মোদি-রাজ্যের ভোটে বড় ফ্যাক্টর, কেন এই সম্প্রদায়কে কাছে টানতে মরিয়া সব দল

জল্পনা ছিলই। সেইমতো কংগ্রেসের সঙ্গে হার্দিক প্যাটেলের ডিভোর্স হয়ে গেল। এখন তাঁর তরণী বিজেপির ঘাটে নোঙর করবে কি না, তা সময়ই বলবে, তবে মোদ্দা কথা হল, গুজরাত ভোটে পতিদার একটা বড় ফ্যাক্টর। তারা ভোটের হাওয়া সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিতে পারে। তাই ভোটের ঢাকে কাঠি পড়তেই তাদের কাছে টানতে মরিয়া সব দল। কংগ্রেস, বিজেপি এবং আপ-এর অন্দরে ঢুঁ মেরে একবার দেখা যাক, কারা কী ছক কষছে। হার্দিক বিদায় জানালেও কংগ্রেস কিন্তু চুপ করে বসে নেই। কীভাবে তারা ঘুঁটি সাজাচ্ছে, সে প্রসঙ্গে আসা যাক।

 

পতিদার আন্দোলন থেকে উঠে এসে কংগ্রেসে যোগ দিলেও হার্দিক পটেল বুধবার দল ছেড়েছেন। পতিদার আন্দোলনের মুখ হার্দিকের লড়াই ছিল কার্যত বিজেপির বিরুদ্ধে। তাই স্বাভাবিকভাবে তিনি কংগ্রেসের সমর্থন পান এবং পরে কংগ্রেসে যোগ দেন। তবে 'হাত'-এর সঙ্গে তাঁর মধুচন্দ্রিমার পিরিয়ড বেশিদিন স্থায়ী হল না। এই অবস্থায় পতিদাররা যদি পুরোপুরি কংগ্রেস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে তাদের লড়াই যে বিশাল মুশকিল হবে, তা বলাই বাহুল্য। তাই তারা চুপ করে বসে নেই।

 

বৃহস্পতিবার ভোরেই কংগ্রেস নেতারা রাজকোটে পতিদার সমাজের নেতা নরেশ প্যাটেলের বাড়িতে পৌঁছে যান। নরেশ প্যাটেল পতিদারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় লেউভা প্যাটেলদের সংস্থা, শ্রী খোদালধাম ট্রাস্টের চেয়ারম্যান। সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে নরেশের প্রভাবের জন্য বিজেপি, আম আদমি পার্টিও তাঁকে দলে টানতে চাইছে। এআইসিসি-তে গুজরাতের ভারপ্রাপ্ত নেতা রঘু শর্মা ও গুজরাত প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি জগদীশ ঠাকুর যখন রাজকোটে নরেশ প্যাটেলের সঙ্গে প্রাতরাশের টেবিলে বৈঠক করছেন, সেই একই সময়ে দিল্লি থেকে ভিডিও কনফারেন্সে কুণ্ডলধাম স্বামীনারায়ণ সম্প্রদায়ের যুব শিবিরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বক্তৃতা দিয়েছেন। পতিদারদের মধ্যেও স্বামীনারায়ণ সম্প্রদায়ের প্রভাব প্রবল। মোদিও অন্য পথে পতিদারদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেছেন।

 

আরও পড়ুন: জেলে যাওয়ার ভয়েই হার্দিকের দলত্যাগ?

 

বাংলায় যেমন উত্তর ২৪ পরগনার কিছু অংশে মতুয়া ভোট নিয়ে হইচই হয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, গুজরাতে তেমনই এই পতিদারদের ভোট খুব গুরুত্বপূর্ণ। এরা ভোটের হাওয়া সম্পূর্ণ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। ঘটনা হল এই সম্প্রদায়টি গুজরাতকে অতীতে চারটি মুখ্যমন্ত্রী দিয়েছে। শক্তিশালী পতিদার সম্প্রদায়ের ভোট ১৮২টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে ৬০টিরও বেশি ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। বিজেপি, ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পতিদারদের মন জয় করার জন্য বড় সময় কাজ করেছে। যে উল্লেখযোগ্য অংশ হার্দিক প্যাটেলের প্রভাবে কংগ্রেসে আগে চলে গিয়েছিল, তাদের ভোট ফেরাতে সক্ষম হয় বিজেপি। প্রায় তিন দশক আগে, কংগ্রেসের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মাধব সিং সোলাঙ্কি ক্ষমতা দখলের জন্য ক্ষত্রিয়-হরিজন-আদিবাসী-মুসলিম (কেএইচএএম) জোটের সঙ্গে পরীক্ষা করার পরে পতিদাররা গেরুয়া দলের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়েছিল।

 

গত পাঁচ বছরে, কংগ্রেস বিধায়কের সংখ্যা ৭৭ থেকে ৬৫-তে নেমে এসেছে। সম্প্রতি দলের এক নেতা অভিযোগ করেছেন যে, আসন্ন নির্বাচনের আগে, বিজেপি ১০ জন কংগ্রেস বিধায়ককে 'প্রলোভন দেওয়ার চেষ্টা করছে'। ২০২০ সালে কয়েকজন বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পরে ভয়ে কংগ্রেস তাদের বিধায়কদের একটি রিসর্টে নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এছাড়াও, কংগ্রেসে পতিদারদের স্থানান্তরের ক্ষতি এবং ভবিষ‍্যৎ সম্ভাবনা উপলব্ধি করে, বিজেপি গত বছর তাদের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপানিকে পতিদার নেতা ভূপেন্দ্রভাই প্যাটেলের সঙ্গে প্রতিস্থাপন করেছিল। মার্চ মাসে, বিজেপি-নেতৃত্বাধীন গুজরাত সরকার ২০১৫ সালের পতিদার কোটা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত দায়ের করা ১০টি মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছিল, অবশ্য পতিদার আনামত আন্দোলন সমিতি আন্দোলন পুনরায় চালু করার হুমকি দেওয়ার পরে।

 

বিজেপিতে হার্দিক যোগ দেবেন কি না, তা সময়ই বলবে, তবে কেন তিনি হাত ছাড়লেন, তা নিয়েও চলছে কাঁটাছেঁড়া। দিল্লির অন্দরে এমনও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, জেলে যাওয়ার ভয়েই হাত ছাড়লেন হার্দিক। পতিদার নেতার এই দলত্যাগের পর প্রত্যাশিতভাবে আক্রমণের পথে নেমেছ গুজরাত কংগ্রেস। রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি জগদীশ ঠাকুর বৃহস্পতিবার হার্দিকের দলত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, হার্দিকের বিরুদ্ধে যে দেশদ্রোহিতার মামলা চলছে, তার জন্য তাঁকে জেলে যেতে হতে পারে। সেই কারণে দলত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই পতিদার নেতা। পতিদারদের মন জয় করার চেষ্টা চালাচ্ছে সব দল, একথা যেমন ঠিক, তেমনই এই প্রশ্নও তুলছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা যে, হার্দিককে কি জেল জুজু দেখানো হয়েছিল? অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে সিবিআই জুজু দেখিয়ে হাত করার নজির বিজেপির আছে। তাহলে এই সম্ভাবনা নেহাতই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এখন প্রশ্ন হল পতিদার আন্দোলন হয়েছিল বিজেপির বিরুদ্ধে, এখন হার্দিক বিজেপিতে যোগ দিলে, তাঁর নেতা হিসেবে নৈতিকতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না?

 

এদিকে আপও কিন্তু চুপ করে বসে নেই। গত মাসেই তারা হার্দিকের জন্য আমন্ত্রণপত্র ছাপিয়ে রেখেছে। আগেই হার্দিককে আমন্ত্রণ জানিয়েছে আম আদমি পার্টি। দলের গুজরাত শাখার প্রধান গোপাল ইটালিয়া বলেছিলেন, আপের সঙ্গে হার্দিকের ‘মানসিকতার মিল হবে’। কংগ্রেসে হার্দিকের মতো ‘আদর্শবাদী কর্মীর’ স্থান নেই।

 

গোপালের কথায়, “হার্দিক প্যাটেল যদি কংগ্রেসে থাকতে না পারেন, তিনি আপে যোগ দিতে পারেন। কংগ্রেসে থেকে তিনি সময় নষ্ট করছেন। বরং তিনি আমাদের দলের হয়ে কাজ করুন। কংগ্রেসে তাঁর মতো আদর্শবাদী কর্মীর জায়গা নেই।” এক্ষেত্রে কিন্তু সেই পতিদার ফ্যাক্টর এবং ভোট বড় বালাই। তবে হার্দিক এখনও পরিষ্কার করেননি, তিনি কোন দলে শেষ পর্যন্ত যোগ দেবেন।

 

সবশেষে একথা বলাই যায়, পতিদারদের ছাড়া গুজরাতে কুর্সি দখল সম্ভব নয়। একথা ভালোই জানে কংগ্রেস, বিজেপি এবং আপও। তাই যে যার মতো করে পতিদারদের সামনে রেখে ভোটের অঙ্ক কষা শুরু করে দিয়েছে। কার ভাগ্যে শিঁকে ছেড়ে তা সময়ই বলবে। তবে এই নিয়ে রাজনৈতিক প্রেডিকশন শুরু হবে আরও কিছুদিন পর।

 

More Articles

;