আবারও যুদ্ধের ছায়া? জাপানের এই দ্বীপে কেন ঘনিয়ে উঠছে অশান্তির মেঘ?

তাইওয়ান ও জাপানের মূল ভূখণ্ডের মাঝে পূর্ব চিন সাগরের একটি ছোট দ্বীপ অঞ্চল ওকিনাওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী স্মৃতি আজও ভোলেনি এই দ্বীপের অধিবাসীরা। দীর্ঘ ২৭ বছরের মার্কিন শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৭২ সালের ১৫ মে জাপানের অন্তর্ভুক্ত হয় ওকিনাওয়া। এ-বছর ওকিনাওয়ার জাপানে প্রত্যাবর্তনের ৫০ বছর পূর্তি। তবে এখনও পর্যন্ত এই দিনটি দ্বীপের অধিবাসীদের কাছে আনন্দের চেয়ে বেশি তিক্ততার। এখনও পর্যন্ত এই দ্বীপে মার্কিন সামরিক বাহিনীর টহলদারি রয়েছে। সঙ্গে বর্তমানে চিন-জাপান সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কারণে জাপানি সেনাও মোতায়েন রয়েছে ওকিনাওয়ায়।

৫০ বছর পরেও ওকিনাওয়ার অধিবাসীদের মধ্যে হতাশা অব্যাহত। তাই হতাশার নানা কারণ বোঝার চেষ্টা করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। চলুন, দেখে নেওয়া যাক কারণগুলো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে কী ঘটেছিল?
জাপানের মূল ভূখণ্ডে ধাক্কা পাওয়ায় মার্কিন সেনাবাহিনী ওকিনাওয়া দ্বীপে অবতরণ করে। ১৯৪৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত এই দ্বীপে হত্যালীলা চালায় মার্কিন সেনার দল। দ্বীপের অর্ধেক মানুষকে মেরে ফেলে সৈন্যবাহিনী। যার মধ্যে ছাত্র এবং জাপানি সেনার নির্দেশে আত্মহত্যা করা অধিবাসীরাও ছিল। মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দু'লক্ষ। ঐতিহাসিকদের মতে, জাপানি সৈন্যবাহিনী মূল ভূখণ্ডকে রক্ষা করতে ওকিনাওয়া দ্বীপ পরিত্যাগ করেছিল। এই কারণেই ২০ বছরেরও বেশি সময় ওকিনাওয়া মার্কিন সরকারের অধীনেই ছিল।

আরও পড়ুন: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আহতদের সারিয়ে তুলতে পারে তেলাপিয়া মাছ? বাঙালির মাছের বিশ্বজয়

কেন ওকিনাওয়া দখল করা হয়েছিল?
প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তারক্ষায় ওকিনাওয়ার কৌশলগত গুরুত্ব কতখানি, তা বুঝতে পেরেছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। তাছাড়া রাশিয়া এবং কমিউনিজমকে রুখতে দীর্ঘদিন পর্যন্ত সেনা মোতায়েন রেখেছিল মার্কিন সরকার।

১৯৪৬ সালে সর্বোচ্চ কম্যান্ডার জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের বুদ্ধিমতো ওকিনাওয়া এবং জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের বেশ কিছু দ্বীপকে জাপানের মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, যা আদতে মার্কিন শাসনের পথ প্রশস্ত করেছিল। এ-সময় সানফ্রান্সিসকো চুক্তি বা জাপানের শান্তি চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাত বছরের দখলদারির অবসান ঘটে।

ওকিনাওয়া প্রিফেকচারাল আর্কাইভস অনুসারে, সাম্রাজ্যের উপদেষ্টা হিডেনারি তেরাসাকি সম্রাট হিরোহিতোর 'মতামত' ম্যাকআর্থারকে জানিয়েছিলেন।তিনি বলেন যে, ওকিনাওয়াতে মার্কিন সামরিক দখলের কারণে সরকারকে রাশিয়ার উদ্বেগের সমাধান করতে হবে।

উল্লেখ্য, ওকিনাওয়া অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত এবং সামাজিক উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে ছিল মার্কিন সেনার উপস্থিতির কারণে। অন্যদিকে, মার্কিন সেনার উপস্থিতির কারণে জাপানের সরকারের সামরিক খাতে সামান্য খরচের দরুন যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছিল।

মার্কিন শাসনকালে ওকিনাওয়া
মার্কিন শাসনকালে ওকিনাওয়াতে অর্থ হিসেবে ডলার ব্যবহার করা হতো। আমেরিকান ট্রাফিক আইন অনুসরণ করা হতো এবং ওকিনাওয়া থেকে জাপানের মূল ভূখণ্ডে ভ্রমণের জন্য পাসপোর্ট প্রয়োজন হতো। ভিত্তিনির্ভর অর্থনীতির কারণে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ব্যাহত হয়েছে। স্থানীয় ওকিনাওয়ান সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল সীমিত এবং মার্কিন সামরিক কর্মীদের ফৌজদারি তদন্তের কোনও ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের হাতে ছিল না।

এছাড়া মার্কিন ঘাঁটির জন্য স্থানীয় জমি বাজেয়াপ্ত করার কারণে ওকিনাওয়াজুড়ে পাঁচের দশকের শেষ দিকে জাপানে ফিরে যাওয়ার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। সেখানের অধিবাসীরা ওকিনাওয়া এবং বাকি জাপানের মধ্যে পার্থক্য দূর করতে কর সংস্কার, মজুরি বৃদ্ধি এবং একটি উন্নত কল্যাণকর ব্যবস্থার দাবি করেছিল। কিন্তু বিলম্বিত প্রত্যাবর্তন, বিশাল সংখ্যক মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা ভুলভাবে পরিচালিত উন্নয়ন তহবিলের কারণে দ্বীপের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধা পেয়েছে।

আজ ওকিনাওয়ার প্রধান সমস্যাগুলি কী কী?
ওকিনাওয়ার অধিবাসীদের অনেকেই আশা করেছিলেন যে, দ্বীপটি জাপানে ফিরে গেলে অর্থনীতি এবং মানবাধিকারের দিকটি উন্নত হবে। প্রত্যাবর্তনের এক বছর আগে, তৎকালীন ওকিনাওয়া নেতা চোবিও ইয়ারা দ্বীপটিকে সামরিক ঘাঁটিমুক্ত করার জন্য জাপানের কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ জানিয়ে একটি পিটিশন জমা দেন।

যদিও আজ, দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা চুক্তির অধীনে জাপানে ৫০,০০০ মার্কিন সৈন্য রয়েছে এবং যে ৭০% সামরিক সুবিধা ওকিনাওয়াতে রয়েছে, তা জাপান ভূখণ্ডের মাত্র ০.৬%। পাশাপাশি ওকিনাওয়ায় পরিবারগুলোর গড় আয় সবচেয়ে কম এবং দ্বীপের বেকারত্ব জাপানের ৪৭টি প্রিফেকচারের মধ্যে সর্বোচ্চ। যদি মার্কিন সেনাবাহিনীর দখল করা জমি অন্য কাজের জন্যও ফেরত দেওয়া হয় ওকিনাওয়াকে, তাহলে তা এখনের তুলনায় প্রায় তিনগুণ আয় বৃদ্ধি করবে সরকারের। এমনটাই মত ওকিনাওয়ার গভর্নর ডেনি তামাকির।

তামাকি আরও বলেন, মার্কিন ঘাঁটির কারণে ওকিনাওয়া শব্দ ও পরিবেশ দূষণ, বিমান দুর্ঘটনা এবং আমেরিকান সৈন্যদের দ্বারা সম্পাদিত নানা অপরাধের সম্মুখীন হয়। একটি সাম্প্রতিক টেলিভিশন সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, উত্তরদাতাদের ৮২% সামরিক ঘাঁটি-সম্পর্কিত অপরাধ বা দুর্ঘটনার শিকার হওয়া নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

ওকিনাওয়া এবং টোকিওর মধ্যে সম্পর্ক বর্তমানে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ। দু'-দেশের সরকারের মধ্যে সবচেয়ে বড় বাধা হল দ্বীপের কেন্দ্রীয় সরকারের জেদ। সেখানের সরকারের মতে মার্কিন সামুদ্রিক ঘাঁটি, ফুটেনমা এয়ার স্টেশনকে অন্যত্র সরানোর পরিবর্তে ওকিনাওয়ার মধ্যে স্থানান্তর করা উচিত। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে তিন মার্কিন সামরিক সেনা একটি স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর একটি ব্যাপক ঘাঁটি-বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। ফলস্বরূপ টোকিও এবং ওয়াশিংটন প্রাথমিকভাবে ১৯৯৬ সালে স্টেশনটি বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল।

এছাড়া ২০১৯ গণভোটে ৭২% মানুষের বিরোধিতা সত্ত্বেও, টোকিও ওকিনাওয়ার পূর্ব উপকূলে হেনোকো উপসাগরে একটি নতুন রানওয়ে নির্মাণ করেছে। তামাকি মে মাসের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার সরকারের কাছে ওকিনাওয়াতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সংখ্যা হ্রাস, ফুটেনমা ঘাঁটি অবিলম্বে বন্ধ এবং হেনোকো ঘাঁটি নির্মাণ বন্ধ করার দাবিতে একটি নতুন পিটিশন জমা করেছিলেন।

ওকিনাওয়ার ভয়ের আরও একটি কারণ হল উন্নত ক্ষমতাসম্পন্ন জাপানি মিসাইলের মোতায়েন। ইতিমধ্যেই ওকিনাওয়ার ইশিগাকি, মিয়াকো এবং ইয়োনাগুনি দ্বীপে মিসাইল জড়ো করা হয়েছে যা তাইওয়ানের থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে অবস্থিত।

ওকিনাওয়ানদের মনের কথা
মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি নিয়ে এই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ রয়েছে। অনেক ওকিনাওয়ান বিশ্বাস করেন যে, তাঁদের আত্মত্যাগের ফলেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপান-মার্কিন নিরাপত্তা জোট সম্ভব হয়েছিল। এছাড়াও ওকিনাওয়া এবং জাপানের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে পুরনো কিছু সমস্যা রয়েছে। ওকিনাওয়া ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাজনীতির অধ্যাপক হিরোমোরি মায়েডোমারির মতে, বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে এবং দাবি করা হয় যে ওকিনাওয়ানদের ওপর মূল ভূখণ্ড জাপানকে রক্ষা করার জন্য একাধিক ব্যয়ের ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকী, এখানকার কিছু মানুষ জাপানের থেকে স্বাধীন ওকিনাওয়া গঠনের ডাকও তুলেছেন।

জিনশিরো মোটোয়ামা, ২০১৯ গণভোটের অন্যতম সংগঠক বলেছেন, "তাঁদের দাবি বারবার উপেক্ষা করার কারণে এখানকার তরুণ প্রজন্ম এবং যাঁদের কাছে মার্কিন ঘাঁটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ তাঁরা আর কোনও বাক্যব্যয় করতে অনিচ্ছুক।" তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই কারণে ওকিনাওয়ার অধিবাসীরা সংঘাতের শিকারও হতে পারেন।

 

More Articles

;