মালালা ইউসুফজাই - সর্বকনিষ্ঠ নোবেল পুরস্কার বিজয়িনী

Anasuya Sen
৩ মিনিট
মালালা ইউসুফজাই - সর্বকনিষ্ঠ নোবেল পুরস্কার বিজয়িনী

সারা পৃথিবীর নজর এখন আফগানিস্তানের দিকে। পুরো দেশটা তালিবানদের কব্জায়। এখন সেখানে কোনও তরুণী যদি স্কুলে যাওয়ার চেষ্টা করে, তালিবানদের বন্দুকের গুলিতে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। মনে পড়ে, ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা। নিজের স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল একটি মেয়ে। সেই সময় একজন মুখোশপরা বন্দুকবাজ তার স্কুল বাসে উঠে জিজ্ঞাসা করে- "মালালা কে"? তারপরেই ওই বন্দুকবাজ গুলি করে বাসের সিটে বসা একটি মেয়ের মাথার বাঁ-দিকে। ১০ দিন পর মেয়েটির জ্ঞান ফেরে। সে তখন বার্মিংহামের একটি হাসপাতালের বেডে শুয়ে। সেই আক্রান্ত মেয়েটিকে গোটা বিশ্ব চেনে 'মালালা ইউসুফজাই' নামে। নারীশিক্ষার সমর্থনে প্রকাশ্যে কথা বলেছিল ওই একরত্তি কিন্তু জেদি মেয়েটি।

মালালার জন্ম পাকিস্তানে। ১৯৯৭ সালের ১২ জুলাই। মালালার বাবা জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই চাইতেন পুত্রসন্তানকে যে স্বাধীনতা দেওয়া হয় সেই স্বাধীনতা নিজের মেয়েকেও দেবেন। সেইভাবেই মালালাকে বড় করে তুলেছিলেন তিনি।

চিত্রঋণ : Googleজিয়াউদ্দিন একজন শিক্ষক। নিজেদের গ্রামে মেয়েদের একটি স্কুলও চালাতেন তিনি। সেই ভাবেই মালালাকেও শিক্ষা দেওয়া শুরু করেন। চলছিল ভালোই। আচমকা জীবন বদলে গেল। তাদের শহর সোয়াট উপত্যকা দখল করে তালিবানরা। বহু জিনিস নিষিদ্ধ হয়ে যায় তাদের শহরে। টিভি কেনা থেকে শুরু করে গান শোনার পাশাপাশি বন্ধ করে দেয় মেয়েদের স্কুল যাওয়াও। তালিবানরা জানিয়ে দেয়, কেউ যদি তাদের কথা অমান্য করে তাহলে তাদেরকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। এই কারণেই ২০০৮ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে বন্ধ হয়ে যায় মালালার স্কুল যাওয়া।

২০০৯ সালে যখন মালালার যখন ১১-১২ বছর বয়স, সেই সময় সে একটি ব্লগ লেখে। লেখার মাধ্যমে সে আসলে তুলে ধরেছিল নিজের জীবনেরই কথা। এর পরেই সাংবাদিক অ্যাডাম বি এলিক মালালার জীবন নিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি ডকুমেন্টারি করেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের ওই ডকুমেন্টারি তুলে ধরেছিল মালালার জীবনের একটা বড় অংশ। যার মাধ্যমে বিশ্বের একটি বড় অংশের কাছে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে সে। চলতে থাকে সব ধরনের মিডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারও। ওই সময়েই আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয় মালালা।

২০১২ সালের সেই ভয়ঙ্কর ঘটনায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ব্রিটেনে নতুন বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে থাকতে শুরু করে মালালা।এরপরেই সে প্রতিজ্ঞা করে প্রত্যেকটি মেয়ে স্কুলে না যাওয়া পর্যন্ত সে নিজের লড়াই চালিয়ে যাবে। তারপরই প্রতিষ্ঠা করা হয় 'মালালা তহবিল'। এই সংস্থাটির দ্বারা প্রতিটি মেয়ে যাতে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ পায় সেই ব্যবস্থা করে সে। নিজের এবং তার বাবার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ হিসেবে ২০১৪ সালে ডিসেম্বর মাসে 'নোবেল শান্তি পুরস্কার' দিয়ে সন্মান জানানো হয় মালালাকে। সর্বকালের সর্বকনিষ্ঠ নোবেল বিজয়ী হিসেবে। নিজের পুরস্কারটি মালালা ভারতের শিশু অধিকার কর্মী কৈলাশ সত্যার্থীর সঙ্গে ভাগ করে নেন। দ্বিতীয় পাকিস্তানী হিসেবে নোবেলজয়ের কৃতিত্বও মালালার। এর আগে আর মাত্র একজন পাকিস্তানীই এই পুরস্কার পান। পদার্থবিদ আব্দুস সালাম। ১৯৭৯ সালে।

মালালাকে এই পুরস্কারটি দেওয়ার ব্যাপারে অনেকে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন, আবার এমন অনেক মানুষও ছিলেন যাঁরা এই পুরস্কার দানের সিদ্ধান্তকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেননি, উল্টে সমালোচনা করেছিলেন। বিচারকদের যে কমিটি নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন একজন নরওয়েবাসী, ফ্রেডরিক হেফারমেল। তিনি বলেন যে, "যে সমস্ত ব্যক্তি কোনও একটি জনমোহিনী কাজ করে খ্যাতি লাভ করেছেন এবং এই জাতীয় পুরস্কার পেলে খুব খুশি হবেন এই ধরণের ব্যক্তিকে সম্মানিত করার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রচলন করা হয়নি। এই ধরনের ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করার ভাবনাটাই অপ্রাসঙ্গিক। সারা পৃথিবীর বুকে নিরস্ত্রীকরণের মত গুরুত্বপূর্ণ শান্তিকামী কাজ যিনি করবেন একমাত্র তাঁকেই এই সম্মানে ভূষিত করতে চেয়েছিলেন আলফ্রেড নোবেল |”

চিত্রঋণ : Googleদর্শন, রাজনীতি এবং অর্থনীতি নিয়ে মালালা ২০১৮ সাল থেকে পড়াশুনা শুরু করে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে কমপক্ষে পরবর্তী ১২-বছর পর্যন্ত মেয়েরা যাতে সম্মানের সঙ্গে, নিরাপদে এবং নিখরচায় শিক্ষা লাভ করতে পারে তার জন্য মালালা তার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের বাধাহীন শিক্ষা সুনিশ্চিত করবার প্রয়োজনের কথা সাধারণ মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মালালা পৃথিবীর বহু দেশে ভ্রমণ করেছে। বাল্যবিবাহ, লিঙ্গবৈষম্য, দারিদ্র এবং যুদ্ধদীর্ণ সমাজের জাঁতাকলে পড়ে যাতে মেয়েরা শিক্ষা-দীক্ষা ও আত্মবিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয় তার জন্যও নিরন্তর চলেছে মালালার লড়াই।

২০১৩ সালের ১২ জুলাই তারিখে নিজের ১৬তম জন্মদিনে মালালা সংযুক্ত রাষ্ট্রপুঞ্জে বিশ্বব্যাপী মেয়েদের শিক্ষায় প্রবেশের অধিকার সুনিশ্চিত করবার আহ্বান জানিয়ে একটি বক্তব্য পেশ করেছিল। সেই দিনের ওই ঘটনাকে সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জ দিনটিকে ‘মালালা দিবস’ বলে ঘ‌োষণা করেছে।

তথ্য সূত্র : https://malala.org/

লিখেছেন
Anasuya Sen
Anasuya Sen
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।