকে, তার মধ্যে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়- 'এমন একটা ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’, 'সেই একজন দিও না তাকে মন’, `বলো তো আরশি' `আমি তো তোমার হাসিকান্নার চিরদিনের সাথী’, 'কাগজের ফুল বলে’, `ও তোতা পাখি রে’, `উন্মনা মন স্বপ্নে মগন’। এছাড়া তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় ছায়াছবির গানগুলি হচ্ছে, `আমি হারিয়ে ফেলেছি গানের সাথীরে’, `আবিরে রাঙাল কে আমায়’। তিনি অসংখ্য নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, শ্যামাসংগীত, দেশাত্মবোধক গান এবং লোকসংগীত গেয়েছেন। তিনি মান্না দে, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শিপ্রা বসু এমন অনেক বিখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে গলা মিলিয়েছেন।

গত চার-পাঁচ বছরে বহুবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এবার আর হাসপাতালে যেতে চাননি। বাড়িতেই তাঁর চিকিৎসা করছিলেন ডাক্তার কৌশিক চক্রবর্তী। এর আগে বিভিন্ন সময় তাঁর স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। অনেকবার হাসপাতালে গেছেন। বাড়িও ফিরেছেন। এবার আর শেষ রক্ষা হলো না। অনেক আগেই টাইফয়েডে তাঁর চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, চোখে উঠেছিল হাই পাওয়ারের চশমা। শরীর দুর্বল, তাই পড়াশোনার চাপ নিতে নাজেহাল হয়ে যান। এই অবস্থায় গানকে জীবনের কাণ্ডারি, আশ্রয় করে তুলেছিলেন নির্মলা মিশ্র।

বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া মুক্তোভরা ঝিনুক তিনি, যাঁর অপর নাম তোতাপাখি, তিনি বাংলা গানে বইয়ে দিয়েছেন নির্মল জলধারা, যা প্রবাহিত হবে অনন্তকাল। বাংলা পেরিয়ে উড়িষ্যাতে তিনি স্বনামে খ্যাত। নির্মলা মিশ্র নিজেই বলতেন, "বম্বের যদি লতা মঙ্গেশকর হন, বাংলায় যদি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় হন, তবে ওড়িশায় প্রধান গায়িকা নির্মলা মিশ্র।" প্রচুর ওড়িয়া ছবিতে তিনি ওড়িয়া ভাষায় প্লে-ব্যাক করেছেন। বাংলার মানুষেরও তিনি বড়ই আপন। ছোটবেলার নস্ট্যালজিয়া- `ও তোতা পাখি রে, শিকল খুলে উড়িয়ে দেব, আমার মাকে যদি এনে দাও।‘ একটা প্রজন্মকে আন্দোলিত করেছে এই গান।

নির্মলা মিশ্রর মেজদা মুরারীমোহন মিশ্র ছিলেন খুব প্রতিভাধর শিল্পী। অল্প বয়সেই ধ্রুপদ সংগীতে তাঁর খ্যাতি ভারতব্যাপী ছাড়িয়ে পড়ে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে মুরারীমোহন মারা যান। সেই সময় মুরারীমোহনের বড়দা মনোজমোহন মিশ্র মেজ ভাইয়ের নামে `মুরারী স্মৃতি সংগীত সম্মেলন’ শুরু করেন। যাঁদের সাহচর্যে এই সম্মেলন শুরু হয়, তাঁদের মধ্যে ছিলেন নাটোরের মহারাজ, বর্ধমানের মহারাজা, পাথুরিয়াঘাটার মন্মথ ঘোষ ও কলকাতার প্রথম মেয়র চেতলার বাসিন্দা ফণী ব্রহ্ম। শাস্ত্রীয় সংগীতের বড় বড় শিল্পীরা কে না এসেছেন এই সম্মেলনে। প্রতিযোগিতাও ছিল বড় মাপের। সেই প্রতিযোগিতা থেকেই উঠে এসেছেন নির্মলা নিজেও। খুব ছোট বয়সে সাফল্য পান তিনি। আরতী মুখোপাধ্যায়, হৈমন্তী শুক্লারাও এই সম্মেলন থেকে উত্তীর্ণ। নির্মলা মিশ্র ১৯৬০ সালে সংগীতজগতে পদার্পণ করেন, যখন সংগীত পরিচালক বালকৃষ্ণ দাস তাঁকে `শ্রীলোকনাথ’ ছায়াছবির গানে কণ্ঠ দেওয়ার সুযোগ করে দেন। এরপর তাঁকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। 'স্ত্রী', 'অভিনেত্রী', 'অনুতাপ'- বিভিন্ন ছবিতে তাঁর কণ্ঠের রিমিঝিমি আলোড়ন ফেলেছে।

এই বছরেই মৃত্যু হয়েছে আরও তিন প্রবাদপ্রতিম সংগীতশিল্পীর। ফেব্রুয়ারি মাসের ৬ তারিখ মুম্বইয়ের ব্রিচ ক‍্যান্ডি হাসপাতালে প্রয়াত হন সুরসাম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর। এর কয়েকদিন পরেই ১৫ ফেব্রুয়ারি মুম্বইয়ের হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছিল সুরকার ও সংগীতশিল্পী বাপ্পি লাহিড়ীর। প্রয়াত হন স‌ংগীতশিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ও। এত নক্ষত্রের পতন যেন সংগীতের আকাশকে ঢেকে দিয়েছিল অন্ধকারে। নির্মলা মিশ্রর মৃত্যুতে সেই অন্ধকার আরও ঘনীভূত হলো‌।

সংগীতজগৎ তাঁকে বালকৃষ্ণ দাস পদকে সম্মানিত করেছে। স্বর্ণযুগের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী নির্মলা। তিনি তাঁর ৮১ বছরের জীবনে গানে যে মণি-মুক্তো ছড়িয়েছেন, তাকে আশ্রয় করে বাংলা গানের শ্রোতারা আরও বহুকাল তৃপ্ত থাকবেন। ফলে তাঁর মৃত্যু নেই, মৃত্যু হয় না শিল্পের। বাঙালি গানে গানে খুঁজে যাবে এমন একটা মানুষ, যার মন আছে।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?