পিস বন্ড কী, কেন দিতে হয়? নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঔপনিবেশিক আমলের আইন
Peace Bond: শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলেই কি দিতে হবে পিস বন্ড? AISA-র জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার আপত্তিতে নতুন করে বিতর্কে ঔপনিবেশিক আমলের প্রতিরোধমূলক আইন। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীন ভারত, CrPC থেকে BNSS—কীভাবে বদলেছে এই আইনি ব্যবস্থা? কেন কাউকে ১০ হাজার টাকার মুচলেকা দিতে বলা হয়? কী বলছে আইন?
কোনও আন্দোলন, মিছিল বা প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিলেই কি কাউকে শান্তি বজায় রাখার মুচলেকা দিতে বলা যায়? সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা বা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করাকে কি শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা হিসেবে দেখা যেতে পারে? সম্প্রতি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA)-এর জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার পিস বন্ডে সই করতে অস্বীকার করার ঘটনায় এই প্রশ্নগুলিই নতুন করে সামনে এসেছে। তাঁর বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক অধিকার। অথচ সেই প্রতিবাদকেই শান্তিভঙ্গের সম্ভাবনা হিসেবে চিহ্নিত করে পিস বন্ড দিতে বলা হলে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নেহা বোরার ঘটনায় কী হয়েছিল?
২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর দিল্লির মান্ডি হাউস এলাকায় SIR বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন নেহা বোরা। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। ওই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার পর দিল্লি পুলিশ তাঁকে আটক করে।
পরের দিন, ১৭ অক্টোবর, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (BNSS) ১২৬ নম্বর ধারায় তাঁকে নোটিস পাঠানো হয়। বলা হয়, ১৯ অক্টোবর বিশেষ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হয়ে তাঁকে ব্যাখ্যা দিতে হবে, কেন ১০ হাজার টাকার ব্যক্তিগত বন্ড এবং একজন জামিনদার-সহ মুচলেকা দিতে হবে না। তদন্ত চলাকালীন শান্তি বজায় রাখার জন্যই এই শর্ত দেওয়া হয়েছিল।
নেহা এই নোটিসকে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। ২৩ অক্টোবর আদালত তাঁর আবেদন খারিজ করে দেয়। তবে আদালত তাঁকে মুচলেকা দিতে বাধ্য করেনি; বরং ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে চলা তদন্তে অংশ নেওয়ার কথা বলে। পরদিন, ২৪ অক্টোবর, সাংবাদিক বৈঠক করে নেহা জানান, তিনি পিস বন্ডে সই করবেন না। তাঁর প্রশ্ন, ''আমি কাদের শান্তি বজায় রাখতে বাধ্য হচ্ছি?''
তাঁর বক্তব্য, সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা বা শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করাকে শান্তিভঙ্গের কারণ হিসেবে দেখানো যায় না। প্রতিবাদের অধিকারকে খর্ব করতে এই আইনের ব্যবহার করা উচিত নয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Neha Bora Interview: দিল্লিতে পুলিশি দমনপীড়ন থেকে কলকাতার রাজপথ—রাষ্ট্রীয় আঘাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছাত্র-যুবদের স্বতঃস্ফূর্ত লড়াই গড়ে তুলেছে এক অনন্য প্রতিরোধ। উত্তরাখণ্ডের রক্ষণশীল পরিমণ্ডল ভেঙে উঠে আসা বামপন্থী আন্দোলনকর্মী নেহা বোরার চোখে এই সংগ্রাম স্রেফ ক্ষোভের বহির্প্রকাশ নয়, বরং অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার এক দীর্ঘ পথচলা। স্বস্তিক চৌধুরীর সঙ্গে কথাবার্তায় তিনি তুলে ধরলেন আন্দোলন, পুলিশের লাঠি এবং গণসংগ্রামের নানা দিক নিয়ে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি।
পিস বন্ড কী? কেন দিতে বলা হয়?
পিস বন্ড বা Peace Bond হল শান্তি বজায় রাখার আইনি মুচলেকা। সহজ কথায়, কোনও ব্যক্তির কাজকর্মের কারণে ভবিষ্যতে এলাকায় অশান্তি, সংঘর্ষ বা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে প্রশাসন মনে করলে তাঁকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শান্তি বজায় রাখার অঙ্গীকার করতে বলতে পারে।
এটি কোনও ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দেওয়া শাস্তি নয়। বরং কোনও অপরাধ ঘটার আগেই সম্ভাব্য অশান্তি আটকানোর জন্য এই ব্যবস্থা। অর্থাৎ, কেউ ইতিমধ্যে অপরাধ করেছেন, এমন প্রমাণ থাকা বাধ্যতামূলক নয়। তবে শুধুমাত্র পুলিশের সন্দেহ বা ব্যক্তিগত বিরাগের ভিত্তিতে এমন নির্দেশ দেওয়া যায় না। সম্ভাব্য শান্তিভঙ্গের যথেষ্ট কারণ এবং তার সমর্থনে নির্দিষ্ট তথ্য থাকা প্রয়োজন।
এখানে ব্যক্তিগত বন্ড ও জামিনদার-সহ বন্ডের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ব্যক্তিগত বন্ডে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেই নির্দিষ্ট শর্ত মানার অঙ্গীকার করেন। অন্যদিকে, জামিনদার-সহ বন্ডে আরও একজন ব্যক্তি তাঁর হয়ে আর্থিক দায়ের নিশ্চয়তা দেন। বন্ডে ১০ হাজার টাকা লেখা থাকলেই শুরুতে সেই টাকা জমা দিতে হয় না। শর্ত ভাঙলে আইন মেনে সেই অর্থ বাজেয়াপ্ত বা আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
স্বাধীনতার আগে কীভাবে ব্যবহার হত?
পিস বন্ডের ধারণার শিকড় ব্রিটিশ শাসনেরও আগের ইংল্যান্ডের আইনে। ১৩৬১ সালের Justices of the Peace Act-এ সম্ভাব্য অশান্তি ঠেকাতে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের কাছ থেকে শান্তি বজায় রাখার নিশ্চয়তা নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ব্রিটিশরা ভারতে ঔপনিবেশিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার পর একই ধরনের প্রতিরোধমূলক আইনি ব্যবস্থা এ দেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় নিয়ে আসে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Neha Bora's Kolkata Visit and Mohan Bhagwat's Outreach: যন্তর মন্তরের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ নেহা বোরা কলকাতায় এসে এনটিএ বাতিল ও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ প্রত্যাহারের দাবিতে ছাত্র-যুবদের সংগঠিত করার বার্তা দিতে পারেন বলে জল্পনা। একই সময়ে ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে কর্মসূচি নিচ্ছে আরএসএসও। নতুন প্রজন্মকে ঘিরে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক-আদর্শিক অবস্থানের লড়াই কতটা প্রভাব ফেলবে?
১৮৬১ সালের ফৌজদারি কার্যবিধিতে ম্যাজিস্ট্রেটদের এই ধরনের বন্ড নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। পরে ১৮৭২ সালের আইনের ৪৯১ নম্বর ধারা এবং ১৮৮২ সালের আইনের ১০৭ নম্বর ধারার মাধ্যমে এই ব্যবস্থা আরও স্পষ্ট হয়। ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধিতেও ১০৭ নম্বর ধারা বজায় থাকে।
ব্রিটিশ আমলে এই ধরনের আইনের ব্যবহার শুধু সম্ভাব্য সংঘর্ষ ঠেকানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক এবং প্রতিবাদীদের নিয়ন্ত্রণেও প্রতিরোধমূলক আইনের প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ বাল গঙ্গাধর তিলকের ঘটনা। ১৯১৬ সালে স্বরাজের দাবিতে বক্তৃতা ও রাজনৈতিক প্রচারের কারণে ব্রিটিশ প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক আইনি ব্যবস্থা নেয়। তাঁকে ১০ হাজার টাকা করে দু'জন জামিনদার-সহ এক বছরের জন্য বন্ড দিতে বলা হয়েছিল। তিলকের হয়ে মামলা লড়েছিলেন মহম্মদ আলি জিন্না। ৯ নভেম্বর ১৯১৬ বম্বে হাই কোর্ট সেই নির্দেশ খারিজ করে জানায়, স্বরাজের পক্ষে কথা বলা নিজে থেকে বেআইনি নয়। উল্লেখ্য, তিলকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধারাটি ছিল ১৮৯৮ সালের CrPC-র ১০৮ নম্বর ধারা, ১০৭ নয়। তবে দুটি ধারাই ছিল প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ।
স্বাধীনতার পরেও কেন রয়ে গেল এই আইন?
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও পিস বন্ডের ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়নি। ১৯৭৩ সালে নতুন ফৌজদারি কার্যবিধি বা CrPC চালু হলে ১০৭ নম্বর ধারায় এই ক্ষমতা বজায় রাখা হয়। ১৯৭৮ সালে সংশোধনের মাধ্যমে জামিনদার-সহ বা জামিনদার ছাড়া বন্ড দেওয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Neha Bora Jadavpur University: নেহার কথায়, “আমার গলার অবস্থা, আমার শরীরের অবস্থা যা—ঠিক একই পরিস্থিতি আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের (SRFTI)। আর এই যন্ত্রণা যদি কেউ বুঝতে পারে, তবে দিল্লির রাজপথে যাদের রক্ত ঝরেছে, যাদবপুরে যাদের উপর হামলা হয়েছে, এসআরএফটিআই-তে যাদের উপর আক্রমণ হয়েছে—আমরাই একে অপরের ব্যথা সবচেয়ে ভালো বুঝি।”
১৯৭০ সালে সমাজবাদী নেতা মধু লিমায়েকেও শান্তি বজায় রাখার বন্ড দিতে বলা হয়েছিল। তিনি তাতে আপত্তি জানান এবং বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। Madhu Limaye vs Sub-Divisional Magistrate মামলায় ১৯৭০ সালে সুপ্রিম কোর্ট প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সাংবিধানিক বৈধতা স্বীকার করলেও এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনি শর্ত ও প্রক্রিয়া মেনে চলার গুরুত্ব তুলে ধরে।
২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকার CrPC-র পরিবর্তে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS) চালু করে। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন আইন কার্যকর হয়। সেখানে পুরনো ১০৭ নম্বর ধারার পরিবর্তে ১২৬ নম্বর ধারায় শান্তি বজায় রাখার বন্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পিস বন্ডের শর্ত ও আইনি প্রক্রিয়া কী?
BNSS-এর ১২৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তির কারণে শান্তিভঙ্গ বা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য শান্তি বজায় রাখার বন্ড দিতে বলতে পারেন। তবে এর জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে।
নির্দিষ্ট কারণ থাকতে হবে: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কার যথেষ্ট তথ্য থাকতে হবে। শুধু অনুমান বা ব্যক্তিগত অভিযোগ যথেষ্ট নয়।
লিখিত নোটিস দিতে হবে: BNSS-এর ১৩০ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কেন বন্ড দিতে বলা হচ্ছে, তার কারণ জানিয়ে লিখিত নির্দেশ দিতে হবে।
নিজের বক্তব্য জানানোর সুযোগ: সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের পক্ষে যুক্তি ও প্রমাণ পেশ করতে পারবেন। তাঁর বক্তব্য না শুনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
তদন্ত ও শুনানি: ১৩৫ নম্বর ধারায় তদন্তের ব্যবস্থা রয়েছে। তদন্তের ভিত্তিতে ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্ধান্ত নেবেন, আদৌ বন্ডের প্রয়োজন রয়েছে কি না।
সময়ের সীমা: ১২৬ নম্বর ধারায় বন্ডের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর হতে পারে।
শর্ত ভাঙলে ব্যবস্থা: আইনসম্মতভাবে বন্ড দেওয়ার নির্দেশের পর তা দিতে অস্বীকার করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কারাবাস হতে পারে। বন্ড দেওয়ার পর তার শর্ত ভাঙলেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।






